Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৬ ২৩:৩২
ধর্মতত্ত্ব
হজ আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির অন্যতম মাধ্যম
মুফতি আইনুল ইসলাম কান্ধলবী
হজ আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্তির অন্যতম মাধ্যম

হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম বিধান। পবিত্র এ ঘরের হজ করা সেই মানুষদের জন্য মহান আল্লাহতায়ালার নির্ধারিত একটি ফরজ।   ইসলাম হজ ফরজ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত আরোপ করেছে— ১. মুসলমান হওয়া। ২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। ৩. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া। ৪. শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্যবান হওয়া। ৫. স্বাধীন হওয়া।

আর আমাদের প্রিয় নবী [সা.] হাদিস  শরিফে  বলেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বস্তুর ওপর রচিত। প্রথমত, এ ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করা যে আল্লাহতায়ালা ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ [সা.] আল্লাহর রসুল। দ্বিতীয়ত, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। তৃতীয়ত, জাকাত প্রদান করা। চতুর্থত, হজ সম্পাদন করা। পঞ্চমত, রমজান মাসে রোজা রাখা [বুখারি ও মুসলিম]। হজরত ইবন আব্বাস (রা.) হজরত উমর [রা.]-এর সূত্রে উল্লেখ করেছেন— জিবরাইল আলাইহিস সালাম আরজ করলেন, ইয়া রসুলুল্লাহ! আমাকে অবগত করুন ইসলাম কী? তিনি ইরশাদ করলেন এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। আর মুহাম্মদ [সা.] আল্লাহপাকের রসুল এবং নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, হজ ও উমরা করা, রমজানের রোজা পালন করা, জানাবাতের গোসল করা এবং অজু পূর্ণ করা।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম, ইয়া রসুলুল্লাহ! মহিলাদের ওপর কি জিহাদের দায়িত্ব রয়েছে? জবাবে রসুল [সা.] বলেন— তাদের ওপর এমন জিহাদ রয়েছে, যে জিহাদে হত্যাকাণ্ড নেই, মারামারি নেই। আর তা হলো হজ ও উমরাহ [ইবন মাজাহ শরিফ]।

সুতরাং আমরা যাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে, আমাদের জন্য উচিত সব রকমের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছেড়ে দিয়ে, মনের সর্বপ্রকার দুর্বলতা ছেড়ে দিয়ে সব ধরনের ভ্রান্ত ধারণা পরিত্যাগ করে হজের পাকাপোক্ত নিয়ত করে নিতে হবে। কারণ শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে হজের ব্যাপারে। এ বছর নয়, আগামী বছর। মানুষও শয়তানের জপ জপতে থাকে। এমনকি আমাদের চোখের সামনেই অনেক লোককে দেখা যায় আগামী বছর আগামী বছর জপতে জপতে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু তাদের জন্য হজ আদায় করার নসিব হলো না। অথচ হজ শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ। এটা ইসলামের পাঁচ বুনিয়াদের একটি। সুতরাং ফরজ হওয়ার পর হজ অনতিবিলম্বে আদায় করে নেওয়া একান্ত জরুরি। আল্লাহ না করুন, যদি আমি হজ না করে মারা যাই, আর মারা যাব না এমন কোনো গ্যারান্টিপত্রও তো নেই। এমতাবস্থায় হজ না করে যদি মারা যাই, তখন রসুলে পাক [সা.] হজ অনাদায়কারী সম্পর্কে অনেক শক্ত কথা বলেছেন : হজ ফরজ হওয়ার পরও ওজর ছাড়া যে হজ আদায় না করে মারা যায়, সে ইহুদি হয়ে মারা যাক আর নাসারা হয়ে মারা যাক, তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই। রসুল [সা.]-এর একজন উম্মত ইহুদি বা খ্রিস্টান হয়ে মারা গেলেও রসুলের অন্তরে কোনো দরদ আসবে না এটা হতে পারে না, বরং প্রকৃতপক্ষে রসুল [সা.] হজের গুরুত্বের জন্য এরূপ বলেছেন। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করার তওফিক দান করেন।

হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করা সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে— তোমরা হজ ও ওমরাহ পূর্ণভাবে সম্পাদন কর। এতে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, হজ ও ওমরাহ শুরু করার পর পূর্ণ করা উচিত। উলামায়ে কেরাম একমত পোষণ করেন যে, হজ ও ওমরাহ শুরু করার পর পূর্ণ করা একান্ত কর্তব্য। এখন প্রশ্ন হলো, হজ ও ওমরাহের তাত্পর্য কী? হজরত আলী (রা.) বলেছেন— হজের তাত্পর্য হলো নিজের বাড়ি থেকে ইহরাম বাঁধা অর্থাৎ হজ ও ওমরাহর উদ্দেশ্যে সফর শুরু করা।

হজরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, হজ ও ওমরাহর ইহরাম বাঁধার পর তা পূর্ণ না করে ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই। হজ তখন পূর্ণ হয়, যখন কোরবানির দিন জুমারায়ে উক্কবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করে বাইতুল্লাহ শরিফের তাওয়াফ করে [তাওয়াফে জিয়ারত] এবং সাফা-মারওয়া সাঈ করে। এমনকি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) আরও বলেছেন, হজ হলো আরাফাতের ময়দানে উপস্থিতি আর ওমরাহ হলো তাওয়াফ [তাফসিরে ইবন কাসির]।

হজ ও ওমরাহ আল্লাহর জন্য পূর্ণ কর, এর তাত্পর্য এই যে হজ ও ওমরাহ শুধু আল্লাহর জন্যই হতে হবে। যদিও সব আমলই আল্লাহপাকের জন্যই, তারপরও হজ ও ওমরাহর ব্যাপারে এত তাগিদ কেন? কারণ প্রাক-ইসলামী যুগের লোকেরা মক্কা মুয়াজ্জমায় একত্র হতো অন্য বহু উদ্দেশ্যে। তাই কালামে হাকীম এ ব্যাপারে পরিষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে, হজ ও ওমরাহ হতে হবে একমাত্র আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই। বর্বরতার যুগে যেভাবে পার্থিব লাভ ও লোভের আশায় মানুষ মক্কা-মুয়াজ্জমায় একত্র হতো, ঠিক বর্তমান যুগেও হজ ও ওমরাহর নামে ভিসা নিয়ে অর্থ-সম্পদ লাভের আশায় মক্কা ও মদিনা শরিফ সফরের প্রবণতা লক্ষণীয়। এ পর্যায়ে কোরআনে হাকিমে সতর্কবাণী বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য এবং উল্লিখিত আয়াতে কারিমায় ‘লিল্লাহ’ শব্দটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ।

সূরায়ে হজের যে আয়াতে হজ সম্পর্কীয় বিধান ঘোষণা করা হয়েছে— সেই আয়াতেও এ ‘লিল্লাহ’ শব্দকেই প্রথম ব্যবহার করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে— একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই মানুষের জন্য কাবাগৃহে হজ করা উচিত, যাদের তা করার সঙ্গতি আছে। এখানে হজ ও ওমরাহর জন্য প্রথমেই নিয়তকে সঠিক করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।   সুতরাং নিয়তকে সহি করে হজ আদায়ের তৌফিক আল্লাহ আমাদের সবাইকে নসিব করুন,  আমিন।                

লেখক : প্রিন্সিপাল, জামিআ রশীদিয়া, দক্ষিণখান, ঢাকা।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow