শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ নভেম্বর, ২০২০ ২৩:০২

এত বড় স্পর্ধা-এরা কারা

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

এত বড় স্পর্ধা-এরা কারা

নিতান্ত সরল অর্থ, অতি পরিষ্কার-

বহু পুরাতন ভাব, নব আবিষ্কার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হিংটিং ছট স্বপ্নমঙ্গল কবিতার দুটি অতি জনপ্রিয় লাইন দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করছি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি ঘটনা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জ থেকে অস্ত্রসহ জেএমবি জঙ্গি গ্রেফতার, ধর্মান্ধদের পক্ষ থেকে জাতির পিতা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার দাবি এবং ঢাকা শহরে একদিনে হঠাৎ করে নয়টি বাসে আগুন। এই ঘটনাগুলোর ব্যাপারে আমার কাছে একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, এসব কারা করছে বলে আমার মনে হয় এবং এদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য কী? সাংবাদিক ভাইকে আমি রবীন্দ্রনাথের উপরোক্ত দুটি কবিতার লাইন পড়ে শুনিয়েছি। সাংবাদিক ভাইয়ের প্রশ্নের সঠিক উত্তরের কোনোটাই বাংলাদেশের মানুষের অজানা নয়। এই দুর্বৃত্তদের পরিচয় ও কর্মকান্ড সেই ১৯৭৫ সালের পর থেকেই আমরা দেখে আসছি। তারপরও সব জেনেশুনে কেউ সত্যকে গোপন করবে, আরেক পক্ষ আছে সত্য-মিথ্যাকে মিশিয়ে নিজের মতো করে কিছু বলবে, আবার মানুষের মধ্যে বড় একটি অংশ আছে যারা একেবারে স্পিকটি নট,  চুপ করে থাকবে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর লোক সমাজ থেকে উধাও হয়ে গেছে বলেই সর্বত্র চরম নৈতিকতার অবক্ষয় এবং ধর্মান্ধ উগ্রবাদীদের রমরমা ব্যবসা ও উত্থান। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা ও ভাঙার উন্মাদনা ছড়িয়ে বাংলাদেশে কেউ পার পেয়ে যাবে, গ্রেফতার হবে না, জেলে ঢুকবে না, সেটি তো ভাবা যায় না। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি দেশদ্রোহিতার সমান। শেখ মুজিব আর বাংলাদেশকে কি আলাদা করা যাবে। এই দুর্বৃত্তরা সব জেনেও না জানার ভান করবে, আর নয়তো ধ্রুবতারার মতো সত্যকে অস্বীকার করবে। তারা ধর্মের কথা বলে। অথচ পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারার ৪২তম আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে তোমরা গোপন কর না।’ সৌদি আরবের মদিনা থেকে প্রকাশিত বাংলা অনুবাদ করা কোরআনে করিমে ওই আয়াতের এরকমই অর্থ করা হয়েছে। এসব ধর্মান্ধরা বাংলাদেশের নাগরিক অধিকার ভোগ করে, খেয়ে পরে বর্ধিত হয়, কিন্তু কথা বলে তাদের শেকড় পাকিস্তানি মোল্লাদের ভাষায়। একাত্তরে তারা বাংলাদেশ চায়নি, এখনো চায় না।

বাংলাদেশ নামের খোলসে তারা পাকিস্তানের মতো মোল্লাতন্ত্র কায়েম করতে চায়, যা অনুসরণ করে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের পর পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসা দুই সামরিক শাসক ধর্মীয় রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতির এমন সর্বনাশ করেছেন যে, সেই পথ ধরে জন্ম নেওয়া ধর্মান্ধ উগ্রবাদীরা এত বড় আস্ফালন করছে এবং স্পর্ধা দেখাচ্ছে। ভাবতে পারেন, যুদ্ধাপরাধী নিজামী, মুজাহিদ বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হয়ে বলে, এ দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। তারপরও তারা মন্ত্রী থাকে, জাতীয় পতাকা গাড়িতে উড়ায়। সামরিক শাসকদের গর্ভ থেকে উৎপত্তি হওয়া রাজনৈতিক দল ও পক্ষ ওই দুজনসহ সব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিরোধিতা করে। সুতরাং সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নতুন কিছু নয়। এদের নেক্সাস ও সংঘবদ্ধতার স্বরূপ সবারই জানা। যেহেতু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে এরা মূর্তি হিসেবে আখ্যায়িত করছে এবং চরম অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাই বিশ্বের অন্য মুসলিম প্রধান দেশের কিছু ভাস্কর্যের কথা তুলে ধরছি। ইসলামের পুণ্যময় স্থানগুলো প্রধানত সৌদি আরবে অবস্থিত। সৌদি আরবের প্রধান শহর জেদ্দার বড় বড় চত্বর ঘিরে আছে মুষ্টিবদ্ধ হাত, হাংরি হর্স, অর্থাৎ বড় বড় ঘোড়া এবং উটের ভাস্কর্য। ইরান একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র। তেহরানে মহাকবি ফেরদৌস, ওমর খৈয়াম, কবি হাফিজসহ ইসলামিক বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির অনেক ভাস্কর্য রয়েছে। ইবনে সিনার ভাস্কর্য আছে হামাদান শহরে। সিরিয়ার বিখ্যাত ভাস্কর্যটি হলো বীর মুসলিম সেনাপতি সালাদ্দিন (১১৩৭-১১৯৩)-এর স্মরণে নির্মিত স্ট্যাচু অব সালাদিন। ব্রোঞ্জের তৈরি দৃষ্টিনন্দন বিশাল এই ভাস্কর্যটি আছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কেন্দ্রস্থল সিটিডাল অব দামেস্কে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুর্জ আল খলিফার বিপরীতে রয়েছে আরবীয় যুগলের ভাস্কর্য। তিউনেশিয়ায় শতকরা ৯৮ ভাগ মুসলমান এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। রাজধানী তিউনিসে হাবিব বুর্গিবা এভিনিউতে রয়েছে ইবনে খালিদুনের বিশাল ভাস্কর্য। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শহীদ হওয়া বীরদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ন্যাশনাল মনুমেন্ট। ইরাকের বাগদাদে আলিবাবা ফাউন্টেন, আলিবাবা আর চল্লিশ চোরের সেই বিখ্যাত বুদ্ধিমতী নারী মর্জিনার ভাস্কর্য রয়েছে। সব মুসলিম প্রধান দেশসহ বিশ্বের সর্বত্রই ভাস্কর্য রয়েছে। ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে ধর্মবিরোধী কাজ বলে বিশ্বের কোথাও কেউ বলছে না। পাকিস্তানেও অনেক ভাস্কর্য আছে। মওদুদিবাদী জামায়াত ও তাদের অনুসারীরা মাঝে-মধ্যে সেখানে ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে লাঠিসোঁটা নিয়ে মাঠে নামে। বাংলাদেশের জামায়াত, হেফাজত, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফতে মজলিস, ইসলামিক শাসনতন্ত্র আন্দোলন ইত্যাদি সবার শেকড় অভিন্ন স্থানে। শুধু নেতৃত্ব আর অর্থকড়ির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং অনৈক্যের জন্য এরা বিভিন্ন নামের সংগঠন নিয়ে সবাই মওদুদি জামায়াতি ভাষায় কথা বলে। কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চত্বর থেকে লালনের ভাস্কর্য এবং হাই কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে প্রাচীন গ্রিসের লেডি বিচারকের ভাস্কর্য তারা সরাতে পেরেছে বলে স্পর্ধা এতই বেড়ে গেছে যে, জাতির পিতা, যার জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না, তার ভাস্কর্য অপসারণের দাবি উত্থাপন করছে। এত সাহস তারা কীভাবে পেল সেটি উপলব্ধি করা দরকার। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা বিএনপি জোটের ক্ষমতাশালী শরিক হয়ে প্রকাশ্যে স্লোগান দিলেন, ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান। তিনি হুঙ্কার দিলেন, চারদলীয় জোট আরেকবার ক্ষমতায় এলে দেশ থেকে সব ভাস্কর্য, তাদের ভাষায় মূর্তি নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে। জামায়াতের কথা আর কী বলব। তারা আরেকবার মন্ত্রী হতে পারলে বাংলাদেশ নামটি থাকলেও কার্যক্ষেত্রে তা কোথাও থাকত না। কনফেডারেশন অথবা অন্য কোনো পন্থায় পাকিস্তানের অংশ হয়ে যেত, যার জন্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় জামায়াতিদের জন্য এত দরদ দেখিয়েছে পাকিস্তান। পার্লামেন্টে শোক প্রস্তাবসহ গায়েবি জানাজা পড়েছে পাকিস্তান। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদকে ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যু দন্ডাদেশ প্রদান করা হয়। ওই দিন বিকাল থেকেই জামায়াতের ক্যাডার বাহিনী সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও তা-ব শুরু করে। তারা শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। জাতীয় পতাকায় আগুন দেয়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বিশ্রামরত তিনজন পুলিশকে ফাঁড়িতে  আগুন ধরিয়ে হত্যা করা হয়। পরের দিন, মার্চ মাসের এক তারিখ থেকে বিএনপি সর্বাত্মকভাবে জামায়াতের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তারা আগুন দেয় এবং একজন কর্তব্যরত ইঞ্জিনিয়ারকে পুড়িয়ে মারে। বিএনপি বাংলাদেশে বসে মাঠে এবং পাকিস্তান পার্লামেন্টে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে  যা করছে তার মধ্যে আদৌ কি কোনো পার্থক্য আছে, একই নেক্সাস নয় কি। হেফাজতের আমির নারীদের তেঁতুল বলে আখ্যায়িত করলেন। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের মঞ্চে উঠলেন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতারা। হাত উঁচু করে সমর্থন দিলেন। জামায়াতের ঢাকা মহানগরের আমির টেলিফোনে হুকুম দিলেন জামায়াতের সবাই যেন হেফাজতের সঙ্গে যোগ দেয়। ওই টেলিফোন আলাপ পরে ফাঁস হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে সরাসরি হুকুম এলো বিএনপির সব নেতা-কর্মী যেন হেফাজতের সমর্থনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো, তারা সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই শাপলা চত্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়। তাহলে  দাঁড়ালটা কী। পূর্বের লেগেসি তো আছে। শুধু ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে যা দেখা গেল তাতে এটা স্পষ্ট, এরা সবাই একই নেক্সাসের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে, আবার কখনো সুযোগমতো সম্মিলিতভাবে কমন লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ চেতনার সবকিছু বাদ দিয়ে প্রয়াত সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৮ সালে প্রবর্তিত সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশ চলবে সেটাই তারা চায়, যার সঙ্গে পাকিস্তানি দর্শন ও চেতনার হুবহু মিল রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র শক্তি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে তা হবে না বিধায় ২০১৩ সালের ৫ মে তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত ঘটনার পরিণতিতে আওয়ামী লীগ যে কৌশল ও পন্থায় সবকিছু মোকাবিলা করেছে, তাকে সমালোচনা করা যায়, মেকিয়েভেলির নীতি বলা যায়। কিন্তু সম্মিলিত ওই অপশক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারেনি, এটাই কি বড় কথা নয়। কিন্তু সবকিছু মিলে যা হয়েছে তাতে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর স্পর্ধা বেড়ে গেছে।  এর জন্য কাকে দায়ী করব। একবার ভেবে দেখুন, ১৯৭৫ সালের পর ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি যদি পুনরায় চালু না হতো, দুই সামরিক শাসক যদি বাহাত্তরের সংবিধানকে বিনষ্ট না করতেন, জামায়াত, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফতে মজলিস যদি বিএনপির মিত্রতার সমর্থন না পেত এবং ২০১৩ সালের মে মাসের ৫ তারিখে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ উল্লিখিত সবাই মিলে হেফাজতকে যদি সমর্থন না দিত, তাহলে আজকে জাতির পিতার ভাস্কর্য অপসারণের এমন দাবি তোলার কি দুঃসাহস তারা দেখাতে পারত। ধর্মান্ধতা হলো ভাইরাস যে কথা বার্ট্রান্ড রাসেল তার কংকুয়েস্ট অব হ্যাপিনেস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ধর্মান্ধত্বের ভাইরাস থেকে আওয়ামী লীগও নিজেদের রক্ষা করতে পারেনি। ভাস্কর্য হচ্ছে মানুষের চিন্তার সর্বোচ্চ সৃষ্টিশীলতার বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ শিল্পকলা। সে রকম একটা ভাস্কর্য দেশকে সারা পৃথিবীতে পরিচিতি দিতে পারে।

১৫০৩ সালে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা ছবিটি পাঁচশ বছর পরেও ২৫-৩০ ডলার মূল্যের টিকিট কেটে বছরে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রবেশ করে প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরে। এগুলোর মূল্য ওই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বোঝে না। সেই ১৯৭৫ সালের পর থেকে এগোতে এগোতে এখন তারা বাংলাদেশের কলিজার ওপর হাত দেওয়ার চেষ্টা করছে। স্পর্ধার জায়গার লেগেসি এবং বর্তমান নেক্সাসের সঠিক চিত্র সবার জানা উচিত। স্পর্ধার সব সীমা তারা লঙ্ঘন করছে।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

ই-মেইল : [email protected]

 


আপনার মন্তব্য