প্রথমবারের মতো মা হতে চলেছিলেন মাছুদা আক্তার (ছদ্মনাম)। পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি ছিল নানা দুশ্চিন্তা। প্রসব কোথায় হবে, জটিলতা দেখা দিলে কী করবেন, হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা হবে কি না কিংবা চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন—এসব চিন্তায় কেটেছে গর্ভাবস্থা প্রথম কয়েক মাস। পরে একজন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শে তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং নিরাপদ প্রসবসেবার মাধ্যমে কোনো জটিলতা ছাড়াই জন্ম নেয় তার সন্তান। মাছুদার মতো উত্তরবঙ্গের হাজারো মায়ের নিরাপদ মাতৃত্বের যাত্রায় বাংলাদেশ সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প—‘জননী’।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা মাছুদা আক্তার বলেন, ‘প্রথম সন্তান হওয়ায় খুব ভয় লাগছিল। কোথায় চিকিৎসা নেব, কত টাকা লাগবে—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। পরে জননী প্রকল্পের কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী হালিমা আপার মাধ্যমে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে যাই। গর্ভাবস্থার তিন, ছয়, আট ও নয় মাসে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছি। শুধু চিকিৎসাই নয়, কী খাব, কীভাবে চলাফেরা করব, বিপদসংকেত কী—সবই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কোনো জটিলতা ছাড়াই স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে আমার সন্তানের জন্ম হয়েছে।’
মাছুদার মা শাহনাজ বেগম বলেন, ‘হালিমা আমাদের বাড়িতে এসে মেয়ের খোঁজ নিতেন এবং সরকারি হাসপাতালে যেতে উৎসাহ দিতেন। আমরা গরিব মানুষ। বিনা খরচে এত ভালো সেবা পেয়েছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমার মতো সব অসচ্ছল পরিবার যেন এমন সেবা পায়, সেটাই চাই।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ২০২৩ সাল থেকে রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার ৪০টি ইউনিয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘স্ট্রেনথেনিং দ্য ম্যাটারনাল অ্যান্ড নিওনেটাল হেলথ সিস্টেম (জননী)’ প্রকল্প। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কোইকা) অর্থায়নে, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তা এবং মাঠপর্যায়ে আরডিআরএস বাংলাদেশের বাস্তবায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পের লক্ষ্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা, মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা।
প্রকল্পের আওতায় গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রসব-পূর্ব প্রস্তুতি, পুষ্টি বিষয়ে পরামর্শ, ঝুঁকির লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা, নিরাপদ প্রসব, প্রসব-পরবর্তী ৪২ দিন পর্যন্ত মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, পরিবার পরিকল্পনা এবং নবজাতকের পরিচর্যাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেফারেলের ব্যবস্থাও করা হয়।
কান্দি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মিডওয়াইফ রমিসা খাতুন জানান, তাদের কেন্দ্রে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ জন গর্ভবতী নারী প্রথম গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা (এএনসি) করান। দ্বিতীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান প্রায় ৫০ জন, তৃতীয় প্রায় ৩৫ জন এবং চতুর্থ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান ২২ থেকে ২৫ জন গর্ভবতী নারী। প্রতি মাসে কেন্দ্রে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া প্রসব-পরবর্তী সেবা (পিএনসি- এক অথবা একাধিক) গ্রহণ করেন গড়ে ২৫ জন প্রসূতি নারী ও তাদের নবজাতক।
তিনি বলেন, ‘আগে অনেক গর্ভবতী মা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে চাইতেন না। এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভালো সেবা পাওয়া যায়, প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতিও রয়েছে। নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দেওয়া, উঠান বৈঠক এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে গর্ভবতী মা ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতি আস্থা বেড়েছে। এখন তাঁরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে আসেন, কোনো জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে রাজি হন। তাই নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।’
শুধু মাছুদা নন, পাশের গ্রামের আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ফাতেমা আক্তারও (ছদ্মনাম) গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত সেবা নিচ্ছেন। তার মতো অসংখ্য নারী এখন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা, সময়মতো রেফারেল এবং পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাচ্ছেন।
জননী প্রকল্পের অন্যতম শক্তি হলো পরিবারকে সম্পৃক্ত করা। উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক আলোচনা, লোকগান, পথনাটক, পটগানসহ বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের মাধ্যমে শুধু গর্ভবতী নারী নয়, তার স্বামী, শাশুড়ি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও নিরাপদ মাতৃত্ব সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। ফলে গর্ভাবস্থার যত্নে পারিবারিক সহযোগিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
জননী প্রকল্পের ফিল্ড অপারেশনস ম্যানেজার ডা. গোলাম ফখরুদ্দিন ফাহিম বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-৩ অনুযায়ী মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমাতে সরকারকে সহযোগিতা করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা কমিউনিটি পর্যায়ে গর্ভবতী নারীদের শনাক্ত করে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত করছি। ফলে তারা সময়মতো গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা পাচ্ছেন।’
প্রকল্প সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ৫৮৭টি নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধিরও প্রতিফলন। একসময় জনবল সংকট, সচেতনতার অভাব ও কুসংস্কারের কারণে অনেক নারী বাড়িতেই অনিরাপদ পরিবেশে সন্তান প্রসব করতেন।
বর্তমানে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, মানসম্মত সেবার সহজ প্রাপ্যতা এবং স্থানীয় সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা শুধু একজন মায়ের জীবন রক্ষা নয়; এটি একটি নবজাতকের সুস্থ ভবিষ্যৎ, একটি পরিবারের স্বপ্ন এবং একটি সমাজের টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উত্তরবঙ্গে জননী প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতা, দক্ষ মিডওয়াইফ, শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সময়মতো মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা গেলে মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনুসরণযোগ্য একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিডি-প্রতিদিন/জেডআর