শিরোনাম
প্রকাশ : ৪ জানুয়ারি, ২০২১ ২০:৫৭
প্রিন্ট করুন printer

২৫ দিন পর মর্গ থেকে মেয়ের লাশ পেলেও সৎকার নিয়ে শঙ্কা!

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি

২৫ দিন পর মর্গ থেকে মেয়ের লাশ পেলেও সৎকার নিয়ে শঙ্কা!

আইনি জটিলতা শেষ করে দীর্ঘ ২৫ দিন পর হাসপাতাল মর্গ থেকে আলোচিত লাকিংমে চাকমার লাশ গ্রহণ করলেও নিজের এলাকায় সৎকার নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে পরিবার।

লাশ বুঝে নেওয়ার পর টেকনাফের বাহারছড়া শীলখালী চাকমা পাড়ার লাকিংমের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে না বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। কারণ, সেখানে সৎকার করলে প্রতিপক্ষের লোকজন মরদেহ তুলে ফেলার আশঙ্কা আছে। এই শঙ্কার কারণে লাশটি রামুতে নিয়ে যাওয়া হবে। ওখানে নিয়ে লাশ পুড়ানো হবে না। মাটিতে দাফন করা হবে।

সোমবার বিকাল ৩টার দিকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গের সামনে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান জানান লাকিংমে চাকমার মা ও স্বজনেরা।

এর আগে বাবা লালা অং চাকমার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে লাশটি তুলে দেওয়া হয়। এরপর লাশবাহী গাড়িতে করে মরদেহটি রামুতে নিয়ে যাওয়া হয়। 

লাকিংমে চাকমার মরদেহটি হস্তান্তরকালে র‌্যাব-১৫ এর উপ-পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অঞ্জন চৌধুরী, সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মোহাম্মদ শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। লাশ গ্রহণকালে স্বজনদের মাঝে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

গত বছরের (২০২০ সাল) ১৩ জানুয়ারি আদালতে করা মামলায় লাকিংমে চাকমার বাবা লালা অং চাকমা অভিযোগ করেন, সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া তার মেয়েকে অপহরণ করেছে টেকনাফের আতাউল্লাহ। সেই মামলার তদন্ত চলাকালে ১৫ ডিসেম্বর খবর পান, লাকিংমের লাশ পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে। মেয়ের লাশ নিতে গিয়েও পড়েন বিপত্তিতে। অপহরণ, নাবালিকা, বিয়ে ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত আতাউল্লাহ বাঁধ সাধলেন। নিজেকে লাকিংমে চাকমার স্বামী দাবি করে লাশ নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। ফলে এই আবেদন গড়ায় আদালতে। সেই পটভূমিতে তদন্তসাপেক্ষে মৃতের ‘ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত’ হয়ে র‌্যাবকে মরদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন আদালত। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র‌্যাবকে। বিস্তারিত অনুসন্ধান শেষে লাকিংমে চাকমাকে ‘শিশু’ হিসেবে চিহ্নিত করেন তদন্ত কর্মকর্তা অঞ্জন চৌধুরী। বিষয়টি তিনি আদালতে অবহিত করেন। পরে বিধি মোতাবেক লাশটি পরিবারের নিকট হস্তান্তরের প্রক্রিয়া করা হয়।

বাবা লালা অং চাকমার দাবি, গত বছরের (২০২০ সালের) ৫ জানুয়ারি তার মেয়ে লাকিংমেকে অপহরণ করা হয়। ওইদিন তিনি কক্সবাজারের টেকনাফে শীলখালীর চাকমাপাড়ায় নিজের বাড়িতে ছিলেন না। সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। তার মেয়ে স্থানীয় শামলাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। বাড়ি ফিরে জানতে পারেন মেয়েকে অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যান টেকনাফের বাহারছড়া মাথাভাঙ্গার এলাকার আতাউল্লাহ, ইয়াসিন, ইসা, আবুইয়াসহ আরও চার-পাঁচজন। জন্মসনদ অনুসারে ওই দিন মেয়ের বয়স ছিল ১৪ বছর ১০ মাস। তিনি বিষয়টি ওই দিনই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মোহাম্মদ হাফেজকে জানান। কিন্তু ইউপি সদস্য কোনো ব্যবস্থা নেননি। 

তখন লালা অং চাকমা টেকনাফ মডেল থানায় মামলা করতে গেলে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ (অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলায় বরখাস্ত) মামলা নিতে রাজি হননি। ২৭ জানুয়ারি তিনি কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে কক্সবাজার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দেন।

পিবিআই গত বছরের ৯ আগস্ট কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, লাকিংমে চাকমাকে অপহরণ করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অন্তত পাঁচজন সাক্ষী জবানবন্দিতে লাকিংমেকে বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন বলে মেয়েটির বাবার দাবি।

এমন দাবির বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই কক্সবাজার ইউনিটের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) ক্যশৈনু মারমার ভাষ্য, ‘এজাহারে যে পাঁচজনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে, তাঁরা লাকিংমের আত্মীয়। সাক্ষী ছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ওই পাঁচজন সাক্ষী ছাড়া এলাকার আর কেউ অপহরণের কথা বলেনি। ফলে আমি তদন্ত প্রতিবেদনে লাকিংমে নিজেই চলে গেছে বলে উল্লেখ করেছি।’

বাবা লালা অং চাকমার দাবি, ১১ মাস পর তিনি জানতে পারেন মেয়ে লাকিংমের লাশ মর্গে পড়ে আছে। তিনি লাশ নিতে গিয়ে জানতে পারেন অপহরণ, নাবালিকা বিয়ে ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগে যে আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেছিলেন; সেই আতাউল্লাহ স্বামী দাবি করে লাশ নেওয়ার আবেদন করেছেন।  

বিডি প্রতিদিন/জুনাইদ আহমেদ


 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর