শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ জুন, ২০২১ ০০:০১

সুন্নতের প্রতি অবহেলা অচিন্তনীয় বিষয়

আল্লামা মাহ্মূদুল হাসান

সুন্নতের প্রতি অবহেলা অচিন্তনীয় বিষয়
Google News

আলহামদুলিল্লাহ! মুসলমানদের মধ্যে সামান্য হলেও ইলমের চর্চা ও গবেষণা বিদ্যমান রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং করছে অসংখ্য দীনি মাদারিস ও ছোট বড় শিক্ষাগার। মুসলমানদের মধ্যে ইখলাস নেই- এ কথা আমি বলতে পারি না। কারণ ইখলাস হচ্ছে অন্তরের আমল। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে সুন্নতের ব্যাপারে অনীহা ও অবহেলা প্রদর্শিত হচ্ছে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিশ্বমানবের বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর ইহকাল-পরকালের মুক্তি নির্ভর করে বিশ্বরসুলের প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর পুরোপুরি অনুসরণ ও অনুকরণের ওপর। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘রসুলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম নমুনা, আদর্শ। রসুলের আদর্শ ওঠা-বসা, চলা-ফেরা, কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম, আদেশ-নিষেধ, লেবাস-পোশাক, শরিয়তের ছোট-বড় হুকুম-অহকাম, আকিদা-বিশ্বাস, ইবাদত, রিয়াজত, মু’আমালাতমু’ আশারাত ও আখলাক ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই পরিব্যাপ্ত। রসুলের সুন্নত তাঁর আদর্শেরই অন্য নাম। সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত নামাজের আগে আজান ও ইকামতকে সুন্নত ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত বিলাল, হজরত আবদুল্লাহ, হজরত আবু মাহজুরা, হজরত ইবনে মাকতুম এবং হজরত সা’আদ কুরাজি (রা.) রসুলে পাকের বিশেষ মুয়াজ্জিন ছিলেন। তাঁরা বিশ্বরসুলের কাছে আজান-ইকামত শিক্ষা করে রসুলে পাকের সম্মুখে আজান দিয়েছেন। আজান-ইকামতের সুন্নত তরিকা আমাদের মাদরাসাসমূহের পাঠ্য কিতাবসমূহে লেখা রয়েছে। ইমাম বুখারি (রহ.) ‘উচ্চ আওয়াজে আজান দেওয়া’ অধ্যায় কায়েম করে আজান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ইমাম বুখারির (রহ.) উদ্ধৃতি অনুসারে হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলেন, সরল-সহজভাবে আজান দাও, অন্যথায় আমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাও।’

‘সামহুন’-এর অর্থ বর্ণনা করে ইবনে হাজর আসকালানি ও আল্লামা আইনি (রহ.) বলেন, ‘সরল-সহজভাবে আজান দেওয়া, আওয়াজে গানের মতো সুর ও ভাঙন না হওয়া এবং শব্দ ওঠা-নামা না করা।’

হজরত ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত হাদিসেও অনুরূপ নির্দেশ বিদ্যমান।

এসব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে ফিকাহের কিতাবে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, ‘আজান হতে হবে লাহন এবং তারাননুম ছাড়া।’ কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাধারণ মসজিদ নয়; বরং মাদারিসের মসজিদসমূহেও সুন্নতের খেলাফ আজান-ইকামত হচ্ছে এবং এসব কিছু আলেম-ওলামাদের কেন্দ্রস্থলে তাঁদের সামনে হচ্ছে, অথচ এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না।

নামাজে সুন্নতের অবহেলা : নামাজ সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত, ইসলামের মূল স্তম্ভ। জামাতে নামাজের জন্য বিরাট মসজিদ তৈরি হচ্ছে, মুসল্লির সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু সঠিক নামাজের প্রশিক্ষণ ও তালিম না থাকায় আজান ও নামাজ কোনটিই সুন্নত মোতাবেক আদায় হচ্ছে না। কীভাবে দাঁড়াতে হবে, পা কীভাবে রাখতে হবে, রুকু-সিজদার সুন্নত তরিকা কী, হাত বাঁধার নিয়ম কী, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান কী- এসবের কোনো খবর নেই। যার যেভাবে ইচ্ছা নামাজ আদায় করে যাচ্ছে। সুন্নতের কোনো প্রতিফলন নেই। এমনও দেখা যায়, কিরাতও শুদ্ধ করে পড়ে না, পড়তে জানে বরং অনেকে কিরাত ছাড়াই নামাজ আদায় করে।

কিরাতবিহীন নামাজ : আমার এক পরিচিত লোক একদিন এশার আজানের পর আমাকে বলেন, ‘হুজুর! আপনার ওয়াজ শোনার পর থেকে কোনো দিন নামাজের জামাত তরক করি না। তাহাজ্জুদও পাবন্দির সঙ্গে আদায় করি, কিন্তু এখন আমার অবস্থা হচ্ছে আগের তুলনায় দিন দিন ব্যবসা-বাণিজ্য খতম হয়ে যাচ্ছে, কোনো উন্নতি হচ্ছে না।’ তার হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য শুনে আমি কী উত্তর দেব, তাকে কী বুঝ দেব চিন্তা করছিলাম। এ পর্যায়ে আমরা একই সঙ্গে এশার নামাজ আদায় করলাম। ফরজ নামাজ আদায়ের পর দুই রাকাত সুন্নতের সময় দেখলাম তিনি সুন্নত-বিতর সব আদায় করে বসে আছেন! আমি অবাক হয়ে পরে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আজকের নামাজে কোন কোন সুরা তিলাওয়াত করেছেন? উত্তরে বললেন, ‘হুজুর আমি কোনো সুরা জানি না। ছোটবেলায় আম্মাজান বলেছিলেন ইয়া রাব্বি, ইয়া রাব্বি, ইয়া রাব্বি তিনবার পড়লেই চলে, আমি সেভাবেই নামাজ আদায় করি।’ আমি তার উত্তর শুনে আরও অবাক হলাম। তাকে বললাম, এভাবে তো নামাজ হয় না। এরূপ নামাজের কী ফল হবে? এ তো আল্লাহ পাকের অসন্তুষ্টির কারণ হবে। এই হচ্ছে আমাদের নামাজের অবস্থা। অনেকেই মনে মনে কিরাত পড়ে নামাজ আদায় করে অথচ একে পড়া বলে না; বরং কল্পনা বলে। এমনিভাবে সালাম, দোয়া সব বিষয়েই সুন্নতের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হচ্ছে। যদি নামাজের বেলায় এ অবস্থা হয় তাহলে অন্যান্য বিষয়ে সুন্নতের কী অবস্থা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এ ব্যাপারে আহলে মাদারিস, ওলামা-মাশায়েখ, ইমাম-মুয়াজ্জিন সবাইকে সতর্ক হওয়া বাঞ্ছনীয়। মাদরাসা, মসজিদ এবং বিভিন্ন স্থানে আজান-ইকামত, নামাজ ও কোরআনের প্রশিক্ষণ ও মশ্কের অত্যন্ত প্রয়োজন।

লেখক : আমির, আল হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ।