‘কষ্টে আছি-আইজউদ্দিন’, ‘সুবোধ পালিয়ে গেছে’ স্লোগান দুটি বিগত সরকারের আমলের শেষ দিকে রাজধানীর পিচঢালা সড়কে আর রাস্তার পাশের দেয়ালে এঁকে দেওয়া হয়েছিল। বোধ করি রাজধানীর এমন কোনো নাগরিক নেই, যাদের দৃষ্টি কাড়েনি। শুনেছিলাম যাত্রাবাড়ী না ওই এলাকার কোনো এক জায়গা থেকে নাকি ওই সরকার আইজউদ্দিন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাতে কাজ হয়েছিল, মতপ্রকাশ বন্ধ হয়েছিল। তবে সুবোধকে নিয়ে কারা লিখেছিল, তা জানা যায়নি। জুলাই পরিবর্তনের পর সুবোধ লেখা দেয়াললেখনীতে স্থান পেয়েছিল। কষ্ট কী, কেমন তার চরিত্র এ নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কারণ কষ্টের রকমফের আছে। কষ্ট মনের না শরীরের এ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কথা যা-ই হোক কষ্ট হচ্ছে এমন এক অনুভূতি যার অনুভব রয়েছে বহিঃপ্রকাশ নেই। কষ্ট থেকে যেসব বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার হয়তো বিবরণ রয়েছে, সেসব অবশ্যই কষ্টের কোনো চিত্র নয়। আশিবিষে দংশেনি যারে, সে বিষের কষ্ট কীভাবে বুঝবে। না খাবার কষ্ট অভুক্ত ছাড়া কেউ বুঝবে না। প্রেম-ভালোবাসার কষ্ট ভুক্তভোগী ছাড়া অনুভব করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলা সিনেমার বিখ্যাত গান ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’ এখনো সম জনপ্রিয়। এসবই বেদনার কথা। রাজনৈতিক কষ্ট আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এখন আয়নাঘর থেকে শুরু করে যেসব নির্যাতনের বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছে, তা শুনলে বোঝা যায়, সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো কত কষ্টের ছিল। কষ্টের কথা বোধ করি সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। যিনি শারীরিক ও মানসিক, দুই ধরনের যন্ত্রণাই সমভাবে অনুভব করেছেন। বিষয়টি ছিল পরিকল্পিত নীলনকশার অংশ। ক্ষমতার মদতপুষ্টরা নিজেদের তখতে-তাউসকে স্থায়ী রূপ দিতে মা বেগম জিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল সন্তান তারেক রহমানকে। আর সেজন্য করা হতো শারীরিক নির্যাতন। আজও সেসব বর্বরোচিত জীবন্ত ঘটনার বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছে। নীলকণ্ঠেরে মতো এসব ধারণ করেছিলেন গণতন্ত্রের অপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জাতির আগামীর কথা ভেবে নিজেকে সোপর্দ করেছিলেন আগ্নেয়গিরির জীবন্ত লাভায়। বীরের মতো মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন আপসকে নয়। এর কী ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি, তা লিখে বোঝানোর ক্ষমতা কারও রয়েছে কি না, আমার জানা নেই। তবে জনগণ এটা হৃদয় দিয়ে বুঝেছিলেন আর সেজন্যই দৃঢ় ছিলেন তাঁর কথার। নানা বিপর্যয়ের মধ্যেও এবার বিএনপিকে বিজয়ী করে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করা হয়েছে। শরীরে ধারণ করা কষ্টের অনুভূতি নিয়েই প্রধানমন্ত্রী হিমালয়সম কষ্টের কথা বলেছেন বর্তমান আমলে হওয়া প্রথম ডিসি সম্মেলনে। তিনি বলেছেন, ইতিহাসের সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল বিভাজিত জনপ্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকারকে কাজ করতে হয়েছে। যে তিনটি বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন তা মূলত গোটা দেশের চিত্র এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের চাপও ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, প্রশাসনের অস্থিরতা এবং সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুকতা সেই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির বাস্তবতা কার্যতই এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে সরকারকে। মাঠপর্যায়ের ঘুষ-দুর্নীতি-প্রতারণা অনেক দিন থেকেই চলে আসছে। এক বিবেচনায় নতুন কিছু নয়। মৌলিক ভাবনায় এটাই হচ্ছে মূল সমস্যা। কোন মামলায় কাকে আসামি করা হচ্ছে, কার জমি কে নিচ্ছে, কার টাকা কে লুটে নিচ্ছে- এসব মূলত মাঠপর্যায় থেকেই ঘটছে। বলা ভালো, এসবের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বণ্টনের একটা প্রথাগত পদ্ধতি আছে, যেটাকে সহজ ভাষায় বলা হয় দুর্নীতির চেইন। এই চেইন কবে কখন তৈরি হয়েছে সে আলোচনা অনেক দীর্ঘ। সংক্ষেপে শুধু বলা যায়, আমরা যে ব্রিটিশ আইনে শাসিত হচ্ছি সেখানে এমন কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে, যা কেবল আইন দ্বারা মিটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনে মৌলিক বিষয়ে কাজ করা জরুরি। ব্রিটিশরা ভারতে যে আইন করেছিল সে আইন দ্বারা ব্রিটেনশাসিত হয় না। আমরা মনে করলে সেখানকার প্রথা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। আগের দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে ৫ আগস্ট-পরবর্তী যে মব কালচার এবং সাইবার ক্রাইম যুক্ত হয়েছে, তা নয়া উপদ্রব হিসেবে বিবেচিত। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সড়ক এলাকার যে চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা মূলত প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুলিশের, র্যাবের বা সেনাবাহিনীর পোশাক পরে যারা জনগণকে প্রতারিত করছে, তাদের ঘটনাস্থলে গ্রেপ্তারে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এজন্য কার্যত মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা জরুরি। সর্বাধুনিক ব্যবস্থা না থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুব দুর্বল তা মনে করার কোনো কারণ নেই। সাবেক আমলে বলা হতো চৌদ্দ হাত মাটির নিচ থেকেও তারা সন্ত্রাসী বের করতে পারে। কতটা সততার সঙ্গে করেছে জানা নেই, তবে কাজটি সততার সঙ্গে করা সম্ভব। দেশ-সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে পুলিশকে অবশ্যই হয়রানিমূলক আচরণের বাইরে আসতে হবে। বেসামরিক প্রশাসনে পুলিশই হচ্ছে জনগণের বন্ধু। এ ধারণা প্রতিষ্ঠা করা গেলে জনগণই সমাজের আপদকে পুলিশের হাতে তুলে দেবে। এটি একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
ডিসিদের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণা অভিনন্দনযোগ্য। এর বাস্তবায়নে অবশ্য জাতি উপকৃত হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি প্রকৃত জবাবদিহির কথা বলেছেন। প্রকৃত জবাবদিহি একটি মৌলিক বিষয়। এটি কেবল মূল্যবোধের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। প্রত্যেককে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে, এ ধারণায় সম্পৃক্ত থাকতে পারলে কোনো ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হওয়া অসম্ভব। ব্যক্তি কলুষমুক্ত থাকলে সমাজ কলুষমুক্ত থাকা কোনো বিষয়ই নয়। বাস্তবতা সেটি বলে না। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের শাসন পর্যালোচনা করলে এটি বিনা হিসাবে বলা যায়, যিনি চোরের খনি পেয়েছিলেন সেই চোরাধিপতির বিদায়ের পরদিনই দেশে চাল ও কাপড়ের দাম এবং পণ্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় নেমে এসেছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও রেকর্ড পরিমাণ উন্নতি হয়েছিল। এই ধারা বহাল রেখে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছিলেন উন্নয়নের এক রোল মডেলে। মানুষ চুরি করতে ভুলে গিয়েছিল। দেশে কোনো চোর আছে সেটাই মানুষ ভুলে গিয়েছিল। এটি আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিরে আসে স্বৈরাচার এরশাদের আমলে। আর বিগত এক-এগারো থেকে যা হয়ে আসছে তাকে তো শুধু চুরি বললে অপব্যাখ্যা হবে। এরা তো গোটা দেশই লুটে নিয়েছে। গোটা দেশকে তুলে দিয়েছে অন্যের হাতে কমিশনের বিনিময়ে। নীতিনির্ধারণ থেকে সবকিছু হতো অন্যের ইচ্ছায়। এ থেকে ফেরাতে সরকারপ্রধানের যে গুরুদায়িত্ব রয়েছে মূলত সে কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন প্রধানমন্ত্রী ডিসি সম্মেলনে। লড়াইটা কঠিন তবে অসম্ভব নয়। শুরুটা মাঠপর্যায়ের থেকেই করতে হবে। আমাদের সরকারব্যবস্থায় দুধরনের পদ্ধতি রয়েছে ক্যাডার ও ননক্যাডার। এই ননক্যাডার কর্মচারীরা স্থায়ী। যত সরকারই বদল হোক এরা বদলায় না। রাষ্ট্র সমাজে দুর্নীতি মূলত এদের হাতেই জীবন্ত থাকে। যত কথাই বলা হতো, এরা কখনো হাত গুটিয়ে নেয় না। থানা, ভূমি অফিস, সচিবালয় সর্বত্র এরা দাপুটে। সবাই হয়তো নয়, তবে এরা অনেক ক্ষমতাবান। সরকার অচলের ক্ষমতা রাখে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে হলে আসল জায়গায় হাত দিতে হবে। দুর্নীতিকে অন্তত সহনীয় পর্যায়ে আনা গেলে সমাজে সামাজিক অপরাধের মাত্রাও হ্রাস পাবে। অবৈধ উপার্জনের ছাগলকাণ্ড অথবা বালিশকাণ্ড ঘটার আশঙ্কা শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে বাধ্য। সরকারি ক্রয়ে কমিশন বন্ধ করে সে অর্থ মূল্যে সংযোজন করা গেলে রাষ্ট্রীয় খাতে বোধ করি দুর্নীতির খানিকটা হলেও অবসান হবে। আইজউদ্দিনের কষ্ট শুধু তার একার নয়। গোটা জাতির সাধারণ কষ্টের প্রতিধ্বনি। মূলত শব্দ হলো কষ্টে আছি। কষ্ট থেকে বেরোবার অনেক ব্যবস্থা আছে। সরকার অনেক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এসবের বেলায় তলানিতে ছিদ্র আছে কি না, সেটিও খুঁজে দেখতে হবে। এসব থেকে অবশ্যই উপকার পাওয়া সম্ভব এবং হবেও। মূল উপকার হচ্ছে রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণে নিয়ে আসা তাহলে সুবোধকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অর্থনীতির ভাষায় খারাপ টাকা বাজারে ভালো টাকাকে তাড়িয়ে দেয়। রাজনীতির ভাষায় আজ বড় সত্য হয়ে উঠেছে এ কথা। খারাপ মানুষগুলো অতীতে সমাজ থেকে ভালো মানুষগুলেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। নিঃশেষ করে দিয়েছে নির্যাতন-অত্যাচার মিথ্যা মামলা ও হয়রানির নানা অমানবিক নিবর্তনমূলক আইনে। অনেকেই হয়তো আর বেঁচে নেই। যারা বেঁচে আছেন, তারা সবাই সরকারের কাছে ধরনা দেবেন বা দিতে পারবেন সুযোগ পাবেন, সে ধারণা অর্থহীন। আর এটা করতে যাওয়াও বোকামি।
কারাগারগুলো খুঁজলে এখনো এমন অনেককে হয়তো পাওয়া যাবে তারা জানেই না কেন আটক আছেন। নিবর্তন নির্যাতন একটি ফ্যাসিবাদী ধারণা। এর জন্ম হয় স্বীয় চর্চায়। এখানে ব্যক্তির নাম বড় নয় বড় হচ্ছে আচরণ। এক দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন গণতন্ত্রের সোপানে পা রেখেছে তখন তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক এক মহা ক্রান্তিকাল। এখানে ঐক্যবদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই। কেবল ঐক্যই ফেরাতে পারে মূল লক্ষ্য অর্জনের দিকে। বিভক্তি টেনে নিয়ে যাবে চোরাগলিতে। গণতন্ত্র হচ্ছে এমন এক শাসনব্যবস্থা যাকে বলা হয় সংখ্যালঘিষ্ঠের শাসন কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠরা মেনে নেয়। দুঃসময় দীর্ঘতর হয় সুসময় নিমেষেই হারিয়ে যায়, এটি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সময়ের আপেক্ষিক সূত্র। আমরা যে সুবাতাসে রয়েছি, তা যদি অব্যাহত রাখতে এবং দীর্ঘ করতে হয় তাহলে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী মিছিলে এককাতারে দাঁড়াতে হবে। এখানে কোনো বিভাজন কাম্য নয়। সমাজে নীতিবোধ ফিরলে সুবোধ ফিরে আসবে, আইজউদ্দিনরা মিষ্টি হেসে বলবে আরামে আছি। সেটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওনা।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক