বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

পাহাড়ি নারীর সবজি বাজার

ড. মো. জামাল উদ্দিন

পাহাড়ি নারীর সবজি বাজার

পার্বত্য চট্টগ্রাম কৃষির দিক দিয়ে অতি সম্ভাবনাময় একটি এলাকা। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর জৈব বৈচিত্র্যময় এ অঞ্চলটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্র্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানে রয়েছে ১৩টি উপজাতি সম্প্রদায়। প্রত্যেকের জীবনযাত্রা, কৃষ্টি-কালচার, খাদ্যাভ্যাসে রয়েছে ভিন্নতা। পাহাড়ি সবজি ও ফলের রয়েছে আলাদা কদর। বিশেষ করে ইনডিজেনাস সবজি ও ফলমূল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অতি প্রিয়। এসব সবজির রয়েছে বহুরকম ওষুধিগুণ। অনেক পাহাড়ি সবজি বা ফল তারা ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন।

ফসল উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে পাহাড়ি নারীরাই বেশি সম্পৃক্ত। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উপজাতি নারীরাই প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে এসব ফসল সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে আসেন। নিয়ম করে সাপ্তাহে দুই দিন বাজার বসে। প্রধান সড়ক বা গলির দুই পাশে লাইন ধরে বসে মাটির ওপর পলিথিন বিছিয়ে অথবা ঝুড়িতে এসব পণ্য বিক্রি করা হয়। পর্যটকরা মাঝেমধ্যে এখান থেকে অনেক ফলমূল কিনে নেন। মাটির ওপর পলিথিন বা কাগজ বিছিয়ে এসব সতেজ পণ্য রাখা মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। বৃষ্টির দিনে খোলা আকাশের নিচে কোনোরকম মাথায় ছাতা নিয়ে বা গায়ে পলিথিন জড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করেন বিক্রেতারা। অনেকের অল্প পরিমাণ সবজি বিক্রি করতে আধাবেলা বা পুরো দিন লেগে যায়। তাদের জন্য নেই ছাউনিযুক্ত কোনো বিক্রয়স্থানের ব্যবস্থা। থাকলেও তা অপ্রতুল। এলাকাভিত্তিক উপযুক্ত জায়গায় ছাউনিযুক্ত বিক্রয়স্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে তাদের কষ্ট লাঘব হতো। সহজে পাহাড়ি নারীরা বিপণন কাজ চালিয়ে যেতে পারতেন। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন যুগপৎভাবে এ ব্যবস্থা করে দিতে পারে। তার জন্য দরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। যদিও এলাকার কৃষি উন্নয়নে তাদের অনেক ভূমিকা।

ক্ষুদ্্র ও প্রান্তিক নারী সবজি বিক্রেতাদের সংগঠিত করে তাদের মধ্য থেকে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি করে স্বল্প সময়ে সবজি বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ যিনি উদ্যোক্তা হবেন তিনি অন্যদের এসব সবজি কিনে নিয়ে কোনো পাইকারের কাছে বিক্রি অথবা বড় বাজারে সরবরাহ করে দিতে পারেন। তাতে নিজেরও লাভ হবে। এ কাজটি করা অনেক কঠিন হলেও সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাকে (এনজিও) এগিয়ে এসে তাদের উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। ফলে খুচরা পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়বে। দেশে বিগত দশকে খুচরা পর্যায়ে উদ্যোক্তা বেড়েছে ১২৬%। এটা সুখবরই বটে। তবে উদ্যোক্তা যেন অনেক মধ্যস্বত্বভোগীর মতো খারাপ ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয় সে দিকটিও দেখতে হবে। সেজন্য কৃষি ও কৃষি বিপণন অধিদফতর কর্মকর্তাদের সহায়তায় সবজির ন্যায্যমূল্য ঠিক করে দেওয়া যায় কি না ভাবা দরকার। সমবায়ভিত্তিক কার্যকর কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে এ কাজটি করা সহজ হবে। বান্দরবান সদরের মধ্যমপাড়া, বালাঘাটা, রেইচা; খাগড়াছড়ি সদরের মধুপুর, স্বনির্ভর ও ঘোগরাছড়ি এবং রাঙামাটি সদরের বনরূপা, আসামবস্তি ও কলেজগেট এলাকায় এ ধরনের সবজিবাজার বেশি দেখা যায়।

এসব এলাকার ১৩৫ জন নারী সবজি বিক্রেতার ওপর কেজিএফ ভ্যালু চেন প্রকল্পের একটি আর্থসামাজিক গবেষণা জরিপ কাজ পরিচলিত হয়। জরিপের ফলাফলে প্রায় ৩২ রকমের ইনডিজেনাস সবজি চিহ্নিত করা হয়। সেসব সবজির মধ্যে চাকমা ভাষায় তদেক জিল শাক, ঢিঙি শাক, হোয়েং আলু, বেগোল বিজি, সাম্মো উল (মাশরুম), বরুণা শাক, আগাজা গুলো, মোগোমা (তরবারি শিম), আমিলে (চুকাই), তেত্তোল গুলো, সাবরাং, বাঁশক্রুল (ব্যাম্বুসুট), টকপাতাসহ আরও অনেক। ওই জরিপের তথ্যমতে তাদের মধ্যে ৫৩.৪% নারী উদ্যোক্তার কাছে সবজি বিক্রি করতে আগ্রহী এবং ৭১.৫% নারী উদ্যোক্তা হতে ইচ্ছুক। তবে কীভাবে এ পথে এগোনো যাবে বা অর্থসংস্থান হবে সে বিষয়ে অনভিজ্ঞ। তারা কিছুদিন পর্যন্ত সবজি সংরক্ষণ করে রাখার মতো সংরক্ষণাগার সুবিধা, উদ্যোক্তা হতে করণীয় কী, বড় বাজারের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ স্থাপন এবং ব্যবসার ঝুঁকি মোকাবিলা করবেন এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দরকার বলে দাবি করেন।

পাহাড়ি নারীদের এসব সবজি বিক্রির একটি সুন্দর ব্যবস্থা করে দিতে পারলে তারা অধিক উৎপাদনে আগ্রহী হবেন। তবে এসব সবজির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মেকানিজম তাদের হাতে নেই। এ ক্ষেত্রে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসমূহ এসব জনপ্রিয় সবজির জার্মপ্লাজম  সংগ্রহ করে গবেষণার মূলধারায় নিয়ে এসে উৎপাদনশীলতা বা ফলন বাড়িয়ে প্রযুক্তি হিসেবে প্যাকেজ আকারে আবার হস্তান্তর করতে পারে। এলাকাভিত্তিক মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে চাহিদা অনুসারে গবেষণার প্রযুক্তি বের করলে লাগসই হয় বেশি। গবেষণা কেন্দ্রের কোনো এক কোণে ‘পাহাড়ি সবজি কর্নার’ বা ‘ইনডিজেনাস ভেজিটেবল কর্নার’ নামে একটি প্রদর্শনী প্লট রাখা যেতে পারে। তাতে জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত থাকবে এবং ভিজিটর এলে পাহাড়ি সবজি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারেন। তার চেয়ে বেশি দরকার কৃষিপণ্য বিপণনের একটি সুন্দর বাজার ব্যবস্থাপনা। পাহাড়ি নারীর কৃষিপণ্য বিপণনে বিদ্যমান বাজারব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আসুক সে প্রত্যাশা করছি।

লেখক : সাবেক ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট, এফএও। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

এই রকম আরও টপিক