শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:২৪

গামছা পার্টির ফ্লাইওভার

মির্জা মেহেদী তমাল

গামছা পার্টির ফ্লাইওভার

গত ৬ জানুয়ারি ভোরে কারওয়ান বাজার রেলক্রসিং এলাকার ফ্লাইওভারের ওপর থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান মিজানের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়। ওই মামলার তদন্তে ভয়ঙ্কর এক চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় এই চক্রের তিন সদস্যকে। তারা হলেন- অটোরিকশা চালক নূর ইসলাম, জালাল ও আবদুল্লাহ বাবু। গ্রেফতারের পর ২৪ জানুয়ারি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন নূর ইসলাম। তাদের কাছ থেকে সিরিয়াল কিলিংয়ের নানা কাহিনি শুনে পুলিশ কর্মকর্তারাও হতবাক। অফিস ছুটির পর গামছা পার্টির ব্যস্ততা শুরু। মাঠে নেমে পড়ে তারা। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঘুরে বেড়ান শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত। যাত্রীর আসনে নিজের লোক রেখেই যাত্রী খুঁজতে থাকেন। কেউ হাতের ইশারা দিলেই রাস্তার পাশে থামিয়ে দেন অটো। শেয়ারে যাত্রী যত টাকা ভাড়া দিতে চান, তাতেই রাজি হয়ে অটোতে তুলে নেন। অটোতে তুলে নির্জন জায়গা খুঁজতে থাকেন। চালক গাড়ি চালান। যাত্রীবেশে বসে থাকা দুজনের মিশন শুরু। অটোতে তুলে নেওয়া যাত্রীর ওপর চলে তাদের অপারেশন। আঙ্গুলকে পিস্তল বানিয়ে যাত্রীর পেছনে ঠেকিয়ে দেয়। বলে, যা আছে দিয়ে দে। নইলে গুলি। যাত্রী রাজি হয়ে সব দিয়ে দিলেই ঝামেলা নেই। আর ধস্তাধস্তি করলেই যাত্রীর জীবননাশ। তাদের কাছে থাকা গামছা হয়ে ওঠে অস্ত্রের চেয়েও বিপজ্জনক। গলায় পেঁচিয়ে ধরে দুজন দুদিকে টান দিতেই যাত্রীর জীবন সেখানেই শেষ। এরপর ধারেকাছের ফ্লাইওভারে গিয়ে লাশ ফেলেই চম্পট দেয় এই অটোচালকবেশী ভয়ঙ্কর খুনি দল। পুলিশের ভাষায় এরা গামছা পার্টি। উদ্ধার হওয়া লাশের পাশে গামছাও উদ্ধার হয়। যে কারণে এ চক্রটিকে গামছা পার্টি বলা হয়। এমন চক্রের তৎপরতা এখন রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে। ঢাকায় গামছা পার্টির একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। গ্রেফতার করেছে এই চক্রের তিন সদস্যকে। তারা ইতিমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন জালাল ও আবদুল্লাহ বাবু। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মিজানকে হত্যা ছাড়াও আরও তিনটি হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে নূর ইসলাম। গত ৪ জানুয়ারি রাতে খিলক্ষেত ফ্লাইওভার থেকে মনির হোসেন, ৩১ ডিসেম্বর ভোরে খিলক্ষেত ফ্লাইওভার থেকে অজ্ঞাত পুরুষ (৩০) এবং ১০ ডিসেম্বর ভোরে খিলক্ষেত ফ্লাইওভার থেকে আক্তার হোসেনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও আদালত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানান, একটি হত্যার ঘটনা তদন্তে নেমে ভয়ঙ্কর এক চক্রের সন্ধান পেয়েছি। ইতিমধ্যে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ৮/৯ জন। চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতে অভিযান চলছে। গত ৩/৪ বছরে গামছা পার্টির এই চক্রটি ২৫০০/৩০০০ ছিনতাই করেছে। কেউ মরেছে, কেউ অচেতন হয়েছে কেউবা সর্বস্ব হারিয়েছে এই চক্রের হাতে। একের পর এক খুন করলেও এই চক্রের বিষয়ে এতদিন অন্ধকারেই ছিল পুলিশ। নূর ইসলামের মুখে এসব খুনের বর্ণনা শুনে বিস্মিত পুলিশ কর্মকর্তারা। সিরিয়াল কিলিংয়ের এসব কাহিনি যেন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশ্বাসই হতে চায় না। নূর ইসলাম বলেছে, এই চারজন ছাড়াও গত চার মাসে আরও অন্তত পাঁচটি হত্যার সঙ্গে সে সরাসরি জড়িত। এই সময়ে আরও অন্তত ১০ জনকে অজ্ঞান অবস্থায় বিভিন্ন সড়কে ফেলে গেছে। পরে তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা তার জানা নেই। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশকে আরও তৎপর হতে হবে। রাজপথে মানুষকে নিরাপদে যাতায়াতের ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। শেয়ারে অটোতে যাতায়াত না করাটাই সবচেয়ে ভালো।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর