শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৮ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ মে, ২০২১ ২৩:৩৭

ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলার অবনতি

ছিনতাই ও অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য বেড়েছে, দুই দিনে দুজনের মৃত্যু

সাখাওয়াত কাওসার

ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলার অবনতি
Google News

ছুটি শেষ হওয়ায় ৯ মে কর্মস্থল দুবাই ফিরে যাওয়ার কথা ছিল সুভাষচন্দ্র সূত্রধরের (৩৬)। সে অনুসারে করোনা পরীক্ষার পাশাপাশি আরও কিছু কাজের জন্য আগেভাগেই গ্রামের বাড়ি বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তবে গত বৃহস্পতিবার ভোরে গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় কুড়িল ফ্লাইওভারে তার লাশ পাওয়া যায়। প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশের ধারণা, ছিনতাইকারীর হাতেই নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন সুভাষ। এর ঠিক আগের দিন বুধবার ভোরে রাজধানীর কমলাপুরে ছিনতাইকারীর হাতে নির্মম মৃত্যু হয় পরিচ্ছন্নতা কর্মী সুনিতা রানীর। রেলস্টেশনের পাশ দিয়ে রিকশাযোগে কর্মস্থল মুগদা বৌদ্ধ মন্দিরে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রতিদিনই প্রায় একই রাস্তা ধরে যাওয়া-আসা করতেন সুনিতা। ওপরের দুটি মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনা একটু বেশি হচ্ছে। তবে এর বাইরে প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই ঘটছে। ভুক্তভোগীরা থানায় অবহিত করেন না উল্টো পুলিশি ঝামেলার কথা চিন্তা করে। ২০ এপ্রিল রাতে ছিনতাইকারীর হাত থেকে রেহাই পাননি খোদ রিকশাওয়ালাও। অসুস্থ মায়ের ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করে গ্রামে স্ত্রীকে ‘বিকাশ’ করার জন্য মোবাইলে ১৫০০ টাকা রিচার্জ করেছিলেন আক্তার হোসেন। তবে কমলাপুর রেলগেটসংলগ্ন বিশ্বাস টাওয়ারের সামনে আসামাত্রই একটি মোটরসাইকেলে তিনজন আরোহী তার গতিরোধ করে। পেটে অস্ত্র ঠেকিয়ে তার মোবাইল ফোনটি নিয়ে বিকাশের পাসওয়ার্ড নিয়ে নেয়। ওই রাতেই পুলিশ সদর দফতরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে অবহিত করা হয়। সেখান থেকে তৎক্ষণাৎ সাড়া পেয়ে অন্য একজন পথচারীর সহায়তায় ‘৯৯৯’ কলের মাধ্যমে মতিঝিল থানাকে অবহিত করা হয়। তবে ওই রিকশাওয়ালা থানা পুলিশের লোক দেখানো সহায়তা ছাড়া আর কিছু পাননি। সারা রাত পিকআপ ভ্যানে বসিয়ে রেখে সব শেষে জিডি করার জন্য তার কাছে মিষ্টি খাওয়ার টাকা চাওয়া হয়। অবশেষে ভোরে নিরাশ হয়ে ফিরে যান হতভাগা রিকশাওয়ালা আক্তার।

গত রবিবার দিনদুপুরে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা মোড়ে ধারালো ছুরি দেখিয়ে জাহিদ হাসান নামে এক ব্যবসায়ীর টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গত ১৫ দিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের আরও অন্তত সাতটি ছিনতাই পুলিশি খাতায় উঠেছে। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিছু ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, আবার ঝামেলা এড়াতে কিছু ঘটনায় থানায়ও যাননি ভুক্তভোগীরা। এর বাইরে বাসাবাড়িতেও চুরি-ডাকাতি হচ্ছে। প্রায় দিনই হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঈদের আগে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা করে সতর্ক হয়ে রাজধানীর সব থানা এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ছায়া তদন্ত করে গোয়েন্দা পুলিশ। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার কারণে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। এরই মধ্যে করণীয় ঠিক করতে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। তবে আমাদের পরামর্শ থাকবে, বড় ধরনের আর্থিক ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে নগরবাসী যেন পুলিশের সহযোগিতা নেন।’ একই সঙ্গে গণপরিবহনে চলাফেরার ক্ষেত্রে অপরিচিতদের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। গত রবিবার যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা মোড়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন জাহিদ হাসান (৪০)। দিনদুপুরে দু-তিন জন ছিনতাইকারী তাকে ঘিরে ধরে মারধর করে। একপর্যায়ে তার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে চিৎকার শুনে কর্তব্যরত সার্জেন্ট পলাশ মজুমদার ও আশপাশে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে আসেন। ধরা পড়ে ছিনতাইকারী জাহিদ।

তবে ১৪ ফেব্রুয়ারি উত্তরা ৪ নম্বরের ৪ নম্বর সড়কে হেঁটে যাওয়ার সময় এক নারীর হাতব্যাগ ধরে টান দেয় চলন্ত প্রাইভেট কারে থাকা ছিনতাইকারী। ব্যাগ না ছাড়া পর্যন্ত বেশ কিছুদূর তাকে হিঁচড়ে নেওয়া হয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ভোরে ধানমন্ডিতে। ব্যাগ নিয়ে টানা হেঁচড়ার সময় ছিনতাইকারীর গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান বেসরকারি হাসপাতাল কর্মী হেলেনা বেগম। ২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভোরে দয়াগঞ্জ রেলব্রিজের নিচে ছিনতাইকারীর হেঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে মারা যায় এক শিশু। ২০১৬ সালের ২১ মে কাঁটাবনে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী প্রিয়াংকা দত্তের ব্যাগ ধরে টান দিলে রাস্তায় ছিটকে পড়ে মারা যান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘করোনার কারণে অনেকের অবস্থাই শোচনীয় হয়ে পড়েছে। অনেক মানুষই কর্মহীন হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে। এর অনেকেই নানা অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিকল্পনার মধ্যে এ বিষয়টি রাখতে হবে। এর বাইরে পেটি ক্রাইমের বিষয়টি তো থাকছেই।’

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল খায়রুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে দেশবাসীর নিরাপত্তার জন্য বরাবরের মতো বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে র‌্যাবের সব ব্যাটালিয়নকে। পোশাকে ও সাদা পোশাকে র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।’

পুলিশের পাশাপাশি একাধিক সংস্থার তথ্যানুযায়ী ডিএমপির আটটি ক্রাইম ডিভিশনের সব থানা এলাকায় অন্তত ৩৫৮টি ছিনতাই স্পট রয়েছে। প্রতি ঈদের আগে এসব এলাকায় ছিনতাই বেড়ে যায়। বিশেষ করে এসব এলাকায় রাতে ছিনতাই বেশি ঘটে। এর পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির তৎপরতা রয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালের আশপাশ এলাকায়। বাস, লঞ্চ ও রেলস্টেশন কেন্দ্রিকও রয়েছে এসব অপরাধীদের বিচরণ। এর বাইরে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মাথা ব্যথার বড় কারণ হয়ে উঠেছে বখে যাওয়া কিশোররা। সারা দেশে উঠতি কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। এরা এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে খুনসহ নানা অপরাধমূলক কাজে যখন তখন জড়িয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ কারণেই এরা মাঝেমধ্যে ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটিয়ে আতঙ্ক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে তৎপর রয়েছে পুলিশ। জরুরি প্রয়োজনে ‘৯৯৯’-এ কল করার পরামর্শ দেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর