Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ৩ অক্টোবর, ২০১৯ ১৩:০৬
আপডেট : ৩ অক্টোবর, ২০১৯ ১৪:১৮

অল্পে গল্পে শারদীয় দুর্গোৎসব!

রীতা রায় মিঠু

অল্পে গল্পে শারদীয় দুর্গোৎসব!

এসে গেলো দুর্গাপূজা, বাঙালির প্রাণের উৎসব, সার্বজনীন উৎসব।  দুর্গাপূজা সমগ্র হিন্দুসমাজেই প্রচলিত। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। 

আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। তবে শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি।

হিন্দু পুরাণে যুগ চারটি। সত্য যুগ, ত্রেতা যুগ, দ্বাপর যুগ, কলি যুগ।  সব যুগেই হিন্দুরা বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন দেব দেবীর পূজো করে এসেছে। দুর্গাপূজাও অনুষ্ঠিত হতো তবে  বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন নামে  দুর্গা দেবীর পূজা হতো। ত্রেতাযুগ বা রামায়ণ যুগের পূর্বে অর্থাৎ সত্যযুগে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো বসন্ত ঋতুতে, বলা হতো বাসন্তী পূজা। 

ত্রেতাযুগে্ শ্রীরাম সর্ব প্রথম শরৎকালে দুর্গাপূজা করেন। শারদীয়া দুর্গাপূজাকে "অকালবোধন" বলা হয়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল।

হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাঁদের পূজা করার যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় "অকালবোধন"। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। 

কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। তবে রামায়ণের প্রকৃত রচয়িতা বাল্মিকী মুনি রামায়ণে রামচন্দ্রকৃত দুর্গাপূজার কোনো উল্লেখ করেননি। উপরন্তু রামায়ণের অন্যান্য অনুবাদেও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তবে এই প্রচলিত তথ্য অনুসারে স্মৃতিশাস্ত্রসমূহে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে।

বাল্মীকির রামায়ণে রামের দুর্গাপূজার কোনো বিবরণ নেই। কিন্তু রামায়ণের পদ্যানুবাদ করার সময় কৃত্তিবাস ওঝা কালিকাপুরাণ ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এর কাহিনি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে সংযোজিত করেছেন। 

কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুসারে, লঙ্কার রাজা দশানন রাবণ শ্রীরামের স্ত্রী সীতাদেবীকে হরণ করে নিজের রাজ্যে বন্দী করে রাখেন। রাক্ষসরাজার হাতে বন্দিনী সীতাকে উদ্ধার করতে শ্রীরাম যাত্রা করেন লঙ্কাভিমুখে। 

বিশাল সমুদ্রের কাছে এসে তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন, সমুদ্র পার হওয়ার কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে ভীষণ মুষড়ে পড়েন। সমুদ্র কিভাবে ডিঙ্গানো যায় সেই দুঃশ্চিন্তা, দুর্ভাবনায় অস্থির রামকে 'সমুদ্র দেবতা' স্বপ্নে দেখা দেন। স্বপ্নেই সমুদ্র দেবতা দেবী মহামায়ার পূজা করার জন্য শ্রীরামকে অনুরোধ করেন।

রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। শিব তাঁকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের স্ত্রী দুর্গার পূজা করে তাঁকে তুষ্ট করতে। তাতে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজসাধ্য হবে। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম শরৎকালে দুর্গার বোধন, চণ্ডীপাঠ ও মহাপূজার আয়োজন করেন। 

আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন রাম কল্পারম্ভ করেন, সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন। দুর্গা মা দেখা দেন না। 

হাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও দুর্গার আবির্ভাব হলো না। দিশেহারা রাম ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। হনুমান তাঁকে ১০৮টি নীলপদ্ম জোগাড় করে দেন। দেবী দুর্গার প্রতি রামের ভক্তি পরীক্ষা করার জন্য দেবী নিজেই ১০৮ পদ্মের গোছা থেকে একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখেন।

রাম পূজোয় বসে পদ্ম গুনে দেখেন, একটি কম। আবার গোনেন, একটি পদ্ম কম। ১০৭ পদ্মে দুর্গা পূজা সম্পন্ন হবে না, এদিকে পূজার লগ্ন পেরিয়ে যায়। যথাসময়ে দুর্গাপূজা সম্পন্ন করে দেবী তুষ্ট করতে না পারলে সমুদ্র পার হওয়া যাবেনা, সীতাকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
একটিমাত্র নীলপদ্মের জন্য দেবী মহামায়ার পূজা হবেনা, তাই কি হয়? অথচ কোথাও খুঁজেও আরেকটি নীলপদ্ম পাওয়া গেলো না। 
রামের চোখের রঙ ছিল নীল। 

সিদ্ধান্ত নিতে দেরী হলোনা। পূজোর লগন পেরিয়ে যাওয়ার আগেই রাম ১০৮তম নীলপদ্মের বদলে নিজের একটি চোখ উপড়ে ফেলতে উদ্যত হন, তখনই দেবী দুর্গা পূজোস্থলে আবির্ভূত হয়ে রামচন্দ্রকে চোখ দান করা থেকে বিরত করেন। 

দেবীর প্রতি ভক্তের এহেন ভক্তি দেখে দেবী দুর্গা প্রীত হন, রামচন্দ্রের পূজায় তুষ্ট হয়ে তাঁকে কাঙ্ক্ষিত বর দেন।

শ্রীরামচন্দ্র দেবী বর লাভ করে সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় পৌঁছেছিলেন। সেখানে রাক্ষসরাজ রাবণের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। 'রাম-রাবণ' যুদ্ধে রামচন্দ্র দিগবিজয়ী রাবণরাজকে পরাস্ত করেন। সত্য ধর্মের জয় হয়, স্ত্রী সীতাকে রাবণরাজের বন্দীশালা থেকে মুক্ত করেন।

আরও অনেক পরে,  ত্রেতা যুগ দ্বাপর যুগ পেরিয়ে 'কলিযুগে' আরেকবার দুর্গাপূজা উদযাপিত হয় শরৎকালে। সুরেশ বৈদ্য নামের এক বণিকের সপ্তডিঙ্গা নদীতে ডুবে যায়।  

বাণিজ্যে সমস্ত সম্পত্তি হারিয়ে সুরেশ বৈদ্য উদভ্রান্তের মত ঘোরাঘুরি করেন, পথিমধ্যে রাজ্যহারা আরেক রাজার সাথে বণিক সুরেশ বৈ্দ্য মহাশয়ের সাক্ষাৎ হয় এবং দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়।

রাজ্যহারা, সম্পত্তিহারা দুই অসহায় বন্ধু পথে পথে ঘোরেন, পথে এক মুনিঋষির সাক্ষাৎ পান। সেই ঋষি দুই ভাগ্যহীনকে 'শ্রী রামচন্দ্রের' 'অকালবোধন' পূজার গল্প শোনান, এবং  দেবী দুর্গার পূজা করতে বলেন। 

সময়টাও ছিল শরৎকাল। রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার কাহিনী শুনে দুই ভাগ্যহারা অনুপ্রাণিত হন, দুজনে মিলে দেবী দুর্গার পূজা করেন। 

পূজায় দেবী সন্তুষ্ট হন, তাঁদের হারানো সম্পদ আবার তাঁরা ফিরে পান। সেই থেকে 'দুর্গাপূজা' উদযাপিত হয় শরৎকালে। এর নাম হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। 

পাঁচদিন ব্যাপি দুর্গা পূজা শুরু হয় মহাষষ্ঠীতে বোধনের মাধ্যমে, এরপর মহাসপ্তমী, মহা অষ্টমী মহানবমী এবং দশমীতে দেবী বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে পূজোর সমাপ্তি হয়। 

বাঙালি হিন্দু সমাজে শারদীয় দুর্গোৎসবই একমাত্র উৎসব যা সার্বজনীন সামাজিক উৎসব হিসেবে আবহমানকাল ধরে বাঙালির হৃদয়ে স্থান পেয়েছে। 

সার্বজনীন উৎসব বলেই দুর্গাপূজোতে ধনী দরিদ্র, হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃষ্টানে কোন ভেদাভেদ থাকেনা, উৎসব আনন্দে সকলে মিলিত হয়।

এবছর দেবী দুর্গা ঘোটকে চড়ে মর্ত্যে আসিবেন, সঙ্গে থাকবে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ। দেবী দুর্গা তার চার ছেলেমেয়ের যেমনি মা, আমাদের সকলের মা। মা দয়াময়ী, মা জগজ্জননী। মায়ের কাছে সন্তানের কোন অপরাধ থাকে না। দেবী দুর্গা মা নিশ্চয়ই আমাদের সকল অপরাধ মার্জনা করে আমাদেরকে উনার স্নেহে মমতায় ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করিবেন।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য