শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:১৭

ইশিগুরোর নোবেল

আন্দালিব রাশদী

ইশিগুরোর নোবেল

কোনো আলোচনাতেই কাজুও ইশিগুরোর নাম উঠেনি, বুকার ল্যাডব্রোকারের লম্বা তালিকাতেও না। তিনিও প্রত্যাশা করেননি। সারা দানিউস সুইডিশ একাডেমির পার্লামেন্ট সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেওয়ার পরপর দু’বছর দুটি অঘটনের সংবাদ দিয়েছেন, সাহিত্যবিশ্ব তাতে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিল : ২০১৫ সালে জানালেন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন বেলারুশিয়ান সাংবাদিক স্ফেতলানা আলেক্সিয়েভিচ, ২০১৬-তে বললেন গীতিকার সংগীত শিল্পী বব ডিলান। বব ডিলানের মতো কোটি ভক্তের সেলিব্রেটিকে আরও বড় পুরস্কার দিলেও কারও আপত্তি থাকত না, কিন্তু সাহিত্যের নোবেল কেন? ক্রাইম, থ্রিলার সস্তা রোমঞ্চ এমনকি পর্নোগ্রাফির লেখকরাই বা বাদ যাবেন কেন? এবার সাহিত্য বিশ্বের যেসব বড় বড় নাম আলোচনায় এসেছে সবাইকে পাশ কাটিয়ে সারা দানিউস ঘোষণা দিলেন : পুরস্কার পাচ্ছেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরো।

নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা হতে না হতেই কাজুও ইশিগুরো টের পেলেন বড্ড বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। হঠাৎ চারদিক থেকে গণমাধ্যমের লোকজন ছুটে আসছে। নোবেল মিডিয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথের টেলিফোন প্রশ্নের জবাবে বললেন : আমি রান্নাঘরে বসে এক বন্ধুর কাছে ই-মেইল পাঠাচ্ছিলাম, তখন ফোন বাজল। আমার লিটারেরি এজেন্টের লোকজন লাইভ নোবেল পুরস্কার ঘোষণা দেখছিলেন। আমি মনে করি না আমি পাব, এটা তারা আশা করেছে, এ বছর কে পাচ্ছেন তা জানার জন্যই তাদের অপেক্ষা। তারপর একটার পর একটা ফোন আসা শুরু হলো। আমি বলতে চাচ্ছিলাম এটা ভুয়া সংবাদ। ক্রমেই এটা আরও নিশ্চিত হয়ে উঠল, বিবিসি যখন আমাকে ফোন করল আমি ব্যাপারটাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে শুরু করলাম।... আমার সাক্ষাত্কার নেওয়ার জন্য বাইরে লম্বা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে।... ১৩ বছর বয়স থেকে যিনি আমার নায়ক আমার সবচেয়ে বড় নায়ক সেই বব ডিলানের পরের বছরই আমার পাওয়া—বিরাট ব্যাপার। আমি বব ডিলানের হুবহু নকল করতে পারি, তবে এটা এখন আপনাকে শোনাব না।

[অ্যাডাম স্মিথ বললেন, বেশ তাহলে ডিসেম্বরে স্টকহোমে (নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময়) যখন তখন দেখা যাবে।] ইশিগুরো এত মানুষ কেমন করে সামলাবেন সে প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানালেন, যদি এমন দিন আসে কেউ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন আর কেউই তার ব্যাপারে আগ্রহী নন—এটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার হবে। ২০১৫ সালে বেলারুশিয়ার সাংবাদিক স্ফেতলানা আলেক্সিয়েভিচকে যখন নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো সাহিত্য জগতে অসন্তুষ্টিই প্রকট হয়ে উঠল আর ২০১৬-তে গায়ক বব ডিলান যখন গান লিখে একই পুরস্কার পেলেন নোবেল পুরস্কারের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠল। বব ডিলানও পুরস্কার কবুল করা বা না করা নিয়ে সুইডিশ একাডেমিকে কম হেনস্তা করেননি। নোবেল পুরস্কার কমিটির আরও স্পষ্টভাবে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হয়েছে তা তালি দিয়ে সে ক্ষত ঢাকতে বিশ্বসাহিত্যে সমাদৃত বড় কোনো লেখককে এবার পুরস্কারদাতারা বেছে নেবেন এটাই ছিল সাহিত্যের সুহৃদজনের প্রত্যাশা।

নোবেল পুরস্কারের জন্য ২০১৭-তে বেছে নেওয়া হলো এমন একজনকে যার ‘সৃজনশীল নায়ক’ হচ্ছেন বব ডিলান। বব ডিলান যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন সাহিত্য বিশ্বের যে প্রতিক্রিয়াই হোক না কোন এ ভক্ত পেলেন ‘চরমানন্দ’। সেই কাজও ইশিগুরো পরের বছরই তার পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন। যে প্রশ্নটি এসে গেছে তার অনুরকরণ কিছুদিন শোনা যাবে—কাজুও ইশিগুরোর চেয়ে বড় কোনো লেখক কি নোবেল কমিটির চোখে পড়েনি, অন্য সব দেশ বাদ থাক, ইশিগুরো যে দেশের নাগরিক সে দেশেও তো তার চেয়ে বড় মাপের একাধিক লেখক রয়েছেন।

একেবারে প্রথম ১৯০১ থেকেই বিশ্বসেরা লেখককে এড়িয়ে যাওয়ার যে অপরাধ সুইডিশ একাডেমি করে আসছে সে অপরাধের বোঝা কেবলই ভারী হচ্ছে। এবারের পুরস্কৃত কথাসাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো এটাকে আরও স্পষ্ট করেছেন যখন গণমাধ্যমে বলেছেন ‘অ্যাপোলজি টু মার্গারেট অ্যাটউড’।—আমি মার্গারেট অ্যাটউডের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী যে, তিনি পুরস্কারটি পাননি। আমি একান্তভাবে ভেবেছিলাম তিনিই শিগগিরই পুরস্কারটি পেতে যাচ্ছেন। কাডানার দ্য গ্লোব-এর প্রশ্নকর্তাকে বলেছেন, ‘আমি খুব গর্বিত যে, এলিস মুনরোর (২০১৩-র নোবেল বিজয়ী কানাডিয়ান গল্পকার) পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারছি। তিনি আর একজন কানাডিয়ানের কথা বললেন, লিওনার্ড কোহেন, বব ডিলানের সমসাময়িক সংগীতশিল্পী ‘আমার বড় হয়ে ওঠা এবং লেখালেখি বেছে নেওয়াতে তার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। যেদিন তার মৃত্যুর খবর পেলাম (মৃত্যু ৭ নভেম্বর ২০১৬, জন্ম ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪) আমার জন্য সেটা ছিল খুব কষ্টের দিন।’

১৯৭৬-এর নোবেল বিজয়ী আমেরিকার কথাসাহিত্যিক মশ বেলো নোবেল প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমার ভিতরের শিশুটি আনন্দিত’ কিন্তু পরিণত মানুষটি সন্ধিহান।’ বেলোর মনে হয়েছে এ পুরস্কার প্রাপ্তির সঙ্গে এক ধরনের গোপন অবমাননাও জড়িয়ে আছে। দেরিতে হলেও বব ডিলান পুরস্কার গ্রহণ করে যে ‘অ্যাকসেপটেন্স স্মিচ’ দিয়েছেন তা স্পার্কসনোটস থেকে নকল করা—এরপর সন্ধিহান দশা আরও তীব্র হওয়ার কথা। কাজুও ইশিগুরো গার্ডিয়ানকে বলেছেন, আমার ভিতরের একাংশ নিজেকে প্রতারক ভাববে, একাংশ খারাপবোধ করছে কারণ অনেক জীবন্ত লেখককে ডিঙিয়ে আমাকে পুরস্কারটি দেওয়া হচ্ছে—এক্ষুণি যাদের  নাম মনে হচ্ছে—হারুকি জুরাকামি, সালমান রুশদি, মার্গারেট অ্যাটউড, কারম্যান ম্যাককার্থি—আমার ভিতরের একাংশ মনে করেছে এর জন্য আমার এখনো বয়স হয়নি, কিন্তু তখনই মনে হয় আমি ৬২, নোবেলের জন্য সম্ভবত এটাই গড় বয়স।

দুই

ইশিগুরোর জন্ম ৮ নভেম্বর ১৯৫৪ জাপানের নাগাসাকিতে। যখন ইংল্যান্ড চলে আসেন ১৯৬০ সালে বয়স পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। ‘নাগাসাকি আমার কাছে অস্পষ্ট কোনো চিত্রকল্পের মতো নয়, আমার বেশ মনে পড়ে এটা আমার জীবনের সত্যিকারের একটি টুকরো।’ পাঁচ বছরের বালক তার বড় বোন ফুকিমো, যুক্তরাজ্যে  আসার পর আরও একটি বোনের জন্ম হয় ইয়োকো নাম, নাগাসাকি থেকে গিল্ডফোর্ডে সুমদ্র বিজ্ঞানী বাবার সঙ্গে। বাবা সিজো ইশিগুরো দুই বছরের একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করতে এসেছেন। বাড়ি থেকে আত্মীয়স্বজনরা বাচ্চাদের পড়াশোনার সামগ্রী পাঠাতেন, যাতে সঠিকভাবে তৈরি হয়ে জাপানে ফিরতে পারে। কাজু ইশিগুরোর বয়স যখন পনেরো, থেকে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তার বাবা টোকিওতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ প্রত্যাখ্যান করলেন। তার বাবা-মা এখনো গিল্ডফোর্ডের আলেয়ার মধ্যেই বাস করেন। তারা এখনো নিজেদের জাপানি ভাবেন এবং ইংলিশদের নিয়ে গপ্পো করতে বেশ মজা পান।

তিনি ভর্তি হলেন সেখানকার সরকারি প্রাইমারি স্কুলে (স্টাফটন প্রাইমারি স্কুল)। হেডমাস্টার ছিলেন বেশ প্রগতিশীল, যা ইচ্ছা তাই পড়ার স্বাধীনতা দিলেন এবং ইচ্ছামতো পড়াটাকে উত্সাহিতও করলেন। ফলে ইশিগুরো গণিত পড়লেন সামান্যই। গোয়েন্দা গল্প ভূরিভূরি। এরপরও যখন ওয়ার্কিং গ্লামার স্কুলে ভর্তির ইন্টারভিউ দিলেন, অবলীলায় সুযোগ পেয়ে গেলেন। মধ্যবিত্তের যে শিশু সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছে তাকে নেওয়ার এটা একটা ভালো পদ্ধতি। কিছুটা সময় তিনিই স্কুলের একমাত্র অ-সাদা ছাত্র। কিছু সময় তাকে ডাকা হতো ‘ইশ দা ওয়াগ’ তারপর কেটেছেঁটে ইশদার। আর এখন তো পৃথিবীজুড়েই তাকে ইশি কিংবা ইশ।

ইশিগুরোরা নিয়মিত চার্চে যেতেন—পরে তিনিই চার্চের সংগীত দলের নেতা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাত্র পনেরো বছর পর যে উদারতা ও সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাব নিয়ে চারপাশের লোকজন এগিয়ে এসেছে তাতেই তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তাদের বাড়িতে এবং বাইরে যুদ্ধের আলাপ হতো। তার মা শিজুকো নাগাসাকিতে বিস্ফোরিত আণবিক বোমা থেকে বেঁচে যাওয়াদের একজন। তার বযস তখন ১৮ বছর। আর একবার এক প্রতিবেশী তার মাকে ঝাঁজালো কণ্ঠের কথা শুনিয়েছেন, কারণ তিনি জাপানে যুদ্ধবন্দী ছিলেন। ইশিগুরো সিরিয়াস ধরনের গিটার শিল্পী। তার সংগ্রহে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র। এমনিতেই চুপচাপ ধরনের হলে কি হবে গানের প্রশ্ন আসলে তিনিই মিউজিক ডিরেক্টর, তিনি শ্রোতৃমণ্ডলীকে ভালোভাবেই আমোদিত করতে পারতেন। ১৯৭৩-এ স্কুল ছেড়ে এক বছর আমেরিকাতে হিচ-হাইকিং করে বেড়ালেন।

তার পেশা কী হবে এ নিয়ে ভাবতে থাকেন। মিউজিশিয়ান হওয়ার স্বপ্নটা ভেস্তে গেল। তারপর রেডিওর জন্য নাটক লেখার কথা ভাবলেন এবং লিখলেনও। এটা প্রত্যাখ্যাত করল বিবিসি রেডিও।

‘তারপর হঠাৎ ঘটনাচক্রে আমার চোখে পড়ল একটি ছোট বিজ্ঞাপন। ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়া ইউনিভার্সিটিতে ম্যালকম ব্র্যাডবারি সৃজনশীল লেখালেখিতে এমএ’র কোর্স চালাচ্ছেন। এখন এটা বেশ বিখ্যাত কোর্স। সে সময় এটা বেশ হাস্যকর এক ব্যাপার ছিল। আমেরিকান ধরনের ব্যাপার। আমি পরে আবিষ্কার করলাম আগের বছর কোর্সটি করানো হয়নি, কারণ কোর্স চালানোর মতো পর্যাপ্তসংখ্যক প্রার্থী আবেদনই করেনি। কেউ একজন জানালেন এক দশক আগে আয়ান ম্যাকইউয়ান এ কোর্স করেছেন। আমি ভাবলাম সে সময় তরুণ লেখকদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে মজার। তবে আমার মূল আকর্ষণ ছিল এক বছরের জন্য ইউনিভার্সিটিতে ফিরে যাওয়া। পুরো খবচই সরকারের, আর কোর্স শেষে আমাকে জমা দিতে হবে তিরিশ পাতার একটি ফিকশন। আমার আবেদনের সঙ্গে রেডিওর জন্য লেখা নাটকটা গেঁথে ম্যালকম ব্রাডবারির কাছে পাঠিয়ে দিলাম।

যখন আমাকে নির্বাচন করা হলো, অবাকই হলাম, কারণ ব্যাপারটা হঠাৎ করে সত্যি হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম সেখানকার লেখকরা আমার কাজটি খুঁটিয়ে খুুঁটিয়ে দেখবে। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা হবে আমার জন্য অবমাননাকর। কর্নওয়ালের মাঝামাঝি একটি জায়গা আগে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র ছিল। সেখানে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে বলে একজন জানায়। আমি দেখা করে এক মাসের জন্য একটা জায়গা চাই। আমি নিজেকে লিখতে শেখাব। এটা ১৯৭৯’র গ্রীষ্মকালের ঘটনা। তখনই আমি প্রথমবারের মতো গল্পের কাঠামোর কথা ভাবি। গল্পের বক্তব্য, কেমন করে গল্প বলা— এসব নিয়ে অনেক সময় কাটিয়ে দিই। শেষে দেখানোর মতো দুটো গল্প আমার লেখা হয়। তখন আমি আরও নিরাপদবোধ করি।

আমার চারপাশের যে পৃথিবী সেখান থেকে যখন সরে এলাম, আমি আবিষ্কার করলাম আমার কল্পনা জীবন্ত হয়ে উঠছে। আমি যখন একটা গল্প লিখতে শুরু করলাম : ‘আমি ক্যামডেন টিউব স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে ম্যাগডোনাল্ডস রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। আমার বন্ধু হ্যারি ইউনিভার্সিটি থেকে সেখানে এসেছে’— এরপর কী লিখব তা আর ভাবতে পারছি না। কিন্তু যখনই জাপানের কথা লিখলাম, কোনো একটা তালা খুলে গেল। আমি আমার ক্লাসে দেখিয়েছি, এমন একটা গল্প উপস্থাপন করেছি, বোমা পড়ার সময়কার নাগাসাকিতে আর এক তরুণীর প্রেক্ষাপট থেকে গল্পটা বলা হয়েছে। আমার সহপাঠী বন্ধুরা আমার আত্মবিশ্বাস দারুণভাবে বাড়িয়ে দিল। সবাই বলল, এ জাপানি বিষয় খুবই উদ্দীপক হবে এবং তোমাকে অনেকদূর নিয়ে যাবে। সে সময় আমি (প্রকাশনা সংস্থা) ফেবার থেকে চিঠি পেলাম তাদের নতুন লেখক পরিচিতি সিরিজের জন্য আমার তিনটি গল্প মনোনীত করেছে; এ সিরিজের সুনামের রেকর্ডটি বেশ বড়। আমি জানি টম স্টপার্ড এবং টেড হিউজেসের মতো লেখক এভাবেই আবিষ্কৃত হয়েছেন।

তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য পেইল ভিউ অন হিলস’ সে সময়ের লেখা। বইটি শেষ করার জন্য ফেবার অ্যান্ড ফেবারের রবার্ট ম্যাকক্রাম প্রথম কিস্তির আগাম টাকা পাঠালেন। গল্পটি একটি মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুর কম বয়সী মাকে নিয়ে, যে তার প্রেমিক ও সন্তানকে নিয়ে দ্বিধায় আছে—একবার বলছে আমার জীবনটা বাচ্চার জন্যই নিবেদন করব, আবার বলছে আমি ঐ মানুষটার প্রেমে পড়েছি আর বাচ্চাটাই যত ঝামেলা। লেখক যখন ইংল্যান্ডের গৃহহীনদের সঙ্গে কাজ করতেন তখন এ ধরনের অনেক মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন। ক্লাসমেটরা যখন তার জাপানি প্রেক্ষাপটের গল্প নিয়ে উচ্ছ্বসিত, তিনি তার কর্নওয়ালের গল্পটাকে তুলে নিয়ে জাপানে স্থাপন করেন। দৃশ্যপট পাল্টে গেল, ভিন্ন একটা গল্প ভিন্ন আঙ্গিকে বেরিয়ে এলো।

তিন

১৯৮৩ সালে ইশিগুরো শ্রেষ্ঠ তরুণ ব্রিটিশ লেখকদের কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে দলভুক্ত হলেন; কিন্তু তখনো তিনি ব্রিটিশ নাগরিক নন। সে বছরই শেষের দিকে বাস্তব কারণে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ‘আমি ভালোভাবে জাপানি বলতে পারতাম না, পাসপোর্ট আইন বদলে যাচ্ছে, আমি নিজেকে অনুভব করলাম ব্রিটিশ। আমার ভবিষ্যৎ ব্রিটেনেই। তাহলেই আমি এখানকার সাহিত্য পুরস্কারের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হব। কিন্তু আমি জানি জাপানে আমার স্বজনরা এখনো আমাকে তাদেরই একজন বলে জানে। জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি জুরাকামি স্বীকার করেছেন, ইশিগুরোকে জাপানিরা পছন্দ করে এবং তার অনেক পাঠক রয়েছেন সেখানে।

জাপানে জন্ম হলেও ইশিগুরো মোটেও জাপানি লেখক নন। শৈশবে ইংল্যান্ডের সনাতন ইংরেজি শিক্ষা থেকে শুরু করে অ্যাঞ্জেলা কার্টার ও রয় ব্র্যাডবারির সৃজনশীল পাঠদান শেষ পর্যন্ত তাকে ইংরেজ লেখকেই পরিণত করেছে। দস্তয়ভস্কি, শেখভ, ডিকেন্স কিংবা শার্লট ব্রন্টি তার কল্পনার রাজ্যকে সম্প্রসারিত করেছে, যার প্রকাশ তার পক্ষে কেবল ইংরেজিতেই সম্ভব। জাপানি ভাষায় নয়।

হিতোশি ওশিমা অবশ্য জোর দিয়ে ইশিগুরোর ওপর জাপানি প্রভাবের যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। জাপানি তার মাতৃভাষা, এমনকি স্মৃতি থেকে সে ভাষা চলে গেলেও তা অবচেতন থেকে মুছে যাওয়ার কথা নয়। তিনি ব্রিটেনে জাপানি পরিবারে বড় হয়েছেন, ইংরেজ পরিবারে নয়। মা-বাবার সংসারের ভাষা আদ্যোপান্ত জাপানি— ইশিগুরো নিজেও বলেছেন, তারা ‘টিপক্যাল জাপানিজ’।

ইশিগুরোর প্রথম দুটি উপন্যাস অ্যা পেইল ভিউ অব হিলস (১৯৮২) এবং অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড (১৯৮৬) জাপানের পটভূমিতে রচিত এবং তার উপন্যাসে জাপানের ল্যান্ডস্কেপের যে বিবরণ তা জাপানি নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক কেনজবুরে ওয়ে-কেও বিস্মিত ও মুগ্ধ করেছে। নাগাসাকিতে বোমা বর্ষণের নয় বছর পর ইশিগুরোর জন্ম— এ ঘটনা কি তার লেখার ওপর কোনো ছায়া ফেলেছে? এর জবাবে তিনি বললেন, শুনতে কেমন লাগবে—আমি সত্যিই বুঝিনি আণবিক বোমা বর্ষণের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নাগাসাকি কেমন করে হলো। কিছুকাল পর আমার জানা হয় যে, পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল দুটি স্থান আণবিক বোমায় আক্রান্ত হয়েছে—হিরোশিমা ও নাগাসাকি। আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম বয়স চার-পাঁচ বছর— তখন এসব কথা শিশুদের কেউ জিজ্ঞেস করত না। তুমি কি জান তখন কী হয়েছিল?

তারপরও আমার মনে পড়ে লোকজন এ নিয়ে আলাপ করত— এটা গোপনীয় কিছু ছিল না। আমি কখনো নাগাসাকির সঙ্গে আণবিক বোমাকে জড়াইনি। আমার কাছে নগাসাকির বাইরে আর যতকিছু আছে সবই। আমার বর্ণিল স্মৃতিতে রয়েছে আমাদের বাড়ি, আমার খেলনা, আমার কিন্ডারগার্টেন। আমার সবকিছু মনে পড়ে। কিন্তু আণবিক বোমার সঙ্গে আবেগপ্রবণভাবে আমি কখনো নাগাসাকিকে জড়িয়ে নিই না!

এ প্রজন্মের শিশুরা দেখেছে টুইন টাওয়ারের ধস— সেখান থেকে ইরাকের যুদ্ধ লাগা। ইশিগুরোর মতামত এ ব্যাপারে স্পষ্ট; কোনোভাবেই ইরাকে যুদ্ধ বাঁধানো অনিবার্য ছিল না। আর নয়-এগারোর টুইন টাওয়ারের ঘটনার সঙ্গে সাদ্দামের কোনো সম্পর্ক নেই! দুটোর মধ্যে কোনো যোগাযোগই ছিল না। পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকজন নেতা তাদের বাতিকগ্রস্ততা থেকে এটা ঘটিয়েছেন। তারা কেবল ইরাক আক্রমণের সুযোগ খুঁজছিলেন। নয়-এগারোর ঔদ্ধত্য কাদের, তা না বের করে আরও একধাপ পিছিয়ে গিয়ে ইরাকে যুদ্ধ বাঁধিয়ে শক্তি নিঃশেষ করল। আফগানিস্তানে বা অন্য কোথাও আল কায়েদা আছে কিনা তা খুঁজতে গেল না... ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা কী ভয়ঙ্কর সর্বনাশ যে করেছে তার খতিয়ান এখনো নেওয়া হয়নি।

কাজুও ইশিগুরোর উপন্যাস : অ্যা পেইল ভিউ অব হিলস (১৯৮২), অ্যান আর্টিস্ট অব দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড (১৯৮৬), দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে (১৯৮৯), দ্য আনকনসোলড (১৯৯৫), হোয়েন উই ওয়ার অরফ্যানস (২০০০), নেভার লেট মি গো (২০০৫), দ্য বেরিড জায়ান্ট (২০১৫)। তার লেখা চিত্রনাট্য চারটি, ছোট ফিকশন পাঁচটি এবং বেশকটি স্মরণীয় গানের তিনি গীতিকার।


আপনার মন্তব্য