শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ জুলাই, ২০২১ ২৩:৪৬

আত্মহত্যা নয় খুন

মির্জা মেহেদী তমাল

আত্মহত্যা নয় খুন
Google News

১২ বছরের কিশোরী সুরাইয়া খাতুন। ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না বাঁধা অবস্থায় সুরাইয়ার ঝুলন্ত লাশ মেলে এক সকালে। কিন্তু অতটুকু একটা মেয়ে কেন আত্মহত্যা করতে যাবে; এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার যেন শেষ ছিল না। তবে একটা সময় সবাই মেনে নেয়, সুরাইয়া আত্মহত্যাই করেছে। গত বছর ৩১ অক্টোবর লাশ উদ্ধারের পর এ ব্যাপারে গাজীপুরের কাশিমপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু লাশ উদ্ধারের ৯ মাস পর অপমৃত্যুর মামলাটি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর। সুরাইয়া আত্মহত্যা করেনি। তাকে শাসরোধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিবেদনে ধর্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ নড়েচড়ে বসে এমন ভয়ংকর তথ্য পাওয়ার পর। পুলিশ তদন্তে নামে।

চলতি বছরের ৩ জুলাই একই ঘটনায় এবার হত্যা মামলা হয় কাশিমপুর থানায়। দীর্ঘ তদন্তের পর কাশিমপুরের বারেন্ডা এলাকার বহুল আলোচিত কিশোরী সুমাইয়া খাতুন হত্যার রহস্য উদ্?ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেফতার করা হয় এ ঘটনায় জড়িত দুই যুবককে। গ্রেফতারের পর গত ১২ ও ১৩ জুলাই আদালতে হত্যাকান্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে দুই খুনি। কাশিমপুরের বারেন্ডা এলাকায় সুমাইয়াদের বাসার পাশেই ভাড়া থাকত রনি মিয়া। রনির বাসায় টাকার বিনিময়ে খাওয়া-দাওয়া করত মিলন, হাসান ও সাঈদ। তারা প্রত্যেকই শ্রমিক এবং ওই এলাকায় পাশাপাশি থাকত। রনির বন্ধু মিলনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সুমাইয়ার। সুমাইয়ার প্রতি আকৃষ্ট ছিল রনি ও সাঈদ। নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় রনি। একইভাবে ব্যর্থ হয় সাঈদও। এর মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নেওয়ার চিন্তা করেন সুমাইয়ার মা। গত বছরের নভেম্বরে  বাসার মালিককে জানিয়ে দেওয়া হয় এক মাস পরেই অন্যত্র চলে যাবেন তারা। সুমাইয়া চলে যাবে, তা জানার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে রনি ও সাঈদ। দুজন এক হয়ে শলাপরামর্শ করে। পরিকল্পনা করে তাকে ধর্ষণ করবে। পরিকল্পনা অনুসারেই ৩১ অক্টোবর সকালে যখন সুমাইয়ার মাসহ অন্যরা কর্মস্থলে তখনই ঘটে ঘটনা। সুমাইয়ার সঙ্গে বসে কথা বলছিল রনি ও সাঈদ। এর মধ্যেই হঠাৎ করে সুমাইয়াকে জাপটে ধরে। তার জামা খোলার চেষ্টা করে। সুমাইয়া বাধা দেয়। চিৎকার করতে চেষ্টা করে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বিছানায় শুইয়ে মুখে বালিশ চেপে ধরে রনি। বাধা হয় তার দুই হাত। পা ধরে রাখে সাঈদ। রনি ধর্ষণ করে সুমাইয়াকে। মোবাইল ফোনে সেই ভিডিওচিত্র ধারণ করে সাঈদ। রনির পর সুমাইয়াকে ধর্ষণ করে সাঈদ। সুমাইয়া তখন বলেছিল, ধর্ষণের ঘটনা সবাইকে জানিয়ে দেবে। মাকে নিয়ে থানায় যাবে। তারপরই আরও হিংস্র হয়ে ওঠে রনি ও সাঈদ। পরিকিল্পতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সুমাইয়াকে। তারপর নাটক সাজায় আত্মহত্যার। ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় তার লাশ।

সুমাইয়ার বাবা-মা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না তার মেয়ে কেন আত্মহত্যা করবে। বারবার এ বিষয়ে অভিযোগ করলেও আমলে নেয়নি কেউ। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ জানা ও ধর্ষণের আলামত পাওয়ার পরই হত্যা মামলা রেকর্ড করে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১২ জুলাই ভোরে টঙ্গী পশ্চিম থানার গাজীপুরা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় সাঈদ ইসলামকে। সাঈদ ইসলাম (১৯) নিলফামারী জেলার ডোমার থানার চিলাহাটী মাস্টারপাড়ার মৃত নবীর উদ্দিনের ছেলে। সাঈদকে গ্রেফতারের পরদিন ১৩ জুলাই রাত দেড়টায় গাইবান্ধা থেকে গ্রেফতার করা হয় রনিকে। রনি মিয়া (২১) লালমনিরহাটের তিস্তা চৌরাটারী গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে। নিহত সুমাইয়া যশোরের বাঘাপাড়া থানা এলাকার বাউলিয়া গ্রামের সোহেল রানা ও রুনা বেগমের সন্তান।

পিবিআই জানায়, শুরু থেকেই এ ঘটনায় পিবিআই গাজীপুর জেলায় ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে থানায় হত্যা মামলা রুজু হওয়ার পর স্বউদ্যোগে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে জড়িত দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।