নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তারেক রহমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটের অনুমোদন দেওয়া হলো। গতকাল জাতীয় সংসদে এ বাজেট কণ্ঠভোটে পাস করা হয়। যা আজ পয়লা জুলাই থেকে কার্যকর হবে। এর আগে ১১ জুন এ বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয় সকালে। দুপুরে বিরতির পর বাজটে পাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময় অর্থমন্ত্রীর দ্বারা উত্থাপিত নির্দিষ্টকরণ বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বাজেট পাসের জন্য প্রস্তাব উপস্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। এ সময় সরকারদলীয় সদস্যরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। এর আগে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর ব্যয় সংক্রান্ত ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনা ও ভোট গ্রহণ করা হয়। এসব দাবির বিপরীতে ৪৩ জন সংসদ সদস্য মোট ১ হাজার ৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বাজেট বরাদ্দ এবং নীতিগত বিষয় নিয়ে কয়েক দিন ধরে সংসদে আলোচনা হয়। পরে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ করে মূল বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হয়। এ বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
বাজেট পাসের আগে সোমবার অর্থ বিল, ২০২৬ সংসদে পাস হয়। এতে সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৬৪টি সংশোধনী গ্রহণ করা হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়কর হার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা, সম্পত্তি নামজারি ও বণ্টননামা দলিল নিবন্ধনে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এবং বিনা প্রশ্নে ফ্ল্যাট ও প্লটের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শনের সুযোগও প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামের এ বাজেটের আকার বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। বাজেটের আকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশের সমান।
নির্দিষ্টকরণ বিল অনুযায়ী, সরকারের বিভিন্ন ব্যয় নির্বাহের জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৯ কোটি ৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ব্যয় ও অর্থ প্রদানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা এবং সংসদে ভোটে গৃহীত মঞ্জুরি ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪১৪ কোটি ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
নতুন বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশিবিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রাখা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে, যার পরিমাণ ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে আদায়ের লক্ষ্য ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক ও অন্যান্য কর-শুল্ক থেকেও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাস হওয়া বাজেটে আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। বিদায়ি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি এবং প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে আসার প্রেক্ষাপটে এ লক্ষ্য অর্জনকে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।