২১ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১০:২৭

হলফনামার ‘কলপ’ ও জাদুর চেরাগ

মহিউদ্দিন খান মোহন

হলফনামার ‘কলপ’ ও জাদুর চেরাগ

মহিউদ্দিন খান মোহন

একটা বয়সে প্রাকৃতিক নিয়মে মানুষের চুল-দাড়িতে পাক ধরে। প্রথমে অল্পস্বল্প, পরে এক সময় গোটা মাথার চুল এবং মুখের দাড়ি-গোফ একদম সাদা হয়ে যায়। তবে বয়সের তারতম্যে একেকজনের একেক সময় এটা ঘটতে দেখা যায়। কারও ৪০ পেরোলেই কালো চুল শ্বেতবর্ণ ধারণ করতে শুরু করে, কারওবা ষাটের পরে। চুল পাকলে কেউ কেউ অস্বস্তিতে পড়েন। বয়সটা বেড়ে যাচ্ছে ভেবে অস্বস্তিবোধ করেন। তাই চুল-দাড়ি কালো রাখার জন্য ব্যবহার করেন ‘কলপ’। কালো রঙের কলপ ব্যবহার করে বয়সটা বাহ্যিকভাবে ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। যদিও চুল-দাড়ি কালো করে বয়স আটকানো যায় না। 

মানুষ যেহেতু সুন্দরের পূজারি, তাই সে সবসময় চেষ্টা করে অপরের চোখে নিজেকে সুন্দর দেখাতে। তবে চুল সাদা হয়ে গেলেই মানুষের সৌন্দর্য কমে না। বরং মাথার চুলে পাক ধরাকে অনেকে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান-বুদ্ধির পরিপক্বতার চিহ্ন বলে মনে করেন। এ জন্যই অনেককে বলতে শোনা যায়- ‘আমাকে বোঝাতে এসো না। আমিও বুঝি। চুল কি এমনি এমনি পেকেছে?’ কথাটা সর্বাংশে সত্য বলা যাবে না। কারণ চুল পাকলেই কেউ অভিজ্ঞ কিংবা জ্ঞান-বুদ্ধিতে পরিপক্ব হবেন এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। জীবনে অনেক চুলপাকা বয়স্ক ব্যক্তিকে দেখেছি, যারা জ্ঞান-বুদ্ধিতে বেজায় খাটো। তবে এটা ঠিক, চুল বাতাসে পাকে না, বয়সের কারণেই পাকে।

প্রকৃতির সাংবিধানিক নিয়মে চুল পাকাকে অস্বীকার করা উচিত নয়। অর্থাৎ কলপের প্রলেপে তা আড়ালের চেষ্টা না করাই ভালো। কেননা, আগুন যেমন ছাইচাপা দিয়ে রাখা যায় না, তেমনি শিরভূমিতে কেশের পরিপক্বতার বিষয়টিও বেশি দিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। কারও কারও আঁতে ঘা লাগলেও দ্বিধাহীন চিত্তেই বলতে চাই, চুল-দাড়িতে কলপ মেখে কালো রং করাকে আমার এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা বলেই মনে হয়। ব্যাপারটা অনেকটা কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মতো।

আবার মাথায় টাক পড়লে কেউ কেউ ‘উইগ’ অর্থাৎ ‘পরচুলা’ ব্যবহার করেন। এটাও নিজের আসল রূপ ঢেকে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস। তবে যারা সেলিব্রেটি অর্থাৎ নাটক-সিনেমায় অভিনয় করেন, তাদের বিষয়টি আলাদা। দর্শকদের সামনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে কিংবা চরিত্রের প্রয়োজনে তাদের পরচুলা পরিধান করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেমন আমাদের চলচ্চিত্রজগতের ‘ড্যাশিং হিরো’ খ্যাত সোহেল রানা আজীবন পরচুলা পরে অভিনয় করেছেন মাথায় টাকের কারণে। নায়করাজ রাজ্জাকও শেষ বয়সে পরচুলা পরে অভিনয় করেছেন একই কারণে। তখন আর কোঁকড়ানো চুলের নবীন যুবক রাজ্জাককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তো সেলিব্রেটিদের জন্য যেটা স্বাভাবিক বা আবশ্যকীয়, অন্যদের বেলায় তা হওয়ার কথা নয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই তেমনটি ঘটতে দেখা যায়।

রাজনীতিকরা জনসাধারণের কাছে নিজেদের অবিকৃতভাবে তুলে ধরবেন এটাই প্রত্যাশিত। তারা কোনো ছদ্মবেশ ধারণ করবেন না, ছলচাতুরী বা প্রবঞ্চনার আশ্রয় নেবেন না, জনগণের চোখকে ফাঁকি দেবেন না বা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না এটাই জনপ্রত্যাশা। একজন রাজনীতিকের যদি চুল-দাড়ি পেকে যায়, তাহলে কালো কলপের আড়ালে তা লুকানোর চেষ্টা কেন করবেন? কিংবা যদি তাঁর মাথা টাক-আক্রান্ত হয়, কেন তিনি তা পরচুলার আড়ালে ঢাকতে চাইবেন? 

অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, আমাদের একজন অতীব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পরচুলা ব্যবহার করেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে একজন মানুষের মাথায় চুল থাকল কি থাকল না সেটা কি বিবেচ্য হতে পারে? দৈহিক সৌন্দর্য নয়, তাঁর কর্মের সৌন্দর্যই তো তাঁকে মহীয়ান করবে! রাজনীতিকরা নায়ক অবশ্যই। তবে অভিনয়-মঞ্চের নয়, কর্মগুণেই তাঁরা কেউ হয়ে ওঠেন জননায়ক, কেউ কেউ রাষ্ট্রনায়ক। আবার ওই ‘কর্মগুণেই’ কেউ পরিণত হন ভিলেন বা খলনায়কে। সুতরাং সাদা চুল কালো করা বা পরচুলায় টাক ঢাকা তাঁদের জন্য শোভনীয় নয়।

চুল প্রসঙ্গে যখন এত কথা বললাম, তাহলে সহৃদয় পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে একটি ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুর-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন মাসুদ অরুণ। তাঁর মাথাভর্তি লম্বা চুল। মনোনয়ন বোর্ডে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বললেন, ‘মাসুদ, তোমার এই চুল তো পার্লামেন্টারি রাজনীতির জন্য শোভন নয়।’ মাসুদ অরুণ বললেন, ‘স্যার কেটে ফেলব আজই।’ কিন্তু কাটলেন না। কয়েকদিন পরে বি. চৌধুরী তাকে বললেন, কী ব্যাপার! তুমি চুল কাটাওনি কেন? মাসুদ অরুণ বললেন, ‘স্যার আমার এলাকার মানুষ এতদিন এই লম্বা চুলের মাসুদ অরুণকে দেখে এসেছে। এখন যদি তা ছেঁটে ফেলি ভোটাররা তো আমাকে চিনতেই পারবে না। তারা তো ভোট দিতে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়বে। ভোটের পরে কেটে ফেলব।’ 

মাসুদ অরুণ সংসদ সদস্য নির্বচিত হয়ে এলেন। সংসদ লবিতে বি. চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা। চৌধুরী সাহেব বললেন, ‘ভোটের পরে তোমার চুল কেটে ফেলার কথা ছিল, কাটনি কেন?’ মাসুদ অরুণের সপ্রতিভ উত্তর, ‘স্যার এখন যদি চুলটা ছেঁটে ফেলি, তাহলে সংসদে আমি যখন বক্তৃতা করব, আমার এলাকার মানুষ বলবে, এ তো আমাদের মাসুদ অরুণ নয়! আমাদের আসল মাসুদ অরুণ কোথায়?’ বি. চৌধুরী সাহেব যা বোঝার বুঝে গেলেন। মাসুদ অরুণের সেই লম্বা চুল আজও আছে। ঘটনাটির মধ্যে একটি সত্য লুকিয়ে আছে। সেটা হলো, রাজনীতিকদের রূপ পাল্টানো বা জনগণের সামনে নিজেকে গোপন করা উচিত নয়। কিন্তু এখনকার কতিপয় রাজনীতিক হরহামেশা সেটা করে থাকেন।

চুলে কলপের বিষয়টি মাথায় এসেছে সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত মন্ত্রী-এমপিদের ‘হলফনামা’য় বর্ণিত সম্পদের পরিমাণ দেখে। কেন যেন এ হলফনামাকে সংশ্লিষ্টদের আসল সম্পদের বিবরণ লুকানোর ‘কলপ’ বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। তা ছাড়া তাঁরা হলফনামায় তাঁদের সম্পদ বৃদ্ধির যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে যে কারও আক্কেল গুড়ুম হওয়ার কথা! গত ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘হেনরীর সম্পদ বেড়েছে ৪৯৭ গুণ’। বর্তমান সংসদ সদস্য ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জান্নাত আরা হেনরী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সম্পদের যে বিবরণ জমা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় গত ১৫ বছরে তাঁর সম্পদ বেড়েছে ৪৯৭ গুণ। ২০০৮ সালে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি সম্পদ দেখিয়েছিলেন ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। আর এবার যে সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছেন তাতে তাদের স্বামী-স্ত্রীর আয় ও সম্পদ দেখানো হয়েছে ৬৬ কোটি ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩০৭ টাকা। 

শুধু জান্নাত আরা হেনরী নন, প্রায় সব এমপি-মন্ত্রীর সম্পদ এ কয়েক বছরে ভরা ভাদরের বানের পানির মতোই বৃদ্ধি পেয়েছে। নওগাঁ-৩ আসনের এমপি ও এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী ছলিম উদ্দিন তালুকদারের আয় বেড়েছে ১৮০ গুণ, সম্পদ বেড়েছে ১৪ গুণ। ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের নগদ টাকা বেড়েছে ২২ গুণ। ফেনী-২ আসনের এমপি নিজামউদ্দিন হাজারী ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে শত কোটি টাকার। পঞ্চগড়-২ আসনে বর্তমান এমপি ও রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সম্পদ বেড়েছে ৩২ গুণ। ১৪ ডিসেম্বরের বাংলাদেশ প্রতিদিন জানিয়েছে, হলফনামায় প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাইয়ের আয় বেড়েছে ৫৯ গুণ। আর এ সময়ে তার হাতে নগদ টাকা বেড়েছে ২৭৬ গুণ। এ ছাড়া স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও বেড়েছে সাবেক এ প্রতিমন্ত্রী ও তার স্ত্রীর।

 এদিন বাংলাদেশ প্রতিদিন একটি পুরো পৃষ্ঠাব্যাপী মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের বিবরণ পত্রস্থ করেছে। সেখান থেকে কয়েকটি তুলে ধরছি- জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর আয় ও সম্পদ বেড়েছে ১৩ গুণ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খানের বেড়ছে ৩৯ গুণ, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের এমপি মো. আলী আজগারের বার্ষিক আয় বেড়েছে ১১১ শতাংশ। নাটোর-১ আসনের এমপি শহিদুল ইসলাম বকুলের আয় বেড়েছে ৪০ গুণ। অপরদিকে সাবেক ক্রিকেটার ও নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফি বিন মর্তুজার আয় কমেছে, বেড়েছে ঋণ।

শুধু মন্ত্রী-এমপিগণই নন, পাশাপাশি তাঁদের সহধর্মিণী ও স্বজনদের আয়-সম্পদও এ সময়ে রকেট গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সংশ্লিষ্ট এমপি-মন্ত্রীদের স্ত্রীগণের দৃশ্যমান কোনো পেশা বা ব্যবসাপাতি না থাকলেও তাঁদের সম্পদের পরিমাণ বেলুনের মতো স্ফীত হয়েছে। এ যেন আঙুল ফুলে কলাগাছ নয়, রীতিমতো বটগাছ! কীভাবে সেটা সম্ভব তা ভেবে অনেকের রাতের ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড়। কারও কারও কাছে অলৌকিক মনে হচ্ছে। যেখানে দেশের ছোটবড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিগণ কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে, সারা বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পুঁজি ঠিক রেখে লাভ করতে হিমশিম খান, সেখানে আমাদের মন্ত্রী-এমপি ও তাদের পোষ্যরা কোন জাদুমন্ত্রের বলে বনে যাচ্ছেন ধনকুবের, তা পিএইচডি গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে। 

প্রশ্নটা এসে যায় সংগত কারণেই- তিনারা কি দেশ-জনগণের সেবা করার জন্য মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন, নাকি নিজের ও স্বজনদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য? আজকাল জনমনে প্রতীতি জন্মেছে, রাজনীতি একটি উৎকৃষ্ট ব্যবসায়; যেখানে নগদ পুঁজি লাগে না, শুধু দলীয় পরিচয় থাকলেই চলে। আর এমপি-মন্ত্রী হলে তো কথাই নেই। কোন গৌরী সেন যে তাঁদের তহবিলে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ জমা দেয় সে হদিস কেউ পায় না।

এমপি-মন্ত্রীদের সম্পদ বৃদ্ধির এ খবর জনসাধারণকে বিস্মিত করেছে সন্দেহ নেই। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, তারা কি হলফনামায় তাদের সম্পদের সঠিক বিবরণ দিয়েছেন? নাকি এ হলফনামার আড়ালে অনেক কিছু গোপন করেছেন, কলপ দিয়ে পাকাচুল আড়াল করার মতো? তবে পাকাচুলের রহস্য কিন্তু একসময় বেরিয়ে পড়ে। চুল যখন একটু একটু করে বাড়তে থাকে তখন সাদা গোড়া দৃশ্যমান হতে শুরু করে। কেউ কেউ মনে করেন, এ হলফনামার সূত্র ধরে যদি সত্যিকার অনুসন্ধান চালানো হয়, তাহলে চুলের সাদা গোড়ার মতো লুকানো অনেক রহস্য উদঘাটিত হতে পারে। যদিও আমাদের দেশের বাস্তবতায় তা আশা করা অর্বাচীনতারই নামান্তর।

পাদটীকা : কনকনে শীতের বিকালে জম্পেশ আড্ডা চলছে মহল্লার চায়ের দোকানে। বিষয় এমপি-মন্ত্রীদের আয়-সম্পদ। এর মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই বলতে পারেন, আলাদিনের চেরাগ কোথায় কিনতে পাওয়া যায়? আমি একটা কিনব।’ বললাম, ‘আরে ভাই, ওটাতো আরব্য উপন্যাসের কল্পনার বস্তু, বাজারে বিক্রি হবে কী করে?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘আরব্য উপন্যাসে চেরাগ ছিল একটা। কিন্তু আমাদের এই বঙ্গীয় উপন্যাসে তো শত শত চেরাগের অস্তিত্ব লক্ষ্য করছি। জাদুর চেরাগই যদি না থাকবে, তাহলে মন্ত্রী-এমপিরা এত সম্পদের মালিক হলেন কী করে?’ উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। হাসির দমকে আমার কাপ থেকে কিছুটা চা ছলকে পড়ে গেল।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর