শিরোনাম
শনিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা

ফুলেল সৌরভে বিদায় ২০১৬, স্বাগত ২০১৭

শাইখ সিরাজ

ফুলেল সৌরভে বিদায় ২০১৬, স্বাগত ২০১৭

আমরা কত কিছুর সৌন্দর্যেই না ভুলি। কৃষক ভোলে ফসলের সৌন্দর্যে। খেতের ফসল তার সবচেয়ে প্রিয়। মাটি তার পছন্দ। জমি চাষ তার পছন্দ। ফসল বাজারে পাঠানো থেকে শুরু করে মাটি আর ফসলকেন্দ্রিক যত কাজ সবই কৃষকের প্রিয়। এ কাজগুলোর সঙ্গেই তার সব মমতা ও ভালোবাসা। মাঠই কৃষকের ঠিকানা। যেখানে দাঁড়িয়ে সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে সুখে থাকার। আমরা নগর জীবনে একটি বছর অতিবাহিত করার নানা হিসাব করি। গত বছরটির সাফল্যগুলো, ভুলগুলো, না-পাওয়াগুলো সব হিসাব করি। পুরনো দিনের সব জঞ্জাল দূর করে নতুন দিনকে স্বাগত জানাই সাফল্যের কথা মাথায় রেখে। বছরের শেষে এসে কৃষকের মনে পড়ে কোন ফসল এবার তার ঘরে আনন্দ দিয়েছে, কোন ফসলে গুনতে হয়েছে লোকসান। লাভ-লোকসান যাই থাক, মাঠে এলেই কৃষক আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। দূর হয়ে যায় লোকসানের গ্লানি। আর সেই মাঠ যদি হয় রঙে ভরপুর তাহলে তো কথাই নেই। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গ্রামগুলোর চিত্র এমন যে, সেখানে ফসলের মাঠ দেখে শুধু কৃষকের মনই ভালো হয় না। দারুণ এক ছন্দে জেগে ওঠে যে কোনো মানুষের মন। এই একটি ক্ষেত্রে কৃষকের সঙ্গে পৃথিবীর যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের রুচি, মনন, সৌন্দর্যবোধ সবকিছু একাকার হয়ে গেছে। ফুল কৃষককে যেমন রাঙাচ্ছে, রাঙাচ্ছে শহর-নগরের মানুষকেও। আজকের সূর্যটি বছরের শেষ সূর্য। কয়েক দিন আগে যে চিত্র দেখে এসেছি, তাতে আমি ঠিকই অনুমান করতে পারছি, আজ ঝিকরগাছার গদখালী-পানিসারার ফুলরাজ্যে রীতিমতো উৎসব চলছে। আগামীকাল ইংরেজি নববর্ষ ২০১৭-এর প্রথম দিন। নববর্ষে ফুলের বাজার সরগরম হয়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিপুল পরিমাণ ফুল বিক্রি হয়। এ দিনটিকে ঘিরে কৃষকের অনেক স্বপ্ন থাকে। বহু আগে থেকেই থাকে প্রস্তুতি।

এখন আর সেই গদখালী নেই। ২০০৬ সালের দিকে গদখালী দেশের অন্য যে কোনো গ্রামের মতোই একটি গ্রাম। গ্রামগুলোয় ছিল অভাব ও দারিদ্র্যের ছাপ। অনেক কৃষকের ছিল মাটির ঘর। সেই গদখালী এখন দারুণ সমৃদ্ধির কথা জানান দেয়। ফুল চাষ থেকে ফুলের রাজ্য, সেখান থেকে ফুল শিল্পপল্লীতে পরিণত হয়েছে। এখন মাঠে মাঠে শুধু ফুলের গ্রিনহাউস। বোঝাই যায়, এটি উচ্চমূল্যের এক কৃষি কারবার। বড় বিনিয়োগে বড় লাভেরই হিসাব করেন এখানকার কৃষক। এলাকার ৯৫ ভাগ কৃষক ফুল চাষ করেন। গোটা এলাকায় ইউরোপিয়ান দামি ফুল জারবেরার গ্রিনহাউস গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০টি। আর ফুলের বিস্তীর্ণ মাঠ এখন হয়ে উঠেছে রীতিমতো এক পর্যটন কেন্দ্র। দূরদূরান্তের মানুষ বিস্তীর্ণ ফুল খেত দেখতে আসেন। মনে পড়ে নেদারল্যান্ডসের কুকেনহফের কথা। শুধু ফুলকে ঘিরেই কত বড় পর্যটন বাণিজ্য গড়ে উঠতে পারে তা নেদারল্যান্ডসের কুকেনহফে না গেলে বোঝা যাবে না। কুকেনহফ একটি স্বর্গের নাম।

ইউরোপজুড়েই ফুল রপ্তানি হয় সেখান থেকে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্প্রিং গার্ডেন। প্রতি বছর ২০ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ওই ফুলের রাজ্য খোলা রাখা হয় পর্যটকদের জন্য। বাকিটা সময় ধরে চলে বাগান পরিচর্যা আর টিউলিপ ফুল সাজানোর কাজ। যেখানে অংশ নেন নেদারল্যান্ডসের সব ফুল ব্যবসায়ী। তাদের বিনিয়োগেই চলে আট সপ্তাহের ফুল মেলা। প্রতি বছর সারা পৃথিবীর পর্যটক সেখানে যায় ফুলের ওই স্বর্গে কিছুটা সময় কাটাতে। বড় বড় গাছ আর গালিচার মতো সবুজ ঘাসের ভিতরে বাহারি রঙের টিউলিপ। সে ফুলের রং আর সৌরভ অপার্থিব। পর্যটকদের জন্য রাখা আছে নানা ব্যবস্থা। ভিতরে একটি ক্যানেল ও কৃত্রিম জলপ্রপাত তৈরি করা আছে। সেখানে সারা দিন সর্পিল গতিতে চলছে পানির ধারা। সে সৌন্দর্যে যে কোনো মানুষই হারিয়ে যাবে অন্য জগতে। আমার এবার মনে হলো যশোরের গদখালীও এমন একটি এলাকায় পরিণত হবে একদিন। ফুলের সৌন্দর্য যেভাবে দূরদূরান্তের মানুষকে টেনে আনা শুরু করেছে, শুধু স্থানীয় উদ্যোক্তারা আরেকটু গুছিয়ে নিতে পারলেই সেখানে গড়ে তুলতে পারবে পর্যটন উপযোগী সব ব্যবস্থা।

শীতের পড়ন্ত বিকালে ফুলের মাঠে দেখা হলো একদল শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তারা বিভিন্ন এলাকার। যশোরে এসেছিল কোনো এক অনুষ্ঠানে। খোঁজ পেয়ে ছুটে এসেছে ফুলের রাজ্যে। কথা শুনে বোঝা গেল, ফুলের এই মাঠে আসতে পেরে দারুণ মুগ্ধ তারা। একটু পরই দেখা হলো একদল সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবসরপ্রাপ্তও আছেন। তারা যশোরে দাফতরিক কাজ সেরে সোজা চলে এসেছেন গদখালীর ফুলের মাঠে। প্রাণভরে সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। কৃষক বললেন, প্রতিদিনই মাঠে পর্যটকের কমবেশি ভিড় থাকে। কৃষিবাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটনের এ বিপুল সম্ভাবনা দারুণ এক আশার আলো জাগাল এবার।

আসা যাক ফুল চাষিদের ভালোমন্দের প্রসঙ্গে। কৃষি যখন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত তখন তা ভালোমন্দ মিলিয়েই হবে। শাহ আলম নামে এক তরুণ কৃষক জানালেন, এ বছর গ্লাডিওলাসের বাজার একটু মন্দা ছিল। নতুন বছরেও মন্দাভাব কাটবে বলে তার বিশ্বাস নেই। জানালেন, সাদা গ্লাডিওলাসের একটি স্টিক ২-৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটু বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে রঙিনটার, ৮-১০ টাকা। অন্যবার এই সময়ে গ্লাডিওলাসের বাজার অনেক ভালো ছিল। যা হোক, গ্লাডিওলাসের বাজার এ বছর একটু মন্দা থাকলেও অন্যসব ফুলের বাজার ভালো ছিল।

এ মাঠে এখন সাধারণত বছরব্যাপী ফলছে জারবেরা, গোলাপ, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা ও চন্দ্রমল্লিকা ফুল। চাষিরা আরও দুটি ফুল নতুন সংযোজনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, এ দুটি হলো ইসটোমা ও লিলিয়াম। জারবেরা চাষিরা দেখলাম ফুল বাজারে পাঠানোয় ব্যস্ত। একেবারে নববর্ষকে হিসাব করে তারা ফুল তৈরি করেছেন, যাতে আজকের সকালে অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরের সকালে যে ফুলটি বাজারে পাঠানো হবে, তা একেবারে পরিণত ও প্রস্ফুটিত ফুল। সেটির দামও ভালো আশা করছেন তারা। ফুল চাষি রেজা আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, ইসমাইল হোসেন সবারই ইংরেজি নববর্ষ নিয়ে অনেক প্রস্তুতি।

উৎসবে আয়োজনে মানুষের হাতে ফুল তুলে দেওয়ার মতো পবিত্র কাজ আর কী হতে পারে। এ কাজটির সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য কৃষক। গদখালী এখন শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি ফুল উৎপাদন কেন্দ্র। এ এলাকার ফুল অনুরাগী কৃষকের খুব কাছাকাছি বার বার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। বহু সাফল্যের প্রতিবেদন তুলে ধরেছি চ্যানেল আইয়ের ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’, বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘কৃষি দিবানিশি’ অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় লিখেছিও। ফুল চাষিদের ঢাকার বাজার স্থায়ীকরণ, স্থানীয় বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়েও বার বার কথা হয়েছে। তাদের সংগ্রাম ও কষ্টের কথা জেনেছি। বার বার কথা হয়েছে এ এলাকার ফুল চাষের প্রথম উদ্যোক্তা শের আলী সর্দার এবং ফুল চাষ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সদাতৎপর আবদুর রহিমের সঙ্গে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেছি। অনুপ্রাণিত হয়েছেন দেশ-বিদেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। আমি অনেককেই গদখালীর ফুলরাজ্যে নিয়ে এসেছি। ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা, ইউএসএআইডির মিশন চিফ রিচার্ড গ্রিনসহ অনেক অতিথিকে নিয়ে এসেছিলাম এ এলাকায়। তখনো শের আলী সর্দার, আবদুর রহিমসহ এলাকার বহু চাষি উৎসবমুখর পরিবেশে তুলে ধরেছিলেন ফুলচাষিদের সমস্যা-সম্ভাবনার নানা চিত্র। তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও ইউএসএআইডি মিশন ফুল চাষি ও ব্যবসায়ীদের নানামুখী সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে কথা রেখেছেনও তারা। ফুল চাষিদের জন্য ইউএসএআইডির সহায়তায় একাধিক প্রকল্প এসেছে। তারা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। অনেক কৃষক-কৃষাণী ফুল চাষ ও বাণিজ্যের শীর্ষ কেন্দ্র খ্যাত নেদারল্যান্ডস ঘুরে এসেছেন প্রকল্পের অর্থে। অনেকেই ভারত ও চীনের বিভিন্ন এলাকার  অভিজ্ঞতা সরেজমিন গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। এখন গদখালীর ফুল চাষিরা প্রত্যেকেই চাষ ও বাণিজ্য নিয়ে অনেক দূর স্বপ্ন দেখেন। তারা চিন্তা-চেতনায় হয়ে উঠেছেন প্রগতিশীল ও মননশীল। তারা শুধু নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন নয়, ফুল চাষের মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিকেও পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

ঘুরছিলাম ফুলের মাঠে। একটি জারবেরার গ্রিনহাউসে ঢুকে কথা হলো বৃদ্ধা ফুল চাষি মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে। মনে পড়ল, ২০১৩ সালে মনোয়ারা বেগম এক বিঘা জমিতে জারবেরার একটি গ্রিনহাউস গড়ে তুলেছেন। স্বপ্ন দেখছেন, একটি খেত থেকেই ভাগ্য পরিবর্তনের। এবার মনোয়ারা বেগম জানালেন, তার এখন জারবেরার গ্রিনহাউস পাঁচটি। এখন তার চোখেমুখে স্বপ্ন পূরণের তৃপ্তি। আরও বহুদূর যাওয়ার স্বপ্ন।

মনোয়ারা বেগমের পুত্রবধূ সাজেদা বেগম। ফুল চাষি পরিবারের গৃহবধূ। তাই জীবনকে রাঙিয়েছেন ফুলের সঙ্গেই। ইতিমধ্যেই তিনি ভারত ঘুরে এসেছেন। জেনেবুঝে গেছেন ফুল চাষ আর এ এলাকার পরিবর্তনের গল্পগুলো। এলাকার নারী ফুল চাষিদের সংগঠিত করছেন নাসরিন নাহার আশা। মাঠেই দেখা হলো ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের সঙ্গে। তিনি যে তথ্য দিলেন তা অবাক হওয়ার মতো। সারা দেশে এখন ফুল চাষির সংখ্যা ১৫ হাজার। আবাদি এলাকা পৌঁছেছে ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরে। তার হিসাবে এখন ফুল চাষ ও বাণিজ্যের অর্থমূল্য ৮০০ কোটি টাকার। আগামী বছর এটি পৌঁছবে ১৫০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকায়। আবদুর রহিম বলছেন, ফুল রপ্তানির একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে আমাদের কৃষি অর্থনীতি তথা রপ্তানি বাণিজ্যে ফুলের অবদান ব্যাপকভাবে বাড়বে। ফুল চাষিরা নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য নয়, বাংলাদেশে ফুলের আমদানিনির্ভরতা শূন্যে নামিয়ে আনতে তাদের চেষ্টার কমতি নেই। তাদের এ প্রচেষ্টার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ যুক্ত হলেই ফুল চাষ ও বাণিজ্য অন্য এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাবে আমাদের। এ সম্ভাবনা জানান দিয়েই আজ গদখালীর বিস্তীর্ণ ফুল খেতের ওপর দিয়ে বছরের শেষ সূর্য ছড়িয়ে যাবে তার রক্তিম আভা। বিদায় ২০১৬, স্বাগত ২০১৭। সবাইকে নতুন বছরের ফুলেল শুভেচ্ছা।

 

লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

            [email protected]

সর্বশেষ খবর