শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৩৬

নগরীয় সভ্যতা ও আমার গ্রাম আমার শহর

মোশাররফ হোসেন মুসা

নগরীয় সভ্যতা ও আমার গ্রাম আমার শহর

বস্তুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পৃথিবীর সবকিছুর প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, অধিকাংশ মানুষ পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও পরিবর্তন বিশ্বাস করে না। এখানে একটি স্থানীয় ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। তখন এরশাদ সরকারের আমল। ঈশ্বরদী পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে রেলওয়ে মার্কেটে অবস্থিত মতি ভাইয়ের হোমিওপ্যাথি ডাক্তার খানায় সাংবাদিকদের আড্ডা বসত। তো সে সময় প্রতিদিন রিকশা সমিতি আর টেম্পো সমিতির দ্বন্দ্ব-কলহ লেগেই থাকত। রিকশা সমিতির দাবি ছিল- কোনো টেম্পো রাস্তা থেকে প্যাসেঞ্জার তুলতে পারবে না। টেম্পো সমিতি তাদের দাবি মেনে নেয়। কিন্তু কয়েক দিন পর অভিযোগ আসে টেম্পোর চালকরা শর্ত ভঙ্গ করে রাস্তা থেকে প্যাসেঞ্জার তুলছে। শুরু হয় হাতাহাতি, পরিশেষে ধর্মঘট। সেই সঙ্গে প্রতিবাদ সভা, সংবাদ সম্মেলন-পাল্টা সংবাদ সম্মেলন নিত্যকার ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। দুই পক্ষ কিছুটা ছাড় দিয়ে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে আপস করে। চুক্তিতে লেখা হয়- একটি টেম্পো মোটরস্ট্যান্ড থেকে যাত্রী বোঝাই করে যাত্রা করবে এবং নির্দিষ্ট দুটি জায়গা থেকে তারা প্যাসেঞ্জার তুলতে পারবে। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল টেম্পো চালকরা চুক্তিভঙ্গ করে রাস্তা থেকে আবারও প্যাসেঞ্জার তোলা শুরু করছে। আবার শুরু হয় মারামারি, হরতাল-ধর্মঘট। একইভাবে চলতে থাকে সংবাদ সম্মেলন-পাল্টা সংবাদ সম্মেলন ইত্যাদি। একদিন প্রেস ক্লাবের সভাপতি মতি ভাই ভলিয়ম আকৃতির দুটি বড় ফাইল দেখান (যার প্রতিটির ওজন কমপক্ষে ৫ কেজি করে হবে)। তার একটিতে লেখা আছে রিকশা সমিতির নথি, অন্যটিতে টেম্পো সমিতির নথি। তখন কোনো ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা বলেননি, তোমাদের এসব ঝগড়া ফ্যাসাদের কোনো মূল্য নেই। কারণ ভবিষ্যতে নতুন নতুন প্রযুক্তি আগমনের কারণে রিকশা ও টেম্পো উভয়েরই বিলুপ্তি ঘটবে। আসন্ন নগরীয় সভ্যতা নিয়েও একই ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। তখন আমাদের খাদ্যাভ্যাস, উৎপাদনব্যবস্থা, জীবনাচার, যোগাযোগ, ধর্মীয় অনুভূতিসহ বহু কিছুতে নতুনত্ব আসবে। আশার কথা, গণতান্ত্রিক শাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিডিএলজি দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট ডিজাইনভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগরীয় বাংলাদেশের কথা বলে আসছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, হোমো স্যাপিয়েন্স যুগে এসে মানবসমাজ ইতিমধ্যে ১১ হাজার বছরের পশুচারী জীবন ও কৃষিজীবন অতিক্রম করেছে। সে কারণে আমাদের কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের যাবতীয় রচনা গ্রামীণ সভ্যতা ঘিরে। সিডিএলজির মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ পুরো দেশটি নগরীয় সভ্যতার দিকে টার্ন নেবে। তখন কৃষি-শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন হবে। বিগত সালের গল্প-উপন্যাস, সিনেমা-নাটক ইত্যাদি ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হবে।

১৯৭৬ সালে দেশে মাত্র ৭৭টি পৌরসভা ছিল। বর্তমানে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন ৩৪০টি। ভবিষ্যতে ৩ হাজার গ্রোথ সেন্টার (হাট-বাজার) ঘিরে নতুন নতুন নগর সৃষ্টি হবে। বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি লোক নগরে বাস করে, ৪০ ভাগ লোক কৃষি পেশার সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যতে কৃষিতে আরও নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযোজন হওয়ার কারণে মাত্র ১৫% থেকে ২০% লোক কৃষিতে সম্পৃক্ত থাকবে। ৭৫ ভাগ লোক নগরে বসবাস করবে। নগরে নগরীয় কৃষির চাষাবাদ শুরু হবে। বিলম্বে হলেও সরকার বাস্তবতা অনুধাবন করেছে। আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ নামে একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে; যা বর্তমানে একটি প্রকল্প আকারে চলমান রয়েছে। সম্প্রতি আমার গ্রাম আমার শহর প্রকল্প থেকে বিভিন্ন ইউনিয়নে কয়েকটি দিকনির্দেশনামূলক বিষয় উল্লেখ করে একটি পত্র পাঠানো হয়েছে; যাতে বলা হয়েছে, বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কতভাগ অর্জিত হয়েছে এবং শতভাগ অর্জনের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? যেমন ১) ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ; কতটুকু অর্জিত হয়েছে; ২) ভিক্ষুক চিহ্নিতকরণ ও ভিক্ষুকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকরণ; ৩) গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা চিহ্নিতকরণ; ৪) গ্রামীণ রাস্তা উন্নয়ন; ৫) শিশুর স্কুলে গমন নিশ্চতকরণ; ৬) স্কুলসমূহে আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং পরিচ্ছন্নতা চর্চা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণ; ৭) ভাতাভোগী পরিবারের সংখ্যা নির্দিষ্টকরণ; ৮) স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ; ৯) হাট-বাজারের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন; ১০) ফার্মেসি সুবিধা নিশ্চিতকরণ; ১১) জনসাধারণের বিনোদনের স্পট/পার্কের সুবিধা নিশ্চিতকরণ; ১২) খেলার মাঠের সুবিধা নিশ্চিতকরণ; ১৩) বাল্যবিয়ে, যৌতুক নিরোধ ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণ; ১৪) ধর্মীয় কুসংস্কার দূরীকরণ; ১৫) মাদকমুক্ত করণ; ১৬) কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে পর্যাপ্ত আসবাবপত্র, সরঞ্জামাদি ও ভবনের সুবিধা এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ; ১৭) গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি। যে কেউ স্বীকার করবেন উপরোক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি উন্নত কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লক্ষ্য করার বিষয়, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদসমূহে ১০টি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব ও ৩৭টি ঐচ্ছিক দায়িত্ব দেওয়া আছে; যার মধ্যে আমার গ্রাম আমার শহর প্রকল্পের কর্মসূচিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে আগেকার বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক দায়িত্বাবলির কোথাও নগরায়ণের উল্লেখ নেই। সরকার উপরোক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে স্বীকার করে নিল দেশটি দ্রুত নগরায়ণের দিকে যাত্রা করেছে।  সিডিএলজির মতে দুই ধরনের সরকারব্যবস্থাই সমাধান দিতে পারে। তা হলো- কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা আর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। স্থানীয় সরকারের উচ্চতম ইউনিট হবে জেলা সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে শুধু জেলা সরকারের সম্পর্ক থাকবে। জেলা সরকার এক হাতে নগর সরকারগুলো (পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) এবং অন্য হাতে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারগুলো (উপজেলা ও ইউনিয়ন) পরিচালনা করবে। গ্রামীণ ইউনিটগুলোর আয়তন ও সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ পুরো দেশটির অধিকাংশ নগরীয় ইউনিটে বিভক্ত হয়ে যাবে। তখন জেলা সরকারের অধীনে নগর সরকারগুলো পরিচালিত হবে। তার আগে প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটকে স্বায়ত্তশাসন ও একরূপ প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিতে হবে। মনে রাখা দরকার, বর্তমানে রাজনৈতিক সংঘাত, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি সবকিছুর মূলে রয়েছে শাসনতান্ত্রিক ত্রুটি। সে জন্য শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ছাড়া বর্তমান অচলায়তন দূর করা সম্ভব নয়।

লেখক : গণতন্ত্রায়ণ ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক।

ইমেইল : [email protected]


আপনার মন্তব্য