শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২১

শূন্য থেকে লাখপতি, কোটির ঘরে জাহিদ

শাইখ সিরাজ

শূন্য থেকে লাখপতি, কোটির ঘরে জাহিদ
Google News

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তখনো বাংলাদেশে করোনার অভিঘাত শুরু হয়নি, একদিন অফিসে একটা ফোন এলো। ভালুকা থেকে জাহিদ হাসান নামের একজন। একেবারে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার! আমার নাম জাহিদ, আফনে যদি একদিন আমার বাগানে আইতাইন! আমার খুব শখ আফনেরে আমার বাগান দেহাইতাম!’

জানতে চাইলাম, কীসের বাগান আপনার?

বললেন, লেবুবাগান।

জাহিদের বাগান সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে মিনিট দুয়েক কথা বলে আল্লাহ চাহেন তো কোনো একদিন তার বাগানে যাব- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফোন রাখলাম। এরপর পৃথিবীতে শুরু হলো করোনার অভিঘাত। মানুষের সাজানো-গোছানো পরিকল্পনা সব গেল ভেস্তে। এলো অঘোষিত লকডাউন। সংগনিরোধকাল। পুরো একটি বছর কোন দিক দিয়ে চলে গেল কেউ টেরই পেল না। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মনে পড়ল ভালুকার জাহিদের কথা। তার ফোন নম্বর রেখে দিয়েছিলাম। ফোন দিতেই ধরলেন। জানতে চাইলাম, ‘কি জাহিদ! লেবুবাগান এখনো আছে? নাকি করোনার কারণে গেছে?’ ফোনের ওপাশে উৎফুল্ল কণ্ঠ, ‘কী কইন স্যার! বাগান মেলা বড় করছি। আফনে আহইন, দেইখ্যা যাইন।’

ঢাকা থেকে ভালুকা আর কত দূর। আমি এমনিতেই খুব ভোরে কাজে বের হই। বড়জোর ঘণ্টা দুইর পথ। মার্চের এক সকালে বের হয়ে গেলাম।

আমাদের দেশে গত এক-দেড় দশকে লেবু চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। একটা সময় লেবুর খুব চাহিদা ছিল না। খাবার প্লেটে এক চিলতে লেবু পেলে ভালো না পেলে আপত্তি নেই। তবে গ্রামে-গঞ্জে বাড়িতে অতিথি আসা মানেই প্রথমেই তার হাতে এক গøাস লেবুর শরবত তুলে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখন গ্রামেও লেগেছে শহরের হাওয়া। গ্রামে গেলে আর লেবুর শরবত পাওয়া যায় না। প্রায় প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ চলে গেছে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। অনেকের বাড়িতেই আছে ফ্রিজ। গ্রামের বাজারেও দেদার বিক্রি হচ্ছে কোল্ড ড্রিংকস। তো এখন গ্রামে কারও বাড়িতে গেলে ফ্রিজ থেকে কোল্ড ড্রিংকস ঢেলে দেয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- লেবুর চাহিদা কীভাবে বাড়ল?

আমরা যদি সেই আশির দশক থেকে দেখি তাহলে দেখতে পাই আমাদের দেশের মানুষের চা খাওয়ার অভ্যাস বেড়েছে ব্যাপক হারে। বিশেষ করে শহরে লেবুর চায়ের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। চায়ের স্টলগুলো ঘিরেই প্রথম লেবুর বাণিজ্য বিস্তার লাভ করে। আর ক্রমেই বাড়তে থাকে লেবুর চাষ। পরে শহরের মানুষ যখন স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠল ডাক্তাররা বলতে শুরু করলেন লেবু মেদ কাটে। মানুষ লেবুজল খাওয়া শুরু করল। সে ক্ষেত্রেও লেবুর একটা চাহিদা তৈরি হলো। তবে গত বছরের আগেও কোনো কোনো সময় রাজধানীর ফুটপাথে নামমাত্র মূল্যে লেবু বিক্রি হতে দেখা গেছে। অনেক সময় লেবু এত বেশি বাজারে এসে পড়ত যে দামই পাওয়া যেত না। কিন্তু লেবুর অন্য রকম এক চাহিদা তৈরি করেছে করোনা পরিস্থিতি। করোনার শুরুতেই জানা গেল এ মহামারী থেকে রক্ষা পেতে প্রচুর ভিটামিন সি খেতে হবে। যারা আক্রান্ত হবে তাদের তো খেতে হবেই। ফলে এক লাফে লেবুর চাহিদা বেড়ে গেল বহুগুণ। এখনকার কথা যদি বলি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ জেঁকে বসার পর দেশে লেবুর দাম আরও বেড়ে গেছে। চারটি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। জাতভেদে লেবুর দাম আরও বেশি।

যা হোক, লেবু চাষের গল্পে আসা যাক। মনে পড়ে ময়মনসিংহের চররঘুরামপুরে ইব্রাহিম সরকার লেবুবাগান গড়েছিলেন নব্বইয়ের দশকে। তখন ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লেবু চাষের কথা কারও কল্পনায়ও ছিল না। ইব্রাহিম সরকার ছিলেন আত্মবিশ্বাসী এক শৌখিন কৃষক। ২০০৩ সালে হৃদয়ে মাটি ও মানুষের প্রথম শুটিংয়ে তুলে ধরা হয় তার সাফল্যের গল্প। ইব্রাহিম সরকার গত হয়েছেন প্রায় দেড় দশক আগে। এ এলাকায় তার স্বপ্নের লেবু চাষ ছড়িয়ে গেছে অনেক দূর। যেমন মনে পড়ছে চরনীলক্ষিয়া গ্রামের কৃষক মাইনুদ্দিনের লেবু চাষে অভাবনীয় সাফল্যের গল্প। শুধু মাইনুদ্দিন নন, তার মতো বহু মানুষই লেবু চাষ করে ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছাসহ আরও বিভিন্ন এলাকায় লেবু চাষ সম্প্রসারণের খবর তুলে ধরেছি আমার বিভিন্ন প্রতিবেদনে। লেবু চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে টাঙ্গাইল ও নরসিংদী জেলায়ও। পাঠক! আপনাদের মনে থাকতে পারে কিছু দিন আগে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শালিয়বাহ গ্রামের চাষি আজিজের বিশাল লেবুবাগান নিয়ে লিখেছিলাম। লেবু চাষ নিয়ে নতুন কিছু পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন আজিজ। বলছিলেন, করোনার সময় লেবু চাষ করে ব্যাপক লাভ পেয়েছেন। বাড়িয়েছেন চাষের পরিধি।

যা হোক, সকালের সূর্য দেখা দেওয়ার কিছু সময় পরই পৌঁছে গেলাম ময়মনসিংহের ভালুকার তামাট গ্রামে জাহিদ হাসানের লেবুবাগানে। বয়স ত্রিশ হয়েছে কি হয়নি, সদাহাস্য এক তরুণ। এখনো গ্রামের সরলতা জড়িয়ে আছে তার। আমাকে পেয়ে আবেগাপ্লুত জাহিদ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সমাদরের জন্য। কাছে ডাকলাম। বললাম, ব্যস্ততার কিছু নেই। আগে আপনার লেবুবাগান দেখি, আসেন।

সবুজ ধান খেত। মধ্যে মধ্যে লেবুবাগান। বোঝা যায় ধানের খেতগুলোই পরিণত হয়েছে লেবুবাগানে। ধান চাষে লাভ না পেয়ে অনেক কৃষকই এখন বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। জাহিদ জানালেন তার বাগানের সবই সিডলেস-জাতীয় লেবু। ঘুরতে ঘুরতে নানা বয়সী বাগানের সঙ্গে পরিচিত করে দিলেন তিনি। বিশাল আয়োজন। সব মিলে ১৫ বিঘার লেবুবাগান। বাগানের পথ ধরে যত এগোচ্ছি ততই বিস্মিত হতে হচ্ছে। একেকটা গাছ লেবুতে পূর্ণ। তিন-চারটি খুঁটি দিয়েও লেবুর ভার বহন করতে পারছে না। চলতে চলতে বলছিলেন তার লেবুবাগান গড়ার গল্প। বছর দশেক আগেও একেবারে দিনহীন দরিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন জাহিদ। অর্থের অভাবে বাজারে গিয়ে কিছু না কিনে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বহুবার। হৃদয়ে মাটি ও মানুষের একটি পর্বই পাল্টে দিয়েছে জাহিদের চিন্তার পৃথিবী। তিনিও সিদ্ধান্ত নিলেন লেবু চাষ করবেন। সেই শুরু তার সাফল্য অভিযান। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। লেবুতেই ভাগ্য খুলেছে। বলছিলেন জাহিদ, ‘স্যার! এমনও দিন ছিল ঘরে দুই বেলা খাবার ছিল না। আজ আমার সব হইছে।’ বলতে বলতেই ভিজে উঠল জাহিদের চোখ।

জানতে চাইলাম, ‘লেবু বেচে কী পরিমাণ লাভ পেয়েছেন গত বছর?’

বললেন, ‘বিশ-ত্রিশ লাখের মতো হবে স্যার।’ লেবু বেচেই ত্রিশ লাখ! অবাক হলাম। তখনো জানতাম না আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছে আমার জন্য। জাহিদ বলছিলেন, ‘বছরজুড়ে আমার বাগানে ২০-৪০ জন লোক কাজ করে। এমনও সময় গেছে প্রতিদিন আমাকে ২২ হাজার টাকা শ্রমিকদের বেতন দিতে হয়েছে।’ এত টাকা! জানতে চাইলাম এত টাকা কেন? জানালেন গত বছর তিনি বিক্রি করেছেন ৬ লাখ লেবুর চারা। আর এ বছর তৈরি করেছেন ২০ লাখ লেবুর চারা। বুঝতে পারলাম লেবুর চেয়ে লেবুর চারা বিক্রি করে টাকা পাচ্ছেন জাহিদ। জাহিদই জানালেন, গত বছর ১ কোটি ২০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। খরচও আছে। তবে খরচ বাদে বেশ ভালোই লাভ থাকে।

শূন্য থেকে শুরু করে সমৃদ্ধ হয়েছেন। কিনেছেন জমিজমা। এখন তার মোট ৩০ বিঘার বাগান। ১৫ বিঘা মাল্টা ও কমলা আর ১৫ বিঘা লেবু। এর সঙ্গে ২/১ বিঘা পেয়ারা ও কমলা যুক্ত করেছেন। বলছিলেন, টেলিভিশনে এক একটি ফসলের সাফল্যের গল্প শোনেন আর তার পেছনে ছোটেন।

এ গ্রামের বহু মানুষের কাছেই জাহিদ পরিবর্তনের রূপকার। অসংখ্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন লেবুবাগান করতে। এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। এ গ্রামেরই জহির গড়েছেন লেবুবাগান ও নার্সারি। পড়াশোনা শেষ করে এখন তিনি আর চাকরি খুঁজছেন না। জাহিদের দেখানো পথেই খুঁজে পাচ্ছেন সাফল্য। শুধু জহিরই নন, সখীপুরের রফিক, মাসুদের মতো অনেকেই লেবুবাগান গড়ে সফল হয়েছেন।  আমি বলি কৃষিতেই সমৃদ্ধি। তার প্রমাণ মেলে জাহিদের লেবুবাগানে। বাগান দেখা শেষে জাহিদ নিয়ে গেলেন তার বাড়িতে। বেশ বড় করে ঘর বেঁধেছেন। টিনের চমৎকার বাড়ি। ঘরে ঢুকেই মন ভরে গেল এক কৃষকের ঘরের সমৃদ্ধি দেখে। ফ্রিজ-টেলিভিশন থেকে শুরু করে নানান প্রয়োজনীয় ও শৌখিন জিনিসপত্রে সাজানো। না খাইয়ে ছাড়বেন না। ডাইনিং টেবিলে খেতে দিলেন। দেশি মুরগির মাংস দিয়ে রান্না খিচুড়ি, সঙ্গে বেগুন ভাজা। জাহিদের বাগান থেকে আনা লেবুর সুঘ্রাণ মেখে অমৃত মনে হলো সে খাবারটিকে। পেট তো ভরলই, মন ভরে গেল তার চেয়ে বেশি জাহিদের এমন সাফল্য দেখে।

বাজার আর সময়ের চাহিদা পূরণ করার উদ্যোগের মধ্যেই রয়েছে একজন কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্য। জাহিদ হাসান শুধু তার নিজের সাফল্য নিশ্চিত করেননি রীতিমতো লেবু চাষের এক বিপ্লবের জন্ম দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হবেন দেশের অনেক তরুণ উদ্যোক্তা। একইভাবে করোনার এই সময়ের রমজানে ভোক্তাসাধারণের কাছে লেবু সহজলভ্য করে তোলারও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সবাইকে মাহে রমজানের আগাম শুভেচ্ছা।

লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।