শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৫ ২২:১৭

বাবার সোনালি স্মৃতি

শমী কায়সার

বাবার সোনালি স্মৃতি

বাবাকে নিয়ে আমার নিজের পোক্ত কোনো স্মৃতি নেই। মা এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেছি বাবার কথা। বাবার বই পড়েছি। ১৪ ডিসেম্বরের কথা বলতে গেলেই মায়ের চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠত। বাবার কথা মনে পড়লে আমারও ভীষণ কান্না পায়। শুনেছি ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যার সেই ভয়াল গল্প। তখন আমাদের বাসা ছিল পুরান ঢাকার কায়েতটুলিতে। বাবা বাসাতেই ছিলেন। তিনি মোমবাতি জ্বালিয়ে বিবিসি শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। মা আমাকে কোলে নিয়ে মেঝেতে বসেছিলেন। আর আমি নাকি ফিডারে করে দুধ খাচ্ছিলাম। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। বাবা বারবারই মাকে বলছিলেন, আমরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছি। পাকিস্তানিরা এখন পালানোর পথ খুঁজছে। সবই মায়ের মুখে শোনা। পরবর্তীতে পত্র-পত্রিকায়ও এসেছে। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক করে কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ছোট চাচা [ওবায়দুল্লা] এসে বাবাকে বললেন, ‘বড়দা, দরজায় কে যেন কড়া নাড়ছে, খুলে দেব?’ বাবা নাকি তখন উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন। চিত্কার করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে, তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দাও’ এ কথা বলে তিনি আলমারি খুলে টাকা বের করলেন মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়ার জন্য। কিন্তু এর পরের ঘটনা পুরোটাই অপ্রত্যাশিত। মুক্তিযোদ্ধা নয়, চার-পাঁচজন লোক কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে ঘরে প্রবেশ করল। তারা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল, ‘শহীদুল্লাহ কায়সার কে’ বাবা এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমিই শহীদুল্লাহ কায়সার।’ সেই কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকগুলো তার হাত ধরে নিয়ে যেতে শুরু করল। সঙ্গে সঙ্গে মা আমাকে রেখে বাবার হাত চেপে ধরলেন। অন্য ঘর থেকে ছোট ফুফুও দৌড়ে এলেন। তিনিও বাবার হাত চেপে ধরেছিলেন। কিন্তু তারা শত শক্তি প্রয়োগ করেও ধরে রাখতে পারলেন না । আল-বদররা স্ত্রী ও বোনের হাতের বাঁধন ছিন্ন করে ধরে নিয়ে গেল তাকে। যাওয়ার সময় তিনি স্ত্রী ও বোনের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলেছিলেন, ‘ভালো থেকো’। শুনেছি এক মুহূর্তের জন্য করুণ চোখে আমার দিকেও নাকি তাকিয়েছিলেন। কারফিউর অন্ধকারে তিনি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন। তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মৃতদেহও পাওয়া যায়নি। খুব কষ্ট হয় যখন বাবার কথা ভাবি। এভাবে আমাকে একা রেখে তিনি অন্ধকারের অতলে হারিয়ে গেছেন ভাবতেই মনটা যেন কেমন করে ওঠে। তবু দেশের কথা ভেবে, দশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন বলে গর্ববোধও হয়। একজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান হিসেবে আমি গর্ববোধ করি।


আপনার মন্তব্য