Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৩৯
মধ্যরাতের সেই বিভাজন রেখা—
অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত
মধ্যরাতের সেই বিভাজন রেখা—

রাজনীতির বহুমাত্রিক দার্শনিক, সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। ১৯৭০-৭১ সালে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনকে প্রয়োগ করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

যদিও তার আগে রাজপথে বিক্ষোভ, রক্তদান, আত্মত্যাগ কোনো কিছুর কমতি ছিল না। যখন দাবি আদায়ে সব ব্যর্থ হলো তখন সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দিয়ে গেলেন, প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ৭ মার্চ ’৭১, যার পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা দিলেন ২৬ মার্চ ১৯৭১। রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি। যার প্রথম ও প্রধান উপাদান ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধীর আগে এই উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজন অনেকেই উপলব্ধি করেছিলেন, যার মধ্যে সম্রাট আকবর ও রাজা অশোক ছিলেন অন্যতম। অনেকটা কৃতকার্যও হয়েছিলেন। তবে পারিপার্শ্বিকতার জন্য বাস্তবায়ন করতে পারেননি। জওহরলাল নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও আছে বিতর্ক।

’৭৫-পরবর্তী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ লাগালেন। মনে এবং ধ্যানে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম না থাকলে সংসদ ভবনের দেয়ালে এবং কাগজে-কলমে বিসমিল্লাহ থাকলে কোনো পরিবর্তন আসে না, তাই প্রমাণ হয়েছে।

তারপর এরশাদ সাহেব এলেন। তিনি আরেক ধাপ এগিয়ে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম সংবিধানে লিপিবদ্ধ করলেন। বাস্তবায়নকারীরা মনে-প্রাণে ইসলামের গুণসম্পন্ন মুসলিম না হলে রাষ্ট্রীয় ধর্ম দিয়ে কী হবে? আমরা দেখলাম অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি বেড়ে গেল, যেগুলোকে ইসলামে সবচেয়ে বড় গুনাহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে যখন গণতান্ত্রিক সরকার এলো, তখনো কিন্তু তার কোনো পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করিনি। এমন কি ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন তিন-চতুর্থাংশ মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় আসে তখন সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিকুর রহমান দায়িত্ব নিলেন। তিনি সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলেন। সংবিধান সংশোধনও করলেন কিন্তু পূর্ণাঙ্গরূপে ’৭২-এ ফিরে গেলেন না। কি অদৃশ্য ইঙ্গিতে তা আমরা আজো বুঝতে পারিনি। সবাইকে মনে রাখতে হবে ‘তোমাকে বঁধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে’।

পূজনীয় দাদু, দিদারা বলতেন, ‘আমাদের স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে ১৯৪৭-এ দেশ বিভাগের পূর্বাহ্নের ঘটনা। এই উপমহাদেশের বাসিন্দারা, যাদের ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসেও সাধারণভাবে পরমতসহিষ্ণু বলা যেত, তারা কেউ কোনো প্রশ্ন না তুলে রাতারাতি জুন মাসে নিষ্ঠুর হিন্দু ও নৃশংস মুসলিমে রূপান্তরিত হলো। যে হত্যালীলা তখন সংঘটিত হলো তার সঙ্গে নিজের তথাকথিত ‘প্রকৃত আত্মপরিচিতি’ ‘আবিষ্কারের’ সম্পর্ক কম নয়। সেই আত্মপরিচয় আবিষ্কার যুক্তিভিত্তিক মানবতার দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়নি।

আগেই বলেছিলাম সম্রাট আকবর ও রাজা অশোকের কথা। তাদের আন্তরিক ইচ্ছা, একাগ্রতা ও অদম্য সাহস থাকা সত্ত্বেও শুধু উগ্র হিন্দু এবং উগ্র মুসলিমদের জন্য বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তার দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ জানতেন তার পিতা সবরকম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধী। তিনি যখন পিতার কাছে জানতে চান, সব আচার-অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত কিনা, সত্কর্ম কী উদ্দেশ্যে করা উচিত (যে-প্রশ্ন আজও প্রায়ই করা হয়) সেই প্রশ্নের প্রসঙ্গে তিনি, ভারতীয় মুনিঋষিদের মতো, ‘সত্কর্ম’ পরজন্মে সুফল লাভের জন্য করা উচিত— এই মতের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমার মতে, পুণ্যকর্ম সাধনের সময়ে মৃত্যুর কথা মনে আসাই উচিত নয়। এতে কোনো আশা ও আশঙ্কার কথা না ভেবেই কেবল ভালো বলেই শুভ কাজ করা যায়। ’ ১৫৮২ তিনি ‘সাম্রাজ্যের অধীন সব ক্রীতদাসকে’ মুক্তি দেওয়ার সংকল্প করেন। কারণ ‘শক্তিপ্রয়োগের দ্বারা’ লাভবান হওয়া ‘ন্যায়বিচার ও সদাচারের পরিপন্থী। ’

বঙ্গবন্ধু, নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, সম্রাট আকবর এবং রাজা অশোকের যেই ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি ছিল আজ উপমহাদেশে তা উবে গেছে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ একজন বহুমাত্রিক দার্শনিক, তেমনি মহাত্মা গান্ধী। ‘যে পৃথিবীতে আমরা বাস করি তার আনন্দ, তার নানাবিধ ভয়ঙ্করতা ও চ্যালেঞ্জ, এসব নিয়েও বিশেষ চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন। আকবর যে যুক্তিবিচার ও পরীক্ষার ওপর জোর দিতেন, তাতেই আমাদের মনে পড়ে যায়, ‘সাংস্কৃতিক সীমারেখা’ আমাদের যতখানি গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখে বলে অনেকে মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে তা রাখে না। ’

প্রায় ৭০ বছর আগে ধর্মীয় জিগির তুলে এবং ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণ ভাঙিয়ে উপমহাদেশ যখন স্বাধীন হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি ভূখণ্ড লাভ করে, তখন পাকিস্তান ধর্মীয় আবরণে আচ্ছাদিত হয়, ভারত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করে। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর খুব জোর দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানি ধর্মীয় রাষ্ট্রীয় অনুভূতির জন্য এ ভূখণ্ড থেকে লাখ লাখ পরিবার জনসম্মুখে হেঁটে, বাসে করে রেলগাড়িতে করে এমন কি স্টিমারে করে মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যায়। যে কোনো যানবাহন যখনই যাত্রা শুরু করত, তখন যাত্রীদের ক্রন্দনের রোল আকাশ-বাতাস ধ্বনিত করে দর্শনার্থীদের মনে বিরাট আঘাত বা ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তাদের দীর্ঘশ্বাস থেকে এই পুণ্যভূমি এখনো মুক্তি পায়নি। বঙ্গবন্ধু সত্যিকার দার্শনিক হিসেবে পাকিস্তানি ধর্মীয় আবরণ থেকে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষতার আসনে আনতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন, তারা সত্যিই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ চাননি বলেই আবার এ দেশটিকে ধর্মীয় বাতাবরণ দিতে গিয়ে কী ক্ষতি করেছেন, তা বুঝতে পারবেন ভবিষ্যৎ ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে।

‘অপরপক্ষে বর্তমানে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার কঠোর সমালোচনা করে একের পর এক বিবৃতি প্রকাশিত হচ্ছে। এবং সে আক্রমণ আসছে আলাদা আলাদা মহল থেকে। ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর এই তীক্ষ আঘাতগুলোর মধ্যে অনেকই আসছে সক্রিয়ভাবে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত লোকদের কাছ থেকে, বিশেষত যারা ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে যুক্ত— যে পার্টিকে বলা হয় ‘নির্বাচনী রণক্ষেত্রে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান রাজনৈতিক দল’।  

ব্রিটিশরাজ দুই ধর্মতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ধর্মীয় উন্মাদনায় দুটি গোষ্ঠীকে ক্রমে ক্রমে এতই বিষাক্ত করে তুলেছিল যাতে করে এই বিষাক্ততা নিঃশেষের কোনো উপায় কেয়ামত পর্যন্ত কোনো মনীষীও করতে পারবেন না। কিন্তু দুর্ভাগা ব্রিটিশ জাতির পরিণতি কিন্তু আমরা এখনই দেখতে পাচ্ছি। সময় খুব দূরে নয়, তারাও নিঃশেষ হয়ে যাবে। দুটি গোষ্ঠীকে ধর্মীয় উন্মাদনায় রেখে মধ্যরাতে বিভাজনের রেখা টেনে দুটি দেশের জন্ম দিয়েছিলেন তারা সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow