Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৪ জুন, ২০১৬ ২৩:৩৯
ধর্মতত্ত্ব
রোজার মর্যাদা
মাওলানা মুফতি মো. ওলিউল্লাহ পাটওয়ারি
রোজার মর্যাদা

আল্লাহর করুণা, বরকত, ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির পয়গাম নিয়ে রমজানুল মোবারক আমাদের মাঝে সমাগত। বিশ্ব মুসলিমের কাছে এ মাসটি নেকি অর্জনের বসন্তকাল হিসেবে পরিচিত। এ মাসের একটি নফল ইবাদত অন্য মাসের একটি ফরজের সমান। এ ছাড়া একটি ফরজ অন্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান। এ ছাড়াও এ মাসের বিশেষ মর্যাদা হচ্ছে রোজার মাধ্যমে ইহকালীন সফলতা ও পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। রোজা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার ঢাল, জান্নাতে যাওয়ার উত্কৃষ্টতম উপায় এবং রাইয়ান নামক বিশেষ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ। হাদিস শরিফে আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত— ‘নবী করিম (সা.)  বলেছেন, জান্নাতের মধ্যে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কেবল কিয়ামতের দিন রোজাদার লোকেরা প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে, রোজাদার লোকেরা কোথায়, তখন তারা দাঁড়াবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যাতে এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে।’ রোজা গুনাহ মোচনের অন্যতম মাধ্যম। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও চেতনা সহকারে রোজা রাখবে আল্লাহ তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবেন।’ রোজা কিয়ামতের দিন মুমিন ব্যক্তির জন্য সুপারিশকারী হবে। হাদিসে আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রোজা এবং কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আমার রব! আমি তাকে দিনের বেলা পানাহার এবং যৌনক্রিয়া থেকে বিরত রেখেছি। তার সম্পর্কে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি। তার সম্পর্কে আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন এদের সুপারিশ কবুল করা হবে।’ রোজার পুরস্কার আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন। রোজার মাধ্যমে আচার-আচরণ ও চরিত্র সুন্দর হয়।

রোজা মানুষকে আখেরাতমুখী করে। সামাজিক সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। এটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে নিতান্ত গোপন ইবাদত তাই এর মাধ্যমে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়। রোজা দ্বারা প্রবৃত্তির ওপর আকলের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ এর দ্বারা মানুষের পাশবিক শক্তি অবদমিত হয় এবং রুহানি শক্তি বৃদ্ধি পায়। কেননা ক্ষুধা ও পিপাশার কারণে মানুষের জৈবিক ও পাশবিক ইচ্ছা হ্রাস পায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কারণে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হয় এবং অন্তর বিগলিত হয়। রোজার দ্বারা মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয়ভীতি এবং তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা তাকওয়া হাসিল করতে সক্ষম হও। রোজার দ্বারা মানুষের স্বভাবে নম্রতা ও বিনয় সৃষ্টি হয় এবং মানব মনে আল্লাহর আজমত ও মহানত্বের ধারণা জাগ্রত হয়। মানুষের দূরদর্শিতা আরও প্রখর হয় এবং মানব মনে এমন এক নূরানি শক্তি সৃষ্টি হয়, যার দ্বারা মানুষ সৃষ্টির ও বস্তুর গূঢ় রহস্য সম্বন্ধে অবগত হতে সক্ষম হয়।

রোজার বরকতে মানুষ ফেরেস্তা চরিত্রের কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধ এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। কেননা যে ব্যক্তি ক্ষুধার্ত ও পিপাসিত থাকেনি সে কখনো ক্ষুধার্ত মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারে না। অপরদিকে কোনো ব্যক্তি যখন রোজা রাখেন এবং উপবাস থাকেন তখন তিনি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারেন যে যারা অনাহারে ও অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, আর তখনই অনাহারক্লিষ্ট মানুষের প্রতি তার অন্তরে সহানুভূতির উদ্রেক হয়। রোজা পালন করা আল্লাহর প্রতি গভীর মহব্বতের অন্যতম নিদর্শন। কেননা কারও প্রতি মহব্বত জন্মালে, তাকে লাভ করার প্রয়োজনে প্রেমিক পানাহার বর্জন করে এবং সবকিছু ভুলে যায়, তাই রোজা হলো আল্লাহর মহব্বতের অন্যতম নিদর্শন। রোজা মানুষকে শয়তানের আক্রমণ থেকে হেফাজত করে। রোজা দ্বারা মানুষের শারীরিক সুস্থতা হাসিল হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীদের মতে, প্রত্যেক মানুষের জন্য বছরে কয়েক দিন উপবাস থাকা আবশ্যক। তাদের মতে, স্বল্প খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। সুফি-সাধকদের মতে, হূদয়ের স্বচ্ছতা হাসিলে স্বল্প খাদ্য গ্রহণের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। রোজা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এর কারণে শরীরে চর্বি জমতে পারে না।

লেখক : খতিব, বায়তুন নূর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, দক্ষিণ পীরেরবাগ, ঢাকা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow