শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৯ মে, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ মে, ২০১৭ ২২:৪০

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অর্জন ও সম্ভাবনা

মোহাম্মদ রেজা-উল করিম শাম্মী

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অর্জন ও সম্ভাবনা

বর্তমান বিশ্বে যে কয়টি ইতিবাচক কারণে বাংলাদেশের নাম প্রশংসিত তার মধ্যে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের সাফল্য অন্যতম। ১৯৮৮ সালে ইউনাইটেড নেশনস অবজারভার মিশন ইন ইরাক-ইরান-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শান্তির দূতরা যে কার্যক্রম শুরু করেছিল ২৯ বছর পর তা আজ পরিণত রূপ পেয়েছে। আজ বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রতিশব্দ হচ্ছে বাংলাদেশ। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের উদাহরণ দিতে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করতে হয়। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের জটিল দায়িত্ব পালনের আগে অন্য দেশের শান্তিরক্ষীরা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) ঘুরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। বিশ্বে ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৬৮টি শান্তি মিশনের মধ্যে বাংলাদেশি শান্তিসেনাদের স্পর্শ পেয়েছে ৫৪টি মিশন। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে ১৩টি মিশনে দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা, মধ্য আফ্রিকার দেশ ডিআর কঙ্গো তাদের অন্যতম। মিশন অ্যাসেসমেন্ট টিমের সদস্য হিসেবে ডিআর কঙ্গোতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কার্যক্রম দেখার সুযোগ হয় আমার। ২৩,৪৫,৪০৯ বর্গ কি.মি. আয়তনের দেশটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৩ গুণ বড়। তবে এর জনসংখ্যা বাংলাদেশের অর্ধেকেরও কম, প্রায় সাড়ে ৭ কোটি। আয়তনে আফ্রিকা মহাদেশের দ্বিতীয় এবং বিশ্বের ১১তম বৃহৎ এ দেশটিতে স্বয়ং স্রষ্টা যেন নিজের হাতে সম্পদ দান করেছেন। হীরা, সোনা, রুপাসহ ৩২ ধরনের মূল্যবান খনিজ ছড়িয়ে আছে ডিআর কঙ্গোর মাটির নিচে। এটাই যেন কঙ্গোর মানুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ।

প্যাট্রিস লুমুম্বার নেতৃত্বে ১৯৬০ সালে কঙ্গো ঔপনিবেশিক বেলজিয়ামের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। প্যাট্রিস লুমুম্বা নিহত হন ১৯৬১ সালে। তার অনুসারী লরেন্ট কাবিলা হন দেশান্তরী। স্বৈরশাসক মবুতু ১৯৯৭ পর্যন্ত কঙ্গো শাসন করেন। ১৯৯৭ সালে লরেন্ট কাবিলার মিলিশিয়া বাহিনী এএফডিএল-উগান্ডা, রুয়ান্ডা ও বুরুন্ডর সেনাবাহিনীর সমর্থনে মবুতুকে পরাজিত করেন। বহুমাত্রিক চক্রান্তের জাল ছিন্ন করার চেষ্টা করেন কাবিলা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে কাবিলাও নিহত হন। পরে তার ছেলে যোসেফ কাবিলা কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু জনগণের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেছে সামান্যই।

সফরকালে ব্রিগেট সদর দফতর বুনিয়া থেকে এক ঘণ্টা হেলিকপ্টারে চড়ে মাহাগীতে পৌঁছলাম। এখানে আসার আগে আমরা জানতাম না যে আমাদের  শান্তিরক্ষীরা হাজার মাইল দূরে মাহাগীকে আরেক খণ্ড বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলেছে। সেবা ও আন্তরিকতা দিয়ে তাদের মন জয় করেছে। আগে মাহাগীর অবস্থা এমন ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন ২০০৯ সালে মাহাগীর দায়িত্ব নেয়। তারপর স্থানীয়দের জন্য বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম হাতে নেয়। মেডিকেল ক্যাম্প থেকে শুরু করে স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, বাচ্চাদের খেলার মাঠ, খেলার সরঞ্জাম প্রদানসহ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকেই বদলে গেছে মাহাগীর অবস্থা। সবাই এখন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বন্ধু ভাবছে। বঙ্গবন্ধু স্কুল, বাংলাদেশ এভিনিউ, বাংলাদেশ কঙ্গো ফ্রেন্ডশিপ মেডিকেল সেন্টার, খেলার মাঠ স্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের শান্তি সেনারা স্থানীয়দের কাছে অনেক জনপ্রিয়। স্থানীয়রা অনেকেই বাংলা বুঝে, এমনকি অনেকেই ভালো বাংলা বলতে পারে। আমরা রাস্তায় বেরোলে স্থানীয়রা-বন্ধু কেমন আছ বলে কুশল বিনিময় করে। ইন্টারনেটে কঙ্গোর মাহাগী সার্চ দিলে বাংলাদেশ এভিনিউ, বাংলাদেশ-কঙ্গো ফেন্ডশিপ স্কুল, মেডিকেল সেন্টার ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যায়।

মাহাগীতে পৌঁছে আমরা পরিদর্শনে গেলাম প্রায় ১০ কি.মি. দূরে মেডিকেল ক্যাম্পে যেখানে কয়েকশ লোক চিকিৎসা নিতে অপেক্ষা করছে। সকাল থেকে প্রায় ৪০০ লোক চিকিৎসা নিয়েছে। ডাক্তাররা জানান, এ চিকিৎসাসেবা নিতে ২০-৩০ কি.মি. দূর থেকেও লোকজন আসে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ উগান্ডা থেকেও লোকজন আসে। স্থানীয় এফএম রেডিও ওকাপির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় কখন কোথায় মেডিকেল ক্যাম্প হবে। প্রতি মাসে এ রকম দুটি মেডিকেল ক্যাম্প ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের সদর দফতরে প্রতি শনিবার বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হয়। এর বাইরেও প্রতিদিন অনেক জটিল রোগী ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসে। এখানকার প্রধান সমস্যা হচ্ছে ম্যালেরিয়া, এইডস, অপুষ্টি, বিভিন্ন ধরনের চর্ম রোগ, সাপে কাটা, আগুনে পোড়া ইত্যাদি। বিনামূল্যে দেওয়া হয় ওষুধ।

মেডিকেল ক্যাম্পের পাশেই চলছিল স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ইন্টারেকশন সভা, মেডিকেল ক্যাম্পের মতো এ সভাও প্রত্যেক মাসে বিভিন্ন স্থানে হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা স্থানীয় জনগণের চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে জানতে পারে এবং তা পূরণের চেষ্টা করে। মাহাগীর এডমিনিস্ট্রেটর জন ভসকো এসব সভায় উপস্থিত থাকেন। এ এডমিনিস্ট্রেটররা সরকার কর্তৃক মনোনীত। তবে আমাদের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে বংশ পরম্পরায় এ এডমিনিস্ট্রেটররা নিয়োগ পান। স্থানীয় এমপি থাকলেও পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের সময় ছাড়া তাদের দেখা যায় না। স্থানীয়রা এ এডমিনিস্ট্রেটরদের কাছেই ছুটে যায় যে কোনো বিপদে।

রেডিও ওকাপি কঙ্গোর একটি জনপ্রিয় এফএম রেডিওর নাম। এ রেডিওতে প্রতি বুধবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের বাংলা অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়। বাংলাদেশের অনেক জনপ্রিয় গান এতে প্রচার করা হয়। স্থানীয় জনগণ অধীর আগ্রহে এর জন্য অপেক্ষা করে।

মাহাগীর বর্তমান অবস্থা ভালো। তবে যে কোনো সময় এ স্থিতাবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে। এর কারণ সেখানকার দুর্বল অর্থনীতি, দুর্বল স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় শাসন, সব মিলিশিয়ার সরকারি বাহিনীতে যোগ না দেওয়া ইত্যাদি। মাহাগীতে সক্রিয় আছে লর্ড রেসিসট্যান্স আর্মি (এলআরএ)। যোসেফ কনির নেতৃত্বে ২০০৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া মরগান গ্রুপ নামে একটি মিলিশিয়া বাহিনী এবং আর্মি ফর লিবারেশন্স অব কঙ্গোলিজ পিউপল (এলপিসি)ও এখানে সক্রিয়। তারা মাঝে মাঝেই বিভিন্ন আক্রমণের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির নাম বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দিতে অক্লান্তভাবে লড়ে যাচ্ছে আমাদের শান্তি সেনারা। জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তি মিশনের মাধ্যমে যে রেমিট্যান্স আসছে তার অবদানও কিন্তু অর্থনীতিতে কম নয়। তারা দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করছে। তবে এ ভাবমূর্তির মাধ্যমে বিশ্বে একটি অবস্থান তৈরি করার দায়িত্ব সরকার ও ব্যবসায়ীদের। আমাদের দেশের শান্তিরক্ষীরা যে দেশেই গেছেন সে দেশের মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। সিয়েরালিওনে বাংলা আজ একটি সরকারি ভাষা। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা সিয়েরালিওনসহ শান্তিরক্ষা মিশন সম্পন্ন করা অন্যান্য দেশে ব্যবসা শুরু করতে পারে। এসব দেশের রয়েছে বিস্তীর্ণ মাঠ, যার অধিকাংশই অনাবাদি। এসব জমি লিজ নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কৃষিকাজ শুরু করা যায়। কৃষিকাজের জন্য এদেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে যাওয়া যায়। এতে বিপুলসংখ্যক জনগণের কর্মসংস্থান হবে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। বেসরকারিভাবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কৃষিকাজ শুরু করতে চাইলেও সরকারি বিধির কারণে বিনিয়োগ করতে পারে না, পুঁজি স্থানান্তর করতে পারে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এসব করেও আমরা কি পারছি জনগণের কষ্টার্জিত টাকা বিদেশে পাচার ঠেকাতে? কঙ্গো, উগান্ডা, আইভরিকোস্ট প্রভৃতি দেশে ভারত, চীন প্রভৃতি দেশ তাদের ব্যবসা বিস্তৃত করেছে। এসব দেশের জনগণের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে আমাদের পক্ষে আরও সহজে ব্যবসা করা সম্ভব। এগিয়ে নেওয়া সম্ভব আমাদের অর্থনীতিকে। আজ সময় এসেছে, এ বিষয়টা নিয়ে নতুন করে ভাবার। শান্তির জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায় ১৩২ জন শহীদের রক্তের প্রতি সম্মান দেখাবার। পিছিয়ে পড়ার আর কোনো সুযোগ নেই, সময়ও নেই।

লেখক : সহকারী পরিচালক, আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর), ঢাকা।


আপনার মন্তব্য