শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ জানুয়ারি, ২০২০ ২২:১৮

কম্পিউটারের যত গল্প

তানিয়া তুষ্টি

কম্পিউটারের যত গল্প

অবাক তথ্য

- ১৯৪৫ সালে তৈরি হওয়া প্রথম ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটারের ওজন ছিল ২৭ টন। এটি ১৮০০ স্কয়ার ফিট জায়গাজুড়ে থাকত।

 

- ১৯৬৪ সালে প্রথম কম্পিউটার মাউস ডগ এঞ্জেলবার্ট কাঠ দিয়ে বানানো হয়।

 

- প্রতি মাসে ৫ হাজারের ওপরে ভাইরাস তৈরি হয়।

 

- ১৯৭৯ সালে প্রথম হার্ড ডিস্ক তৈরি হয়, যার ধারণ ক্ষমতা ছিল মাত্র ৫ এমবি।

 

- ১৯৮০ সালে তৈরি হয় ১ জিবি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন হার্ড ডিস্ক যার মূল্য ছিল ৪০ হাজার ডলার এবং ওজন ছিল ৫৫০ পাউন্ড।

 

- বিশ্বের প্রথম ওয়েব সাইটের নাম ছিল   http://www.symbolics.com

 

- প্রথম জনপ্রিয় ব্রাউজারের নাম মোজাইক।

 

- বিশ্বের মোট মুদ্রার মাত্র ৮ শতাংশ ফিজিক্যাল, বাকি টাকা ভার্চুয়াল।

 

- ১৯৩৬ সালে রাশিয়া প্রথম কম্পিউটার তৈরি করে যেটা চলত পানিতে।

 

- যদি মানুষের মস্তিষ্কের মতো শক্তিশালী কম্পিউটার থাকে তবে এটি প্রতি সেকেন্ডে ৩৮ হাজার ট্রিলিয়ন অপারেশন করতে সক্ষম হবে এবং ৩ হাজার ৫৮০ টেরাবাইটেরও বেশি মেমরি ধারণ করতে সক্ষম হবে।

 

- টানা ৮ বছর ধরে ০০০০০০০০ ছিল মার্কিন নিওক্লিয়ার মিসাইল কন্ট্রোলার কম্পিটারের পাসওয়ার্ড।

 

- ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরের আগ পর্যন্ত ডোমেইন রেজিট্রেশন ফ্রি ছিল।

 

- ক্রিপার ভাইরাস ছিল প্রথম ভাইরাস যেটি ১৯৭১ সালে বব থমাস দ্বারা তৈরি হয়।

 

অনুপ্রেরণার সেই অ্যাবাকাস

আজকের দিনে সব সমস্যার সমাধান যে কম্পিউটারের কাছে তার সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা হয়েছিল অ্যাবাকাস। অ্যাবাকাস ছিল পাটিগাণিতিক গণনা সম্পাদনের একটি প্রাচীন যন্ত্র, যাতে একটি কাঠের ফ্রেমে বসানো তারে লাগানো গুটি ওপরে নিচে সরিয়ে গণনা করা হয়। ফ্রেমে বসানো একটি তারের ওপর গুটিগুলো বসানো থাকে। তারগুলোর সঙ্গে লম্বভাবে একটি আড়াআড়ি দ- থাকে যা গুটিগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে। প্রতিটি তার দশমিক ব্যবস্থার একটি ঘর নির্দেশ করে। সবচেয়ে ডানদিকের তারটি হলো এককের ঘর। তার বাম পাশেরটি হলো দশকের ঘর, ইত্যাদি। অনেক প্রাচীন সভ্যতা অ্যাবাকাস ব্যবহার করত। রোমানদের অ্যাবাকাস ছিল  ব্রোঞ্জ নির্মিত লিপিফলক। লিপিফলকটি খাঁজকাটা ছিল। গোলাকৃতির গুটিগুলো গড়িয়ে যেতে পারত। রোমানদের অ্যাবাকাস পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যে এবং দূরপ্রাচ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে অ্যাবাকাসের একটি সরলীকৃত রূপ ব্যবহার করা হতো। দ্বিতীয় শতকে চীন দেশের সাহিত্যে অ্যাবাকাস ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে চীন দেশে অ্যাবাকাস তেমন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। রোমান অ্যাবাকাস এবং চৈনিক অ্যাবাকাসের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে জাপানে অ্যাবাকাসের ব্যবহার শুরু হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এর একটি উন্নত সংস্করণ প্রচলন হয়। চীন ও জাপানের কিছু কিছু অঞ্চলে এখনো অ্যাবাকাসের প্রচলন আছে।

 

ইতিহাসে প্রথম

প্রথম কম্পিউটার এনিয়াক হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক নিউমেরিক্যাল ইন্টিগ্রেটর অ্যান্ড কম্পিউটারের শর্ট ফর্ম। এর পর থেকেই আকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে কম্পিউটার প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী একটি পুরোপুরি ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটার নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। এ উদ্দেশ্যে আধুনিক কম্পিউটারের জনক ভন নিউম্যান, প্রেসপার জুনিয়র এবং হারম্যান গোল্ডস্টেইনের মতো কম্পিউটার মহারথী মুর স্কুল অব ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন। ৫ লাখ ডলার ব্যয়ে তৈরি করেন এনিয়াক। এর প্রাথমিক নকশা করা হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যালাস্টিক রিসার্চ ল্যাবরেটরির আর্টিলারি ফায়ারিং টেবিল গণনা করার জন্য। প্রথম গবেষণা ছিল তাপবিদ্যুৎ অস্ত্র নিয়ে। নির্মাণে সময় লাগে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। সে বছরের ১০ ডিসেম্বর ব্যবহার শুরু হয়। তারপর এই ৫০ ফুট বাই ৩০ ফুটের ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে চল্লিশজন বিজ্ঞানী তিন দেয়ালজুড়ে থাকা এই কম্পিউটার চালাতেন। ১৯৪৬ সালে পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎসর্গ করা হয়। এনিয়াক হয়ে ওঠে অন্যান্য মেকানিক্যাল মেশিনের চেয়ে এক হাজার গুণ দ্রুত গতির। একজন মানুষের ২০ ঘণ্টার কাজকে এনিয়াক ১ ঘণ্টায় করতে পারত। আর সেজন্য এনিয়াকে আরও নতুনত্ব সংযোজনে সমসাময়িক বিজ্ঞানী ও শিল্পপতিদের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। ১৯৮৬ সালের ৬ নভেম্বর স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণে চলে যায়।

 

এখনো বিস্মিত করে শুরুর কথা

কম্পিউটার আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা আসে অনেক আগে থেকে। তবে স্ট্রাকচারাল কম্পিউটারের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। এমনকি ১০০ বছরও হয়নি। এরই মধ্যে ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। কিন্তু শুরুর কথা এখনো সবার মাঝে বিস্ময় জাগায়। মজার বিষয় হলো, আজকের একটি স্মার্ট ফোন নাসার চন্দ্র অভিযানের অ্যাপোলো-১১ এ ব্যবহৃত কম্পিউটারের চেয়েও ৩ থেকে ৪ হাজার গুণ বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন। আর মেমরি ধারণক্ষমতা বেড়েছে ৪০ লাখ গুণ বেশি! মেমরি হিসেবে ব্যবহার করা হতো বড় বড় টিউব। আর ডাটা স্টোর করা হতো বিশাল সব টেপ ড্রাইভে। তখনকার কম্পিউটারগুলো ছিল বিশাল আকারের। এখন ভাবার বিষয়, ১০০ বছর পরে এই কম্পিউটার প্রযুক্তি যন্ত্রনির্ভর মানব সভ্যতাকে কোথায় নিয়ে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন মিলিটারি কাজে কম্পিউটারের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। ফলে ১৯৪৫ সালের পরে এসে কম্পিউটার গবেষণায় মনোযোগী হয়ে ওঠে দেশগুলো। সেই প্রথম মানুষ বুঝতে পারে তথ্য বা ইনফরমেশন একটি শক্তি।

 

বিবর্তনের ধারা...

উৎকর্ষতার শীর্ষে থাকা প্রযুক্তির অন্যতম ধারক হলো কম্পিউটার। আজকের সুপারফাস্ট মডেলের একটি কম্পিউটার দিয়ে কিনা সম্ভব, জটিল-কঠিন ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সব বিষয়ের সমাধান হচ্ছে খুব সহজে আর অল্প সময়ে। বলতে গেলে দৈনন্দিন জীবন যাপনের সিংহভাগই নির্ভর করছে কম্পিউটারের ওপর। একদিনেই কম্পিউটার এমন নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি। এই পর্যায়ে আসতে যাত্রা শুরু করেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগে। তখন গণনার যন্ত্র হিসেবে উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রচেষ্টাকে কম্পিউটারের ইতিহাস হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন কালে মানুষ একসময় সংখ্যা বুঝানোর জন্য ঝিনুক, নুড়ি পাথর, দড়ির গিঁট ইত্যাদি ব্যবহার করত। পরবর্তীতে গণনার কাজে বিভিন্ন কৌশল ও যন্ত্র ব্যবহার করে থাকলেও অ্যাবাকাসকে কম্পিউটারের ইতিহাসে প্রথম যন্ত্র হিসেবে ধরা হয়। এটি আবিষ্কৃত হয় খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সালে ব্যবিলনে। সূচনা পর্বে অ্যাবাকাস ছিল শুধু একটি গণনা যন্ত্র। খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অথবা ৫০০ অব্দে মিসরে বা চীনে গণনা যন্ত্র অ্যাবাকাস তৈরি হয়। ১৬৪২ সালে ১৯ বছর বয়স্ক ফরাসি বিজ্ঞানী ব্লেইজ প্যাসকেল সর্বপ্রথম যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর আবিষ্কার করেন। দাঁতযুক্ত চাকা বা গিয়ারের সাহায্যে যোগ বিয়োগ করত সেই ক্যালকুলেটর। ১৬৭১ সালের জার্মান গণিতবিদ গটফ্রাইড ভন লিবনিজ প্যাসকেলের যন্ত্রের ভিত্তিতে চাকা ও দ- ব্যবহার করে গুণ ও ভাগের ক্ষমতাসম্পন্ন আরও উন্নত রিকোনিং নামের যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈরি করেন। পরে ১৮২০ সালে টমাস ডি কোমার রিকোনিং যন্ত্রের পরিমার্জন করে লিবনিজের যন্ত্রকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর ১৯৪৫ সালে পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার এনিয়াক আসে। এটিই প্রথম প্রোগ্রাম ঢুকানোর মতো ডিজিটাল কম্পিউটার। তবে এনিয়াকের ধারণা আসে ১৮৩৩ সালে চার্লস ব্যাবেজের আবিষ্কৃত ডিফারেন্স ইঞ্জিন থেকে।

কম্পিউটার বিজ্ঞানের সত্যিকার সূচনা হয় অ্যালান টুরিংয়ের প্রথমে তাত্ত্বিক ও পরে ব্যবহারিক গবেষণার মাধ্যমে। বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে আধুনিক কম্পিউটারের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। ১৯৭১ সালে মাইক্রোপ্রসেসর উদ্ভাবনের ফলে মাইক্রোকম্পিউটারের দ্রুত বিকাশ ঘটতে থাকে। বাজারে প্রচলিত হয় বিভিন্ন প্রকৃতি ও আকারের কম মূল্যের অনেক রকম পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি।

 

সর্বক্ষেত্রে সবার আগে

মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে কম্পিউটার। সেজন্য কম্পিউটার কী কাজে ব্যবহার হয় তার উত্তর না খুঁজে কোথায় ব্যবহার হয় না তার উত্তর খোঁজা হয়তো সহজ। বর্তমানে কম্পিউটার ছাড়া উন্নত ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন, গবেষণা, টেলিযোগাযোগ, প্রকাশনা কল্পনা করা যায় না। মূলত মানুষ তার কাজের উন্নয়নের জন্য কম্পিউটারকে কাজে লাগায়। যেমন অফিস ব্যবস্থাপনা, শিল্প ক্ষেত্রে, মুদ্রণ শিল্পে, যোগাযোগ ব্যবস্থায়, চিকিৎসা ক্ষেত্রে, গবেষণায়, ব্যাংকিং খাতে, আদালত, সামরিক ক্ষেত্রে, অর্থবাজারে, কৃষি ক্ষেত্রে, সংস্কৃতি ও বিনোদনে, তথ্য পরিসংখ্যানে, ডিজাইনে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এক কথায় কম্পিউটার ব্যবহৃত হয় সর্বত্র। পড়ার টেবিল থেকে ভিডিও লাইব্রেরি, অফিস, ডিপার্টমেন্ট সেন্টার ও হোটেল থেকে শুরু করে সর্ব ক্ষেত্রে কম্পিউটার ব্যবহার দিনকে দিন অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে চলেছে।

 

দামি কম্পিউটার এমজে

বিশ্বের সবচেয়ে দামি কম্পিউটার এমজের সরোভস্কি এবং ডায়মন্ড স্টুডেড নোটবুক। ইউক্রেনীয় আর্ট স্টুডিও এমজে বিলাসবহুল গেজেট পাগলদের জন্য অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত একটি ল্যাপটপ এনেছে বাজারে। এটিকে তারা সাজিয়েছে হীরার টুকরো আর স্বর্ণ দিয়ে। এর দাম হাঁকানো হয়েছে ৩.৫ মিলিয়ন ডলার। এই পর্যন্ত বাজারে আসা সবচেয়ে দামি কম্পিউটার এটি। বাজারে থাকা অন্যান্য দামি ব্র্যান্ড আসুস, ল্যাম্বারগিনি প্লাটিনাম ক্রোকোডাইল, এসিয়ার ফেরারি গোল্ড পাইথন, সনি ভাইয়ো ব্ল্যাক উড, আসুস এপেক ভিআইপি সরোভস্কি শ্রেণির ধরা হয়। বিলাসবহুল ল্যাপটপের কিছু অংশে যুক্ত হয়েছে সাপ আর কুমিরের চামড়া, সোনার মাউসসহ আরও অনেককিছু।

 

প্রথম ইন্টারনেট সংযোগ

১৯৬৮ সালে শুরু হয় প্রথম ইন্টারনেট প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের প্রাথমিক পর্যায়ে নাম ছিল Arpanet, এটি শুরু হয় আমেরিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনী ও সরকারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে তথ্য আদান-প্রদান করা। Arpanet network সিস্টেম পরবর্তীতে Internet নাম ধারণ করে বিশ্বের একমাত্র আধিপত্য স্থাপন করে চলেছে। ১৯৬৯ সালে ২১ নভেম্বর (Interface message processor) IMP এর সহায়তায় দূরবর্তী ২টি কম্পিউটারের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। IPM # ১ কম্পিউটারটির অবস্থান ছিল লস এঞ্জেলসে এবং IPM # ২ কম্পিউটারটির অবস্থান ছিল ক্যালিফোর্নিয়ার মেনলো পার্কের Stanford Research Institute-G।

 

প্রজন্মে প্রজন্মে অনেক তফাত

১৯৪২ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে যেসব কম্পিউটার তৈরি হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটার। এগুলোর মূল যন্ত্রাংশ ছিল ভ্যাকুয়াম টিউব। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে এসব কম্পিউটারের নানা সুবিধা থাকলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এগুলোর কিছু অসুবিধাও ছিল। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে যেসব কম্পিউটার পাওয়া যেত সেগুলোকে বলা হতো দ্বিতীয় প্রজন্মের কম্পিউটার। এগুলো উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ভ্যাকুয়াম টিউবের বদলে ট্রানজিস্টর লাগানো হয়। এই কম্পিউটারগুলোর যন্ত্রাংশ ছিল আকারে তুলনামূলকভাবে ছোট। এরপর এলো তৃতীয় প্রজন্ম। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৫ সালে এগুলো বাজারে এলো। বিবর্তনের পথ ধরেই নিরন্তর গবেষণার মধ্য দিয়ে আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটাল তৃতীয় প্রজন্মের কম্পিউটারে। তৃতীয় প্রজন্মের কম্পিউটারে জায়গা নিল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি), যা সাধারণত সিলিকনের একটি মাত্র টুকরোর ওপরে তৈরি অতি ক্ষুদ্র স্থানে সীমাবদ্ধ বিদ্যুৎ সঞ্চালন চক্র। যে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আইসির এই ব্যবহার, তার নাম দেওয়া হয় লার্জ স্কেল ইন্টিগ্রেশন (এলএসআই) টেকনোলজি। ১৯৭৫ ও তার পরবর্তী সময় তৃতীয় প্রজন্মের এলএসআই প্রযুক্তির বদলে চতুর্থ প্রজন্মের কম্পিউটারে ব্যবহার করা হলো ভেরি লার্জ স্কেল ইন্টিগ্রেশন টেকনোলজি বা ভিএসএলআই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির ভিত্তিতে কম্পিউটারে বসানো হলো মাইক্রো প্রসেসর। স্বভাবতই এর ব্যবহারিক সুবিধা বেড়ে গেল অনেক গুণ। উৎপাদন ব্যয় অনেকটা কমে এলো। তথ্য বিন্যাস সহজ হলো, স্মৃতিশক্তি খুব জোরালো হলো এবং এগুলো আকারে বেশ ছোট করা হলো। বিদ্যুৎ খরচ কমে এলো অনেক। এখন পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার তৈরির কাজে ব্যস্ত, চলছে আরও উন্নত ও পরিমার্জিত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গবেষণা। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে অপটিক ফাইবার প্রযুক্তির প্রয়োগ।

 

রকমফের

গঠন ও প্রচলন নীতির ভিত্তিতে কম্পিউটারকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। অ্যানালগ, ডিজিটাল ও হাইব্রিড কম্পিউটার। আকার, সামর্থ্য, দাম ও ব্যবহারের গুরুত্বের ভেদে ডিজিটাল কম্পিউটারকে আবার ৪ ভাগে ভাগ করা যায়। ১. মাইক্রো, ২. মিনি, ৩. মেইনফ্রেম ও ৪. সুপার কম্পিউটার। মাইক্রো কম্পিউটারগুলোরও আছে ২টি ভাগ। যেমন-ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ। এনালগ কম্পিউটার একটি রাশিকে অপর একটি রাশির সাপেক্ষে পরিমাপ করতে পারে। এটি উষ্ণতা বা অন্যান্য পরিমাপ যা নিয়মিত পরিবর্তিত হয় তা রেকর্ড করতে পারে। অপরদিকে ডিজিটাল কম্পিউটার দুই ধরনের বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ দ্বারা সব কিছু প্রকাশ করা হয়। এটি যে কোনো গণিতের যোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। এদিকে হাইব্রিড কম্পিউটার এনালগ ও ডিজিটাল কম্পিউটারের সর্বোত্তম বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বয়ে গঠিত। এটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহার করা হয়। মাইক্রো কম্পিউটারকে পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি বলেও অভিহিত করা হয়। এতে ইন্টারফেস চিপ, একটি মাইক্রোপ্রসেসর, সিপিইউ, র‌্যাম, রম, হার্ডডিস্ক ইত্যাদি থাকে। দৈনন্দিন জীবনের সর্বক্ষেত্রে এ কম্পিউটারের ব্যবহার দেখা যায়। অপরদিকে মিনি কম্পিউটার টার্মিনালে লাগিয়ে প্রায় এক সঙ্গে অর্ধ শতাধিক ব্যবহারকারী ব্যবহার করতে পারে। মেইনফ্রেম কম্পিউটারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও বড় অ্যাপ্লিকেশনের জন্য ব্যবহার করে, যেমন জনসংখ্যা, শিল্প এবং ভোক্তা পরিসংখ্যান, এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স পরিকল্পনা এবং লেনদেন প্রক্রিয়াজাতকরণ। অত্যন্ত শক্তিশালী ও দ্রুতগতিসম্পন্ন কম্পিউটারকে সুপার কম্পিউটার বলে। এটির গতি প্রায় প্রতি সেকেন্ডে ১ বিলিয়ন ক্যারেক্টর। কোনো দেশের আদমশুমারির মতো বিশাল তথ্য ব্যবস্থাপনায় এটি ব্যবহার হয়। বর্তমানে এক ধরনের মাইক্রো কম্পিউটার হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ট্যাবলেট কম্পিউটার। এটি টাচস্ক্রিন সংবলিত প্রযুক্তি। এটি এনড্রয়েড এবং উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে চলে।

 

বৈপ্লবিক পরিবর্তন

আজ কম্পিউটার বলতে যে যন্ত্রটির চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা প্রযুক্তিগত বিবর্তনের দীর্ঘ পথ অতিক্রমের ফসল। এই বিবর্তনে একের পর এক যোগ হয়েছে- অ্যাবাকাস, প্যাসকালের যান্ত্রিক গণক,  চার্লস ব্যাবেজের ডিফারেন্সিয়াল ইঞ্জিন,  বৈদ্যুতিক সংখ্যা গণক বা ইলেক্ট্রনিক নিউমেরিক ইন্টিগ্রেটর অ্যান্ড ক্যালকুলেটর, সর্বজনীন স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার বা ইউনির্ভাসাল অটোমেটিক কম্পিউটার। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সাল থেকে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নানা ধাপ পেরিয়ে কম্পিউটার ও তার প্রযুক্তি অগ্রগতি অব্যাহত। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টেল করপোরেশন ১৯৭১ সালে মাইক্রোপ্রসেসর উদ্ভাবন করার পর বাজারে আসতে শুরু করে মাইক্রোপ্রসেসর ভিত্তিক কম্পিউটার। তখন থেকে কম্পিউটারের আকৃতি ও কার্যক্ষমতায় এক বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়। ১৯৮১ সালে বাজারে আসে আই বি এম কোম্পানির পারসোনাল কম্পিউটার বা পিসি। এর পর একের পর এক উদ্ভাবিত হতে থাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোপ্রসেসর এবং তৈরি হতে থাকে শক্তিশালী পিসি।

 

সুবিধা-অসুবিধার হিসাব-নিকাশ

দ্রুত গতিতে বিশাল পরিমাণ তথ্য প্রস্তুত করতে কম্পিউটারের জুড়ি নেই। মানুষের বিভিন্ন কাজে নির্ভুলভাবে সাফল্য এনে দিয়েছে কম্পিউটার। সুতরাং বলাই যায় কম্পিউটার আমাদের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে। কম্পিউটারের মাধ্যমে আপনি যে কোনো তথ্য মুহূর্তেই খুঁজে পেতে পারেন। কম্পিউটারের সুবিধা-অসুবিধা আলোচনার ক্ষেত্রে সুবিধার একটি বড় অংশ হলো ইন্টারনেট। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি স্থানের সঙ্গে যোগসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবেন। কম্পিউটারের আরেকটি সুবিধা মাল্টিমিডিয়া ডিভাইস। এতে বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করতে পারি যেমন- গান শোনা, গেমস খেলা ইত্যাদি। কম্পিউটারে প্রচুর পরিমাণ তথ্য জমা রাখা যায়। বিশ্বের ৬০ শতাংশ মানুষ অনলাইন বাণিজ্যের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করে থাকে। বিশ্বে ৫০ শতাংশ মানুষ এখন ওয়েবসাইট থেকে শিক্ষাগত জ্ঞান অর্জন করে। তবে কম্পিউটার ব্যবহারে সমাজে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যেমন- দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার ব্যবহার করলে চোখের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কম্পিউটারের নষ্ট পার্টগুলো থেকে বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়াতে পারে। অনেক মানুষ গেম খেলতে ও সামাজিক মাধ্যমে দীর্ঘসময় চ্যাট করার জন্য সময় ও শক্তি অপচয় করে থাকেন। অনেকে আছেন, যারা নেতিবাচক কাজকর্মের জন্য কম্পিউটার ব্যবহার করে থাকেন। তারা জনগণের ক্রেডিট কার্ডের নম্বরগুলো হ্যাক করে নেয়। আবার অনেক সময় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য চুরি করে তাদের বিপাকে ফেলে দেয়। কম্পিউটারের অন্যতম আবিষ্কার রোবটের ব্যবহারে সমাজে বেকারত্ব বাড়ছে।

 

 

 


আপনার মন্তব্য