Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৩
রাখাল বালক এবং রাজভাণ্ডার চুরির গুপ্ত কথা!
গোলাম মাওলা রনি
রাখাল বালক এবং রাজভাণ্ডার চুরির গুপ্ত কথা!

তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বহু বছর আগে। তিনি তখনো বিখ্যাত ছিলেন। তবে এখনকার মতো আলোচিত এবং পরিচিত মুখের মানুষ ছিলেন না। অন্যদিকে একজন উদীয়মান তরুণ ব্যবসায়ী এবং ভবিষ্যতে এমপি মনোনয়ন প্রত্যাশী রাজনৈতিক কর্মীর বাইরে আমার উল্লেখ করার মতো কোনো পরিচয়ই ছিল না। তার সঙ্গে আমার দেখা হতো কোনো কোনো দিন সকালে আবার কখনোবা বিকালে। তিনি ধানমন্ডি লেকের পাড়ে নিয়মিত শরীরচর্চার জন্য হাঁটতেন, তার হাঁটার ভঙ্গি, গতি এবং প্রকৃতি ছিল অদ্ভুত রকম সুন্দর। তিনি খুব জোরে হাঁটতেন এবং হাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাত দুখানা ঝোলাতেন। সাধারণত মাথা নিচু করে হাঁটতেন এবং মুখে মুচকি জাতীয় সুন্দর একটি হাসি ধরে রাখতেন। তার মাথার সামনের অংশে বর্তমান কালের মতো তখনো চুল কম ছিল। ঘামের কারণে কিছু চুল ভিজে অবিন্যস্ত হয়ে তার মাথার টাকের অংশ খালি করে ললাটের ওপর ঝুলে পড়ত। তিনি তার এক হাতে থাকা রুমালটি দিয়ে ললাটের ঘাম মুছে অবিন্যস্ত চুলগুলোকে যথাস্থানে সরিয়ে দিতেন এবং মাথাটি ঈষৎ উঁচু করে হাসিমুখে আশপাশে তাকাতেন।

ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হতো সুধাসদনের কাছাকাছি স্থানে। তিনি লেকটিকে বামদিকে রেখে হাঁটতেন। অন্যদিকে, আমি আসতাম বিপরীত দিক থেকে। চলতি পথে তাকে কেউ সালাম দিলে তিনি হাসি মুখে উচ্চস্বরে ওয়ালাইকুম সালাম বলে উত্তর দিতেন। তার এই সালাম দেওয়া এবং নেওয়ার ভঙ্গিটিও আমার ভালো লাগত। আর তাই আমিও সময়-সুযোগ পেলে তার সঙ্গে আনন্দচিত্তে সালাম বিনিময় করতাম। তিনি যখন গভর্নর হলেন তখন তার সঙ্গে কেবল সালাম বিনিময়ের সম্পর্কের কারণে আমি খুব খুশি হলাম। পরবর্তীতে তার শৈশব ও কৈশোরের সফল সংগ্রাম এবং মা-মাটি মানুষের সঙ্গে আত্মিক বন্ধনের খবর প্রচারিত হয়ে পড়লে আমি স্বভাবত তার প্রতি এক ধরনের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা পোষণ আরম্ভ করলাম। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে সসম্মানে রাখাল বালক বলে সম্বোধন শুরু করল। মিডিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের আমজনতার মতো আমিও রাখাল বালকের সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করতে থাকলাম।

২০১০ সালের দিকে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনায় অনেকেই বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে থাকেন। কেউ কেউ আবার সরাসরি ড. আতিউরকে দায়ী করে বলতে থাকেন যে, তিনি বিভিন্ন রকম উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত প্রদানের মাধ্যমে শেয়ার মার্কেট সংক্রান্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে জটিল বানিয়ে ফেলেছেন, যার কারণে শেয়ারের অস্বাভাবিক দরপতন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে যেদিন সবচেয়ে বড় দরপতনটি হয়েছিল সেদিন গভর্নর আতিউর পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আদা চাষ সংক্রান্ত উপজাতীয়দের অনুষ্ঠানে যোগদান করতে গিয়েছিলেন। ঢাকায় তার সমালোচকরা এ ঘটনাকে রোমনগরী পুড়ে যাওয়ার সময় সম্রাট নিরোর বাঁশি বাজানোর ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে আকাশ-বাতাস কাঁপাতে লাগলেন। ঘটনার রাতে একুশে টিভির একটি টকশোতে আমি নিজেও অন্য সমালোচকদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে জনাব আতিউর সম্পর্কে নির্মম সমালোচনা করলাম এবং তার জন্য প্রযোজ্য নয় এমন কতগুলো মন্তব্য করলাম।

উপরোক্ত ঘটনার কয়েক মাস পরে দৈবচক্রে ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে আমার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কার্যালয়ে। এটা ছিল তার সঙ্গে আমার জীবনের প্রথম বৈঠক এবং সরাসরি কথা বলা। বৈঠকের আগে আমি কিছুটা হলেও বিব্রতবোধ করতে থাকলাম অতীতে তাকে নিয়ে টেলিভিশন টকশোতে বিরূপ মন্তব্য করার কারণে। কিন্তু বৈঠকের শুরুতেই তিনি এতটা আন্তরিকতা এবং সহৃদয়তা দেখালেন যে, আমি আমার বিব্রতবোধ ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম বটে কিন্তু মনের কোণে এক ধরনের অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য তিনি জানালেন, তিনি নিয়মিত আমার লেখা পড়েন এবং টকশোও দেখেন। তারপর তিনি  অত্যন্ত সাবলীলভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব-কর্তব্য দেশের ব্যাংকিং অবস্থার হাল-হকিকত এবং তার আমলে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে বললেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং ডিজিটালাইজেশন এবং ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের কিছু নমুনা তার রুমে স্থাপিত বড় পর্দার টেলিভিশন মনিটরের মাধ্যমে আমাকে দেখালেন। আমি সুদৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন— যেহেতু তুমি নিয়মিত কলাম লেখ এবং টেলিভিশনের টকশোতে অংশগ্রহণ কর, সেহেতু তোমার এগুলো জানা দরকার।

ড. আতিউরের সঙ্গে বৈঠকের পর আমি মোটামুটি বুঝতে পারলাম যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, দেশের মুদ্রাবাজার, শেয়ারবাজার, আন্তঃব্যাংকিং লেনদেন আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স ইত্যাদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে একটি অপরটির সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে চলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতে কী করেছে এবং আগামী দিনে কী করতে চায় তা যেমন আমি জানতে পারলাম তেমনি দেশের কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারি সম্পর্কে গভর্নরের ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি জানার পর তার সম্পর্কে আমার পূর্বেকার কটূক্তি সবার অজান্তে আপন মনে প্রত্যাহার করে নিলাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত ৮০০ কোটি টাকার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ড. আতিউর কিছুটা অসহায়, কিছুটা অভিমান, মহল বিশেষের চক্রান্ত এবং উদ্ভূত বিরূপ পরিস্থিতির কারণে পদত্যাগ করেন।

ড. আতিউরের সঙ্গে কোনো কালে আমার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না—তার সঙ্গে আমার জীবনে একবারই মাত্র কথা হয়েছে এবং সামাজিক-পারিবারিক অথবা পেশাদারিত্বের দিক থেকে আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক বা সংযোগ নেই। তারপরও তার পদত্যাগ আমাকে বেদনাহত করেছে। তার বিপদের দিনে কথিত শুভার্থীদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রতিদ্বন্দ্বীদের নারকীয় উল্লাস এবং হুজুগে আমজনতার উল্লম্ফন দেখে যারপরনাই বিস্মিত এবং হতবাক হয়েছি। পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত সুন্দরী সুসানা এবং হজরত দানিয়েল (আ.)-এর ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার পর মনে হয়েছে—আর কেউ না বললেও আমার বলা উচিত ‘ড. আতিউরের ওপর আমরা সবাই মিলে জুলুম করেছি—তার মানবিক ব্যাংকিংয়ের ধারণাকে আমরা অমানবিক এবং নিষ্ঠুর আচরণ দ্বারা অপমানিত করেছি এবং দেশ-জাতির জন্য তিনি যে ভালো কাজ করেছেন আমরা সেগুলোর প্রতিদান খুব মন্দভাবে দিয়েছি।’

সম্মানিত পাঠক, হয়তো ভাবতে পারেন কেন আমি এতকাল পর ড. আতিউরকে নিয়ে লিখতে উদ্যোগী হলাম এবং তার ঘটনার সঙ্গে বাইবেলে বর্ণিত দানিয়েল নবী এবং সুসানার কাহিনীর কী সম্পর্ক থাকতে পারে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে ভারতীয় রাজনীতি এবং আইন-আদালতের জীবন্ত কিংবদন্তি রাম জেঠ মালানীর একটি সুবিখ্যাত উক্তির কথা বলে নিই। তিনি বলেন, জাতীয় জীবনে ভুল এবং অন্যায় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র যেমন ভুল করে তেমনি কখনো সখনো পুরো জাতি ভুল করে বসে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন যখন কোনো ভুল বা অন্যায় সম্পর্কে প্রতিবাদ করার মতো একটি লোকও থাকে না। কোনো ব্যক্তি, পরিবার, রাষ্ট্র অথবা জাতির ভুল সম্পর্কে কোনো প্রতিবাদকারী পাওয়া না গেলে ধরে নেওয়া যায় যে, ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে অন্যায়কারী ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে বাধ্য। কিন্তু যতদিন পর্যন্ত একজন প্রতিবাদকারী জীবিত থাকেন ততদিন পর্যন্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং জাতি রক্ষা পায়। বাইবেলে বর্ণিত সুসানার কাহিনীতে এই ঐতিহাসিক চিরসত্যটির প্রমাণ রয়েছে। ঘটনাটি বেশ দীর্ঘ হওয়ার কারণে বিস্তারিত বর্ণনা বাদ দিলাম। সময় ও সুযোগ হলে অন্য কোনো দিন হয়তো বলব।

এবার ড. আতিউর প্রসঙ্গে আসি। নিতান্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছার পরও তার মন ও মননশীলতায় কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি, সবুজ বিপ্লব এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার দুরন্ত এবং দুর্দান্ত সব পরিকল্পনা ছিল। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব লাভের পর তিনি এমন কতগুলো বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার সফল বাস্তবায়নের ফলে আমাদের দেশের সার্বিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। তিনি যখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল ব্যাংকিং চালু করলেন তখন কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি যে, গ্রামগঞ্জের দরিদ্র শিশুরা মিলে সাড়ে আটশ’ কোটি টাকা জমা করবে। তার উদ্ভাবিত পথশিশুদের ব্যাংক হিসাবে ১৯ লাখ টাকা জমা পড়েছে।

১০ টাকার অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে এক কোটি ৫৯ লাখ হতদরিদ্র মানুষকে সরাসরি ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যে কত বড় বিস্ময়কর ঘটনা তা আমরা টের না পেলেও জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক আইএমএফসহ উন্নতবিশ্ব ঠিকই টের পেয়েছে। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও ড. আতিউর তার উদ্ভাবনী শক্তির অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন যা বাংলাদেশ তো নয়ই—দুনিয়ার কোনো দেশে এর আগে ঘটেনি। তার সময়কালে তিনি বর্গাচাষিদের মোট ২ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করেন। বাংলাদেশে উৎপাদন সম্ভব অথচ বিদেশ থেকে ব্যাপক হারে আমদানি করতে হয় এমন কয়েকটি ফসলকে বিশেষ ফসল আখ্যা দিয়ে তিনি মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ৪৪৬ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেন। ফলে আদা, রসুন, পিয়াজ, মরিচ এবং হলুদ উৎপাদনে বিস্ময়কর সফলতা অর্জিত হয়। ঠিক একই কায়দায় তিনি গাভী পালনে ২০০ কোটি টাকার তহবিল চালু করেন।

নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান, নতুন উদ্যোক্তাদের এসএমই ঋণ প্রদান, মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, গ্রিন ব্যাংকিং ইত্যাদি চালুর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেবার পরিধি বিশাল এবং ব্যাপকতর পর্যায়ে উন্নীত করেন। সর্বোপরি ব্যাপকভাবে কৃষিঋণ বিতরণের মাধ্যমে দেশে সবুজবিপ্লব ঘটানোর অন্যতম নিয়ামকশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। তার এসব কর্মের ফলে ব্যাংকিং সেক্টরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো প্রায় আড়াই হাজার নতুন শাখা খোলে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কারণে সারা দেশে প্রায় ছয় লাখ এজেন্ট ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছে এবং প্রায় সোয়া ৩ কোটি লোক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সেবা গ্রহণ করছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান ও সেবা প্রাপ্তির এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করার ক্ষেত্রে গভর্নর আতিউরের কড়াকড়ির কারণে তার আমলে এই খাতে ব্যয় দশগুণ বৃদ্ধি পায়। মানবকল্যাণ ও আর্তমানবতার সেবায় ২০১৫ সালে ব্যাংকগুলো মোট ৫১১ কোটি টাকা ব্যয় করে। তার কার্যকালে দেশের মোট বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স দ্বিগুণ হয়ে যায়। অন্যদিকে মোট আমানতের পরিমাণ বেড়ে যায় প্রায় তিনগুণ। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ বাড়ে প্রায় সাড়ে চারগুণ। গত সাত বছরে পৃথিবীর অর্থনীতির দুটো মারাত্মক সমস্যা অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশকে বিপদের মধ্যে ফেললেও বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ বেঁচে যায়। বাংলাদেশের জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক আর্থিক উন্নয়ন তাবৎ দুনিয়াকে এক নতুন অধ্যায় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করে তুলেছে। তারা সব রাগ-অভিমান, খেদ ইত্যাদি ভুলে বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে বাধ্য হয়েছে।

ড. আতিউরের গৃহীত আরও অনেক অভিনব এবং সফল পদক্ষেপ নিয়ে বলতে গেলে নিবন্ধের পরিধি বড় হয়ে যাবে। কাজেই ওদিকে না গিয়ে বরং বহুল আলোচিত রিজার্ভ চুরি নিয়ে কিছু বলি। দেশি-বিদেশি নানামুখী তদন্তে এ কথা প্রমাণিত যে, একটি আন্তর্জাতিক জুয়াড়ি চক্র অপকর্মটি করেছে। কোনো তদন্ত দলই বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, মহল বিশেষ বা ব্যক্তি বিশেষের সংশ্লিষ্টতার ন্যূনতম ইঙ্গিত খুঁজে পায়নি। গভর্নরের দায়িত্বে অবহেলারও কোনো প্রমাণ নেই। সময়ের ব্যবধানে চুরিকৃত রিজার্ভের একটি বিরাট অংশ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা মিলেছে— বাকি অর্থও ফেরত আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনাটি ঘটার পর ড. আতিউর চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন আজ অবধি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সরকার সে পথেই হাঁটছে—তাহলে ড. আতিউরকে কেন বিদায় নিতে হলো?

ড. আতিউরের সবচেয়ে বড় বিপত্তি ছিল তার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগাধ আস্থা এবং প্রগাঢ় স্নেহ। এই বিপত্তিকে হজম করার জন্য যে রাজনৈতিক ছলচাতুরি, বহুমুখী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং মোনাফেকির দরকার ছিল তা ড. আতিউর করতে পারেননি। ড. আতিউর কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। কিন্তু রাজনীতির সব গুণাবলি তার মধ্যে রয়েছে। ফলে পদ-পদবি প্রাপ্তির পর তার সহজাত নেতৃত্বগুণ, গণমুখী চরিত্র এবং জনসংযোগের কারণে তিনি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের নীতি-নির্ধারণী ব্যক্তিবর্গ এবং জাতিসংঘের অর্থ বিভাগের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন যা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হৃদয়-মন ও মস্তিষ্কে প্রতিহিংসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ড. আতিউরের নিঃশর্ত সততা, পেশাদারিত্ব এবং প্রশাসনিক গুণাবলিও তার জন্য অন্যতম বিপত্তির কারণ ছিল। তার সততা শর্তযুক্ত ছিল না। অর্থাৎ তিনি কেবল নিজে সৎ ছিলেন না— বরং তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভানুধ্যায়ীদের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে। ফলে তার কার্যকালে ড. আতিউরের নাম ব্যবহার করে কেউ বাংলাদেশ ব্যাংক তো দূরের কথা—বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার, দালালি, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদি করেছে এমন বদনাম তার ঘোরতর শত্রুরাও দিতে পারেনি।

অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বেশির ভাগই অভিযুক্ত এবং শীর্ষ দুর্নীতিবাজ বলে স্বীকৃত। কেউ কেউ অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে সৎ কিন্তু তাদের সন্তান, ভাই ও অন্য আত্মীয়বর্গের অপকর্ম, দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তপনার কারণে দেশের পুরো আর্থিক অঙ্গনকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা নৈতিকভাবে তার মুখোমুখি হওয়ার সাহস পেত না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কারণে ড. আতিউরের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বিরোধিতার সুযোগও ছিল না। ফলে তারা বড় বড় চক্রান্তের জাল তৈরি করে দৈব দুর্ঘটনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ড. আতিউরের বিরুদ্ধে দুটো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। প্রথমটি হলো—তিনি বিষয়টি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীকে জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কেন তিনি হলমার্কের ঘটনার মতো প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনাটি ফাঁস করলেন না?

দ্বিতীয়ত, এ ঘটনা নিয়ে যখন তোলপাড় চলছিল তখন তিনি কেন ভারতে একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। প্রথম অভিযোগের ব্যাপারে ড. আতিউরের বক্তব্য অর্থাৎ ফিলিপাইন সরকারের অনুরোধ, অর্থ ফেরতের প্রতিশ্রুতি এবং জুয়াড়িদের নির্বিঘ্ন গ্রেফতার নিরাপদ করার জন্য গোপনীয়তা আবশ্যক ছিল যা সময়ের বিবর্তনে সত্য ও নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

আর দ্বিতীয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করার মতো রুচি আমার নেই। আমার শুধু একটাই প্রশ্ন— যে জাতি তার সুসন্তানকে সম্মান করে না, সুকাজকে মূল্যায়ন করে না এবং যোগ্যতমকে ধারণ করতে পারে না সেই জাতির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

     লেখক : কলামিস্ট।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow