Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২২:৫৪
ধর্মতত্ত্ব
সন্তান কী করছে খোঁজ নিন
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
সন্তান কী করছে খোঁজ নিন

প্রকৃতিতে এখন শীতের আমেজ। এমন দিনে সকালের সূর্যের নরম আলো গায়ে মেখে শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় পা ভিজিয়ে কৃষক মাঠে যেত। ঠিক তখনই কিচিরমিচির সুরে মক্তব থেকে ভেসে আসত আলিফ জবর আ, বা জবর বা, তা জবর তা, সা জবর সা’র ঐশী গান। একসময় এ ধরনের সুরেই শুরু হতো আমাদের দিন। ঘুম ভাঙত ‘আলসে মেয়েদের’। হায়! এখন আর অতসব মক্তব নেই, নেই সেই ঐশী সুর। বহু মক্তব এখন হয়েছে কিন্ডারগার্টেন। মাঠে যাওয়ার পথে কৃষকের কানে ভেসে আসে ‘হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম’-এর গান।

আমরা যারা ইটপাথরের শহরে থাকি, আমাদের কানেও বাজে হাট্টিমাটিম টিম কিংবা টুইংকল-টুইংকলের সুর। আফসোস! যেসব শিশুর মুখে ফোটার কথা কোরআনের ফুল, সেখানে ফুটছে টুইংকল-টুইংকলের সুর। টুইংকল কিংবা হাট্টিমাটিম পড়া দোষের নয়, তবে কোরআনের ফুল ফোটার আগেই হাট্টিমাটিমের সুর ধরাটা কতকটা  দোষের। কারণ, শিশুর সবুজ মন-জমিন ধর্ম চাষের উর্বর ক্ষেত্র। প্রাকৃতিকভাবেই একে উর্বর করা হয়েছে ধর্মের বীজ বোনার জন্য। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কুল্লু মাওলিদিন ইউ লাদু আলাল ফিতরাত। প্রতিটি শিশুমনই ধর্ম চাষের উর্বর জমিন। একটু যত্ন নিলেই এখানে ইসলামের বাম্পার ফলন হবে। আফসোস! শিশুর মা-বাবাই এ জমিনে ইহুদিবাদ ও খ্রিস্টবাদের বীজ বুনে দিচ্ছেন। আর বড় হয়ে সে হয়ে উঠছে একজন পাক্কা দূর ধর্মের মানুষ। রসুল (সা.)-এর কথাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শিশুমনেই ধর্মের ফুল ফোটাতে হবে। নয় তো বড় হয়ে সেখানে আর ধর্মফুলের চাষ হবে না। ধর্ম চাষের উপযুক্ত ক্ষেত্র যে শিশুমন তার একটি বড় প্রমাণ হলো, প্রতিটি শিশুই মা-বাবার দেখাদেখি রোজা-নামাজ ও অন্যান্য ধর্মকাজে আগ্রহ দেখায়। অনেক শিশু তো সাহরি খেতে ডাকে না বলে না খেয়েই রোজা রাখার বায়না ধরে। আবার মা-বাবাই যে এই সবুজ মন-জমিনে ইহুদিবাদ-খ্রিস্টবাদ বা অধর্মের বীজ বুনে দিচ্ছেন তার প্রমাণ হলো, ওই শিশুটিকেই জোর করে রোজা ভাঙিয়ে, সাহরিতে না ডেকে তার আগ্রহের আগুনে শীতল জল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। তার মুখে কোরআনের ফুল না ফুটিয়ে মনে এ প্লাসের স্বপ্ন এঁকে দিচ্ছে। তাকে বোঝানো হয়, এ প্লাসই জীবনের লক্ষ্য। এর জন্য বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, উৎসব-অনুষ্ঠান, হাসি-আনন্দ, কান্না-আবেগ যা যা বিসর্জন দেওয়া দরকার সবই দিতে হচ্ছে। প্রয়োজনে ন্যায়-অন্যায়ের বাছ-বিচারও ভুলে যেতে হবে তোমাকে। যেমন করেই হোক এ প্লাস তোমার চা-ই চাই। ঠিক এ কারণেই পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া একটি শিশুও প্রশ্নফাঁস ও নকলের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। তাকে সহযোগিতা করছেন বাবা-মা আর শিক্ষক। হায়! নবীজি কী বললেন আর আমরা কী করছি? নবীজি বলেছেন, শিশুমনে ধর্মের ফুল-বীজ বুনে দাও। আর আমরা প্রশ্নফাঁসের ভুল বীজ রুয়ে দিচ্ছি। নবীজি বলেছেন, সাত বছর থেকে নামাজের অভ্যাস কর, ১০ বছর হলে শাস্তি দিও। খাবার বন্ধ করে দিও। আর আমরা ১৫ বছর হলেও বলছি, তুমি এখনো ছোট। আরও পরে রোজা রেখো। পরীক্ষা শেষ হলে নামাজ পড়ো। এখন সময় নষ্ট করো না। সময়ের কাজ সময়ে না করলে যা হয়, আমাদের এ প্লাস প্রজন্মেরও এখন তাই হচ্ছে। রোজা রাখার বয়স হয়নি যে শিশুর সেই এখন খুন করছে সহপাঠীকে। মেরে ফেলছে বাবা-মাকে। নামাজ পড়লে সময় নষ্ট হবে যে শিশুর সে-ই এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্নো ছবি দেখে, অনলাইন গেমিং করে ‘টাইম পাস’ করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাবা যেন অসহায়। সব বাবা-মার একটাই কথা, সন্তান আমার বিগড়ে যাচ্ছে। কথা শোনে না। আর যারা এখনো ‘সন্তান কন্ট্রোলে আছে’ ভেবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন তাদের জন্য ছোট্ট একটা তথ্য দিই। কয়েক দিন আগে রমনা পার্কে একাধিক প্রেমিকযুগল দেখে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যাই। আগ্রহের কারণ হলো, ওরা সবাই স্কুলপড়ুয়া। বাবা-মায়ের ভাষায় যারা এখনো শিশু! বললাম, ‘তোমরা যে এসব করছ বাবা-মা জানে?’

তারা বলল, ‘জানলে কি আর এসব করতে পারতাম?’

আবার জিজ্ঞাসা করলাম, ‘স্কুল ফাঁকি দিয়ে পার্কে এলে কীভাবে? বাবা-মা খোঁজ নেন না?’

এবার একটি মেয়ে মুখ টিপে হেসে বলল, ‘বাবা-মা জানবে কীভাবে? আমাদের এক গেট দিয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, আর আমরা অন্য গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছি। ছুটির আগে আগে আবার স্কুলে গিয়ে হাজির হই।’ তার মানে হলো, আপনি ভাবছেন সন্তান ক্লাস করছে, আসলে তা নয়। সে প্রেম প্রাকটিস করছে। ঠিক একই ঘটনা নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন করেছে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল। এসব শুনে হয়তো বাবা-মাদের এবার নড়েচড়েই বসার কথা। আফসোস! আমাদের দেশের শিশুদের ধর্মমুখী করার জন্য সরকার-আলেমসমাজ এমনকি পরিবারের পক্ষ থেকেও জোরালো কোনো পরিকল্পনা দেখা যায় না। ফলে আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠছে নানা অপকাজের ভিতর দিয়ে। একটি দেশ ও জাতির জন্য এ যে কত বড় হুমকি, তা বোধ করি এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না সবাই। শেষ করছি শুরুর কথা দিয়ে। এখনো সময় আছে, শিশুমনে ধর্মের বীজ বুনে দিন। কোরআনের ফুল শিশুর মন-জমিনে ফুটতে দিন। ইসলামী আদর্শ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে আপনার শিশুর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে দিন। বিজাতীয় সংস্কৃতি বদলে একটি নির্মল পরিবেশ আপনার শিশুকে উপহার দিন। এতে দেশ এবং দেশের মানুষের যেমন উপকার হবে, তেমন আগামীতে আপনিও বেঁচে যাবেন বৃদ্ধাশ্রম নামক নির্মম কারাগার থেকে।

লেখক : বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

www.selimazadi.com

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

এই পাতার আরো খবর
up-arrow