শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৭

ধর্ষকের ক্রসফায়ার দাবি কতটা যৌক্তিক

এ কে এম শহীদুল হক

ধর্ষকের ক্রসফায়ার দাবি কতটা যৌক্তিক

১৪ জানুয়ারি ২০২০ খ্রি. তারিখে মহান জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলীয় মাননীয় সংসদ সদস্যরা ধর্ষণের ওপর অনির্ধারিত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে সিনিয়র সদস্যও ছিলেন। প্রত্যেকেই ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। তাদের অনেকেই ধর্ষককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারে মৃত্যু ঘটার পক্ষে জোরাল বক্তব্য প্রদান করেন। তাদের বক্তব্যে যে ইঙ্গিত আসে তা হলো ধর্ষকদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। বিচার ছাড়াই ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে প্রাণনাশ হওয়া উচিত। দেশে সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুরাও ধর্ষকের বিকৃত ও পাশবিক থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ধষর্ণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের আইন প্রণেতারাও দেশবাসীর সঙ্গে উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্নতার কারণেই তাদের এমন কঠিন উচ্চারণ। কিন্তু মহান জাতীয় সংসদে মাননীয় আইন প্রণেতারা যখন বিচার বহির্ভূতভাবে অপরাধীদের ক্রসফায়ারে হত্যা করার পক্ষে মত দেন, তখন গণতান্ত্রিক সমাজে কি মেসেজ জনগণের কাছে যায়? অনেক দেশে বিচারে মৃত্যুদন্ডের বিধান রহিত করা হয়েছে। আমাদের দেশের মতো আবার অনেক দেশে মৃত্যুদন্ডের বিধান আছে। অপরাধী যত কুখ্যাতই হোক তাকে বিচারের সোপর্দ করতে হবে এবং তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। এটাই গণতান্ত্রিক সমাজে বিচার প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক প্রথা। আইন প্রণেতা, মানবাধিকার কর্মী, তথা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিকরা সংবিধান, আইন ও বিধি-বিধানের মধ্যে থেকেই তাদের মতামত ব্যক্ত করবেন এটাই বাঞ্ছনীয়। জাতীয় সংসদে যখন সংবিধান ও আইন বহির্ভূত বক্তব্য আসে, তখন তা শোভা পায় না। আবেগে সাধারণ নাগরিক যে কথা বলতে পারবে মহান সংসদে জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠে সে কথা মানানসই হয় না। আবেগ থাকবে কিন্তু আইনের কাঠামোর মধ্যে তা ব্যক্ত হবে। এটাই সমীচীন। এটাই বিধিসম্মত। ইদানীং দেশে ধর্ষণের ঘটনা অনেকটা মহামারিতে রূপ নিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রতিদিনই ধর্ষণের সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। অত্যন্ত অমানবিক, পাশবিক ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। ঢাকার হাজারীবাগে পিতার সহায়তার তের বছরের এক কিশোরী পঁয়ত্রিশ বছরের এক ব্যক্তি কয়েক মাস যাবৎ ধর্ষণ করছিল। এসব সংবাদ শুনে বিবেকবান যে কোনো ব্যক্তির মধ্যেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। ধর্ষকের ফাঁসি দাবি করাটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা আইনের মধ্যেই হওয়া উচিত। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভিকটিম সময়মতো সঠিক বিচার পাচ্ছে না। আইনের ফাঁকফোকরে আসামিও অধিকংশ ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। ধর্ষণ ও স্পর্শকাতর বা গুরুতর নির্যাতনের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের অতিরিক্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে তিন মাসের মধ্যে বিচার কার্য সম্পন্ন করার কার্যকর বিধান করা অপরিহার্য। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে ধর্ষণ মামলার ত্রুটিহীন তদন্ত শেষ করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নিলে এবং সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক হলে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সফলতার সঙ্গে গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ শাসন শুরু করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে যেটা একটি রাষ্ট্রের প্রদেশ ছিল সেটাকে রাষ্ট্রে রূপদান করেছিলেন। শূন্য থেকে শুরু করে একটি ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত একটি জনপদকে পুনর্গঠন করেছিলেন। সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু দেশের আথর্-সামাজিক উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট পুনঃনির্মাণ, এক কোটি শরণার্থীকে ভারত থেকে এনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, নির্যাতিতা নারীদের পুনর্বাসন, কল-কারখানা, ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান চালু, প্রশাসনিক কাঠামো, পুলিশ ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলা, সংবিধান প্রণয়ন, ভারতীয় সেনা ফেরত ইত্যাদি অসংখ্য ঐতিহাসিক, সংস্কার, উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক কাজ বঙ্গবন্ধু অল্প সময়ের মধ্যে সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা তার রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা, দক্ষতা, নেতৃত্ব, দেশ ও জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা, দরদ ও দৃঢ় অঙ্গীকারের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ার এবং জনগণের কল্যাণে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন তখন এক শ্রেণির নেতা-কর্মী দুর্নীতি ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তি ও মহল নানা প্রক্রিয়ায় দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করছিল। কিছু কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি বিদেশি প্রভুদের কাছ থেকে আর্থিক লাভবান হয়ে বিদেশি মতবাদ আমাদের দেশে চাপিয়ে দেওয়ার নামে নানারকম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কাজে তৎপর ছিল। জাসদের গণবাহিনী, পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিসহ বিদেশিদের মদদ ও ষড়যন্ত্রে গড়ে ওঠা জনবিচ্ছিন্ন কতিপয় রাজনৈতিক সংগঠনের সশস্ত্র উইং তৈরি করা হয়। তারা একটি নতুন রাষ্ট্রের নবগঠিত সরকারের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তারা থানা-ফাঁড়ি লুট করে। পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের হত্যা করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। অসাধু ব্যবসায়ী, মাস্তান ও সন্ত্রাসীরা চোরাচালান, খাদ্যশস্যের অবৈধ মজুদ, চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ অপকর্ম চালিয়ে দেশের মধ্যে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। মাস্তান, সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারী ও চোরাকারবারীদের গ্রেফতার করেও বেশিদিন জেলহাজতে রাখা যেত না। জামিনে বের হয়ে তারা আবার একই অপকর্মে লিপ্ত হতো।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৪ সালে একটি কঠোর আইন প্রণয়ন করেন। সেটা হলো Special Power Act, 1974-এ আইনে সংঘটিত অপরাধ special tribunal এর মাধ্যমে বিচারের বিধান করা হয়। অর্থাৎ যেসব দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, অবৈধ অস্ত্রধারী বা চোরাকারবারী যাদের প্রচলিত আইনে জেলহাজতে বেশিদিন আটকে রাখা যেত না কিংবা যাদের ভয়ে কেউ মামলা করত না বা সাক্ষী দিত না তাদের পুলিশ প্রতিবেদনের আলোকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাহী আদেশে নিবর্তনমূলক আটকাদেশে কয়েক মাস জেলে আটকে (Preventive Detention) রাখতে পারত। এতে প্রাথমিকভাবে সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল। দেশের বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার কর্মী ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ Special Power Act, 1974-কে একটি কালো আইন বলে সমালোচনা করতেন।

Preventive Detention-কে তারা মানবাধিকার ও সংবিধানবিরোধী আইন বলতেন। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম ঘরানার রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ক্ষমতার বাইরে থাকলে Special Power Act কে কালো আইন বা Black Law আখ্যা দিয়ে গলা ফাটিয়ে কথা বলতেন। তারা যখন ক্ষমতায় যেত তখন এ আইন বা আইনের ধারা বাতিল বা সংশোধনের কোনো উদ্যোগ না নিয়ে চুপ থাকত। এটাই বাংলাদেশে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদদের স্ববিরোধী ও শঠতার রাজনীতি। এটা ছিল তাদের মিথ্যা প্রচারণা ও আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে হীন রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের অপকৌশল।

বিচার বিভাগ অর্থাৎ উচ্চ আদালতও Special Power Act এর Prevention Detention এর ব্যাপারে বারবার রুলিং দিয়েছেন।

Detention আদেশের বিরুদ্ধে Writ Petition হলে পুলিশকে উচ্চ আদালতে হাজির হয়ে জবাবদিহি করতে হতো। তাই পুলিশও এ আইন প্রয়োগ করে ডিটেনশন দিতে অনীহা প্রকাশ করে। পুলিশ Detention দেওয়ার প্রস্তাব প্রায় বন্ধ করেই দেয়।

Special Power Act-কে যারা কালো আইন ও সংবিধানবিরোধী বলেন তারা ঠিক বলেন না। বাংলাদেশের সংবিধান বিশ্বে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানের ন্যায়ই একটি উন্নত মানের সংবিধান। সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই Special Power Act-এ নিবর্তনমূলক আটক বা

Preventive Detention-এর বিধান রাখা হয়েছে। সংবিধানের ৩৩(৪) নং অনুচ্ছেদে নিম্নরূপ বর্ণিত আছে- “নিবর্তনমূলক আটকের বিধানসংবলিত কোন আইন কোন ব্যক্তিকে ছয় মাসের অধিককাল আটক রাখিবার ক্ষমতা প্রদান করিবে না যদি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক রহিয়াছেন বা ছিলেন কিংবা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগলাভের যোগ্যতা রাখেন, এইরূপ দুইজন এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত একজন প্রবীণ কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত কোন উপদেষ্টা পর্ষদ উক্ত ছয় মাস অতিবাহিত হইবার পূর্বে তাহাকে উপস্থিত হইয়া বক্তব্য পেশ করিবার সুযোগ দানের পর রিপোর্ট প্রদান না করিয়া থাকেন যে, পর্ষদের মতে উক্ত ব্যক্তিকে তদাতিরিক্ত কাল আটক রাখিবার পর্যাপ্ত কারণ রহিয়াছে।” সংবিধানের উপরোক্ত আর্টিক্যালে এটা স্পষ্ট যে, জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থে একজন ব্যক্তিকে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্বাহী আদেশে ছয় মাস পর্যন্ত নিবর্তনমূলক আটক রাখতে পারবে। ছয় মাসের বেশি হলে উপদেষ্টা পর্ষদের মতামত প্রয়োজন হবে। কাজেই কোনোক্রমেই Special Power Act, 1974 কালো আইন নয়। সংবিধান পরিপন্থী নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কখনো জনবিরোধী আইন বা কালো আইন প্রণয়ন করতে পারেন না। তিনি যা করেছেন তা দেশ ও জনগণের স্বার্থেই করেছেন। অথচ Preventive Detention বিধান এখন অনেকটা অকেজো হয়ে পড়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সন্ত্রাস দমনের নামে অপারেশন ক্লিনহার্টের আওতায় মাঠে সেনাবাহিনী নামায়। দেশে সন্ত্রাস, হত্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে ক্লিনহার্ট অপারেশন চালানো হয়। ওই অপারেশনে বেশকিছু লোক মারা যায়। তখন বলা হতো তারা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। ওই মৃত্যুর দায় থেকে সংশ্লিষ্টদের মুক্ত রাখার জন্য ইনডেমনিটি আইন করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর এ ধরনের অভিযানে আগ্রহ ছিল না বিধায় হাওয়া ভবনের পরামর্শে Rapid Action Battalion (RAB) গঠন করা হয়।

Cross Fire-এ সন্ত্রাসীদের নিহত হওয়ার ঘটনা RAB-এর অভিযানেই প্রথম শুরু হয়। এখন পুলিশও পিছিয়ে নেই। Cross Fire বা Encounter শুরু হওয়ার পর নিবর্তনমূলক আটক বা Preventive Detention-এর প্রয়োজনীয়তা রইল না। Encounter বা Cross Fire-এ জনবিরোধী, কুখ্যাত অপরাধী ও সন্ত্রাসীরা নিহত হওয়ায় অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ক্রসফায়ারকে নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। কারণ আদালতের বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় এ ধরনের গুরুতর অপরাধীরা সাজা এড়িয়ে সমাজে অপরাধ কর্মকান্ড অব্যাহত রাখে এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই ক্রসফায়ার অনেকেই সমর্থন করে। মাননীয় সংসদ সদস্য তথা আইন প্রণেতারা সাধারণ নাগরিকের কাতারে এসে ক্রসফায়ারে ধর্ষকদের হত্যার পক্ষে সংসদে বক্তব্য রাখছেন। ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার সব অপরাধ দমনে মহৌষধ নয়। কিছুদিন আগে হারকিউলিস নামে সাভারে, নারায়ণগঞ্জে, চট্টগ্রাম ও বরিশালে কয়েকজন ধর্ষকের হত্যার ঘটনা জনগণ দেখেছে। তাতে কি ধর্ষকদের মনে ভীতি সঞ্চার করা সম্ভব হয়েছে? অবস্থাদৃষ্টে দেখা যায় তা সম্ভব হয়নি। ধর্ষণের ঘটনা কমেনি। যখন কারও মনে অপরাধ প্রবণতা প্রবলভাবে আলোড়িত হয় তখন তাদের বিবেক-বুদ্ধি, মানবিকতা ও মনুষ্যত্ববোধ লোপ পায়। অপরাধ করলে তার পরিণতি কি হবে সেই বিবেচনা বা ভীতি তখন তার থাকে না। খুন করলে খুনের শাস্তি মৃত্যুদ-। এটা সবাই জানে। তবুও সমাজে অহরহ খুন হচ্ছে। কিছু কিছু অপরাধ আছে যা পুলিশ ও আদালত দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এসব সামাজিক অপরাধ বা ব্যাধি যেমন- নারী নির্যাতন, যৌতুক, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদকের অপব্যবহার, জঙ্গি তৎপরতা ইত্যাদি দমনে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি গণসচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মনে এসব সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করতে হবে। নারীরা কারও মা, কারও বোন, কারও স্ত্রী। সমাজে নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। ধর্ষকরা কুরুচিপূর্ণ, বিকৃতমনা, অমানুষ ও পশু সমতুল্য। ধর্ষকদের বা নারী উত্ত্যক্তকারীদের সমাজ ঘৃণার চোখে দেখবে। সামাজিকভাবে তাদের হেয় করতে হবে। বয়কট করতে হবে। নারী ধর্ষণ ও উত্ত্যক্তকারীদের সমাজে কোনো ভালো অবস্থানে রাখা যাবে না।

কিশোর, তরুণ ও যুবকদের মনে সামাজিক অপরাধ ও ব্যাধিবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির জন্য স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে শিক্ষার বিষয় হিসেবে সামাজিক ব্যাধিকে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। সামাজিক ব্যাধি তথা এসব জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন ও সমাজে ধিক্কার সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে পারলেই এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা হ্রাস পেতে পারে। এ কাজে সমাজের সব পেশার ও শ্রেণির লোকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে অবদান রাখলেই সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসবে। ক্রসফায়ার একমাত্র সমস্যার সমাধান নয়। সরকার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

                লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ।


আপনার মন্তব্য