শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০৩

কাঁদিয়ে চলে গেলেন হাসির রাজা টেলি সামাদ

আলাউদ্দীন মাজিদ

কাঁদিয়ে চলে গেলেন হাসির রাজা টেলি সামাদ
জন্ম : ৮ জানুয়ারি ১৯৪৫, মৃত্যু : ৬ এপ্রিল, ২০১৯
Google News

ঢাকাই ছবির হাসির রাজা খ্যাত জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা টেলি সামাদ অগণিত দর্শক-ভক্তকে কাঁদিয়ে পরপারে চলে গেলেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল দুপুরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর এই বেদনাবিধুর খবরটি নিশ্চিত করেন তারই কন্যা সোহেলা সামাদ কাকলী। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই নানা অসুখে ভুগছিলেন বরেণ্য এই অভিনেতা। সম্প্রতি শরীর বেশি খারাপ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। জনপ্রিয় এই অভিনেতার মৃত্যুতে চলচ্চিত্রসহ সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার তুখোড় ছাত্র টেলি সামাদের ছিল অভিনয়ের নেশা। জীবদ্দশায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ছবিতে অভিনয়ের প্রতি দারুণ ঝোঁক ছিল আমার। ছুটে আসতাম এফডিসির গেটে। কিন্তু এফডিসির দারোয়ান কাদের মৃধার রক্তচক্ষু আর লাঠির আঘাত বহুবার আমার ইচ্ছা পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কাদেরের চোখ ফাঁকি দিয়ে একসময় এফডিসিতে ঢুকেই পড়ি। কাদেরের মনও জয় করে নিই। তারপর নির্মাতাদের কাছে আমার মনোবাসনা নিয়ে বহু ঘুরেছি। অবশেষে ১৯৬৬ সালে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রখ্যাত চিত্র নির্মাতা নজরুল ইসলাম আমাকে কমেডিয়ান চরিত্রে তার ‘কার বউ’ ছবিতে কাস্ট করেন। নায়ক হতে না পারলেও কৌতুকাভিনেতা হিসেবে অভিনয় করতে পেরে আমি সন্তুষ্ট। আর যখন এই চরিত্রে দর্শক আমাকে লুফে নিল তখন ভাবলাম আমার স্বপ্ন আসলেই সার্থক হয়েছে।’ চলচ্চিত্রে ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে তার বলা সংলাপ দর্শকের মুখে ফিরত। তার আসল নাম আবদুস সামাদ। চলচ্চিত্রে আসার আগে টিভি নাটক ও মঞ্চে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পান বলে টিভি থেকেই তার নামের প্রথম শব্দ ‘আবদুস’ বাদ দিয়ে টেলিভিশনের ‘টেলি’ যোগ করে দেওয়া হয়। ব্যস হয়ে যান টেলি সামাদ। নিজের নাম টেলি সামাদ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘বিটিভির ক্যামেরাম্যান মোস্তফা মামুন ভাই এ নামটা দিয়েছিলেন। বিটিভি থেকে এক দিন আমার বাসায় চিঠি এলো আমাকে সেখানে যেতে হবে। সেখানে উপস্থিত হতেই মামুন ভাই বললেন,  তোমার নাম আজ থেকে আবদুস সামাদ বাদ দিয়ে টেলি সামাদ। সেই থেকেই আমি হয়ে  গেলাম টেলি সামাদ।’ ছোট পর্দায় প্রখ্যাত ও প্রয়াত নির্মাতা চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘জব্বর আলী’ সিরিজ নাটকে ঝন্টু চরিত্রে অভিনয় করেও অসাধারণ দর্শকপ্রিয়তা লাভ করেন তিনি। চমৎকার আঁকতেও পারতেন। প্রায় চার দশকে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। তাছাড়া নায়ক হিসেবে দুটি ছবিতে অভিনয় করেন। এগুলো হলোÑ ‘দিলদার আলী’ ও ‘মনা পাগলা’। নায়ক হিসেবেও দর্শক তাকে গ্রহণ করে। চমৎকার গাইতেও পারতেন। অসংখ্য ছবিতে প্লেব্যাক করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘সুজন সখী’ ছবির ‘ডেগেরও ভিতরে ডাইলে চাইলে উতাইলেগো সই’ গানটি। তার অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘জিরো ডিগ্রি’ মুক্তি পায় ২০১৫ সালে। শেষ জীবনে শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধলে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরেন তিনি। সারা দিন ইন্দিরা রোডের বাসাতেই থাকতেন। টিভি দেখতেন, ছবি আঁকতেন টেলি সামাদ। দুটি বিয়ে করেন এবং তার তিন পুত্র ও এক কন্যা রয়েছে। প্রথম স্ত্রী হলেন অভিনেত্রী রেখা সরকার রাখী। ১৯৪৫ সালে বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন টেলি সামাদ।

 

সুচন্দা : টেলি সামাদ নেই এ কথা বিশ্বাস করতে পারছি না। এখনো স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ছিপছিপে একটি ছেলে ইউনিটের সবাইকে হাসি-খুশির মধ্য দিয়ে কীভাবে মাতিয়ে রাখে। অসাধারণ অভিনয় তার। গুরুজনদের সম্মান করতে কখনো ভুলত না। একটু জেদি ও রাগী প্রকৃতির হলেও বেশিক্ষণ সেই রাগ ধরে রাখত না সে। ক্যামেরার সামনে যেমন পারফেক্ট ছিল তেমনি সময়জ্ঞান ছিল টনটনে। তার এই বিদায় চলচ্চিত্র জগতের অসীম শূন্যতা।

 

 

 

এ টি এম শামসুজ্জামান : টেলি সামাদ চলে গেছে। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। সিনিয়র শিল্পীরা একে একে সবাই চলে যাচ্ছেন। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তারপরও বলব কাজের মাধ্যমেই মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে। টেলি সামাদ ছিল অসীম গুণের অধিকারী। তার কাজ আর জনপ্রিয়তাই এর প্রমাণ। এই দক্ষ কাজের মাধ্যমে এ দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবে এ কালজয়ী অভিনেতা।

 

 

 

আনিস : টেলি সামাদের মতো এমন জনপ্রিয় ও দক্ষ শিল্পীর মৃত্যু নেই। ঢাকাই চলচ্চিত্রে টেলি সামাদ একটি ইতিহাসের নাম। অভিনয় দিয়ে হাসানো সহজ কাজ নয়। এই কঠিন কাজটি সহজে করে গেছেন তিনি। তা ছাড়া গায়ক, আঁকিয়েসহ নানা গুণে গুণান্বিত এই মানুষটি এদেশের দর্শকের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন। তার স্মৃতি কাঁদাবে এতদিন তার অভিনয় দেখে হাসা দর্শকদের। টেলি সামাদ পরপারে শান্তিতে থাকুক।

 

 

 

 

প্রবীর মিত্র : টেলি সামাদ এক নম্বর কৌতুকাভিনেতা। অসম্ভব রকমের ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। সবার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল।  কেউ বলতে পারবে না, টেলি সামাদ কারও মনে কষ্ট দিয়েছেন। আমি টেলি সামাদের থেকে বয়সে বড়। যদিও আমরা একই বছরে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করি। আমি টেলি সামাদের চলে যাওয়ার খবর শুনে খুব ব্যথিত হয়েছি। বয়স হিসাব করলে চলে  তো যাওয়ার কথা ছিল আমার।

 

 

অভিনীত ছবি

কার বউ, পায়ে চলার পথ, অবাক পৃথিবী, সোহাগ, ঘর সংসার, বৌরানী, নয়নমণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, ভাত দে, কসাই, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা, মিন্টু আমার নাম, ফকির মজনু শাহ, পাগলা রাজা, মধুমিতা, দিন যায় কথা থাকে, মাটির ঘর, নদের চাঁদ, নাগর দোলা, কথা দিলাম, শেষ উত্তর, এতিম, দিলদার আলী, ভালো মানুষ, মান অভিমান, লাভ ইন সিঙ্গাপুর, সখিনার যুদ্ধ, মনা পাগলা, জিরো ডিগ্রি, কুমারী মা, সাথী হারা নাগিন, মায়ের চোখ, আমার স্বপ্ন আমার সংসার, রিকশাওয়ালার ছেলে, মন বসে না পড়ার টেবিলে, কাজের মানুষ, মায়ের হাতে বেহেস্তের চাবি, কে আমি, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, মিস ললিতা, নতুন বউ, জয় পরাজয়, গুণ্ডা, সুজন সখী, চাষীর মেয়ে, রঙিন রূপবান, মতিমহল, লাইলি মজনু, ঘর জামাই, ওয়াদা, সাম্পানওয়ালা, সখী তুমি কার, অভিযোগ প্রভৃতি।