ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জেরে নতুন করে উত্তেজনার মধ্যেই কোরীয় উপদ্বীপে আবার অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে সমরাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়াতে উত্তর কোরিয়ার একাধিক উদ্যোগের পর দক্ষিণ কোরিয়াও আধুনিক ড্রোন বাহিনী গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এতে নতুন করে চির বৈরী দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার বন্দর নগরী নামফোতে ৫ হাজার টন শ্রেণীর বহুমুখী ধ্বংসাত্মক যুদ্ধজাহাজ ‘চো হাইওন’ এর কমিশনিং অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার সবোচ্চ নেতা কিম জং উন নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সাজানোর ঘোষণা দেন। ৫ হাজার টনের দুটি যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীতে অন্তর্ভূক্তির পর উত্তর কোরিয়া একের পর এক ১০ হাজার টনের যুদ্ধজাহাজ বানানোর পরিকল্পনা করছে।
তার একদিন পর গত বৃহস্পত্তিবার কিম জং উনের উপস্থিতিতে উত্তর কোরিয়া উন্নত সংস্করণের রকেট আর্টিলারি ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। এটি দেশটির পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ।
এ অনুষ্ঠানে কিম বলেন, ‘বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে কেবল শক্তিতে পূর্ণ আধিপত্য থাকলেই সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। তাই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার করা আমাদের জাতীয় কৌশলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ এর আগে এ মাসের শুরুতে উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক বোমার জ্বালানি ইউরেনিয়াম তৈরির একটি নতুন কারখানা জনসমক্ষে এনেছে।
উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা উদ্বিগ্ন দক্ষিণ কোরিয়া। তবে তারাও বসে নেই। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৬ জুন) দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়াকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে তারা দ্রুত ড্রোন ও পাল্টা-ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এর আওতায় ৫ লাখ ‘ড্রোন যোদ্ধা’কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়াও সম্মুখসারির ইউনিটগুলোতে বিপুল সংখ্যক চালকবিহীন আকাশযান (ড্রোন) মোতায়েন করা হবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানান, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও মেরিন কোরের ব্যবহারের জন্য ২০২৯ সালের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা ছিল। তবে মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে এই সংখ্যা সংশোধন করে প্রায় ৬০ হাজারে নামিয়ে এনেছে। যার মধ্যে প্রায় ১১ হাজার ড্রোন ২০২৬ সালেই যুক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ড্রোন শুধু কয়েকটি বিশেষ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিটি সৈন্যের জন্য এটি রাইফেলের মতো দ্বিতীয় সরঞ্জাম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামরিক শাখায় এই ব্যবস্থা চালু করা হবে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে এ ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে সিউল চীনা যন্ত্রাংশের পরিবর্তে শতভাগ দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদিত যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভর করবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং জাপানি উপনিবেশ থেকে কোরিয়া উপদ্বীপ মুক্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় নতুন জটিলতা। বিশ্বের দুই পরাশক্তি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ার দুই অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
উত্তর অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন, দক্ষিণ যায় যুক্তরাষ্ট্রের কব্জায়। ১৯৪৮ সালের আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয় রিপাবলিক অব কোরিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়া, এরপরের মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা উত্তর কোরিয়া। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক বৈরী।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পযন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যান। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সে যুদ্ধ থামলেও কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। তাই কাগজে কলমে দুই কোরিয়া এখনও যুদ্ধে লিপ্ত। বিভিন্ন সময়ে শান্তি আলোচনা বা দুই কোরিয়াকে একত্র করার উদোগ নেয়া হলেও কোনোটাই সফল হয়নি। বরং মাঝে মাঝেই দুই দেশের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া চাপের মুখে রয়েছে। ফলে সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে দেশটির সেনাবাহিনীকে এখন অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং চালকবিহীন প্রযুক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স।
বিডি প্রতিদিন/আরকে