শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২২:০৮

ফিরে আসছে গল্পনির্ভর নাটক

ফিরে আসছে গল্পনির্ভর নাটক
একসময় গল্পনির্ভর ও জীবনঘনিষ্ঠ একক-ধারাবাহিক নাটক ছিল অমর সৃষ্টি। পঁচাত্তর থেকে নব্বই- এই সময়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট ছিল খুবই শক্তিশালী; শিল্পীদের অভিনয় ছিল মানসম্মত। ইদানীং তো স্ক্রিপ্ট ছাড়াই শুধু গল্প দিয়ে নাটক বানানোর ট্রেন্ড চালু হয়েছে। নেই কোনো বৈচিত্র্য। তবে এই অচলায়তন থেকে বেরিয়ে দুই বছর ধরে বেশ কিছু গল্পনির্ভর নাটক নির্মিত হয়েছে। সেগুলো প্রশংসিতও হয়েছে। নাটক ইন্ডাস্ট্রির এই ইতিবাচক দিক নিয়ে লিখেছেন- পান্থ আফজাল

এখনকার মতো বিজ্ঞাপন দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে নাটক দেখানোর সিস্টেম তেমন ছিল না তখন। নাটক ছিল মানসম্মত। নাটক তৈরি হতো কম। কিন্তু নাটক হতো মনে রাখার মতো অভিনয়শৈলীসম্পন্ন। দর্শকপ্রিয় সেসব নাটকে ছিল তারকার সমাবেশ। কে ছিলেন না! একটির পর একটি মন ভোলানো নাটক আমরা দেখেছি বিটিভির সময় থেকে বেসরকারি টেলিভিশনে প্যাকেজ নাটক প্রচলন থেকে। সেই আশির দশকে হুমায়ূন আহমেদের নন্দিত নরকে নাট্যজগতে এক বিপ্লব আনে। পরবর্তীতে এইসব দিনরাত্রি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, বহুব্রীহি, আজ রবিবার, বারো রকমের মানুষ, ভাঙনের শব্দ শুনি- এই নাটকগুলোর মধ্য দিয়ে প্রচুর দর্শক তৈরি হয়েছিল। আফজাল-সুবর্ণা জুটির ক্রেজ তখন তুঙ্গে। রোমান্টিক জুটি হিসেবে সার্থক। হুমায়ুন ফরীদি-সুবর্ণা, রাই সুল ইসলাম আসাদ-সুবর্ণাও বেশ নাম করেছিল। পঁচাত্তর থেকে নব্বই, নাটকের স্ক্রিপ্ট ছিল খুবই শক্তিশালী। একটির পর একটি গল্পনির্ভর ও জীবনঘনিষ্ঠ নাটক নির্মিত হতো। একটা ঘণ্টা, মনেই হয়নি যেন কোনো নাটক দেখছি। মনে হয়েছে যেন নিজের জীবনে নিজেদের পরিবারে এই ঘটনাপ্রবাহ ঘটে চলেছে। চৌদ্দ বা চব্বিশ ইঞ্চি সাদা-কালো অথবা রঙিন টিভির সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকা হতো। নাটক শেষ হলেও মনে তার রেশ রয়ে যেত। উত্তরসূরিদের পথ ধরে একসময় এসেছেন জাহিদ হাসান, শহীদুজ্জামান সেলিম, রোজী সিদ্দিকী, বিপাশা হায়াত, তৌকীর আহমেদ, শমী কায়সার, আফসানা মিমি, তানিয়া আহমেদের মতো জনপ্রিয় সব তারকা। এখনো তাদের নিয়ে দর্শকের মাঝে অন্যরকম আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাদের পরবর্তী সময় অনেক অভিনয়শিল্পীই মিডিয়ায় এসেছেন। অনেক নাটকে কাজ করেছেন বা করছেন। কিন্তু এসব প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে আগ্রহ বা তাদের পরিচিতি নিয়ে দর্শকদের মাঝে আগ্রহ খুবই কম। অন্যদিকে ভালো নাট্যকার নেই; নেই ভালো নির্মাতা-প্রযোজক। স্ক্রিপ্ট ছাড়া হচ্ছে নাটক। তাড়াহুড়ো করে ইম্প্রভাইজ করে নাটক নির্মিত হচ্ছে প্রযোজক-শিল্পীদের ইচ্ছানুসারে। নাটকে নেই গল্প; নেই কোনো বৈচিত্র্য। দিলারা জামান এ সময়ের নাটক নিয়ে বলেন, ‘এখন তো তিন-চার জনকে নিয়ে নাটক বানাচ্ছেন নির্মাতারা। বাজেট স্বল্পতা দেখিয়ে নির্মাতারা দিন দিন চরিত্র কাটছাঁট করছেন। সেই পারিবারিক আবহ আর নাটকে নেই।’ মীর সাব্বিরের মতে, ‘এ দেশের নাটক তো এখন সবাই খায়, দেখে না।’ আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘এখন তো ভালো নাট্যকারের অভাব, স্ক্রিপ্টের অভাব। নতুন নাট্যকার সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। সবাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। নাটকে নেই কোনো অ্যাকশন-রিয়েকশন!’ চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় ইদানীং কিছু নাটকে সিরিয়াস ও মানবিক গল্প প্রাধান্য পাচ্ছে। এটা খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে নাটকের মূল সমস্যা স্ক্রিপ্টিং। এই দুর্বলতা রয়েই গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক গল্প দিয়েই নাটক নির্মিত হচ্ছে। স্ক্রিপ্টিং নিয়ে খুবই বিব্রত ও বিরক্ত! ভালো স্ক্রিপ্টের অভাব খুব অনুভব করি।’

তবে সেই বন্ধ্যত্ব ঘোচানোর চেষ্টা চলছে দুই বছর ধরে। গত কয়েক ঈদে মানবিক গল্প নিয়ে নাটক বানানোর চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। এসব মানবিক গল্প দর্শকের মন কাড়তে সক্ষমও হচ্ছে। অভিনয়শিল্পীর অনেকে নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টায় ছিলেন। টিভি চ্যানেল-ইউটিউব প্ল্যাটফরমে গত কয়েক বছরে বাজে নাটকের ভিড়ে বেশ কিছু নাটক-টেলিছবি ছিল আলোচনায়। সেসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলেছে আলোচনা। এর আগে সুন্দর গল্প নিয়ে তৈরি আদনান আল রাজীবের ‘বিকেল বেলার পাখি’ দর্শককে মুগ্ধ করে। তানিয়া আহমেদের নির্মাণে ‘বাবার জুতো’ নাটকে অ্যালেন-সেলিমের অভিনয় কাঁদিয়েছে দর্শককে। গত বছরও দর্শক পায় কিছু পারিবারিক, সামাজিক গল্পনির্ভর নাটক। এর মধ্যে রয়েছে মাবরুর রশীদ বান্নাহর ‘আশ্রয়’, ‘লেডি কিলার ও লেডি কিলার ২’, সাজিন আহমেদ বাবুর ‘উবার’, আশফাক নিপুণের ‘মিস শিউলী’, ‘সোনালী ডানার চিল’, মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘সাবলেট’, ‘২২শে এপ্রিল’ ও ‘লাইফ ইন্স্যুরেন্স’, শাফায়েত মনসুর রানার ‘আমাদের সমাজবিজ্ঞান’, দীপু হাজরার ‘জয়েন ফ্যামিলি’, ইফতেখার আহমেদ ফাহমির ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’, সাগর জাহানের ‘ক্ষণিকের আলো’, জিয়াউর রহমান জিয়ার ‘মধ্য রাতের সেবা’ নাটক।

এ বছর করোনাকালীন নাটক-টেলিছবি কম নির্মিত হলেও বেশ কিছু নাটক কেড়ে নেয় দর্শকপ্রশংসা। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় আশফাক নিপুণের ‘ইতি, মা’ নাটকটি নিয়ে। দর্শকের পাশাপাশি বিনোদন অঙ্গনের অনেকেই এই নাটকের গল্প, সংলাপ, নির্মাণ ও অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। নাটকটিতে যেমন এক নতুন আফরান নিশোকে পাওয়া গেছে, তেমনি দর্শকমন জয় করেছেন ঈশিতা। মায়ের চরিত্রে শিল্পী সরকার অপু আর ভাইয়ের চরিত্রে আবির মির্জার অভিনয়ও উল্লেখ করার মতো। এর আগে ঈশিতার অভিনীত ‘পাতা ঝরার দিন’ সবার কাছে প্রশংসিত হয়। রাফাত মজুমদার রিংকুর ‘বোধ’ নাটকে বর্তমান সময়ের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। মোশাররফ করিমের অভিনয়ে এই নাটকে এক চেয়ারম্যানের লোভী ও স্বৈরাচারী মনোভাবের চিত্র ফুটে ওঠে। সমসাময়িক গল্পের এই নাটকে রুনা খান, আশীষ খন্দকার ও তাসনুভা তিশার অভিনয়ও চোখে পড়ার মতো। ভিকটিম নাটকে অপি করিমের অভিনয় দেখে ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন এভাবে- ‘জাত অভিনয়শিল্পীরা কোনো দিনও অভিনয় ভুলে যান না, যার প্রমাণ অপি করিম।’ অভিনয়শিল্পীও যে নিজেকে ভেঙেচুরে নতুনভাবে দর্শকের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন, তা-ই দেখিয়েছেন নিশো। মাহমুদুর রহমান হিমির ‘কেন’ টেলিছবিতে মুঠোফোনহীন আশির দশকের চট্টগ্রাম শহরের এক সত্যিকারের প্রেমের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। রাইমা চরিত্রে অভিনয় করেছেন মেহজাবীন ও ঈশিতা এবং আবির চরিত্রে তৌসিফ ও আফরান নিশো। মিজানুর আরিয়ানের শহর ছেড়ে পরাণপুর একটি অন্যরকম নাটক মনে হয়েছে। প্রেসার কুকার নাটকে খুব সুন্দর করে বর্তমান সময়ের বাস্তব একটি সমস্যার চিত্রায়ণ এবং সমাধান দিয়েছেন শাফায়েত মনসুর। সঞ্জয় সমদ্দারের ‘যে শহরে টাকা ওড়ে’ ও ‘পলিটিকস’ এ সময় ছিল আলোচনায়। এবারও নির্মাতা হানিফ সংকেত ‘মনের মতি মনের গতি’ নাটকটি দিয়ে দর্শকনজর কেড়ে নেন। ‘এক্সট্রা আর্টিস্ট’ নাটকের গল্প ও ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয় ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়াও ভুল এই শহরের মধ্যবিত্তদেরই ছিল, গিরগিটি, বাবার বুকের ঘ্রাণ, নির্বাসন, জানবে না কোনোদিন, ক্রিস্টালের রাজহাঁস, কন্ট্রাক্ট, টু-লেট, মা, আব্বা, বাবারা সব পারে, শিফট, ‘মানুষের গল্প’, শূন্য পাতার চিঠি, এই শহরে, ব্যঞ্জনবর্ণ, দ্য লাস্ট অর্ডার, মা আই মিস ইউ, ‘প্রাণপ্রিয়’, ‘অপরূপা’সহ নির্মাতা নিয়াজ মাহবুব, আবু হায়াত মাহমুদ, তুহিন হোসেন, তপু খান, হিমু আকরাম, মাহমুদ দিদার, রুমান রুনি, মুরসালিন শুভর তৈরি কিছু নাটক দর্শক প্রশংসিত হচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায়, ভিন্নধর্মী গল্পের নাটক ও টেলিছবির জন্য দর্শকরা বরাবরই মুখিয়ে থাকেন। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের যুগে নাটক-টেলিছবিতে শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। তবে এখন সেই অচলায়তন ভাঙার সময় এসেছে।  ভালো গল্প, নির্মাণ ও জাত শিল্পী হলে দর্শকনন্দিত হবেই- তা নিশ্চিত করে এখন বলা যায়!


আপনার মন্তব্য