শিরোনাম
৩০ এপ্রিল, ২০২২ ০৯:৪৬

জলিলের ট্রাম্পকার্ড আর ফখরুলের ঈদের পর সরকার পতন

সৈয়দ বোরহান কবীর

জলিলের ট্রাম্পকার্ড আর ফখরুলের ঈদের পর সরকার পতন

সৈয়দ বোরহান কবীর

আজ ৩০ এপ্রিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৩০ এপ্রিল একটি আলোচিত তারিখ। ২০০৪ সালের এ দিনটিকে সরকার পতনের দিন হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। একটি সরকারকে বলে-কয়ে দিন-তারিখ দিয়ে ফেলে দেওয়া অকল্পনীয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেই অকল্পনীয় কাজটি করেছিলেন। এপ্রিলের শুরুর দিন এক সংবাদ সম্মেলনে আবদুল জলিল ঘোষণা করেন, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পতন ঘটবে। আবদুল জলিল বলেছিলেন, এমন ট্রাম্পকার্ড তাঁর কাছে আছে, যার প্রয়োগে সরকারের পতন হবেই। জলিলের কাছে কী ট্রাম্পকার্ড আছে, এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাই সেদিন দলের সাধারণ সম্পাদকের দিন-ক্ষণ দিয়ে সরকার ফেলে দেওয়ার এ ঘোষণা পছন্দ করেননি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের ট্রাম্পকার্ড তত্ত্বের পর আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত সরকার পতনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে। ২০০৪-এর ৭ ও ৮ এপ্রিল দুই দিনের হরতাল ডাকে। ১৫ এপ্রিল জেলায় জেলায় ‘গণঅনাস্থা মানবপ্রাচীর’ কর্মসূচি পালন করে। ২১ এপ্রিল পালন করে ‘হাওয়া ভবন’ ঘেরাও কর্মসূচি। ২৫ এপ্রিল সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেন বিরোধী দলের সদস্যরা। ওই দিনই আওয়ামী লীগ অনাস্থা কর্মসূচি পালন শুরু করে। ৩০ এপ্রিলের দুই দিন আগে ২৮ এপ্রিল থেকে আওয়ামী লীগ দুই দিনের হরতাল পালন করে। কিন্তু ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বহাল থাকে। সেদিন ঢাকায় বা দেশের কোথাও বড় কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা যায়নি। জীবনযাত্রা ছিল স্বাভাবিক। বিকালে বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়।

৩০ এপ্রিল সরকার পতন হয়নি। এ অজুহাতে বিএনপি আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ট্রাম্পকার্ডে আতঙ্কিত হয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গণগ্রেফতার শুরু করে। সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ৬ এপ্রিল রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের মিছিলে পুলিশ নির্বিচার গুলি চালায়। ২০ জন নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের পাশাপাশি ছাত্রদল ও যুবদল সারা দেশে তান্ডব শুরু করে। ১৮ এপ্রিল বগুড়ায় ছাত্রলীগের মানববন্ধন কর্মসূচিতে ছাত্রদল ক্যাডাররা হামলা চালায়। অর্ধশতাধিক কর্মী আহত হন। ছাত্রদল ও যুবদল তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার বাসভবন ‘সুধা সদন’ ঘেরাওয়ের কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু এ কর্মসূচি নিয়ে জনগণের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তীব্র গণআপত্তির মুখে বিএনপি সে কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। মোদ্দা কথা, আবদুল জলিলের ট্রাম্পকার্ড ঘোষণার পর রাজনীতিতে একটু মৃদু উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সরকার পতন তো দূরের কথা, সরকারের জন্য কোনো অস্বস্তিও তৈরি হয়নি। আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দল। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই এ দলের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সময় অসহনীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। সংগ্রাম করেই আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতিকে মুক্তির নেতৃত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে ২০০৪ সালে এ রকম একটি হঠকারী ঘোষণা দিয়েছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি কৌতুকের জন্ম দিয়েছিল?

আবদুল জলিল ছিলেন খুবই সজ্জন একজন রাজনীতিবিদ। ২০০১ সালের নির্বাচনের পরপরই সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের তান্ডব শুরু হয়। আওয়ামী লীগের কর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিমেষেই সর্বস্ব হারায়। তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নৃশংসভাবে সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চলতে থাকে। ১০ অক্টোবর শপথ নেয় বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এরপর বিএনপি নেতাদের লাগামহীন কথাবার্তা শুরু হয়। ‘আওয়ামী লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে’। ‘এক শ বছরেও আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না’। বিএনপি নেতাদের এসব কথার অত্যাচারে দেশের মানুষ রীতিমতো শব্দদূষণের শিকার হতে থাকে। ঘরছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা আশ্রয় নেন দলীয় কার্যালয়ে। ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ যেন পরিণত হয় এক শরণার্থী শিবিরে। ’৭৫-পরবর্তী আওয়ামী লীগ আরেকটি সংকটে পড়ে। এ সংকট উত্তরণের জন্য ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ দলের কাউন্সিল করে। এ কাউন্সিলের মাধ্যমে আবদুল জলিলকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কঠিন সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব নেন আবদুল জলিল। আওয়ামী লীগের জন্য পরিস্থিতি তখন কী ভয়ংকর ছিল তা এখন চিন্তাও করা যাবে না। গত ১০-১২ বছরে যারা আওয়ামী লীগার হয়ে এটা-ওটা বনে গেছেন, তারা কোনো দিন জানবেন না বিএনপি-জামায়াত কি পৈশাচিক দানবীয় নিপীড়ন করেছিল সে সময়। সে রকম এক বৈরী পরিবেশে আবদুল জলিল দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। আবদুল জলিল খুব পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। আর ছিলেন শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত, আস্থাভাজন। কিন্তু তিনি কীভাবে ৩০ এপ্রিল সরকার ফেলে দেবেন বলে জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যদ্বাণী করলেন? এটা রাজনীতিতে এক বিস্ময়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি তিনি ছিলেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান। মতিঝিলে বেশ সাজানো গোছানো কক্ষ ছিল। সেখানে তিনি দুপুর পর্যন্ত থাকতেন। নেতা-কর্মীরা গিজগিজ করতেন। বিপর্যস্ত নেতা-কর্মীদের সব সময় সহযোগিতা করতেন জলিল।

আমি তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে তিনি ৩০ এপ্রিলের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন? ট্রাম্পকার্ডই বা কী? প্রায়ই তিনি দাবি করতেন, ৩০ এপ্রিল ছিল মিডিয়ার সৃষ্টি। মিডিয়া তাঁকে দিয়ে এ রকম কথাটি বলিয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। প্রতিবারই তাঁকে ৩০ এপ্রিল এবং ট্রাম্পকার্ড নিয়ে কথা বলেছি। বিক্ষিপ্তভাবে তিনি এ নিয়ে কিছু ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের সে সময় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতাও ট্রাম্পকার্ড সম্পর্কে কিছু জানতেন। তাঁদের সবার তথ্য জোড়া দিলে ব্যাপারটা এ রকম দাঁড়ায়-এর নেপথ্যে ছিলেন প্রশিকার কাজী ফারুক আহমেদ। প্রশিকা তখন ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে বড় এনজিও। সারা দেশে তাদের নেটওয়ার্ক ও কর্মী বাহিনী ছিল। ট্রাম্পকার্ডের দুটি অংশ ছিল। প্রথমত, সারা দেশ থেকে প্রশিকার লাখ লাখ কর্মী ঢাকায় এসে অবস্থান নেবেন। যে যেখানে আছেন বসে পড়বেন। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান থাকবে। দ্বিতীয় অংশ ছিল, সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব। বিএনপির সিংহভাগ সংসদ সদস্য বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবেন। এজন্য তাঁদের সঙ্গে কথাও হয়েছিল। যেসব সংসদ সদস্য অনাস্থা প্রস্তাব আনবেন বলে প্রাথমিকভাবে সায় দিয়েছিলেন তাঁদের একজন ছিলেন প্রয়াত আবু হেনা। অনেক পরে একদিন কফির আড্ডায় আবু হেনা বলেছিলেন, এটা কোনো সিরিয়াস পরিকল্পনা ছিল না। শুধু একটি ঢিল ছোড়ার মতো আমাকে একদিন বলা হয়েছিল। আমি হ্যাঁ-না কিছুই বলিনি। যাই হোক, প্রশিকার চাকরিজীবীরা শেষ পর্যন্ত রাজপথ দখল করতে পারেননি। ৩০ এপ্রিল তাদের টিকিটিও পাওয়া যায়নি। আর বিএনপির সংসদ সদস্যরাও বেগম জিয়ার সামনে বিদ্রোহের বীরত্ব দেখাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আবদুল জলিলের ট্রাম্পকার্ড এক রাজনৈতিক কৌতুকে পরিণত হয়। অথচ এটি যদি সফল হতো তাহলে হয়তো আবদুল জলিলের রাজনৈতিক পরিণতি অন্যরকম হতে পারত।

ক্ষমতায় থাকলেই কেবল রাজনীতিবিদরা বেসামাল হন না। বিরোধী দলে থাকলেও অস্থির হয়ে যান। বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট, প্রস্তুতি ইত্যাদি কিছুই বিবেচনা করে না। ক্ষমতায় থাকলে একটি দল যেমন ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চায়। মনে করে এটাই জীবন। আর কোনো দিন ক্ষমতাচ্যুত হওয়া যাবে না। তেমনি বিরোধী দলে কেউ এক মুহূর্ত থাকতে রাজি নয়। যে কোনো প্রকারে সরকার হটানোর স্বপ্ন দেখে। ফন্দি আঁটে। বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা দলটির জন্য সবকিছু। পুলিশ, আমলা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক সবাই ক্ষমতাসীনদের তোষণ করে। মৌমাছির মতো চাটুকার-তোষামোদকারীরা গিজগিজ করে। এমনভাবে ক্ষমতাসীনদের ঘিরে রাখা হয় যে তারা নিজেদের ভুলগুলোও দেখে না। ক্ষমতায় থাকলে সবকিছু আছে। আর ক্ষমতায় না থাকলে কিছুই নেই। ক্ষমতায় না থাকলে পুলিশ পেটায়। আমলারা চেনে না। ব্যবসায়ীরা এড়িয়ে যায়। এজন্য ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দল শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় হাঁসফাঁস করতে থাকে। এ সময় কারও সামান্য আশ্বাসে বিভ্রম হয়। সরকারের ছোটখাটো ব্যর্থতায় উল্লসিত হয়। সরকার পতনের খোয়াব দেখে। এজন্যই জলিলের মতো পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদও ধোঁকা খেয়েছিলেন। এনজিও কর্মীরা যে রাজনৈতিক কর্মীর মতো সাহসী, সর্বাত্মক, অকুতোভয় হতে পারে না, এটা তিনি বুঝতে পারেননি। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বকাঠামো এমন যে প্রধান নেতার সমালোচনা করা ‘কবিরা গুনাহ’র মতো অপরাধ। যে অপরাধের মাফ নেই। এ রকম একটি সংস্কৃতির মধ্যে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন এটা অবাস্তব। অলীক।

ক্ষমতায় থাকলেই শুধু বিভ্রম হয় না। বিরোধী দলেও বিবর্ণ বিভ্রম হয়। ক্ষমতার সুখে আত্মহারা হয়েই মানুষ প্রলাপ বকে না। ক্ষমতাহীনতার যন্ত্রণা ও কষ্টেও রাজনীতিবিদরা প্রলাপ বকেন। যেমন ২০০৪ সালে বকেছিলেন আবদুল জলিল। এখন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মির্জা ফখরুল এখন অসংলগ্ন কথাবার্তায় আবদুল জলিলের ট্রাম্পকার্ডকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি ইদানীং এমনভাবে কথাবার্তা বলেন যেন আগামীকাল সরকারের পতন হবে। তাঁর কথা শুনে মাঝেমধ্যে মনে হয় তিনিও বোধহয় অন্য গ্রহের বাসিন্দা। তিনি এখন রাজনৈতিক কৌতুকে আবদুল জলিলকেও হারিয়ে দিয়েছেন। প্রতিবার রোজা এলেই বিএনপি মহাসচিব হুংকার দেন। ঈদের পর তীব্র আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এবারও দিয়েছেন। বলেছেন, সরকারের পতন নাকি অনিবার্য। কদিন আগে বললেন, ‘এ সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই’। সেদিন সংবাদপত্রে দেখলাম মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘এ সরকারের পতনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে’। মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁওয়ে বলেছেন, ‘আগামীতে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। প্রয়োজনে হরতাল ডাকা হবে।’ মির্জা ফখরুল ক্ষমতাহীনতাজনিত হতাশা রোগে আক্রান্ত।

আওয়ামী লীগ টানা ১৩ বছরের বেশি দেশ পরিচালনা করছে। আওয়ামী লীগের সাফল্য আছে, ব্যর্থতাও আছে। অর্জন আছে বিসর্জনও আছে। অনেক ভালো কাজের জন্য আওয়ামী লীগ প্রশংসিত। আবার অনেক কাজের জন্য নিন্দিত। কিন্তু গত ১৩ বছরে বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে কী করেছে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। এ ব্যাপারে কদিন আগে প্রধানমন্ত্রী তাঁর হতাশার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর বিএনপি মহাসচিবের প্রতিক্রিয়া বেশ মজার। তিনি বললেন, ‘অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ হবে। শক্তিশালী বিরোধী দল তিনি দেখতে পাবেন।’ মির্জা ফখরুল কি তাহলে বিরোধী দলেই থাকতে চান? এখন তিনি দুর্বল বিরোধী দল। শিগগিরই তিনি বিএনপিকে শক্তিশালী বিরোধী দল বানিয়ে ফেলবেন। রাজনৈতিক দলে তাহলে গরু-ছাগলের মতো মোটাতাজাকরণের পদ্ধতি আছে! যে পদ্ধতি মির্জা ফখরুল বিএনপিতে প্রয়োগ করবেন। বিশেষ প্রক্রিয়ায় কোরবানির আগে গরুকে যেমন রাতারাতি মোটা বানানো হয়, তেমনি কি বিএনপি মহাসচিব নিমেষেই বিএনপিকে শক্তিশালী বানিয়ে ফেলবেন? মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি ক্ষমতার গর্ভে জন্ম নেওয়া বিএনপি এত দিন ক্ষমতার বাইরে থেকে মৃতপ্রায়। আর মৃতপ্রায় দলটির মরিয়া মহাসচিব তাই রাজনীতির মৌলিক ব্যাকরণ ভুলে গেছেন। একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণ হলো কর্মী, সংগঠন এবং কমিটি। এসব এক দিনে সম্ভব না। ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। কিন্তু অস্থির মির্জা ফখরুল রাতারাতি সংগঠনকে শক্তিশালী করতে চান। তাঁর কাছেও কি ট্রাম্পকার্ড আছে? আবদুল জলিল থেকে মির্জা ফখরুল। ২০০৪ থেকে ২০২২। দুজনই অস্থির। ভুল পথের যাত্রী। রাজনীতি হলো সবচেয়ে অনিশ্চয়তার বাস্তবতা। আবদুল জলিল যেমন এক মাসের বিশেষ ডোজ (ট্রাম্পকার্ড) প্রয়োগ করে বিএনপিকে কিছুই করতে পারেননি। কেবল নিজে খেলো হয়েছেন। তেমনি মির্জা ফখরুলের ‘ঈদের পর সরকার পতনের আন্দোলন’ এখন এমন একটা তামাশার বাণীতে পরিণত হয়েছে, যে বাণী সম্ভবত তিনি নিজেও বিশ্বাস করেন না।

আমরা প্রায়ই বলি, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। তার মানে এই নয় যে চিরদিন ক্ষমতায় থাকবে। এটা যেমন সত্য। তেমনি এও সত্য, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি সরকারকে হটানোর কোনো শর্টকার্ট পথ নেই। বিদেশি দূতাবাসে গিয়ে নালিশ করলেই একটা সরকারের পতন হয় না। সমালোচনার শব্দ দিয়ে সরকারের পতন হয় না। দূরদেশে বসে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে সরকারের পতন হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্র এবং সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসিত মিথ্যাচার করলেও সরকারকে ফেলে দেওয়া যায় না। বিএনপি এবং বিরোধীরা প্রায়ই বলেন, জনগণের ওপর এ সরকারের কোনো আস্থা নেই। এ সরকার জনগণের নয়। বুধবার বিএনপি মহাসচিব বললেন, ‘জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সরকার’। ভালো কথা। বিএনপি বা বিরোধী দল কি জনগণের ওপর আস্থাশীল? তারা কি জনগণের শক্তিতে বিশ্বাসী? জনগণের শক্তিতে বিশ্বাসী বিরোধী দল তো কখনো ষড়যন্ত্র করবে না। বিদেশি দূতাবাসে ধরনা দেবে না। অন্য দেশে নালিশ করবে না। তারা জনগণের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থাপন করবে। জনগণকে সংগঠিত করবে। জনগণের কাছে বিচার দেবে। ভোটের মাধ্যমেই জনগণ তার রায় দেবে। বিরোধী দলও কি জনবিচ্ছিন্ন নয়? রাজনীতির জন্য এটা কি একটা অশনিসংকেত নয়? এ সরকার জনগণের নয় যাঁরা বলছেন, তাঁরা কি একবার ভেবে দেখবেন এই বিরোধী দল কতটুকু জনগণের?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।


বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ

এই রকম আরও টপিক

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর