শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ২১:৪৮

তারকার নামেই চলত ছবি...

আলাউদ্দীন মাজিদ

তারকার নামেই চলত ছবি...

একসময় তারকার নামেই চলত ছবি। মানে ছবি দর্শকগ্রহণযোগ্যতার অন্যতম উপকরণ ছিলেন শিল্পী। এক্ষেত্রে শুধু নায়ক-নায়িকাই নন, খলনায়ক, কৌতুক অভিনেতা কিংবা শিশুশিল্পীর প্রতি দর্শক অনুরাগ ছিল প্রবল। এখন আর সেই অবস্থা নেই। বর্তমানে ঢাকাই ছবিতে একমাত্র শাকিব খান ছাড়া আর কোনো তারকা সিনেমা হলে দর্শক টানতে পারেন না। একসময় তারকারা ছিলেন দর্শকের আইকন-আইডল। তাদের মতো  পোশাক-আশাক, ফ্যাশন, হাঁটা-চলার স্টাইল, কথা বলার ঢং অনুকরণ-অনুসরণ করতেন অনেকেই। সিনেমায় দেখা চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নায়ক-নায়িকাদের নানা উপাধি-বিশেষণও দিতেন দর্শক। প্রিয় তারকার কোনো সংলাপও মুখে মুখে ফিরত।  এদেশের প্রথম বাংলা ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালে। সেই ছবির মুখ্য চরিত্র ডাকাতরূপী অভিনেতা ইনাম আহমেদের বলিষ্ঠ অভিনয়ের কারণে প্রথম ছবিই তাকে চলচ্চিত্রের স্থায়ী আসনে বসিয়ে দেয়। ১৯৬০ সালে মুক্তি পাওয়া এহতেশাম পরিচালিত ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে রহমান-শবনম জুটিকে খুঁজে  পাওয়া যায়। এ ছবিতে তাদের লিপসিং করা ‘তোমোরে লেগেছে এত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে’ এখনো দর্শকের নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করে। এ ছবির পর রহমান-শবনম জুটি মানেই দর্শক ক্রেজ। তাদের অভিনীত চান্দা, তালাশ, হারানো দিন, দরশন এখনো জনপ্রিয় হয়ে আছে। ১৯৬৬ সালে রাজ্জাক-সুচন্দাকে জুটি করে জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘বেহুলা’ ছবিটি। এ ছবি এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এর নায়ক-নায়িকা হয়ে পড়েন দর্শক ভালোবাসার তারকা। তাদের ক্রেজ এমনই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, নির্মাতারা ছবি নির্মাণ করতে গেলে আগেই নিশ্চিত করে নিতেন সেই ছবিতে সুচন্দা-রাজ্জাক জুটি থাকবেন কিনা। ১৯৬৭ সালে এহতেশাম তার ‘চকোরি’ ছবির মাধ্যমে আরেক জনপ্রিয় জুটি নাদিম-শাবানাকে উপহার দিলেন। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হান প্রযোজিত ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবিতে জুুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করে চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি হয়ে আছেন রাজ্জাক-ববিতা জুটি। এভাবে সত্তর থেকে আশির দশক পর্যন্ত বহু শিল্পীর নামেই ছবি চলত। তাদের নামের আগে দর্শক-ভক্তরা ভালোবেসে নানা বিশেষণও জুড়ে দিতেন। যেমন-

নায়করাজ রাজ্জাক, ড্যাশিং হিরো সোহেল রানা,  মেগাস্টার উজ্জল, মিয়াভাই ফারুক, হ্যান্ডসাম হিরো আলমগীর, আজিম, সুজাতা, রাফ অ্যান্ড টাফ ট্র্যাজেডি কিং জসিম, লাভারবয় ও স্টাইলিশ জাফর ইকবাল, বাপ্পারাজ, হি-ম্যান হিরো ওয়াসিম, মহানায়ক বুলবুল আহমেদ, ইলিয়াস কাঞ্চন, বিউটি কুইন শাবানা, মিষ্টি মেয়ে কবরী, ইন্টারন্যাশনাল ট্যালেন্ট ববিতা, ড্রিমগার্ল সুচরিতা, অঞ্জনা, অঞ্জু ঘোষ, অলিভিয়া, রোজিনা, দিতি, চম্পা, মমতাময়ী আনোয়ারা, রোজী সামাদ, রওশন জামিল, মুকুটবিহীন নবাব আনোয়ার হোসেন, খান আতা, কমেডি কিং টেলিসামাদ, আনিস, রবিউল, হাসমত, খান জয়নুল, সাইফুদ্দিন, মতি, দিলদার, খলঅভিনেতা ফতেহ লোহানী, খলিল, মুস্তাফা, রাজীব, এ টি এম শামসুজ্জামান প্রমুখ। তাদের মতো কালজয়ী অভিনেতা-অভিনেত্রী-শিল্পী তৈরি হচ্ছে না আর। চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, বাংলাদেশের শাবানাই একমাত্র অভিনেত্রী, যিনি একটি দেশের চলচ্চিত্র জগতে সর্বকালের সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা নিয়ে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। শাবানার কান্নায় কাঁদেননি এমন নারী দর্শক খুঁজে পাওয়া যাবে না  দেশে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতার জন্য তার এক ভক্ত বুকে-পিঠে নাম লিখে ১৯৮৩ সালে ঢাকার প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন করেছিলেন। ১৯৯১ সালে এহতেশাম চলচ্চিত্রে আরেক জনপ্রিয় জুটি উপহার দেন। তারা হলেন ‘শাবনাজ-নাঈম’। এই নির্মাতার ‘চাঁদনী’ ছবিতে অভিনয় করে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তারা। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে নায়ক করে আনেন সালমান শাহকে। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে দক্ষ অভিনয়গুণে এখনো তিনি হয়ে আছেন দেশীয় সিনেমার সাফল্যের বরপুত্র। ১৯৯৩ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত যেসব নায়ক- নায়িকা চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন গড়ে নেন তাদের মধ্যে রয়েছেন রিয়াজ, ফেরদৌস, শাবনূর, ওমর সানি, মৌসুমী, আমিন খান, মান্না, পপি, পূর্ণিমা, শাকিব খান, অপু বিশ্বাস প্রমুখ। এছাড়া খলচরিত্রে মিশা সওদাগর ও শিশুশিল্পী হিসেবে দীঘি চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে নেন।

এরপর চলচ্চিত্রে শুধু নায়ক-নায়িকা নন, অন্যান্য চরিত্রেও অনেক শিল্পী এসেছেন এবং আসছেন। সত্যিকার অর্থে তারা শুধু আসা-যাওয়ার মধ্যেই রয়েছেন। দর্শকহৃদয় বা চলচ্চিত্র জগতে স্থায়ী আসন গড়ে নিতে পারছেন না। মানে এখন একমাত্র শাকিব খান ছাড়া আর কোনো তারকার নামে ছবি চলে না। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা বলেন, লিজেন্ডারি অভিনেতা-অভিনেত্রী হতে গেলে সাধনার দরকার। এক্ষেত্রে নির্মাতা-শিল্পী-কলাকুশলীদের যৌথ প্রয়াস থাকতে হয়। এখন যারা আসছেন তাদের মধ্যে অল্প পরিশ্রমে দ্রুত তারকা এবং অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার লোভ বেশি।  মেধাহীনতায় ভুগছেন তারা। শূন্য থাকছে ফলাফল। নির্মাতারাও নতুনদের শিখিয়ে-পড়িয়ে কাজ আদায় করে নিতে পারছেন না। নির্মাতারা যদি সঠিক নির্দেশনা দেন তাহলে হয়তো এই সংকট মোচন হতে পারে।


আপনার মন্তব্য