শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ এপ্রিল, ২০২১ ২২:৫৮

সুস্বাস্থ্য ও রোজার মহিমা

ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

সুস্বাস্থ্য ও রোজার মহিমা
Google News

ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ রমজানের রোজা। শুধু আত্মশুদ্ধিরই নয়, এ মাস আত্মনিয়ন্ত্রণেরও। রোজার অন্যতম লক্ষ্য মানুষের স্বাস্থ্যগত উন্নতি সাধন। রোজা রাখলে অনেকেই স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় করেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোজায় কারও স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে গেছে বা রোজা রেখে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কারও মৃত্যু হয়েছে এমন কিছু শোনা যায়নি। রোজা কষ্টকর ইবাদত এবং এর দ্বারা শরীরে চাপ পড়ে বলে অনেকেই রোজা রাখতে ভয় পান বা রাখতে চান না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া রোজা পরিত্যাগ করা সম্পূর্ণ অনুচিত। সুস্থ ব্যক্তি তো বটেই, অনেক অসুস্থ ব্যক্তিরও রোজা ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না।

রমজানে রোজা রাখা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, ‘যে ব্যক্তি রোজার মাসটি পাবে তারই কর্তব্য হচ্ছে রোজা রাখা।’ সুরা বাকারা ১৮৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের। তোমাদের মধ্যে কেউ ব্যাধিগ্রস্ত হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এটা যাদের অতিশয় কষ্ট দেয় তাদের কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদিয়া অর্থাৎ একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎ কাজ করে, এটা তার পক্ষে অধিক কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন তথা রোজা রাখাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণপ্রসূ যদি তোমরা জানতে।’ অতিশয় কষ্ট বলতে অতিবার্ধক্য, চিরস্থায়ী রোগ যা অতীব কষ্টকর, তার জন্য ওই মাসে রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। পরে কাজা আদায় করলেই চলবে। রোজা রাখায় প্রাণের আশঙ্কা আছে- এ কথাটি কোনো আলেম এবং ইসলামী জ্ঞানসম্পন্ন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে। গর্ভবতী মহিলার যদি গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা হয় অথবা স্তন্যদায়ী মা যদি রোজা দ্বারা তার নিজের বা তার স্তন্যপানকারী শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তবে তিনিও এ মাসে রোজা না রেখে পরে সুবিধামতো সময়ে কাজা আদায় করতে পারেন।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজা আমার জন্য, আমি নিজে রোজার প্রতিদান দেব।’ সব ইবাদতই তো আল্লাহর জন্য। তাহলে রোজাকে আল্লাহ কেন বললেন, ‘রোজা আমার জন্য?’ আসলে অন্যসব ইবাদত করার পাশাপাশি তা প্রদর্শনের সুযোগ ও মনোভাব থাকে, যেমন নামাজ, হজ, জাকাত ইত্যাদি। কিন্তু রোজা আল্লাহ এবং বান্দা ছাড়া প্রদর্শনের বা জাহির করার কোনো সুযোগই থাকে না। আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্যই আমাদের জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণের মূল নিয়ামক। এ আনুগত্য প্রকাশের অন্যতম উপায় হলো রোজা। দিনে রকমারি খাবারের প্রাচুর্য থাকার পরও বান্দা তা মুখে তোলে না। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে গেলেও পানি পান থেকে বিরত থাকে। প্রিয়জনদের সঙ্গে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে খাওয়া হয় না। এদের উদ্দেশে হাদিসে বলা আছে, ‘যে আল্লাহ ও তার রসুলের (সা.) আনুগত্য করে, সে-ই সফলকাম।’ বান্দা যেহেতু শুধু আল্লাহর হুকুম পালন এবং সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখে তাই আল্লাহতায়ালা নিজ হাতেই তার পুরস্কার দেবেন। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদারের জন্য রয়েছে দৈহিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধন, আত্মিক ও নৈতিক অবস্থার উন্নতিসহ অশেষ কল্যাণ ও উপকার লাভ করার সুযোগ। রোজা মানুষকে সংযমী ও শুদ্ধ করে এবং অশ্লীল, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। আর সেজন্যই প্রত্যেক মুমিন মুসলমান, সুস্থ অথবা রোগাক্রান্ত সবাই রোজা রাখতে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চান।

তবে রমজানে রোগীরা প্রায়ই রোজা রাখবেন কি রাখবেন না এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। অবশ্য কী কী অবস্থায় রোজা রাখা যাবে বা যাবে না তার সুস্পষ্ট বিধান শরিয়তে আছে। আবার সুনির্দিষ্ট কারণে রোজা না রাখতে পারলে তার পরিবর্তে ক্ষতিপূরণস্বরূপ কাজা, কাফফারা, ফিদিয়া বা বদলি রোজা রাখার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা আছে। তার পরও রোজা পালনে যে আনন্দ, অনুভূতি, আত্মিক পরিতৃপ্তি এবং এর সঙ্গে সংযম, কুপ্রবৃত্তি দমন, লোভ-লালসা, হিংসা-প্রতিহিংসা ইত্যাদি ত্যাগ করার যে আলোকোজ্জ্বল আমেজ আর অনুভূতির চর্চা হয় তা রমজানের রোজা ছাড়া অন্য কোনোভাবে লাভ করা যায় না। তাই রোগাক্রান্ত অবস্থায়ও অনেকেই রোজা রাখতে চান। কেউ কেউ এমনও বলেন, ‘মরি মরব, বাঁচি বাঁচব তবু রোজা ছাড়ব না।’

অনেক রোগীই যে কোনো অবস্থায় রোজা রাখতে বদ্ধপরিকর। অনেকেই আবার নিজের মতো অজুহাত তৈরি করে রোজা না রাখার যুক্তি খোঁজেন। আসলে দীর্ঘস্থায়ী রোগেও রোজা রাখা সম্ভব। যারা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগেন যেমন রোজার মাসে পেপটিক আলসার রোগীরা কীভাবে খালি পেটে থাকবেন, ডায়াবেটিস রোগীরা কীভাবে রোজা রেখে ইনসুলিন নেবেন, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা কীভাবে দুই বেলা বা তিন বেলা ওষুধ সেবন করবেন এসব চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েন। আবার কিছু কিছু অসুস্থ ব্যক্তি এমনকি সুস্থ ব্যক্তিও দুর্বলতা এবং নানারকম দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার কারণে রোজা রাখতে গড়িমসি করেন। আসলে রোজা রাখলে শরীরে তেমন কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুচিন্তিত অভিমত হলো, রোজা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি তো করেই না বরং শরীর ও মনের উন্নতি লাভেও সহায়ক। পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিক, হৃদরোগী, বাতব্যথার রোগীরাও সরাসরি রোজায় উপকার পান। পেপটিক আলসারের কারণে অনেকেই রোজা ছেড়ে দেন। কিন্তু চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের মতে পেপটিক আলসারে রোজা বিশেষ উপকারী।

রোজা, রোগ ও আপনার স্বাস্থ্য : রোজা রাখার উদ্দেশ্য শরীরকে দুর্বল করে অকর্মণ্য করা নয় বরং শরীরকে সামান্য কিছু কষ্ট দিয়ে দৈহিক ও আত্মিক উৎকর্ষ সাধন। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে রোজায় ক্ষতি না হয়ে বরং বহু রোগব্যাধির প্রতিরোধক এবং আরোগ্যমূলক চিকিৎসা লাভে সহায়ক হয়। রোজায় স্বাস্থ্যের সমস্যার চেয়ে বরং উপকারই বেশি হয়।

* ডায়াবেটিক রোগী : রোজা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রোগীদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ ও রহমতস্বরূপ। ডায়াবেটিস রোগীরা সঠিক নিয়মে রোজা রাখলে নানারকম উপকার পেতে পারেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল উপায় হলো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ আর রোজা হতে পারে এক অন্যতম উপায়। এতে সহজেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সহজ ও সুন্দরভাবে করা যায়। যারা ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীল নন বা যাদের অন্য কোনো ওষুধ খেতে হয় না  তাদের ক্ষেত্রে রোজা রাখা হতে পারে আদর্শ চিকিৎসাব্যবস্থা। যারা ইনসুলিন নেন তাদের ক্ষেত্রেও রোজা ওষুধের মাত্রা কমাতে সহায়ক। শুধু রক্তের গ্লুকোজই নয় রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণেও রোজা মোক্ষম। এর সঙ্গে সঙ্গে রোজা রোগীকে সংযম, পরিমিতিবোধ ও শৃঙ্খলার শিক্ষা দেয়, যা ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় অপরিহার্য। যাদের মুখে খাওয়ার ট্যাবলেটের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে রমজান তাদের জন্য সুফল বয়ে আনে। এদের অনেকের আগের চেয়ে কম ডোজের ওষুধ লাগে। যারা নিয়মিত ইনসুলিন নেন তারা অনেকেই জানেন না রোজা রেখেও ইনসুলিন নেওয়া যায়। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের কতটা ইনসুলিন নিতে হবে, কী কী খেতে হবে সে বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

* রক্তের কলেস্টেরল : যাদের শরীরে কলেস্টেরলের মাত্রা বেশি রোজা তাদের কলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে। রোজা ভালো কলেস্টেরল (এইচডিএল) বাড়াতে এবং মন্দ কলেস্টেরল (এলডিএল) ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে। মানবদেহে চর্বি ও কলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে হৃদরোগ, রক্তচাপ, বহুমূত্র রোগসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। রোজা চর্বি বা কলেস্টেরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে শরীরকে বিভিন্ন রোগ থেকে নিরাপদ রাখে।

* অতিরিক্ত ওজন : যাদের ওজন অতিরিক্ত তাদের ক্ষেত্রে রোজা ওজন কমানোর জন্য এক সহজ ও সুবর্ণ সুযোগ। ওজন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন রোগ থেকে বেঁচে থাকা যায় যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, বাতের ব্যথা, অস্টিওআরথ্রাইটিস, গাউট ইত্যাদি। আবার ওজন কমাতে পারলে কলেস্টেরলের মাত্রাও কমে আসে।

* হৃদরোগী ও উচ্চ রক্তচাপ :  রোজার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও কলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের ফলে যারা হৃদরোগে অথবা উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন তাদের জন্য রোজা অত্যন্ত উপকারী। এতে শরীরের বিশেষ করে রক্তনালির চর্বি হ্রাস পায়, রক্তনালির এথেরোসেক্লরোসিস কমাতে সাহায্য করে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

* পেপটিক আলসার ও যাদের অন্যান্য পেটের পীড়া :  একসময় ধারণা করা হতো পেপটিক আলসারে আক্রান্তরা রোজা রাখতে পারবেন না, তাদের ঘন ঘন খেতে হবে, অনেকক্ষণ পেট খালি রাখা যাবে না। অনেকে মনে করেন রোজা পেপটিক আলসারের ক্ষতি করে এবং অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ায়। প্রকৃতপক্ষে রোজায় নিয়ন্ত্রিত খাওয়া-দাওয়ার ফলে অ্যাসিডের মাত্রা কমে যায়। মূলত রোজা রাখার পর সারা দিনের খাবার একসঙ্গে খেতে হবে এ রকম মানসিকতা থেকেই বিপত্তি দেখা দেয়। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, পাকস্থলীর একটা নির্দিষ্ট আয়তন ও খাবার ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। শুধু এক দিন কেন, তিন দিন না খেয়ে থাকার পরও পাকস্থলী তার ধারণক্ষমতার বেশি খাবার গ্রহণ করতে পারে না। সুতরাং বেশি খেলে বিপত্তি ঘটবেই। তাই সঠিকভাবে রোজা রাখলে এবং সঠিক খাবার দিয়ে সাহরি ও ইফতার করলে রোজা বরং আলসারের উপশম করে, অনেক সময় আলসার ভালো হয়ে যায়। যারা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন রোজা তাদের জন্য খুবই উপকারী। রাতে তিনবার আহার, প্রচুর শরবত পান এবং যথেষ্ট আঁশযুক্ত খাবার দিয়ে ইফতার করায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যায়। এ ছাড়া রোজা গ্যাস্ট্রাইটিস, আইবিএস ইত্যাদি রোগেরও উপকারী।

* শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমা রোগী : যারা এসবে ভোগেন তাদেরও রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা নেই। রোজায় এ ধরনের রোগ সাধারণত বৃদ্ধি পায় না। বরং চিন্তামুক্ত থাকায় এবং আল্লাহর প্রতি সরাসরি আত্মসমর্পণের ফলে এ রোগের প্রকোপ কমই থাকে। প্রয়োজনে রাতে একবার বা দুবার ওষুধ খেয়ে নেবেন, যা দীর্ঘক্ষণ শ্বাস নিয়ন্ত্রণে রাখে। এ ধরনের ওষুধ বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। দিনের বেলায় প্রয়োজনে ইনহেলার বা নেবুলাইজার জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যায়, এতে রোজা নষ্ট হবে না।

* কিডনি ও লিভারের রোগী : রোজা অবস্থায় কিডনি ও লিভার বিশ্রাম পায়। কিডনির মাধ্যমে শরীরে প্রতি মিনিটে ১ থেকে ৩ লিটার রক্ত সঞ্চালিত হয়। অপ্রয়োজনীয় পদার্থগুলো প্রস্রাবের সঙ্গে নির্গমন হয়। সুস্থ রোগীর লিভার আরও সুষ্ঠুভাবে কার্যক্ষম হয়। তবে যারা আগে থেকেই লিভারের বা কিডনির রোগে আক্রান্ত তারা রোজা রাখার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

* ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার : রোজা এগুলো পরিহার করার সুবর্ণ সুযোগ। এর ফলে অনেক রোগ যেমন ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ বহু জটিল রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

* মস্তিষ্কের কার্যক্রম : রোজা মস্তিষ্কের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অধিক খাদ্য গ্রহণে শরীরের ওপর যেমন চাপ বৃদ্ধি পায় তেমন এ চাপ মস্তিষ্কের ওপরও পড়ে। এজন্যই বলা হয় ক্ষুধার্ত উদর জ্ঞানের আধার। যারা মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, অবসাদ কিংবা টেনশনে ভোগেন রোজা অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিত্রাণ দেয়।

* প্রোটিন, ফ্যাট ও শর্করা : রোজায় শরীরের প্রোটিন, ফ্যাট ও শর্করা পাচিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলো পুষ্টি পায়। ফলে শরীরে উৎপন্ন উৎসেচকগুলো বিভিন্ন কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এটি হচ্ছে শরীর বিক্রিয়ার এক স্বাভাবিক পদ্ধতি। রোজা এ পদ্ধতিকে সহজ, সাবলীল ও গতিময় করে। রোজায় শরীরের ক্ষতিকারক টক্সিনের মাত্রা কমে যায়।

* মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার দৈহিক গঠন প্রকৃতি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে। কিন্তু এর কাজের সীমাবদ্ধতাও আছে। সাধারণত সারা বছর এগুলো ন্যূনতম বিশ্রামের সুযোগও পায় না। কিন্তু রোজায় শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দৈনিক ৫-৬ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পায়। ফলে পরবর্তী সময়ে এগুলো আরও শক্তি নিয়ে সুন্দরভাবে মানবদেহে কাজ করতে পারে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুস্থতার পাশাপাশি রোজায় মানসিক শক্তি, স্মরণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তিসহ সবকিছুই বৃদ্ধি পায়।

* চিকিৎসায় বাধা নেই : রোজা রেখে বিভিন্ন অসুখে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বাধা নেই। যেমন রোজা অবস্থায় চোখ, নাক ও কানের ড্রপ, স্প্রে, ইনহেলার ব্যবহার করা যাবে। ইনসুলিন ব্যবহার করা যাবে। চিকিৎসার প্রয়োজনে ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট, ব্যান্ডেজ, পল্গাস্টার ইত্যাদি ব্যবহার করলে সমস্যা হবে না। রোজা রেখে রক্ত পরীক্ষার জন্য রক্ত দিলে এবং কাউকে রক্তদানে কোনো বাধা নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য এন্ডোসকপি বা গ্যাস্ট্রোসকপি করালেও রোজা নষ্ট হয় না। রোজা রাখা অবস্থায় না গিলে মাউথওয়াশ, মুখের স্প্রে ব্যবহার করা যাবে এবং গড়গড়া করা যাবে।

রোগ নিরাময়ের যত প্রতিকার এবং প্রতিষেধক রয়েছে রোজা তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও ফলপ্রসূ। মূলত এজন্যই রমজানে হাসপাতাল ও প্রাইভেট চেম্বারে রোগীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম হয়। আসলে রোজা শুধু উপবাস নয়, এ হলো প্রার্থনা যা মনের কালিমা দূর করে দেয়। সঙ্গে শরীরের রোগ, জরা আর ক্লান্তি হয় বিলীন। মাহাত্ম্য অর্জনে, আত্মার প্রশান্তি মেটাতে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটাতে তাই যথাসম্ভব শুদ্ধভাবে রোজা যেন নষ্ট না হয়, ছুটে না যায় যেন একটি রোজাও সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখা খুবই জরুরি। রোজা যেহেতু আল্লাহতায়ালার জন্য এবং আল্লাহ এর পুরস্কার দেবেন তাই কেউ যদি মনে করেন আমি আল্লাহর জন্যই রোজা রাখব, যা হওয়ার হবে তার কোনো সমস্যাই হবে না। আর যারা মনে করবেন রোজা রাখলে নানারকমের সমস্যা হবে, রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে, নানারকম জটিলতা হবে তাদের বেলায় এসব সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। দৈহিক রোজার সঙ্গে সঙ্গে অন্তরের রোজাটাই আসল, তাই কোনো অজুহাত বা আলস্য করে রোজা পালন থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। উপসংহারে বলা যায়, সব মিলিয়ে রোজা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তো নয়ই বরং খুবই উপকারী।

 লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক।