শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুলাই, ২০১৯ ০২:৩৩

নৌকাবিরোধীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না : শেখ হাসিনা

ধর্ষক-অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বললেন সংসদে

নিজস্ব প্রতিবেদক

নৌকাবিরোধীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে না : শেখ হাসিনা

নৌকা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে যারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতা করেছেন তাদেরকে আগামীতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারদলীয় সভাকক্ষে           দলের সংসদীয় দলের সভায় তিনি এমন হুঁশিয়ারি দেন। একই সঙ্গে নৌকার বিরোধিতা করা এবং নির্বাচনী এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজনের প্রাণহানির ঘটনায় একজন সাবেক মন্ত্রীকে ভর্ৎসনা করেন দলীয় সভানেত্রী। যেসব মন্ত্রীরা মন্ত্রিপাড়ায় বাসা পাওয়ার পরও ন্যামভবনে বাসা ছাড়েননি এবং যেসব সাবেক মন্ত্রীরা মন্ত্রিপাড়ার বাসা দখল রেখেছেন তাদেরকে দ্রুত বাসা ছাড়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকে সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান, হুইপ আতিউর রহমান আতিক, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, এ কে এম শামীম ওসমান, মমতাজ বেগম প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, দলের মধ্যে কোন্দল-দ্বন্দ্বে জড়িত মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা নৌকা মার্কা নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন কিন্তু নিজ এলাকায় এখন নৌকার বিরোধিতা করছেন- এটা তো আমাদের দেখতেই হবে। আগামীতে তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না।’ নৌকা মার্কা নিয়ে বিজয়ী হয়ে এলাকায় নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে আজ শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এদিকে চিফ হুইপ নূর ই আলম চৌধুরী লিটন সংসদীয় দলের সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।

বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা এবং সংসদে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি তাগিদ দিয়ে বলেন, যার যার এলাকায় যান, দলীয় কর্মকান্ডে  মনোযোগী হন, নেতা-কর্মীসহ জনগণের পাশে থাকুন, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে কাজ করুন। তিনি প্রত্যেক জেলা-উপজেলায় দলের কার্যালয় স্থাপনের তাগিদ দিয়ে বলেন, যেসব জেলা বা উপজেলায় নিজস্ব দলীয় কার্যালয় নেই, দ্রুত সেখানে কার্যালয় নির্মাণ করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের কাছে পরিপূর্ণ রিপোর্ট দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। 

বৈঠকে দলের মধ্যে কোনো ধরনের কোন্দল-দ্বন্দ্বে জড়িত না হওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, কোনোভাবেই কোন্দল বা দ্বন্দ্বে জড়িত হবেন না। এ সময় সাবেক এক মন্ত্রীকে তীব্র ভর্ৎসনা করে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাচনে দলের মনোনীত নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন। বিরোধিতা করতে গিয়ে সংঘর্ষে একজন কর্মীর প্রাণ গেছে। এসব কর্মকা  কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। যে যত বড় নেতাই হোন না কেন, দলের বিরোধিতা কিংবা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কাউকেই ছাড়া হবে না। সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের ন্যাম ভবন ও সরকারি বাড়ি না ছাড়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এগুলো দ্রুত ছেড়ে দিতে হবে। নতুন যারা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। অনেকে মন্ত্রী হয়ে সরকারি বাড়ি বরাদ্দ পাওয়ার পরও ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট দখল করে রেখেছেন। তাদের পিওন, ড্রাইভার, গানম্যানরা এসব ফ্ল্যাটে থাকছেন। ন্যাম ফ্ল্যাট পিওন-ড্রাইভারদের জন্য নয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সাধারণ সম্পাদক নূর ই আলম চৌধুরী লিটন সংসদ সদস্যদের দলের ফান্ডে বার্ষিক চাঁদা বাকি থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত যেসব সংসদ সদস্যের দলের বার্ষিক চাঁদা বাকি রয়েছে তা দ্রুত পরিশোধের নির্দেশ দেন।  বৈঠকে সংরক্ষিত মহিলা আসনের কয়েকজন সংসদ সদস্য তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানান। বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।

অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে : সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধিতে ক্ষোভ ও শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনকে আরও কঠোর করা হবে, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কেউ সাহস না পায়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গতকাল  একাদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের (বাজেট অধিবেশন) গতকাল  সমাপনী বক্তৃতায় তিনি এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ষকদের চেহারা যেন বার বার দেখানো ও প্রকাশ করা হয়। যাতে এই জঘন্য অপরাধীরা লজ্জা পায়। পাশাপাশি পুরুষ সমাজকেও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নারীরা কেন একা প্রতিবাদ করবে। এ বিষয়ে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, রাজনীতি করি দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে হবে সেই রাজনীতি আমি করি না।

আমার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের উন্নতি ও দেশের মানুষের কল্যাণ। প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যে শেষে স্পিকার রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করে সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে গ্যাসের মূল্য বেশি এমন অভিযোগ নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দুই  দেশের তুলনামূলক মূল্যের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভারতসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাসের মূল্য কম। বাংলাদেশে গৃহস্থালি খাতে যেখানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ১২ টাকা ৬০ পয়সা, সেখানে ভারতের মূল্য ৩০ থেকে ৩৭ রুপি। শিল্পে বাংলাদেশে ১০ টাকা ৭০ পয়সা, ভারতে ৪০ থেকে ৪২ রুপি, সিএনজি খাতে বাংলাদেশে ৪৩ টাকা, ভারতে ৪৪ থেকে ৫৩ রুপি এবং বাণিজ্যিক খাতে বাংলাদেশে ২৩ টাকা, সেখানে ভারতে ৫৮ থেকে ৬৫ রুপি। তবে ভারত থেকে আমাদের দেশে গ্যাসের দাম বেশি হলো কীভাবে? গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এলএমজি  আমদানি  খুব ব্যয়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ এনার্জি  রেগুলেটরি কমিশন মূল্যায়ন করে দেখেছে বর্ধিত ব্যয় নির্বাহের জন্য কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করার প্রয়োজন ছিল। সেখানে আমরা কতটুক দাম বৃদ্ধি করেছি? গ্রাহকদের আর্থিক চাপ বিষয়টা বিবেচনা করে কমিশন মাত্র ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করেছে।

গণপরিবহনের বিষয়টি বিবেচনা করে সিএনজি খাতে শুধু প্রতি ঘনমিটারে ৩ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে এখন থেকে মিনিমাম চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। সব শিল্প গ্রাহকদের ইবিসি মিটার দেওয়া হবে। যাতে করে গ্যাস কে কত ব্যবহার করে  সেটা যেন নির্দিষ্ট থাকে। যাতে বিল পরিশোধ সহজ হয়। গ্রাহকদের আর্থিক চাপ যেন বেশি না পড়ে সেজন্য সরকার গ্যাসে প্রতি বছর ৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল থেকে এ খাতে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের উল্লেখ করে বলেন, আমরা যদি সব খরচটা ধরি তাতে এলএমজি আমদানির খরচ পড়ে সম্পূরক শুল্কসহ প্রতি ঘনমিটার ৬১ দশমিক ১২ টাকা। আমরা নিচ্ছি মাত্র ৯ দশমিক ৮০ টাকা। অর্থাৎ এলএমজি আমদানিতে যেখানে ৬১.১২ টাকা দাম পড়ে, সেখানে নেওয়া হচ্ছে ৯.৮০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৫১ দশমিক ৩২ টাকা। আর সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের কারণে সরকারের ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা এলএমজি আমদানি করছি গ্যাসের চাহিদা মেটাবার জন্য। দেশে শিল্পায়ন হচ্ছে, শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু সে পরিমাণ গ্যাস আমাদের দেশে নেই। আমরা গ্যাসের কূপ খনন করছি। গ্যাসের জন্য পরীক্ষা- নিরীক্ষা করা হচ্ছে, যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি।  সেখানেও গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, তখনই দেশের উন্নয়ন হয়।

চাকরিতে বয়সের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যত নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আগের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই। শিক্ষার কার্যকর পরিবেশ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া প্রসঙ্গে সংসদ নেতা বলেন, ডেঙ্গু রোগটা বেড়ে গেছে। সমস্যা হচ্ছে ডেঙ্গু মশাটা এরোসক্রেট হয়ে গেছে। এরা পচা ডোবা-নর্দমায় নয়, একটু ভদ্র এলাকায় বাস করে। বাসা-বাড়ির স্বচ্ছ পানিতে এরা বংশবিস্তার করে। তাই এ ব্যাপারে দেশের মানুষকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে, বাসা-বাড়ির আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর