শিরোনাম
প্রকাশ : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৭:৫২
প্রিন্ট করুন printer

আহমদ আখতারের বিদায়

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

আহমদ আখতারের বিদায়
আহমদ আখতার

আহমদ আখতার আর নেই। নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে পরলোকে গমন করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কবি ফররুখ আহমদের পুত্র হিসেবেই আহমদ আখতার বেশি পরিচিত ছিলেন। আহমদ আখতার তার কলমী নাম। আসল না সম্ভবত মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। আসল নামে তাকে খুব কম লোকই জানত। তিনি সাংবাদিকতা করতেন ও কবিতা লিখতেন। তার কবিতা আমার পড়া হয়নি। দেশের দুটি জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রায় ২২ বছর তিনি আমার সহকর্মী ছিলেন। কিছুদিন থেকেই তার অসুস্থতার কথা শুনছিলাম। আশা করছিলাম তিনি সেরে উঠবেন। আমার আশায় কিছু যায় আসে না। আল্লাহর ইচ্ছাই চিরন্তন।

আহমদ আখতার ব্যক্তি হিসেবে সজ্জন ছিলেন। প্রায় সবসময় তাকে বিষন্ন ও চিন্তাযুক্ত দেখে আমার মনে হতো জীবন সম্পর্কে তিনি উন্নাসিক বা অন্তর্মুখী অথবা জীবন বিমুখ। কোনোকিছুতে আন্তরিকতা ছিল বলে মনে হতো না। সে জন্য কর্মক্ষেত্রে আমার অবস্থানগত কারণে ছোটখাট পেশাগত ভুলত্রুটি শুধরে দিতে দু’একবার তাকে ভৎর্সনাও করতে হয়েছে। পরে কাছে ডেকে দু:খ প্রকাশ করেছি, যাতে তিনি কিছু মনে না করেন। তিনি সবসময় মাথা নিচু করে থাকতেন। বিনয়ের সাথে কথা বলতেন। কেউ তাকে হাসতে বা উচু কণ্ঠে কথা বলতে শুনেছে বলে আমার মনে হয় না। তার পিতা ফররুখ আহমদকে আমি কখনো দেখিনি। তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রায় সবগুলোই পড়েছি এবং আমার সংগ্রহেও তাঁর বেশকিছু কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। তাঁর কাহিনি কাব্য “হাতেম তায়ী” আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত এবং একাধিকবার পড়ার পরও মনে হতো আরেকবার পড়ব।


১৯৮১ সালে আহমদ আখতারের বয়স কত ছিল? ১৯ বা ২০ বছর। সাধারণভাবে চাকুরি করার বয়স নয়। ওই বয়সে বাংলাদেশে গ্রাজুয়েশনই শেষ হয় না। আহমদ আখতার সাব-এডিটর হিসেবে দৈনিক সংগ্রামে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরিবারের নিশ্চয়ই আর্থিক চাপ ছিল। কবি ফররুখ আহমদ তাঁর শেষ জীবনে আর্থিক কষ্টে ছিলেন। ১৯৭৪ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ওই বছরই কবি ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফররুখ প্রেমিক বেশ ক’জন ছাত্র কবিকে আর্থিক সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তাঁর স্মরণে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। তাতে ফররুখ আহমদের বেশ কিছু নির্বাচিত কবিতা স্থান পায়। আমি এ উদ্যোগের কেউ ছিলাম না। ইংরেজি বিভাগে একজন সিনিয়র ছাত্র ফাওজুল কবীর (বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব) ছিলেন এ উদ্যোগের প্রধান। আমার সহপাঠি ও রুমমেট আবু তাহেরও ছিলেন। অনেক সময় আমাদের রুমে উদ্যোক্তারা মিলিত হয়ে তাদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন। যথাসময়ে কাব্য সংকলন প্রকাশিত হলো এবং ‘পুশ সেল’ করে বেশ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। টাকাগুলো কবি পরিবারের কাছে দেয়ার জন্য একদিন তাহের ভাই আমাকে নিয়ে গেলেন। কবি পরিবার তখনো ইস্কাটনের সরকারি কোয়ার্টারেই ছিল। কবির দ্বিতীয় পুত্র মঞ্জুরুল ইসলাম পরিবারের পক্ষে টাকা গ্রহণ করলেন। জানতে পারলাম মঞ্জুরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ব্যাচেই কমার্স ফ্যাকাল্টির ছাত্র। সেদিন আহমদ আখতার বা আর কারও সাথে দেখা হয়নি। একাশি সালে আহমদ আখতার সংগ্রামে যোগ দেয়ার পর তাদের বাসায় যাওয়ার কথা বলেছিলাম।


১৯৭৭ সালে ঢাকা ডাইজেস্ট কবি ফররুখ আহমদ স্মরণে তাঁর ওপর একটি কভার স্টোরি করার পরিকল্পনা করে। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ফররুখ আহমদ সম্পর্কে দেশের বিশিষ্ট কবিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের। আমি কবি আল মাহমুদ, মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, আহসান হাবীব, হাসান হাফিজুর রহমান ও আবুদল মান্নান সৈয়দের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তাদের ভালো ও মন্দ দু’ধরনের বক্তব্যই ছিল। কেউ বলেছেন, যারা প্রথম জীবনে কমিউনিষ্ট থাকে, তারা যদি আদর্শ বদলে ধর্মের দিকে ফেরেন, তাহলে তাল সামলাতে পারেন না। কবি ফররুখ আহমদেরও তাই হয়েছিল। তিনি নিজেকে একঘরে করে ফেলেছেন। কেউ বলেছেন, ইসলাম তাঁর মধ্যে শুরু থেকেই ছিল, যার স্ফুরণ ঘটেছে বিলম্বে। শামসুর রাহমানের সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা থাকলেও তিনি আমাকে কয়েকদিন ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকার দেননি। আমার এই অভিজ্ঞতার কথাও আখতারকে বলেছি।


আমার দৈনিক সংগ্রামে থাকাকালেই সম্ভবত ১৯৯১ বা ৯২ সালের কোনো একদিন আমরা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ইউনিট সভা করছিলাম। করিডোরে হঠাৎ নারীকণ্ঠে প্রচণ্ড কান্নাকাটির শব্দ শোনা গেল। সম্ভবত কণ্ঠ শুনেই আহমদ আখতার সভা থেকে উঠল। আরও কয়েকজন তার সাথে এগিয়ে গেল। একটু পর একজন ফিরে এসে জানাল, মেয়েটি আহমদ আখতারের স্ত্রী। তাদের ছোট্ট সন্তান মারা গেছে। তার স্ত্রী দিশেহারা হয়ে অফিসে চলে এসেছেন। আখতার সম্ভবত তখন রামপুরায় থাকত। সভা স্থগিত রেখে আখতারের সহযোগিতায় যেতে হয়। এধরনের একটি ঘটনায় আখতারের স্ত্রীর অফিসে ছুটে আসার ঘটনা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। তার প্রতিবেশীদের কেউ খবরটি দেয়ার জন্য অফিসে আসতে পারত বা ফোনে জানাতে পারত। পরদিনই আখতার অফিসে এসেছেন। আহমদ আখতার ভাবলেশহীন। সন্তান হারানোর বেদনার কোনো ছাপ ছিল না তার চেহারায়।

১৯৮৩ সালে আমি জার্মান সরকারের একটি বৃত্তি লাভ করে তিন মাসের এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার জন্য বার্লিন যাই। সেখানে অবস্থানকালে বেশ ক’জন বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়েছিল। বার্লিন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের এক পাকিস্তানি ছাত্র আজফার আলী খান একদিন বললেন যে, বাংলাদেশের এক মশহুর শায়েরের ছেলে বার্লিনে থাকেন। তার সাথে পরিচয় আছে। তার নাম মাসুদ। তবে শায়েরের নাম বলতে পারেননি তিনি। জেনে আমাকে জানাবেন বললেও এক রবিবার শায়েরের পুত্রকে বার্লিনের ক্রুয়েজবার্গে আমার হোস্টেল ‘কলপিং হাউজে’ নিয়ে এলেন। ফররুখ আহমদের বড় ছেলে। তাকে বললাম, আপনি এখানে আছেন। অথচ আহমদ আখতার আমাকে বলেনি। তিনি বললেন, আখতার একটু খামখেয়ালী ধরনের। কোনোকিছুতে সিরিয়াস নয়। তিনি নিজেও পরিবারের সাথে তেমন যোগাযোগ রাখেন না। তিনি জানালেন যে, তিনি আর বেশিদিন বার্লিনে থাকবেন না। কিছুদিনের মধ্যেই ইংল্যাণ্ডে চলে যাবেন। সেখানে ড. সৈয়দ আলী আশরাফের (দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা) প্রতিষ্ঠানে তার একটি চাকরি হয়েছে। আরেকদিন তার সাথে দেখা হয়েছিল। মাসখানেক পর একদিন ফোনে বললেন যে, তিনি পরদিনই ইংল্যাণ্ড চলে যাচ্ছেন। বার্লিনের প্রোগ্রাম শেষ করে দেশে ফেরার আগে আমার লণ্ডন যাওয়ার কথা। তাকে বললাম আমি লন্ডনে গিয়ে আপনার সাথে যোগাযোগ করব। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আমি লন্ডনে গিয়ে তার সাথে ফোনে কথা বলি। সৈয়দ আলী আশরাফের প্রতিষ্ঠান লণ্ডন থেকে বেশ দূরে। তিনি আমন্ত্রণ জানালেও আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ আমার লন্ডন অবস্থান ছিল মাত্র আট দিনের জন্য।

দেশে ফিরে আহমদ আখতারকে তার ভাইয়ের কথা বলার পর তিনিও বললেন যে, ভাইয়ের সাথে তাদের তেমন যোগাযোগ নেই। সে জন্য আমাকে ভাইয়ের বার্লিনে অবস্থান করার জানায়নি। এর কয়েক মাস পর আখতার খবর দিল তার ভাই আত্মহত্যা করেছেন। শুনে স্তব্ধ হয়েছি, দু:খ পেয়েছি। আখতারের দ্বিতীয় ভাই মঞ্জুরুল পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশ বেতারে যোগ দিয়েছিল বলে শুনেছিলাম। হঠাৎ একদিন তাকে রাস্তায় দেখলাম একটি ছেঁড়া প্যান্ট, গেঞ্জি গায়ে, খালি পায়ে হেঁটে যেতে। মাথার চুল এলোমেলো, হাঁটছে। কোনোদিকে মনোযোগ নেই। যতক্ষণ দেখা যায় আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এ সম্পর্কে আহমদ আখতারকে কিছু বলিনি। কবি পরিবারের সাথে ঘনিষ্ট এমন দু’একজনের কাছে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হই যে মঞ্জুরুল বেশ কিছুদিন থেকে মানসিক রোগগ্রস্ত। রেডিওর চাকরি নেই অনেকদিন আগে থেকেই। উন্নত চিকিৎসা করানোর সামর্থ পরিবারের ছিল না। বাসায় রেখে যা চিকিৎসা করানো তা করা হয়েছে। কিন্তু সারাক্ষণ বাসায় আটকে রাখা সম্ভব হতো না। কিছুদিন পর জানতে পারি মঞ্জুরুল মারা গেছে।

২০০২ সালে আহমদ আখতার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বাংলা বিভাগে সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দেয়। তার যোগ দেয়ার কিছুদিন আগেই আমি বাসস এর সেন্ট্রাল ডেস্কে নিউজ এডিটর হিসেবে যোগ দিয়েছি। পুরোনো একজন সহকর্মীকে আবারও একই প্রতিষ্ঠানে পেয়ে ভালো লেগেছে। কিন্তু তার সাথে খুব একটা দেখা হতো না। আমি দোতলায় ইংরেজি বিভাগে বসতাম, বাংলা বিভাগ ছিল তিন তলায়। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছর পর্যন্ত বিএনপি আমলে বাসসে যোগদানকারী সাংবাদিকরা বহাল ছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বাসস এর নতুন প্রশাসন ছাঁটাই শুরু করে। প্রথমে অনেককে ডেকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। আহমদ আখতার নিতান্তই ভদ্রলোক। সে পদত্যাগ করে। আমি জানতে পারি তিনি চলে যাওয়ার পর। এরপর তার সাথে আমার আর দেখা হয়নি। আহমদ আখতার নিজের সমস্যা কাউকে খুলে বলার মতো লোক ছিলেন না। তার শারীরিক সমস্যাও হয়তো দীর্ঘদিন পর্যন্ত সবার অজানা ছিল। যখন জানতে পেরেছেন তারা সাধ্যমতো সহায়তা করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পৃথিবীতে আগমন ও প্রস্থানের সিদ্ধান্ত যেহেতু একমাত্র আল্লাহর, অতএব তাঁর সিদ্ধান্তেই আহমদ আখতারকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে। আমি তাঁর পরকালীন শান্তি কামনা করি।

বিডি-প্রতিদিন/ সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৯:০০
প্রিন্ট করুন printer

যে কারণে আমি নিউইয়র্কে'র 'দেশ' পত্রিকায় লেখিনি

সালেম সুলেরী

যে কারণে আমি নিউইয়র্কে'র 'দেশ' পত্রিকায় লেখিনি
সালেম সুলেরী

বিশ্বের রাজধানীখ্যাত নিউইয়র্ক থেকে বের হলো নতুন কাগজ। চকচকে নতুন একটি সাপ্তাহিক- 'দেশ'। এর উদ্যোক্তারা আমার একান্ত ঘনিষ্ঠ, সুহৃদ। অধিকাংশজন ছিলেন প্রবাসের প্রধান কাগজ 'ঠিকানা'য়।  আমিও একদা 'বিশেষ সংবাদদাতা' রূপে নিয়োগপত্র পেয়েছিলাম। দশক দশক সেই পর্যন্তই আছি অনিয়মিতরূপে। 

নিউইয়র্কে 'ঠিকানা' বের হয় প্রতি বুধবার। সাপ্তাহিক দেশ'-এর প্রকাশবারও ঐ বুধবার। উদ্যোক্তাদের বলেছিলাম- এই ঠোকাঠুকি কেনো? উত্তর দিয়েছিলেন উদ্যোক্তা মনজুর হোসেন। তিনি সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি। ঠিকানা'র সর্বশেষ পরিচালক, বাণিজ্য ছিলেন। তিনি বললেন, ডাকযোগে পাঠালে শুক্রবার অন্য রাজ্যে পৌঁছায়। শনি-রবি ছুটিবার মানুষ মন-মজিয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া সোম-মঙ্গল কাজ সেরে রাতেই ছাপানো। বুধ-বৃহস্পতি-শুক্র বাজারজাতকরণ। বাণিজ্যিক বিকাশের জন্যে বুধবার প্রকাশনার বিকল্প নেই। 

মনে মনে 'ঠিকানা' এর ৩২ বছরের পুরনো উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কারণ ৩২ বছর আগেই ওনারা বুধবারের উপযোগিতা বুঝেছিলেন। একটি স্মৃতি বারবার চলকে ওঠে। ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে সম্ভাব্য সম্পাদক এম এম শাহীন বাংলাদেশে এলেন। ঢাকায় 'হোটেল প্রীতম' থেকে আমাকে ফোন দিলেন। আমি তখন সর্বাধিক প্রচারিত সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের নির্বাহী সম্পাদক। তিনি বললেন, নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা এসেছি জরুরী কাজে। একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করবো আমরা। নির্বাহী সম্পাদক কৌশিক আহমেদ একটি চিঠি দিয়েছেন। সেটি নিয়ে আপনার সঙ্গে মতবিনিময় করতে চাই। 

সেই যে এলেন, হৃদয়ের গহীনেই থেকে গেলেন। নিউইয়র্ক থেকে ঠিকানা বের হলো ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। প্রায় দশ বছর পর মনজুরকে দেখি ঢাকাতেই। শাহীন সাহেবের 'কাজিন ব্রাদার' হিসেবে। নিউইয়র্কে  ঠিকানা'য় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ করে। ঢাকায় জমায়েত হয়েছে বিবাহ উপলক্ষে। বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নম্বর-সংলগ্ন 'সন্তুর' রেস্টুরেন্টে। শাহীন সাহেবের মহান মাতা প্রিয় শ্রদ্ধেয় খালাম্মাও ছিলেন। সেই থেকে অনুজ মনজুর সর্বদা আমার সুপ্রিয়জন। 

মনজুরে'র শেষ ফোনটি পেলাম ২৩ ফেব্রুয়ারি'২১ সন্ধ্যায়। প্রকাশনা-প্রস্তুতিকালে অনেকবারই কথা হয়েছে। মনজুর জানালেন, কাজ প্রায় শেষ। 'সাপ্তাহিক দেশ' উদ্বোধনী সংখ্যা প্রেসে পাঠাচ্ছি। প্রায় ৩০০ পাতার আয়োজন, প্রবাসে রেকর্ড। ২০০৭ সালে ঠিকানা করেছিলো ২৪০ পৃষ্ঠা। আমাদের 'দেশ'-এ প্রায় সব লেখাই নতুন। কোনরকম 'কাট এন্ড পেস্ট' না। প্রতিউত্তরে বললাম, অনেক অনেক শুভকামনা। 

না, এমন এক বিশাল বপুর আয়োজনে আমার লেখা নেই। আগেই বলেছিলাম- থাকবে না। যুক্টিটি পূর্বে জানিয়ে দিয়েছিলামও। কারণ পত্রিকার নামটি মৌলিক নয়। সংবাদপত্র বা মিডিয়া একটি সৃষ্টিপ্রধান প্রতিষ্ঠান। এটি কেনো পুরনো বা নকল নাম ধারণ করবে? প্রথমত 'দেশ' শিল্প-সাহিত্যের অতীব পুরনো কাগজ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যে লালিত। সারা পৃথিবীতেই এর প্রচার প্রসার। আশির দশকে আমরা এর আঙিনায় ঠাঁই নেই। গল্প-কবিতা-সাহিত্য সমালোচনা- সবটাতেই কলমচারণা। 

পাঠের শুরু মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের শরণার্থীকাল শৈশবে। ১৯৮৫-তে 'দেশ' কার্যালয়ে আমাদের প্রবেশ শুরু। ইত্তেফাক'র 'রোববার'-খ্যাত ফটোসাংবাদিক বাতেন সিরাজসহ। 'কবির লড়াই' প্রচ্ছদের তিন কুশীলবকে একযোগে প্রাপ্তি। সুনীল গাঙ্গুলী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। তখন থেকেই সুসম্পর্ক সম্পাদক সাগরময় ঘোষের সঙ্গেও। কী বিশাল ভাবমূর্তির মানুষটির গোপন আকুলতা ভুলিনি। বলতেন, যে মাটিতে জন্মেছি তাতে তোমাদের বসবাস। কলকাতা এলেই দ্বিধাহীনভাবে চলে আসবে। তোমাদের নৈকট্য মানে জন্মমাটির গন্ধ, স্মৃতিপেলবতা। 'দেশ' নামটির ভেতর হারানো বাংলাদেশকেই খুঁজে ফিরি। 

সেই 'দেশ' নামটিই কি নিউইয়র্কে চুরি হয়ে গেলো! না, মহান মাতৃভাষার মাসে আমি তাতে লিখতে পারিনি। হাজার লেখক এমন নৈতিকতার রোগে ভোগেন না। আমি আমার নীতিমালা নিয়ে একটু নিভৃতেই থাকি। সরকারি দলের পক্ষে থাকলে সরকারি পদক জোটে। শীর্ষ পর্যায় থেকে হাতছানি দেয় প্রলোভন। আমি বলি আমরা অস্তিত্ববাদী জ্যা পল সার্ত্রের ভক্ত। ১৯৬৪-তে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানান। বলেছিলেন- ওটা আমার কাছে এক বস্তা আলুর সমান। 

উল্লেখ্য, একটি প্রামাণ্য ইতিহাস আজ তুলে ধরি। দেশ-সম্পাদক সাগরময় ঘোষ ঢাকার একটি কাগজকেই সাক্ষাকার দিয়েছিলেন। সেটি আমার সম্পাদিত সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে', ১৯৮৯ তে। নিয়েছিলো বর্তমানে 'এটিএন'-এ কর্মরত সুসাংবাদিক শহিদুল আজম। রাশভারী সাগরদা'র জন্ম বাংলাদেশের মেঘনা-সংলগ্ন চাঁদপুরে। পিতা কালীমোহন ঘোষের হাত ধরে চলে যান শান্তিনিকেতন। সেখানে, কলকাতায় লেখাপড়া, বিপ্লব, জেল খাটা। অতঃপর আনন্দবাজার গ্রুপে 'দেশ'-এ যোগদান। সম্পাদক ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। পরকালে চলে গেলেন ১৯৯৯-এর ১৯ ফেব্রুয়ারি। ওনার বিদেহী আত্মা যেন আমাদের সাহিত্যজীবন পাহারা দিচ্ছে। 

আমি নবম শ্রেণীতে মফস্বল সাংবাদিকতা শুরু করি। থানা প্রতিনিধি ছিলাম সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী'র। আর সত্তর দশকের 'দৈনিক দেশ'-এর। দু'টি কাগজ দু'টি প্রধান রাজনৈতিক ধারায় বিভাজিত। একসঙ্গেই কাজ করেছি নিরপেক্ষতার পতাকা উড়িয়ে। আশির দশকে ঢাকার পূর্ণ-পেশাজীবনে মিডিয়াসরব ছিলাম। কিন্তু 'দেশ' নামাঙ্কিত কোন মিডিয়ায় নয়। 

প্রবাসের 'দেশ' পত্রিকাটির সাফল্য কামনা করি। যদিও নামের কারণে জন্মকালে আমাকে নাড়াতে পারেনি। কর্ম দিয়ে ভবিষ্যতে নাড়াবে আশাকরি। সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যভাষায় তখন বলতে চাই-
তারে আমি কই জাদুকর, যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর!  

 

বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ সিফাত


আপনার মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০১:৩৫
প্রিন্ট করুন printer

মকসুদ ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

মকসুদ ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না
সৈয়দ আবুল মকসুদ

মকসুদ ভাই চলে গেলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) আমি প্রায় ছয় বছর তার জুনিয়র সহকর্মী ছিলাম। ১৯৮৩ সালে আমি তাকে জানতাম না। বাংলাদেশে আমি তার নামের সঙ্গেও পরিচিত ছিলাম না। তার নামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে দেশ থেকে বহুদূরে ওই সময়ের প্রাচীর ঘেরা জার্মান সিটি পশ্চিম বার্লিনে। 

সাংবাদিকতার ওপর তিন মাসের এক কর্মসূচিতে বার্লিনের 'ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর জার্নালিজম'-এ যাই ১৯৮৩ সালের জুন মাসে। বাংলাদেশ থেকে আমার সঙ্গে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন অধূনালুপ্ত বাংলাদেশ টাইমস এর সাব-এডিটর আনোয়ারা বেগম। তিন মাসের জন্য আমাদের আবাস ছিল ইন্সটিটিউট থেকে একটু দূরে বার্লিনের ক্রুয়েজবার্গ এলাকায় ‘কলপিং হাউজে’। দূর বলে লাঞ্চের বিরতির সময় হোস্টেলে ফেরা হতো না। কিছু খেয়ে পাশেই কুরফুরস্ট্যানডাম এলাকার শপিং মলগুলোতে ঘুরতাম, কখনো ইন্সটিটিউটের লাউঞ্জে বসে টিভি দেখতাম বা আমাদের সতীর্থ আফ্রিকানদের সঙ্গে কথা বলতাম। 

বইয়ে ঠাসা কয়েকটি বুক শেলফ ছিল। জার্মান ও ইংরেজি ভাষার বই। মাঝে মাঝে বই ঘাটি। মোটামোটা বইয়ের সারির ফাঁকে ছোট বই নজরে পড়ার কথা নয়। কিন্তু বইটির বাঁধাই দৃষ্টিনন্দন নয় বলেই হয়তো চোখে পড়েছে। টেনে নিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বইটি বাংলায়। লেখকের নাম হিসেবে লেখা আছে ‘সৈয়দ আবুল মকসুদ’। পড়তে শুরু করলাম। 

তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) কাজ করেন। আমি বার্লিনের ওই ইন্সটিটিউটে যাওয়ার পাঁচ-ছয় বছর আগে তিনি এবং দৈনিক ইত্তেফাকের রাহাত খান এক সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ জার্মানিতে তার অবস্থানের ওপর ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন। সেই প্রথম তার নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। আমি আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি একটু দুঃখ বোধ করি। কারণ, আমার ইচ্ছা ছিল জার্মানি থেকে দেশে ফিরে একটি ভ্রমণ কাহিনি লেখার। 

কলেজে থাকাকালে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র’, ‘বেদুইনের দেশে’, এবং প্রফেসব আবদুল হাই এর ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ' দিন’ পড়ার পর মনে হতো কখনো বিদেশে গেলে এ ধরনের একটি বই লিখবো। কিন্তু মকসুদ ভাইয়ের কারণে আমার জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের ওপর আমার কোনোকিছু লেখা হয়নি। 

দেশে ফিরেও মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। বাসস এর সব রিপোর্টারের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্টতা থাকলেও মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় বার্লিন থেকে ফিরে আসার ১৯ বছর পর ২০০২ সালে আমি বাসস এ যোগ দেয়ার পর। তিনি বাসস এর ইংরেজি বিভাগে তিনি সিনিয়র নিউজ এডিটর, আমি ইংরেজি বিভাগে যোগ দেই জুনিয়র নিউজ এডিটর হিসেবে। 

বাসস এর আগে আমি কখনো ইংরেজি সাংবাদিকতা করিনি। সেজন্য প্রথম কয়েকটি মাস একটু দ্বিধার মধ্যে ছিলাম। সেখানকার পুরনো দু’একজন যারা জানতেন যে আমি বরাবর বাংলা সংবাদপত্রে কাজ করেছি, তারা আমার প্রতি একটু অবজ্ঞার ভাবও প্রকাশ করেন। কিন্তু  সৈয়দ আবুল মকসুদ কখনো তা করেননি। আমরা যদি এক শিফটে থাকতাম, তাহলে তিনি সহায়তা করতেন এবং আমাকে প্রথম কয়েকটি মাস সতর্কতার কাজ করে সকলের প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেন। তার পরামর্শ মেনে আমি উপকৃত হয়েছি এবং সম্ভবত বাসস এ কমবেশি সবার প্রিয়পাত্রই ছিলাম। 

সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদও সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন। কেউ তাকে হাসিমুখে ছাড়া কথা বলতে দেখেনি। তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। সবসময় মৃদুভাষী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালালে মকসুদ ভাই এ হামলার প্রতিবাদে পাশ্চাত্যের পোশাক বর্জন করে হজ্ব পালনকারীদের ইহরাম বাঁধার মতো দুই প্রস্থ শ্বেত বস্ত্র ধারণ করেন। তখন থেকে এ পোশাকই তার প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠেছিল। 

বাসস এ কাজ করার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তার লেখায় সরকারের বিভিন্ন গণবিরোধী কাজের যথেষ্ট সমালোচনা থাকতো। সাংবাদিক নেতা আমানুল্লাহ কবীর যতোদিন বাসস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি নিউজরুমের মাঝ দিয়ে তার রুমে আসা-যাওয়ার সময়ে মকসুদ ভাইকে দেখলে, ‘মকসুদ ভাই, আমাদের সরকার কী এতো খারাপ!’ অথবা ‘একটু রয়ে সয়ে লিখুন, মকসুদ ভাই,’ এ ধরনের কথা বলতেন। এর বেশি কিছু নয়। 

আমানুল্লাহ কবীরের পর বিএনপি সরকার বাসস এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলেন গাজীউল হাসান খানকে। বিএনপি সরকারের বেনিফিশিয়ারি হিসেবে এর আগে তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিষ্টার ছিলেন। গাজীউল হাসান খান মারদাঙ্গা গোছের মানুষ। তিনি যোগ দিয়ে প্রায় একতরফাভাবে ও অনেক ক্ষেত্রে বিধি বহির্ভূতভাবে নিজের সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করে কাকে কী করা যায়, অর্থাৎ কাকে সুযোগ দেয়া যায় ও কাকে সাইজ করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেন। আমাকেও যে সুযোগ দিয়েছেন তা অস্বীকার করবো না। 

তিনি সব সিনিয়র নিউজ এডিটরদের ডিঙিয়ে আমাকে ‘ডেপুটি চিফ নিউজ এডিটর’ হিসেবে পদোন্নতি দেন এবং একই সাথে আমার ওপর চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। আমি অত্যন্ত বিব্রত বোধ করি। কারণ বাংলাদেশে দু'টি ক্ষেত্রে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে পদোন্নতি দেয়া হলে তা নিয়ে প্রচুর কানাঘুষা হয়। এবং তা হলো প্রধান বিচারপতির পদ ও সেনাবাহিনী প্রধানের পদ। যাদের ডিঙিয়ে যাওয়া হয় তাদের অনেকে ভগ্ন হৃদয়ে পদত্যাগ করেছেন এমন ঘটনাও আছে। 

গাজীউল হাসান খান তার রুমে ডাকেন সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদকে। বাইরের কারও সঙ্গে মিটিং না থাকলে আমরা তার অফিসে হরহামেশাই যাই। বিশেষ করে কফি পান করার ইচ্ছা হলে আরও বেশি যাই। কিন্তু কাউকে ডেকে পাঠালে তার অর্থ ভিন্ন হয়। মকসুদ ভাই ফিরে আসলে তার কাছে জানতে চাই। তিনি বলেন গাজীউল হাসান খান তাকে বলেছেন সরকারের সমালোচনা করে কলাম লেখা বন্ধ করতে অথবা পদত্যাগ করতে। তার ওপর নাকি ওপরের মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি তাকে ক’দিন পর সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলে এসেছেন। আমাদের বললেন যে নীতির সঙ্গে তিনি আপোষ করবেন না। যা তার দৃষ্টিতে সমালোচনাযোগ্য মনে হবে তিনি তা লিখবেন। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বিলম্ব করেননি মকসুদ ভাই। তিনি পদত্যাগ করেন।   

পদত্যাগ করলেও তিনি প্রায়ই বাসস এ আসতেন। তিনি কলাম লেখায় নিয়মিত হয়ে যান। মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন। তাকে মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে শরীক হয়ে মিছিলে, মানবন্ধনে ও অনশনে যোগ দিতেন। 

মকসুদ ভাই মাওলানা ভাসানীর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং বাংলাদেশে মাওলানা ভাসানীর ওপর এককভাবে তার গবেষনা ও প্রকাশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ অথবা ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রস্থ মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন তাকে আমন্ত্রণ জানায় নিউইয়র্কে ভাসানীর ওপর আয়োজিত সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর আমরা আলিঙ্গনবদ্ধ হই, স্মৃতিগুলো রোমন্থন এবং ওজোন পার্কে আরেকজন ভাসানী প্রেমিক সৈয়দ টিপু সুলতানের বাগানে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করি। পরবর্তী যে ক’দিন তিনি নিউইয়র্কে ছিলেন, প্রতিদিন সময় করে তার সঙ্গে দেখা করেছি। 

২৩ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) সকালে ঘুম থেকে ওঠে ফেসবুকে প্রথমেই চোখে পড়ল বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামের পোস্টে মকসুদ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর। একসাথে অনেক স্মৃতি ভিড় করলো। তার ওপর কিছু কথা লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। বিদায় মকসুদ ভাই। এ পৃথিবীতে আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না। পরজগতে আল্লাহ আপনাকে সুখে রাখুক।

 

বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ সিফাত


আপনার মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ২১:৫৮
প্রিন্ট করুন printer

শিক্ষক নামের সেই নিঃস্বার্থ মানুষটা তো আর নেই

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

শিক্ষক নামের সেই নিঃস্বার্থ মানুষটা তো আর নেই
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

আমি শিক্ষা ও গবেষণা প্রিয় একজন মানুষ। আমার সব সময় চাই চোখের সামনে ছাত্ররা থাকবে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে আমি তাদের কাছ থেকে শিখবো ও আমার যতটুকু সাধ্য আছে সে সাধ্যের মধ্যে থেকে আমি তাদের শিখাবো। জীবনমুখী বাস্তব শিক্ষার প্রভাব এভাবে একসময় বিশ্বজনীন হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আমার ছাত্রদের সাথে নিয়ে মৌলিক ও ফলিত গবেষণায় নিজেকে খুব গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতে চাই। আমি সব সময় বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের ছাত্রদের সাথে নিয়ে গবেষণার স্বপ্নকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে চাই। 

গবেষণা করার সময় ছাত্ররা তাকে ঘিরে থাকতো। ছাত্রদের গবেষণা শিখাবেন বলে বিয়ে করে সংসার পর্যন্ত করেননি তিনি। খুব ভাগ্যবান একজন মানুষ ছিলেন। ছাত্রদের গবেষণা শিখাতে শিখাতে এক প্রিয় ছাত্রের বুকে মাথা রেখে কখন যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন তা কেউ বুঝতেও পারেনি। এমন ভাগ্য নিয়ে আমরা জন্মেছি কিনা জানিনা তবে এমন ভাগ্য নিয়ে যেন আমাদের শিক্ষার সব স্তরে শিক্ষকরা জন্ম নেন। আরেকজন ছাত্র বান্ধব শিক্ষকের কথা মনে পড়ছে। আমাদের জাতীয় বীর তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক শহীদ শামসুজ্জোহা স্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্বে থাকাকালে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রক্ষা গিয়ে তিনি প্রাণ দেন। প্রাণের ছাত্রদের আগলে রেখে তিনি নিজের বুক পেতে পাকিস্তানী জান্তার বিরুদ্ধে চিৎকার করে বলেন  “আমি বলছি গুলিবর্ষণ হবে না। আর যদি গুলি করা হয় তবে কোন ছাত্রের গায়ে লাগার আগে তা আমার গায়ে লাগবে”। সাহসী মানুষটি কথাগুলো বলে পিছুপা হলেন না। কারণ এগুলো কথার কথা ছিলোনা বরং অন্তর দিয়ে ভালোবাসার মুখগুলিকে আঁকড়ে ধরার আকুতি ছিল। গু‌লি চালালো পাকিস্তানী হানাদারেরা। ছাত্রদের নিরাপদ  রাখতে  বুক উঁচিয়ে দাঁড়ালেন তি‌নি। রক্ত ঝরলো মাটিতে। শহীদের রক্ত। নিভে গেলো আলোকিত একজন মানুষের জীবন। নিজের জীবন তুচ্ছ ভেবেছেন সন্তানতুল্য ছাত্রদের জন্য। এমন শিক্ষক কি এখন আর আছে। যিনি পরিবারের কথা ভাবেননি। নিজের স্বার্থের কথা ভাবেননি। সব সময় ভেবেছেন ছাত্রদের কল্যাণের কথা। মৃত্যু মানুষটির প্রাণ কেড়ে নিলেও, কেড়ে নিতে পারেনি তার কালজয়ী সত্তাকে। ইতিহাস এই মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষটিকে গড়েনি বরং তিনিই  ইতিহাসকে গড়েছেন।

মমতাময়ী মাও তো একজন শিক্ষক। সেটা আমরা হয়তো বুঝতে পারিনা। তবে সময় আমাদের তা বুঝিয়ে দেয়। একটা ঘটনায় বিষয়টি অনেক সহজবোধ্য হয়ে যাবে।  বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের তখন শিশুকাল। এক দিন এডিসন ঘরে এসে তার মাকে খামবন্দি চিঠি দিলেন। তিনি মাকে বললেন, ‘আমার শিক্ষক আমাকে কাগজটি দিয়েছেন এবং শুধু তোমাকেই দিতে বলেছেন।’ মা চিঠিটি জোরে পড়া শুরু করলেন এবং তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে, ‘আপনার পুত্র মেধাবী। এই স্কুলটি তার জন্য অনেক ছোট এবং এখানে তাকে শেখানোর মতো যথেষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ  শিক্ষক নেই। দয়া করে আপনি নিজেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করুন।’ তার মা মারা যাওয়ার অনেক বছর পরের কথা। এডিসন তখন শতাব্দীর সেরা আবিষ্কারক। এক দিন তাঁর পারিবারিক পুরনো জিনিসপত্র দেখছিলেন। একটি ডেস্কের ড্রয়ারের কোনায় হঠাৎ তিনি একটি ভাঁজ করা কাগজ পেলেন। তিনি সেটি খুললেন। কাগজে লেখা ছিল—‘আপনার সন্তান মেধাহীন ও নিম্ন বুদ্ধিসম্পন্ন। আমরা তাকে আমাদের স্কুলে আর আসতে দিতে পারি না।’ এডিসন কয়েক ঘণ্টা ধরে কাঁদলেন। কারণ এডিসন বুঝতে পারলেন তার  মা সেদিন বড় কিছু ভাবেননি। বরং তার চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করে ভেবেছেন কিভাবে একটা নেতিবাচক ধারণাকে ইতিবাচক ধারণায় পরিণত করা যায়। তিনি টমাস আলভা এডিসনকে গড়ার আগেই ভেঙে যেতে দেননি বরং তার  মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করেছিলেন যে তার মতো মেধাবী পৃথিবীতে আর কেউ নেই। কয়েকটি শব্দের ইতিবাচক পরিবর্তন এডিসনের জীবন পাল্টে দিয়েছিল। এখানে এডিসনের মা একজন শিক্ষকের মতো কাজ করেছেন। কিন্তু তা  স্কুলের শিক্ষকরা তা পারেননি।

প্রতিদিন এমন নিঃস্বার্থ শিক্ষকদের খুঁজি। সেই প্রাণপ্রিয় মুখগুলিকে খুঁজি। কিন্তু কোথায় তারা। তারা তো আকাশের তারা হয়ে গেছে। সে তারা এখনও রাতে আলোর মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের আলোকিত পথ দেখানোর অপেক্ষা করে। কিন্তু আমরা তো স্বার্থপর হয়ে গেছি। সবাই আর শিক্ষক নেই, কেউ কেউ শিক্ষক। এক দুষ্টচক্রে বাধা পড়ে গেছে শিক্ষকদের প্রকৃত সত্তা। শিক্ষকতা পেশা নয়, এটা একটা আত্মত্যাগ। এটা একটা সেবা। কিন্তু কে শুনবে কার কথা। ছাত্রদের মুখগুলো দেখে কষ্ট লাগে। ওরা ওদের প্রতিভার আলো ছড়িয়ে আলোকিত হতে চায়। কিন্তু শিক্ষক নামের সেই নিঃস্বার্থ মানুষটা তো আর নেই। সব যেন দুঃস্বপ্ন, সব যেন গন্তব্যহীন।

বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৭:০৮
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১০:৪৯
প্রিন্ট করুন printer

বারে বারে ট্রাম্প তুমি খেয়ে যাও ধান

ড. মোস্তফা সারওয়ার

বারে বারে ট্রাম্প তুমি খেয়ে যাও ধান
ড. মোস্তফা সারওয়ার

১৩ ফেব্রুয়ারি সিনেটের ইমপিচমেন্ট বিচার সমাপ্ত হল। যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করা গেল না। সংবিধান অনুযায়ী ইমপিচমেন্টের জন্য প্রয়োজন ছিল কমপক্ষে ৬৭টি ভোট। পার্টি লাইনের ভোটে সব ডেমোক্র্যাটদের পঞ্চাশ এবং রিপাবলিকানদের সাতটি মিলে সর্বমোট সাতান্ন ভোট ছিল ইমপিচমেন্টের পক্ষে আর বাকী রিপাবলিকান তেতাল্লিশ ভোট বিপক্ষে। দলীয় ভিত্তিতে বর্তমানে তীব্রভাবে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রে এমনি ঘটবে এটা আগেই আঁচ করা যাচ্ছিল। অতীতে এর নিদর্শন রয়েছে। 

১৭৯৮ সালে সিনেটর উইলিয়াম ব্লাআউন্ট (William Blount) সিনেট থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরও সিনেটে তার বিচার হয়েছিল। কিন্তু সে দোষী সাব্যস্ত হয়নি। তার দলের সিনেটররা নিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দিয়ে তার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অতীতে ঠিক এমনি আরেকবার ঘটেছিল ১৮৭৬ সালে যুদ্ধ মন্ত্রী উইলিয়াম বেলন্যাপ (William Belknap) এর ব্যাপারে।  ইমপিচমেন্ট বিচারের আগেই সে পদত্যাগ করেছিল। তথাপি তার ইমপিচমেন্ট বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু ব্লাআউন্টের মতই তার সাজা হয়নি পার্টি লাইন ভোটে।

প্রেসিডেন্ট এ্যানড্রু জনসন (Andrew Johnson)  হল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট যাকে ইমপিচ করা হয়েছিল ১৮৬৮ সালে। কিন্তু সিনেটের বিচারে তার শাস্তি হয়নি। সাম্প্রতিক ১৯৯৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি সিনেটে ইমপিচমেন্টের বিচার হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের। তখনও সাজা হয়নি। ট্রাম্পের ব্যাপারে দুই বার একই ঘটনা ঘটল। ইমপিচমেন্ট জন্য রয়েছে দুটো পদক্ষেপ। 

প্রথমটি হল কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাশ করতে হবে ইমপিচমেন্ট আর্টিক্যাল। দ্বিতীয় পদক্ষেপে সিনেটে হবে ইমপিচমেন্ট আর্টিক্যাল অথবা নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য বিচার। এ বিচারে নিম্ন কক্ষের পক্ষ থেকে বাছাই করা কংগ্রেস সদস্যরা প্রসিকিউটর হিসেবে সিনেটে অভিযোগ উত্থাপন করবে আর তার সমর্থনে সাক্ষী ও যুক্তি প্রয়োগ করবে। দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৭ জন সিনেটর অভিযোগের পক্ষে ভোটদান করলেই প্রেসিডেন্টের অথবা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রমাণিত হবে এবং অপসারণ ধার্য হয়ে যাবে। এর পর সিনেট ইচ্ছে করলে দোষী (convicted) প্রেসিডেন্ট অথবা উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদেরকে শুধু অপসারণ নয়, তার চেয়ে অধিক শাস্তি প্রদান করতে পারে। এই পর্যায়ে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্থাৎ ৫১ ভোটে দোষীকে চিরতরে অযোগ্য করা যাবে যে কোন সরকারি পদ, সম্মান, ট্রাস্ট অথবা লাভজনক প্রতিষ্ঠানের পদ থেকে। ৫১ ভোটের দ্বিতীয় ধাপ প্রয়োগের জন্য বাধ্যতামূলক পূর্বশর্ত হল ৬৭ ভোট অর্জনের মাধ্যমে অভিযুক্তকে প্রথমে দোষী সাব্যস্ত করা। ১৩ ফেব্রুয়ারি সিনেটের ইমপিচমেন্ট বিচারে ট্রাম্পের অপরাধ প্রমাণিত হয়নি অতএব তাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট গ্রহন করা গেল না।

যুক্তরাষ্টের ইমপিচমেন্টের ইতিহাসে আমরা একটা প্যাটার্ন অতি সহজেই লক্ষ্য করতে পারি। দলীয় আনুগত্যের কারণে কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সহজেই ইমপিচ করা যাবে। দুই তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৭ জন সিনেটর পদে কোন দলের বিজয় প্রায় অসম্ভব। তাই অপরাধের সরাসরি প্রমাণ থাকলেও সিনেটে শাস্তি দেওয়া মোটামুটি অসম্ভব। অতএব মোদ্দা কথায় এটা বিচারের নামে প্রহসন ছাড়া অন্য কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর লক্ষ কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় ৬ জানুয়ারির ঘটনা দেখেছে ঠিক যখন এই ভয়ংকর ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটছিল। এই ঘটনার আগের দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে অনেকেই পর্যবেক্ষণ করছিল ট্রাম্পের উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। নির্বাচনে জয়ী না হলেও সে যেন জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করে একনায়কত্ত্ব কায়েম করতে পারে সেজন্য অনবরত মিথ্যাচার করে যাচ্ছিল। নির্বাচনী বোর্ড, স্টেট পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সুপ্রিম কোর্ট সহ বিভিন্ন স্তরের আদালত, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুলর উপর অন্যায় দাবি ও জোড় পূর্বক বাইডেনের লক্ষ লক্ষ ভোট বাতিল করার চেষ্টা চালিয়েছিল। মিথ্যা প্রচার ও সরাসরি প্ররোচনার মাধ্যমে বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ দুর্বৃত্তদের ট্রাম্প লেলিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসী আক্রমণে।

সিনেটের পার্টি লাইন ভোটে ট্রাম্প পার পেয়ে গেল। তার অর্থ হল প্রেসিডেন্ট হিসেবে গুরুতর অপরাধ করলে তার দায় দায়িত্ব থাকছে না। ভবিষ্যতে কোন প্রেসিডেন্ট যদি জোর পূর্বক ক্ষমতা দীর্ঘ স্থায়ী করতে চায়, তবে তার পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য এটা একটি অশনি সংকেত। এখন প্রশ্ন হল ট্রাম্পের এই অপরাধের দায় দায়িত্বের শাস্তি স্বরূপ অন্য কোন বিধান অথবা উপায় রয়েছে কিনা। মনে হয় তিনটি পথ খোলা রয়েছে। (১) কংগ্রেসে বস্তুগত ফলাফল বিহীন সেন্সর (censure), অন্য কথায় নিন্দা প্রস্তাব। সাধারণ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় কংগ্রেসের দুই কক্ষে অথবা আলাদাভাবে যে কোন কক্ষে এটা পাশ করা যেতে পারে। এর কোন বস্তুগত দন্ড অথবা ফলাফল (material consequences) নেই। রয়েছে শুধু জন সমক্ষে প্রকাশ্য অপমান। ইংরেজিতে বলা হয় পাবলিক শেইমিং (public shaming)। তাই এ ধরণের সাজা ট্রাম্পের জন্য হবে নামকা ওয়াস্তের সাজা যার কোন দাঁত নেই। 

অতীতে ভারত উপমহাদেশে সামাজিক ভাবে প্রচলিত ছিল পাবলিক শেইমিং। বর্তমানে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শালিস বিচারে পাবলিক শেইমিং আছে বলে শোনা যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির একজন প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৮৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে গিয়েছিলাম। সাংহাই শহরে আমাদের হোটেলের সামনে একটি বিলবোর্ডের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়েছিল। পোস্টারে মনে হল একই পরিবারের ছবি। একটু অদ্ভুত ধরণের। চীনা ভাষা বুঝতে পারিনি। গাইডের কাছে জানতে চেয়েছি। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল মাঝখানের করুণ ছবিটি একটি চোরের। চারপাশে আত্মীয় স্বজনদের ছবি। ওটা ছিল নিদারুণ নির্দয় পাবলিক শেইমিং। এটা যুক্তরাষ্ট্রে প্রযোজ্য নয়। যদি হত। পাঠক ভেবে দেখুন, মাঝখানে পরচুলা এবং কমলা রঙের ট্যান বিহীন ট্রাম্প আর চারিদিকে ট্রাম্প জুনিয়র, এরিক, ইভাংকা, মেলানিয়া, জ্যারেড, রুডি জুলিয়ানী এবং স্টর্মি ড্যানিয়েল। 

অনর্গল মিথ্যায় অভ্যস্ত ট্রাম্পের লজ্জা শরম আছে বলে মনে হয় না। চৈনিক ওষধিও নির্ঘাত ফেল মারত বলে মনে হয়। (২) অতএব চলুন দেখা যাক দ্বিতীয় বিকল্প। সংবিধানের চতু্র্দশ সংশোধনীর ৩য় বিভাগ অনুযায়ী সেন্সর। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের পর রাষ্ট্র্রদ্রোহী এবং পরাজিত কনফেডারেট নেতৃবৃন্দ যাতে কোন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে বহাল হতে না পারে তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল উপরোক্ত ধারা। ঐ যুগের পর এই ধারাটি কদাচিৎ আলোচিত হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী কংগ্রেসের উভয় কক্ষে আলাদাভাবে সাধারণ সংখ্যা গরিষ্ঠতায় সেন্সর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। এর ফলে ট্রাম্পকে ভবিষ্যতে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অথবা সরকারি পদে যোগদানে অযোগ্য করা যাবে। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর টিম কেইন (Tim Kaine) এবং রিপাবলিকান সুজান কলিন্স (Susan Collins) এবিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে। (৩) তৃতীয় বিকল্প হল ক্রিমিনাল ইনডাইটমেন্ট। ইমিউনিটি অথবা রেহাই থাকার জন্য প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন সময়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কোন ক্রিমিনাল অভিযোগ দেওয়া যায়নি। যে মুহূর্তে সে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল নেই, তারপর থেকেই অতীতের কৃত অপরাধের বিচারের অভিযোগ গঠন করা যায়। ঘটনা ঘটার পাঁচ বছরের মধ্যে বিচার শুরু করতে হবে। এটাকে বলা হয় স্ট্যাটিউট অব লিমিটেশন (Statute of Limitation)। 

৯ ফেব্রুয়ারির এক প্রবন্ধে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের জুডিসিয়ারী কমিটির প্রাক্তন কৌঁসুলি (Counsel) মাইকেল কনওয়ে (Michael Conway) মতামত দিয়েছে, সিনেটের বিচারে ট্রাম্পের সাজা হয়নি অতএব তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল বিচারের ব্যবস্থা করা যাবে। সিনেটের রিপাবলিকান নেতা মিচ মেকনাল ১৩ ফেব্রুয়ারি সিনেটের বক্তৃতায় ক্রিমিনাল বিচারের ইঙ্গিত দিয়েছে। ট্রাম্প বিরোধী কৌঁসুলিরা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিচ্ছে।এছাড়াও নিউ ইয়র্ক, জর্জিয়াসহ অন্যান্য স্টেটে মামলা টুকে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি এনবিসি (NBC) নিউজের চার এ্যাডামস (Char Adams) প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিসিসিপি থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য বেনি টমসন (Benni Thompson) এবং এনএএসিপি (NAACP) যৌথভাবে একটি দেওয়ানী মকদ্দমা দিচ্ছে ১৮৭১ সালে গৃহীত কু ক্লাক্স ক্ল্যান এ্যাক্ট অনুযায়ী। এই মকদ্দমায় আসামি হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প, রুডি জুলিয়ানী, বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গ সংগঠন প্রাউড বয়েজ (Proud Boys) এবং ওথ কিপারস্ (Oath Keepers)। যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের পর পুনর্গঠনের সময়কালে ঘৃণা কারবারি বর্ণবাদী সংগঠনগুলকে শক্তি প্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দ্বারা নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তাদের সরকারি কাজ সম্পাদনে বাধা সৃষ্টির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইন। এই আইন এখনও বহাল রয়েছে। কংগ্রেস সদস্য বেনি টমসনের মকদ্দমাটি খুবই জোড়াল। ভীতি প্রদর্শন, হুমকি ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে টমসনের ৬ জানুয়ারির ভোট গণনা কাজে অভ্যুত্থানকারীরা জোরপূর্বক বাধার সৃষ্টি করেছিল। ট্রাম্প ও জুলিয়ানী ইন্ধন, উসকানি এবং নেতৃত্ব দিয়েছিল। দুষ্কৃতিকারীদের মধ্যে যারা ধড়া পড়েছে তাদের অনেকেই রাজসাক্ষী হতে চাচ্ছে। আরও অনেক মামলা দায়ের করা হবে।  মনে হচ্ছে এবার ট্রাম্প ধরা খেয়ে যাচ্ছে। টেফলন ট্রাম্প সব সময় পিছলে যায়। এবার মনে হয় ডেমোক্র্যাট এবং এস্টাবলিস্টমেন্ট রিপাবলিকানরা মনের আনন্দে বাংলা ভাষায় কবিতা আবৃত্তি করবে বিশ্ব মাতৃভাষার মাসে! 'বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার কাটব দুই কান'।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সাবেক উপ-উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিয়েন্স।

বিডি-প্রতিদিন/বাজিত হোসেন


আপনার মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০৭:০৭
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১০:২৮
প্রিন্ট করুন printer

সমালোচনা করা সহজ, সমালোচিত হওয়া কঠিন

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

সমালোচনা করা সহজ, সমালোচিত হওয়া কঠিন
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

কোনটা বেশি শক্তিশালী? সমালোচনা করা নাকি সমালোচিত হওয়া। এটা নিয়ে অনেক যুক্তি তর্ক, মত-মতবিরোধ, ঠান্ডা লড়াই থাকতে পারে। তবে সমালোচনা করা সহজ, সমালোচিত হওয়া কঠিন। এই গভীর তত্ত্বের মর্মটা  উপলব্ধি করতে গিয়ে কোনো একটা জায়গায় থামতে হয়। কারণ জীবন জমাট বাধা বরফের মতো কঠিন এক অদেখা দহনের প্রতীক, যা মানুষের বুকে তিলে তিলে ক্ষত তৈরি করে মানুষকে বুঝিয়ে দেয় সে মানুষের দ্বারা কতটা সমালোচিত।

সমালোচনার দুষ্ট চক্রে নিগৃহীত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত হয়তো এভাবেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষটা   সমালোচিত হতে হতে একদিন বিশ্বময় আলোচিত হয়ে উঠে। আলোচিত হতে হতে একদিন আলোকিত হয়ে উঠে। কেননা যে মানুষ যত কোনঠাসা সে মানুষের ভিতরের পুঞ্জীভূত ঘুমন্তশক্তি তত আপন শক্তিতে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা বেশি। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতি চিনে, জানে ও বুঝে সেই নেতিবাচক শক্তিতে ভর করা বিবেকহীন সমালোচকদের। তাদেরও প্রকৃতি সীমা লঙ্ঘনের সময় দেয়  টুকরো টুকরো অস্থিরতার ট্রাজেডির উপাখ্যান লিখে।
   
এমন করেই প্রকৃতি অস্থিরতায় জ্বলতে জ্বলতে কোনো একটা সময়ে সহনশীলতার আবরণ থেকে বের হয়ে এসে চিৎকার করে বলে উঠে তোমাদের ঘৃণা করতেও ঘৃণা হয় আমার। কারণ সব সমালোচনা, সমালোচনা হয়ে উঠেনা | যে সমালোচনায় স্বার্থ থাকে, ঈর্ষা থাকে, ঘৃণা থাকে, যুক্তিহীন ক্ষোভ থাকে, তা কখনো সমালোচনা হয়ে উঠেনা | বরং তা হয়ে উঠে দীপ্যমান সূর্যের আলোক রশ্মিকে টেনে ধরার মতো অসহিষ্ণুতা। নিজে না পারার অক্ষমতা থেকে হতাশা আর মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়া মানুষের তৈলচিত্র যেন তা। 

তবে সূর্যের আলোকে থামিয়ে দিয়ে তার গতি রোধ করবে এমন সাহস কি সমালোচকদের আছে। সূর্যের আলো মানে সমালোচিত মানুষ। যে পুড়ছে প্রতিদিন সমালোচকদের অর্থহীন কথায়, যুক্তিহীন মনস্তত্বে। এপিজে আব্দুল কালাম আজাদ পুড়ে পুড়ে জীবন গড়া একটা মানুষ। মায়ের হাতের পোড়া রুটি খেয়ে বাবার কাছে যিনি শিখেছেন সমালোচনা নয়, উদারতা আর মহত্ব দিয়ে  জীবনবোধ তৈরী করতে হয়। তিনি ভেবেছেন তাই একটু অন্যভাবে।  বলতেও পেরেছেন মন খুলে এভাবে  "তুমি যদি সূর্যের মতো আলো ছড়াতে চাও, তাহলে আগে সূর্যের মতো পুড়তে শেখো"।  

সমালোচনা করতে যোগ্যতা লাগেনা, সমালোচিত হতে যোগ্যতা লাগে। সেটি ভালো হোক কিংবা খারাপ। নিন্দুক কি তবে সমালোচক? যদি তাই হয়, তবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বদান্যতা ও শুভশক্তির উৎস এখানেই যে,  তিনি এদের পরম বন্ধু বলেছেন | যেমনটি তার কবিতার ছত্রে ছত্রে একটা বাষ্পরুদ্ধ বিস্ময় চমকিত হয়ে বলেছে,  "নিন্দকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভাল, যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আঁলো। সবাই মোরে ছাড়তে পারে, বন্ধু যারা আছে, নিন্দুক সে ছায়ার মত থাকবে পাছে পাছে। বিশ্বজনে নিঃস্ব করে পবিত্রতা আনে, সাধক জনে নিস্তারিতে তার মত কে জানে? বিনামূল্যে ময়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার, বিশ্বমাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর? নিন্দুকে সে বেঁচে থাকুক বিশ্ব হিতের তরে; আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।" 

কবিকেও এমনটা ভাবতে হয়েছে। কারণ নেতিবাচক চিন্তা দ্বারা পুষ্ট মানুষ অগঠনমূলক সমালোচনাকে তাদের অস্ত্র বলে মনে করে। তখন ঠিক এটা সমালোচনা না হয়ে নিন্দুক চরিত্র ধারণ করে। যুক্তি, বিজ্ঞান, দর্শন, অকাট্য সত্য কোনকিছুতে তারা তোয়াক্কা করেনা। বিশ্বাসঘাতকতার মুখ আর মুখোশ তাদের অমানুষ বানায়। ভাবনাটা এমন তারাই ঠিক আর সব বেঠিক। তারপরও কবি অন্ধকারের ভিতর থেকে আলো খুঁজেছেন। কারণ তিনি যে উদার, তিনি যে মহান। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্ধকার আছে বলেই পৃথিবীতে আলোর অস্তিত্ব আছে।

একটা লেখায় পেলাম- "সমালোচনা করতে যোগ্যতার প্রয়োজন হয়না, যে কেউ সমালোচনা করতে পারে। সমাজের সবচেয়ে অযোগ্য মানুষ গুলোরই প্রধান হাতিয়ার হলো অপরের ভালো-মন্দ সবকিছুতে নির্বিচারে সমালোচনা করা। অপরদিকে সমালোচিত হতে হলেও যোগ্যতার প্রয়োজন আছে।কেউ যখন তার যোগ্যতা দিয়ে নতুন বা উদ্ভাবনী কিছু করবে তখন ই একদল অযোগ্য লোকের আতে ঘা হয়ে লাগে এবং সমালোচনা শুরু করে।" 

কথাটা মিথ্যে নয়, অমোঘ সত্য। যারা  সমালোচনা করার মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করছে বলে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন, তারা পরোক্ষভাবে সমালোচিতদের পরম উপকার সাধন হয়তো করে ফেলছে। কিন্তু সেটা বোঝার মতো মাথাটা তাদের যে জায়গাটাতে থাকা দরকার ছিল সেখানে হয়তো নেই। আজকের সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার দৈন্যদশা চলছে। 

গঠনমূলক সমালোচনার জায়গায় অগঠনমূলক সমালোচনার ধজ্জাধারীদের বাড়টাও বেড়েছে অনেক। তবে সেটা যত বেড়েছে সমালোচিত মানুষদের ইতিবাচক জেদটাও তত বেড়েছে। ফলে দিন দিন ইলোজিক্যাল সমালোচনাকারীরা পিছিয়ে পড়ছে আর দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সমালোচিতদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। সমালোচনা মানুষকে সাময়িক সুবিধা দেয় হয়তো তবে তা মানুষের ব্যাক্তিত্বও ধ্বংস করে দেয়। শক্ত মেরুদণ্ডে পচন ধরায়। ইতিহাস তাই বলছে। 

সমালোচিতরা থেমে থাকেনা। এক একটা অবরুদ্ধ নগরের কংক্রিটের দরজা ভেঙে এগিয়ে যায় তাদের অভিষ্ঠ লক্ষ্যে। আর সমালোচনাকারীরা আটকে যায় নিজেদের বানানো অবরুদ্ধ নগরে। পৃথিবী সমালোচনাকারীদের কখনো মনে রাখেনা। তবে সমালোচিতরা সময়ের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ইতিহাস হয়ে যায়। 


বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ সিফাত


আপনার মন্তব্য

পরবর্তী খবর