শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ আগস্ট, ২০১৮ ২৩:৫২

পবিত্র কাবার স্মরণ আল্লাহ-প্রেমের নিদর্শন

মুফতি আমজাদ হোসাইন হেলালী

পবিত্র কাবার স্মরণ আল্লাহ-প্রেমের নিদর্শন

পবিত্র কাবার স্মরণ প্রতিটি মোমিনের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে ওঠে। বিশেষ করে হজের মাসসমূহে আল্লাহ-প্রেমিকদের হৃদয়ে কাবার ভালোবাসা জাগ্রত হয়। যারা হজে গেছেন তারা কায়মনে প্রিয়তম স্থানে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। যারা যাবেন তাদের মনে শুধু একটি আশা কখন যাব প্রিয় ভূমি মক্কা-মদিনায়। প্রত্যেক হাজী কাবার পাশেই নামাজ আদায় করতে চান। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে সেখানে হাজীরা পৌঁছার প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কারণ প্রত্যেকের মনের আশা এখানে নামাজ পড়লে বরকত বেশি পাওয়া যাবে। রব্বুল আলামিনের একজন খাঁটি প্রেমিক হওয়া যাবে। মনের সব নেক তামান্না আল্লাহ পূরণ করবেন। একজন আল্লাহ-প্রেমিকের এমন বিশ্বাসই থাকা চাই। কাবা নিজেই অতি বরকতময়। তা ছাড়া তার চারদিকে রয়েছে বরকতময় স্থানসমূহ। প্রিয় পাঠক! আসুন সেই স্থানগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় জেনে নেওয়া যাক। এক. বায়তুল্লাহ : বায়তুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর ঘর (কাবা)। এটি মক্কা মুয়াজ্জমায় মাসজিদুল হারামের মাঝখানে অবস্থিত। একটি মহাপবিত্র ঘর এবং দুনিয়ার সর্বপ্রথম ইবাদতখানা, মুসলমানদের কিবলা এবং অতি বরকতময় ও পবিত্রতম স্থান যা দুনিয়াবাসীর জন্য রহমতস্বরূপ, ইত্যাদি। দুই. হাজরে আসওয়াদ : হাজরে আসওয়াদ অর্থাৎ কালো পাথর। এটি জান্নাতের একটি পাথর। জান্নাত থেকে আনার সময় তা দুধের মতো সাদা ছিল। কিন্তু আদমসন্তানের গুনাহ একে কালো বানিয়ে ফেলেছে। এটি বায়তুল্লাহর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সাড়ে ৩ ফুট উঁচুতে স্থাপিত আছে। তার চারপাশে রুপার বৃত্ত লাগানো আছে। তিন. হারাম : হারাম কাবার চারদিকে নির্দিষ্ট ভূমিকে হারাম বলে। এর চারদিকের সীমানায় বিশেষ চিহ্ন স্থাপিত আছে। হারামের সীমানার ভিতর কোনো প্রাণী শিকার করা, গাছ কাটা ও পশুকে ঘাস খাওয়ানো সবই হারাম। চার. হিল : হিল হারামের সীমানার বাইরে কিন্তু মিকাতের ভিতরে যে ভূমি রয়েছে তাকে হিল বলে। পাঁচ. হাতিম : হাতিম বায়তুল্লাহর উত্তর দিকে কাবা-সংলগ্ন প্রাচীরবেষ্টিত কিছু জায়গা। একে হাতিম, হিজর ও খাতিরাও বলা হয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির আগে কোরাইশরা যখন বায়তুল্লাহ পুনর্নির্মাণের ইচ্ছা করল তখন তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত হলো যে, কেবল হালাল টাকা দিয়ে এ কাজ করা হবে। কিন্তু তাদের হাতে হালাল টাকার পরিমাণ কম ছিল। তাই উত্তর দিকে সাবেক বায়তুল্লাহ থেকে কিছু জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এই ছেড়ে দেওয়া অংশকেই হাতিম বলে। আসল হাতিমের পরিমাণ হলো ৬ হাতের মতো। বর্তমানে আরও কিছু বেশি জায়গাজুড়ে বেষ্টনী তৈরি করে রাখা হয়েছে। ছয়. জমজম : জমজম মাসজিদুল হারামের  ভিতরে বায়তুল্লাহর কাছে একটি প্রসিদ্ধ ফোয়ারার নাম। বর্তমানে তা কূপের আকারে আছে। বায়তুল্লাহর পূর্ব দিকে প্রায় ১৮ মিটার দূরে এ কুয়ার অবস্থান। এটা আল্লাহতায়ালা আপন কুদরতে হজরত ইসমাইল  বিবি হাজেরা আলাইহিস সালামের জন্য প্রবাহিত করেছিলেন। সাত. মিজাবে রহমত : বায়তুল্লাহর ছাদে একটি নল লাগানো আছে। বৃষ্টি হলে এখান দিয়ে ছাদের পানি নিচে গড়িয়ে পড়ে। একে মিজাবে রহমত বলে। এতে বহু বরকত আছে। এ স্থানটি হাতিমের ওপরে অবস্থিত। আট. মাতাফ : বায়তুল্লাহর চারদিকে তাওয়াফ করার স্থান। এ স্থানে মরমর পাথর বাঁধানো রয়েছে। নয়. মাকামে ইবরাহিম : একটি জান্নাতি পাথরের নাম। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর ওপর দাঁড়িয়ে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। এটি মাতাফের পূর্ব দিকে মিম্বার ও জমজমের মধ্যবর্তী স্থানে একটি জালিবিশিষ্ট সবুজ গম্বুজের মধ্যে সংরক্ষিত। দশ. মুলতাজাম : হাজরে আসওয়াদ ও বায়তুল্লাহর দরজার মধ্যবর্তী দেয়াল। একে জড়িয়ে ধরে দোয়া করা সুন্নাত। এ স্থানের দোয়া কবুল হয়। এগার. রুকনে ইয়ামানি : বায়তুল্লাহর পশ্চিম-দক্ষিণ কোণ। যেহেতু এটি ইয়ামানের দিকে অবস্থিত তাই একে রুকনে ইয়ামানি বলা হয়। বারো. রুকনে ইরাকি : বায়তুল্লাহর উত্তর-পূর্ব কোণ; যা ইরাকের দিকে অবস্থিত। যেহেতু এটি ইরাকের দিকে অবস্থিত তাই একে রুকনে ইরাকি বলা হয়। তের. রুকনে শামি : বায়তুল্লাহর উত্তর-পশ্চিম কোণ; যা শাম বা সিরিয়ার দিকে অবস্থিত। যেহেতু এটি শামের দিকে অবস্থিত তাই একে রুকনে শামি বলা হয়। চৌদ্দ. গাফা : বায়তুল্লাহর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত ছোট একটি পাহাড়। বর্তমানে যার সামান্য আকৃতি অবশিষ্ট রয়েছে। এখান থেকেই সায়ি শুরু হয়। পনের. মারওয়া : বায়তুল্লাহর পূর্ব-উত্তর দিকে অবস্থিত ছোট একটি পাহাড়; যা সাফা থেকে প্রায় ৩৭৫ মিটার দূরে। এখানে পৌঁছে সায়ি সমাপ্ত করতে হয়। ষোল. মিলাইনে আখজারাইন : সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে নির্দিষ্ট একটি স্থান। যারা সায়ি করে তাদের এ স্থানটি দৌড়ে অতিক্রম করতে হয়। স্থানটির দুই পাশের দেয়ালে ও ওপরে সবুজ বাতি দ্বারা সুসজ্জিত করা আছে। সতের. মাওয়ালিদুন্নাবী বা রসুলুল্লাহর জন্মদিন : আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান। এটি হারাম শরিফের পূর্ব দিকের চত্বরের পুবে অবস্থিত। বর্তমানে একে একটি জাতীয় পাঠাগার বানিয়ে রাখা হয়েছে। প্রিয় পাঠক! প্রতিটি জায়গার নাম কত সুন্দর। নামগুলো শোনামাত্র দিলে কেমন যেন আনন্দ অনুভূত হয়। প্রতিটি জায়গাই রহমত, বরকতে ভরপুর। আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সেই পবিত্র ভূমিতে বার বার যাওয়ার তাওফিক দান করুন।

            লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব। বারিধারা, ঢাকা


আপনার মন্তব্য