শিরোনাম
বুধবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৪ ০০:০০ টা

সরকারের বিড়াল মারা বিএনপির নেক্সট ট্রেনের অপেক্ষা

নঈম নিজাম

সরকারের বিড়াল মারা বিএনপির নেক্সট ট্রেনের অপেক্ষা

সম্পর্ক ও কর্ম নিয়ে প্রবাদ হলো, বিড়াল নাকি প্রথম রাতেই মারতে হয়। ডা. সামন্ত লাল তাই করলেন। চেয়ারে বসেই ব্যবস্থা নিলেন ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে। কিছুদিন আগে এই হাসপাতালে সুন্নতে খতনা করাতে নেওয়া হয়েছিল শিশু আয়ানকে। চিকিৎসকদের অবহেলায় মারা গেল শিশুটি। শিশুর বাবা-মায়ের আর্তনাদ ও কান্না মিডিয়াতে প্রকাশ হলো। কেউ তোয়াক্কা করল না।  সামন্ত লাল চেয়ারে বসেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। খোঁজ নিয়ে জানালেন এই হাসপাতালের নিবন্ধন নেই। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেন। বন্ধের নির্দেশ দিলেন হাসপাতালটি। এমন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা স্বস্তি এনেছে মানুষের মনে। আশা জাগিয়েছে আগামীতে চিকিৎসা খাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে চিকিৎসা নিয়ে নয়ছয় অনেক দিনের। দুর্নীতি-অনিয়মের শেষ নেই। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার আনাচেকানাচে অবৈধ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি। কোনো অনুমতি-অনুমোদনের বালাই নেই। ঢাকার বাইরে ভালোমানের হাসপাতাল নেই। সব সরকারি মেডিকেলে চিকিৎসার ঘাটতি। যিনি দায়িত্বে যান তিনি ব্যস্ত হন কেনাকাটা নিয়ে। এসব যন্ত্রপাতি কোনো কাজে লাগে না। অনেক সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে নতুন কেনা যন্ত্র পড়ে আছে। কেনার পর সেই যন্ত্র খোলাও হয় না। প্রশ্ন করলে বলা হয় টেকনিশিয়ান নেই। তাই পড়ে আছে। অনেক অঞ্চলে সরকারি টাকায় হাসপাতালের ভবন নির্মাণ হয়। পরে আর চালু হয় না। অরাজকতার চূড়ান্ত। সেদিন একজন বললেন, হাসপাতালে চিকিৎসা কেমন বুঝতে হলে রোগীদের ব্যবহারের বাথরুমগুলোর অবস্থা দেখুন। টের পাবেন কতটা ভয়াবহ চিত্র। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই। বড় বড় কর্তা বসেন। তারা বাথরুমগুলোও পরিষ্কার করাতে পারেন না। বাকিটা নাই বললাম। ডা. সামন্ত লাল ব্যতিক্রম মানুষ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আলাদা করে বার্ন ইউনিট তৈরি করতে গিয়ে নিজেও ভোগান্তিতে পড়েছিলেন। ফাইল ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল আমলারা। চিকিৎসক হিসেবে এক ধরনের, কাজ করতে গিয়ে আরেক ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তার হাতে গড়া শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে ছিমছাম সুন্দর পরিবেশ। দেখতে অনেকটা বেসরকারি নামি হাসপাতালের মতো। সৃষ্টিশীল এ মানুষটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আসার পর আশার আলো তৈরি হয়েছে। সবাই বিশ্বাস করেন এবার একটা কিছু হবে। চিকিৎসাসেবায় নয়ছয় চলবে না।

মানুষ বিশ্বাস আর আশা নিয়েই বেঁচে থাকে। পঞ্চমবারের মতো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আগের চেয়েও প্রত্যাশা বেড়েছে। চ্যালেঞ্জ অনেক। দেশ-বিদেশের ষড়যন্ত্র পরতে পরতে মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। ধরে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সব বন্ধন। ঠিক রাখতে হবে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি উন্নয়ন ধারাবাহিকতা। গত ১৫ বছরের উন্নয়নের গল্প এবার শুনালে চলবে না। আগের চেয়ে চমকপূর্ণ অনেক কিছু আনতে হবে। উন্নয়নের গতি ধরে রাখতেই প্রয়োজন সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। ফিরিয়ে আনতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর শৃঙ্খলা। দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে প্রশাসনকে। লাগাম টানতে হবে ব্যাংকিং খাতের। জবাবদিহিতা রাখতে হবে আর্থিক খাতের। মানুষ শান্তি চায়। স্থিতিশীলতা চায়। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগ আসবে না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ। সাধারণ মানুষ দেশের বর্তমান উন্নয়নে খুশি। শেখ হাসিনা তাদের আস্থার ঠিকানা। সেই আস্থা ধরে রাখতে দরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানা। পণ্যের দাম নিয়ে তৈরি সব সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা। সামনে রমজান। সারা দুনিয়ায় বড়দিনসহ ধর্মীয় উৎসবে জিনিসপত্রের দাম কমে। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেয় মুনাফা লুটতে। ডলার সংকটে আমদানি নিয়ে সমস্যা আছে। এ সংকট কাটাতে হবে। তারুণ্যকে বাঁচাতে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া চলবে না। বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। দূরত্ব কমাতে হবে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে। সরকারে সবার কথা বলার দরকার নেই। নির্ধারিত মুখপাত্র থাকলে ভালো।

দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। মানুষের মন ক্ষণে ক্ষণে বদল হয়। সামান্য স্বার্থের কারণে মানুষ মুহূর্তে বদলে যায়। সম্পর্কের বাঁধন হয়ে ওঠে মূল্যহীন। নবাব সিরাজউদ্দৌলার ভয়ে মুর্শিদাবাদে বাঘ আর মহিষ এক ঘাটে জল খেত। মাত্র এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। ভালো-মন্দ বোঝারও সুযোগ পাননি। রাষ্ট্রের হাল ঠিকভাবে ধরার আগেই ষড়যন্ত্রের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস সিরাজের পতনের পর কেউ টুঁ শব্দ করেনি। আপনজনদের চেহারা মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল। পতনের পর একদল মাঠে নামল সিরাজের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে। আরেক দল গুণকীর্তন শুরু করল মীর জাফরের। এখনো আমরা ব্রিটিশ শাসনের প্রশংসা করি। নিজেদের স্বাধীনতা হারানোর কথা ভুলে যাই। অন্যায়, শাসন শোষণ আর বাংলার সম্পদ লুটের কথা মনে করি না। জগতে পরাজিত সৈনিকরা মূল্যহীন হয়। বীরের পূজা হয়। কাছের মানুষও পরাজিতের সঙ্গে থাকে না। এ সরকারকে পাঁচ বছর অতিক্রম করতে হবে। দেশ-বিদেশে অনেক ষড়যন্ত্র ছিল, আছে, থাকবে। এসব নিয়ে চিন্তায় ব্যস্ত থাকলে সরকার চালানো যাবে না। ভোটের আগে ক্ষমতাসীনরা জনগণের কাছে অনেক অঙ্গীকার করেছেন। সেই অঙ্গীকার এখন পূরণ করতে হবে। আগামী পাঁচ বছর মানুষ আওয়ামী লীগকে জনবান্ধব হিসেবে দেখতে চায়। জনগণের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হিসেবে চায়। কোনো মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নিতে হবে। সামন্ত লাল যেভাবে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই যাত্রা শুরু করেছেন অন্যদেরও একই অবস্থান থাকতে হবে।

সরকারের পাশাপাশি নজর দিতে হবে দলের দিকে। অংশগ্রহণমূলক ভোট করতে গিয়ে এবার ভাই লড়েছে ভাইয়ের বিরুদ্ধে। সন্তান ভোট করেছে বাবার বিপক্ষে। শতাধিক আসনে আওয়ামী লীগ নিজেরাই লড়াই করেছিল। এ লড়াইয়ের প্রয়োজন ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে। অংশগ্রহণমূলক ভোটের দরকার ছিল। ভোট শেষ হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এখন কী সবাই এক হতে পারবে? উদারতা নিয়ে পরস্পর হাঁটতে পারবে হাতে রেখে হাত? সামনে এ পরীক্ষা হবে। স্বতন্ত্র বনাম নৌকার সমর্থকদের মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ এখনো রয়েছে। সেই সংকট দূর হয়নি। বরং বেড়েছে। স্বতন্ত্র লীগ বনাম নৌকার আওয়ামী লীগের লড়াই হানাহানি সংঘাতে হচ্ছে খুনোখুনি। নৌকায় ভোট দেওয়ার অপরাধে মার খেয়েছে অনেক সমর্থক। আবার ঈগলের পক্ষ নিয়েও মামলা হামলায় পড়ছে। এ বিরোধ মোটেও আদর্শিক নয়। নিজেদের ক্ষমতা দেখানো, ব্যক্তিস্বার্থের। সংশ্লিষ্টদের ভুলে গেলে চলবে না সবাই একই আদর্শের অনুসারী। একই দলের মিছিল-সমাবেশে দুই দিন আগেও একসঙ্গে অংশ নিয়েছিল। নিজেদের ভিতরকার ঐক্য আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। ভুলে যেতে হবে নির্বাচনকালীন বিভেদ। কীভাবে তা সম্ভব জানি না। বিশ্বাস আছে একজনই পারেন সবকিছু ঠিক করতে। তিনি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। নেতা-কর্মীদের শেষ আস্থার ঠিকানা। একমাত্র তিনিই পারছেন। তিনিই পারবেন। নেত্রীর এক নির্দেশে হতে পারে অনেক কিছু।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বাংলার সাত শত বছরের ইতিহাসে যারা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা তাদের একজন। এই দেশে কেউ কারও ভালো চায় না। বলা হয়, নরকে পৃথিবীর সব দেশের নাগরিকদের জন্য দারোয়ান রেখেছেন ঈশ্বর। বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রয়োজন হয় না। নরক ছেড়ে কেউ স্বর্গে যেতে চেষ্টা করলে নিজেরাই নিজেদের টেনে আটকে রাখে। সেই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় টানা থাকা কঠিনতম বিষয়। শেখ হাসিনা সেই কাঠিন্য জয় করেছেন। টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় নিয়েছেন দলকে। পঞ্চমবারের মতো হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলার সাত শত বছরের ক্ষমতার ইতিহাসে অমরত্বের পথে হাঁটছেন তিনি। এত দীর্ঘসময় থাকার ভাগ্য খুব কম শাসকের হয়েছিল। সাত শত বছরে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে বাংলা দখল করেছিলেন। তারপর শাসন করেছিলেন। চৌদ্দ ও ষোলো শতকে কিছু শাসক ২০ থেকে ২৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এর মধ্যে শায়েস্তা খান দুই দফায় (১৬৬৩-১৬৭৮, ১৬৮০-১৬৮৮) ২৩ বছর ছিলেন। সবচেয়ে বেশি ছিলেন সিকান্দর শাহ (১৩৫৮ থেকে ১৩৯০)।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটা স্বাধীন করে মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সরকার সামরিক শাসনের মধ্যে ক্ষমতায় আসার পর মেয়াদ ছিল মাত্র পাঁচ বছর। আর এরশাদ ছিলেন ৯ বছর। খালেদা জিয়া দুই মেয়াদে ছিলেন ১০ বছর। এ সরকারকে কারও নজর লাগা থেকে দূরে থাকতে হলে চলতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। জনগণের কাছে করা অঙ্গীকারের শতভাগ পূরণ করতে হবে। ব্যক্তিবিশেষের কারণে কোনো কিছু ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া যাবে না। ২০১৪ আর ২০১৮ সালের সঙ্গে এবার তুলনা করলে হবে না। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার পরিবর্তন আছে। ঈগলের ডানার ঝাপটায়, ইসির কঠোরতায় নির্বাচনে সুষ্ঠু-স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছিল। মানুষ কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছে। আর ভোট দিয়েছিল বলেই ৬২ আসন নিয়ে বিজয়ী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখন সংসদে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চেয়ে অনেক ভালো করত বিএনপি। পশ্চিমা বিশ্ব ও মিডিয়ার চোখ খোলা থাকায় এবার ভোট প্রদানের সুযোগ ছিল। বিশাল তারুণ্য তৈরি ছিল ভোট কেন্দ্রে যেতে। গত দুই বছর মামলা কাটিয়ে বিএনপি ছিল চাঙা সংগঠন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজের মতো করে সব গুছিয়েছিলেন। তিনি তৈরি ছিলেন। তারপরও বিএনপি পারল না কেন? বিভেদ, সিদ্ধান্তহীনতা, প্রধান নেতৃত্বশূন্যতা ও সংঘাতের পথ বিএনপিকে আপাতত শেষ করে দিয়েছে। ধ্বংসাত্মক পথে না গিয়ে ভোটে এলে বিএনপি ভালো করত। তিন শত আসনে ভোট করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে অনেক বেশি পছন্দ পেত। দেশ পেত শক্তিশালী বিরোধী দল। ভোট প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।  বিএনপি সেই অধিকার থেকে তার সমর্থকদের বঞ্চিত করেছে। এই দায় তাদের। অন্য কারও নয়। বোঝা উচিত ছিল এবার সবকিছুর ওপর আন্তর্জাতিক মহলের চোখ ছিল। দেশ-বিদেশের মিডিয়া ছিল সক্রিয়। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আলজাজিরাসহ বিদেশি মিডিয়া ও পর্যবেক্ষকদের সারা দেশে ঘুরতে দেখেছি। তাছাড়া যার হাতে মোবাইল তিনিই টেলিভিশন ক্যামেরার মালিক। কঠিন বাস্তবতায় এবারকার ভোট শতভাগ নিরপেক্ষ না করার সুযোগ ছিল না। নির্বাচন কমিশন ছিল কঠোর। তারা নৌকার এক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছিল। অনেককে করেছে জরিমানা। এবারকার ভোটের ট্রেন মিস করা বিএনপির ঠিক হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী চলার পথে একবার ট্রেন মিস হলে অপেক্ষা করতে হয়। বিএনপিকে পরের ট্রেনের জন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে স্টেশনে। কারণ সেই ট্রেন আসে পাঁচ বছর পরপর।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বশেষ খবর