শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ মে, ২০২০ ২২:০০

উত্তম-সুচিত্রা জুটি কেন কিংবদন্তি

উত্তম-সুচিত্রা জুটি কেন কিংবদন্তি

১৯৫২ সালে কলকাতার সিনেমা জগৎ খুঁজে পেল কাক্সিক্ষত এক রোমান্টিক জুটি- ‘উত্তম-সুচিত্রা’। দর্শক তাদের পেয়ে নিজেরাও কেমন জানি রোমান্টিকতায় ডুবে গেল। এই জুটির চাল-চলন, স্টাইল অনুকরণ যেন ৬৮ বছরের মাথায় এসে এখনো জ্বলজ্বলে, মানে বাঙালির হৃদয়ে কিংবদন্তি হয়ে আছেন উত্তম-সুচিত্রা জুটি। তাদের নিয়ে লিখেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ

 

‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে সাত সাগর আর তেরো নদীর পাড়ে, ময়ূরপঙ্খী ভিড়িয়ে দিয়ে সেথা দেখে এলাম তারে’, সেই বিখ্যাত ছবি সাগরিকা। পিয়ানো বাজিয়ে মনের মানুষের কথা গানে গানে বলছেন মহানায়ক উত্তম কুমার। সুচিত্রা সেন ছাড়া সেই মনের মানুষ আর কে হতে পারে? আবার হারানো সুর ছবিতে সুচিত্রা সেনের কোলে মাথা রেখে পরম সুখে শুয়ে আছেন উত্তম কুমার। আর ভালোবাসা ভরা চিত্ত নিয়ে সুচিত্রা গেয়ে চলেছেন-ওগো তুমি যে আমার, কানে কানে শুধু একবার বলো, তুমি যে আমার’। উত্তম নিশ্চয়ই  সুচির কানে বলে দিয়েছিলেন, ‘তুমি যে আমার’। না হলে এই জুটির আবেগঘন রসায়ন রুপালি পর্দা ছাড়িয়ে শুধু তাদের বাস্তব জীবনে নয়, দর্শকের মনের গভীরেও আছড়ে পড়েছিল। তাই পঞ্চাশের দশক থেকে এ সময়েও প্রেমের অবিসংবাদিত প্রতীক হয়ে আছেন উত্তম-সুচিত্রা জুটি। ‘সুচিত্রা সেন, সুচিত্রা সেন’ নাইলন শাড়ি, ফাউন্টেন পেন, উত্তম কুমারের পকেটে সুচিত্রা সেন’-এই অণুকাব্যটির রচয়িতা কে ছিলেন, সেটা জানা না গেলেও, পঞ্চাশ ও ষাট দশকে বাঙালি মননে এই ছড়াটির যে বিশেষ এক তাৎপর্য ছিল, তা বলাই বাহুল্য। রোমান্টিকতায় ভরা এ জুটি বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়। কীভাবে রোমান্টিক বাতাবরণ তৈরি করে উত্তেজনায় কাঁপিয়ে দিতে হয় সবাইকে। উত্তম-সুচিত্রা জুটি রুপালি পর্দার এমনই এক প্রেমিক-যুগল, যা চিরদিনের। এই জুটির কোনো ছবির একটি রোমান্টিক দৃশ্য দেখলেও আজকের প্রেমিক হৃদয়েও তোলপাড় ওঠে। তাদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি সংলাপ যেন কাল অতিক্রম করে চলে গেছে বহুদূর। উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রথম হিট ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া হাসির এ ছবিটিতে উত্তম কুমার কিংবা সুচিত্রা সেন কেউই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেননি। এ ছবিটি যখন মুক্তি পায়, তখন ছাপানো পোস্টারে উত্তম-সুচিত্রার কোনো পাত্তাই ছিল না। ছবির প্রদর্শকরা ব্যবসায়িক মানদন্ডে  চরিত্রাভিনেতা তুলসী চক্রবর্তীকে পোস্টারের প্রধান মুখ বানিয়েছিলেন। কিন্তু ছবিটিতে উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক অভিনয় বাংলা সিনেমার জগতে যেন এক প্রলয়ের ডাক দিয়ে যায়। একটি চমৎকার রোমান্টিক জুটির জন্য হাপিত্যেশ করে ফেরা কলকাতার সিনেমা শিল্প যেন পেয়ে যায় এক আলোর দিশা। যে আলো কলকাতার সিনেমা শিল্পে স্বর্ণ সময়ের সূচনা করে। এর পর পথে হলো দেরী, মরণের পর, শাপমোচন, শিল্পী, সপ্তপদী, সাগরিকা, হারানো সুর, সবার উপরে, সূর্যতোরণ, চাওয়া-পাওয়া, জীবনতৃষ্ণা, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, ইন্দ্রানী, চন্দ্রনাথ, আলো আমার আলো, অগ্নি পরীক্ষার মতো ২৮টি ছবিতে এই জুটি দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে বাংলা সিনেমায় রোমান্টিসিজমের ধারা পাল্টে দেন। হয়ে যান বাঙালির রোমান্টিকতার চিরকালীন আইকন। রোমান্টিক জুটি হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা নিজেদের নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য এক জগতে। তাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনায় আজও ক্লান্তি আসে না। সুচিত্রার পোশাক অনুকরণ করতেন সেকালের যুবতীরা। তার শাড়ি পরা কিংবা চুল বাঁধার ধরন ছিল পঞ্চাশ ও ষাট দশকে কলকাতা ও ঢাকার বাঙালি সমাজে আভিজাত্য ও ফ্যাশন-সচেতনতার প্রতীক। উত্তম কুমারের চুলের স্টাইলও অনুকরণীয় ছিল যুবকদের মধ্যে। তার শার্টের কলার কেমন ধাঁচের কিংবা তার স্যুটের কাটিং, সবই ছিল অনুকরণীয়। উত্তম-সুচিত্রার পোশাক-পরিচ্ছেদ ছিল আধুনিক ও কালোত্তীর্ণ। উত্তম কুমার তার জীবদ্দশায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনই উত্তম কুমার হতে পারতাম না। এ আমার বিশ্বাস। আজ আমি উত্তম কুমার হয়েছি, কেবল ওর জন্য।’ সুচিত্রা সেন যখন উত্তমের সঙ্গে গড়ে ওঠার জুটির বাইরে গেছেন, সাফল্য পাননি। বলয়গ্রাস ছবিতে নায়িকাপ্রধান চরিত্রে সুচিত্রা অসাধারণ অভিনয় করেও ছবিটিকে বেশি দিন সিনেমা হলে ধরে রাখতে পারেননি। উত্তম কুমারের বলয় ছিঁড়ে বসন্ত চৌধুরী কিংবা বিকাশ রায়ের সঙ্গে শুভরাত্রি ও সাজঘর নামের দুটি ছবিতে অভিনয় করেও তিনি সাফল্যের মুখ দেখেননি। ১৯৫২ সালে নির্মল দের পরিচালনায় সাড়ে চুয়াত্তরের হাত ধরে বাংলা সিনেমায় এক অবিস্মরণীয় রোমান্টিক জুটির উত্থানের সাক্ষী থেকেছিলেন দর্শক। উত্তম-সুচিত্রা জুটি। রুপালি পর্দায় চিরপ্রেমিক বাঙালির রোমান্টিসিজম ভাষা খুঁজে পেল এই জুটির হাত ধরে। তারপরেরটা ইতিহাস। সোনায় মোড়া সেই ইতিহাস। পঞ্চাশ ও ষাট দশকে পর্দাজুড়ে থাকা সেই জুটির আবেদন কয়েক প্রজন্ম পরে এখনো একই রকম, একই আবেগে ভরা। এই জুটির জনপ্রিয়তার তুলনা শুধু তারা দুজনই। আজ পর্যন্ত জনপ্রিয়তা আর স্টারডামে ঘেরা এই জুটির আশপাশেও ঘেঁষতে পারেনি কেউ। সাড়ে চুয়াত্তরের পর থেকেই সুচিত্রা-উত্তমের জুটি পর্দায় আসা মানেই ম্যাজিক। যে ম্যাজিকের স্বাদ রিল লাইফের গন্ডি টপকে আপামর বাঙালির রিয়েল প্রেমের আনাচে কানাচে জড়াজড়ি করে নিঃশ্বাস ফেলে প্রতি মুহূর্তে এখনো। জেনারেশন ওয়াইজ ওই একটি ব্যাপারে খাঁটি বাঙালি, প্রাচীনপন্থি। এখনো প্রেমিক-প্রেমিকার তুলনা সুচিত্রা-উত্তম জুটিতে এসে শেষ হয়। বাঙালির কিংবদন্তি জুটি উত্তম-সুচিত্রার প্রেম নিয়ে এখনো মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। চায়ের আড্ডায় দুজনের জন্মদিন এবং মৃত্যুদিনে ঘুরে ফিরে আসে সেই রোমান্টিকতার গালগল্প। একের পর এক ছবি করার সুবাদে উত্তম-সুচিত্রার সখ্য বাড়ল। কিন্তু তাদের এই সখ্য কাল হয়ে উঠল সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ সেনের কাছে। আর তা আঁচ করতে পেরে ১৯৫৪ সালেই দিবানাথ সুচিত্রাকে চাপ দিলেন অভিনয় ছেড়ে দিতে। কিন্তু যার রক্তে তখন অভিনয় মিশে গেছে সে কি আর অভিনয় ছাড়ে। স্বামীর বৈরী মনোভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই উত্তমের সঙ্গে অভিনয় করে গেলেন সুচিত্রা সেন। স্বামী দিবানাথের মতো ওই একই বছর উত্তম সুচিত্রার ভক্তরাও ভাবতে লাগল বাস্তবেই উত্তম সুচিত্রা প্রেমিক যুগল। যে মিথের জন্ম হয়েছিল ৬৮ বছর আগে সেই মিথের অবসান হয়নি আজও। এই মিথের আগুনটা উসকে দেওয়ার ব্যাপারে সুচিত্রার ভূমিকাও কম ছিল না। এই জুটির ‘অগ্নি পরীক্ষা’ ছবির পোস্টারে সুচিত্রার স্বাক্ষরসহ লেখা ছিল ‘আমাদের প্রণয়ের সাক্ষী হলো ‘অগ্নি পরীক্ষা’। বাঙালির হৃদয়ে রেখে গেছেন তারা হৃদয়গ্রাহী অনেকগুলো প্রেমের সিনেমা। যা এখনো দেখে প্রেমের সুখানুভূতি খুঁজে ফিরে ভক্তরা। সময়ের গন্ডিতে এখনো বাঁধন হারা প্রেমময় যুগলের প্রতীক ‘উত্তম-সুচিত্রা কিংবদন্তি জুটি।’ যা কখনো হারিয়ে যাওয়ার নয়...।


আপনার মন্তব্য