শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৩০

ভাষার বেগ

শামীম আজাদ

ভাষার বেগ
অলংকরণ : শাকীর

‘যত দূরেই যাই না কেন

সেই পিচ্ছিল ঘাট, নোংরা উঠান,

এঁদো পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়

আর ভস্ম হয়ে যাওয়া তাদের দীর্ঘ ছায়া

... দেশবাসী কৃতিসন্তানের আলোকিত সভাকক্ষ

আমাকে স্পর্শ  করবে...’

আমার এই উচ্চারণ, ওই পঙ্ক্তিমালা একুশকেন্দ্রিক চেতনার প্রতিসরণে প্রবাস থেকেই উচ্চারিত। বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্রের বাইরেও যেভাবে নিজ দেশ ব্যাপ্ত হয়ে আছে, তার যে বির্মূত মানচিত্রের মধ্যে আমরা সর্বদা বাস করি তা থেকে  আমরা আমাদের আলাদা করি না। দেশ দূরায়ত নয় কখনোই। তাই ঊষর-মরু ধূসর-আকাশের নিচে অথবা বরফের ছুরি মারা শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে, অথবা সূর্যের ব্যাপক আক্রমণে দেহ গলিয়ে চূড়ান্ত পিপাসার্ত হয়েও অনাবাসী বাংলাদেশিরা একটি বার একুশে ফেরুয়ারিতে শহীদ মিনারের পাদদেশে সমবেত হন।

আমার যাপিত জীবনের পঞ্চাশভাগ বাংলাদেশ ও পঞ্চাশভাগ ইংল্যান্ডে কেটেছে। ভাষা ও ভাষাকেন্দ্রিক কাজেই আমি জীবিকা নির্বাহ করেছি এবং এখনো করছি। অভিবাসিত সমাজের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি কিভাবে লেখার ভাষা থেকে শুধু মুখের ভাষা হয়ে এক সময় তা শুধুই দাদি-নানির ভাষা হয়ে যাচ্ছে। কখনো কখনো বাবা-মা তা বোঝেন, কিন্তু নিজ ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সে ভাষা বলেন না। বলেন এমন একটি ভাষা যা মান ভাষা। অথবা যে ভাষা সেখানকার লিংগুয়াফ্রাঙ্কা। তাঁরা মনে করেন এতে তাদের সন্তান সে দেশ বা রাষ্ট্রে নিজাসন দ্রুত নিশ্চিত করতে পারবে। আসলে তিন প্রজন্ম এক ভাষা ব্যবহার না করলে সে ভাষা বিপদাপন্ন হতে বাধ্য।

আমার পিতামহ ও পিতামহীর ভাষা ছিল সিলেটী। সিলেটের আদি ভাষা নাগরী, এক সময় কথ্য ছিল, লেখ্য ছিল, ছিল তার ছাপাখানা। আমি নিজেই আমার নানি-দাদিকে তা পড়তে দেখেছি। স্নানশেষে বা গোধূলিবেলায় মোড়ায় বসে পড়তেন আমার খালার শাশুড়ি। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ধরুন আরও পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কথা বলছি। কখনো পাশে গিয়ে কান মেলে দিলে মনে হয়েছে এ আমাদের কথ্য সিলেটিরাই একটু ভিন্নরকম। যেমন সেকসপিরিয়ান ইংরেজি শুনলে বোঝা যায় তা ইংরেজি কিন্তু সেকসপিয়রই স্কটের ভাষ্যে পড়লে মনে হয় তা যেন সহজ ককেশিয়ান ইংরেজি। 

দেখেছি বিলেতের জুইশ বন্ধুরা হানুকা উদযাপন থেকে ফিরে হায় হায় করছে, হারিয়ে গেল আমাদের বিব্লিক্যাল হিব্রু। আমাদের ছেলেমেয়েরা একদিন চিনতেই পারবে না যে, এ আমাদের ভাষা ছিল। তেমনি মিডল ইংলিশ বা চসারিয়ান ইংরেজির ওপর উঠে এসেছে সেকসপিয়রের প্রাথমিক আধুনিক ইংরেজি। আর ইজিপশিয়ান ভাষা, হিরোগ্লিফিক্স এখন তো গবেষণাকর্ম ছাড়া ব্যবহৃতই হয় না। আমাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতের যুগে এর যে রূপ ছিল সে প্রাকৃত রূপেই প্রচলিত ছিল। আবার সে প্রাকৃতেরই হয়েছে বিশেষ প্রতিরূপ। বাংলাদেশের প্রাকৃত বাংলারও ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে নানা রূপ, বলা, কওয়া। 

ভাষা-প্রবাহে, বা প্রবহমান ভাষায় শূন্যস্থান বলে কোনো কথা নেই। এর যাত্রাপথে যাহা পড়ে তাহাই ভাষার খাদ্য। সে খাদ্য পুড়িয়ে ভাষার নিঃশ্বাস, তেল ও তনু। যা পারা যায় তা নিয়ে মরিয়া হয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করে ভাষা। তারপরও পৃথিবী থেকে প্রতি ১৪ দিনে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এ হচ্ছে ভাষার কারবারি বৈশ্বিক সংস্থা গ্লোবাল লিংগোর ভাষ্য। স্পঞ্জের মতো তার শুষবার ক্ষমতা।

আমার কথা এখানেই। নিজ ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে তার একটি নিয়মিত প্লেটের জোগান থাকলে প্রথমে সে তাই খাবে। পরে মাঝে মধ্যে স্ন্যাক্স হিসেবে এখন সেখান থেকে ঝালমুড়ি, বার্গার, পিৎজা বা পিয়াজু খেলেও ভাষার স্বাস্থ্যটা অন্তত টিকে থাকে। জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাক্সিডেন্ট ও ইমার্জেন্সিতে যেতে হয় না। যাহা পরীক্ষিত সংযোগ সফল তাকেই রাখতে হয়। তা দিয়েই মুছে ফেলতে হয় বর্জ্য। তাহাই হতে পারে ভাষার সূচক। সমভাষীদের মধ্যে ভাষা হাঁটে এভাবেই। মানুষ নিজ গরজেই এই প্রাকৃত ধারা অব্যাহত রেখেছে। ভাষার নমুনা যত্ন করে তুলে নিয়ে রাখার দায়িত্ব একার নয় নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠান, টিভি, রেডিও, সংবাদপত্রের এবং রাষ্ট্রের।

দেশের ভিতরে থাকলে দেখা যায় এর অসুখ-বিসুখ। আর দেশান্তরী হলে দূর থেকে দেখা যায় তার প্রকৃত রূপ। তাই বহির্বিশ্বের বাঙালিরা বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি ও স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে  শুরু করলে আর থামেন না। সেটি চলতেই থাকে। আমি সেই চলার সঙ্গে দেশের চলার তুলনামূলক ভাবনা থেকেই বলছি।

‘শোনা’ থেকেই মানবের বলা। বলা থেকে পড়া। পড়া থেকে লেখা। প্রয়োজনের নিমিত্তেই ‘বলা’ হয় প্রভাবিত। বিশ্বায়নের বায়ুতে কিছু লুট হয়, কিছু নতুন জুটে। আর এ লুটপাটের প্রক্রিয়া চলমান। তাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনেক। লেখকদের দায় আরও। ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করলে নিজ দেশের ভাষা বাদ দিয়ে নতুন সে ভাষা একটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা দেয়। কিন্তু দেশের মধ্যে তার দরকার কী? দেশে ‘শিষ্ট ভাষা’ বা মানভাষার প্রতি মিডিয়া ও মানচিত্রের সরে যাওয়া কেন ভেবে পাই না।

আমার সাহিত্যকর্ম দু ভাষায়। আমার পরিচিতি বাঙালি। দেশের সঙ্গে এই বাঙালি ‘আমি’র যোগাযোগটা বজায় রাখি প্রাকৃত এবং প্রমিতে। লিখতে প্রমিত বা মান ভাষা আর কথা বলতে প্রাকৃত বা প্রান্তজনের ভাষা। কিন্তু সারাক্ষণই মনে মনে, বাইরে ও ভিতরে বলে চলেছি একটাই ভাষা-বাংলাভাষা। তবে এই থাকা না থাকার কালে আমার বলার মধ্যে ডায়াস্পোরার কুটো, কষ, ফুল, ফসফরাস, লেগুন ও লবঙ্গ এসে পড়েছে। তাই সজাগ থাকতে হয় সেই বিশেষ প্লেটের প্রতি যা কিনা আমার ভাষার সূচক। দরকার হলেই হাতে তুলে নিই অভিধান।

আমি দেশেও কাজ করি, পড়াই, স্টোরিটেলিং বা গল্প বলার প্রশিক্ষণ দিই, কবিতা পারফর্ম করি। দুপায়ে দুনৌকা না চলার মিথ ভেঙেছি। ৩০ বছর ধরে আমার দুটোই চলছে। একটি ভাষিক জনগোষ্ঠীর অভিভাসিত মানুষ বলে মর্মে মর্মে বাজে আমার বাংলা ভাষা। বুঝি ঐ আমার শক্তি, ঐ আমার বল ও ঐ আমার মূল প্লেট। আমি সে প্লেট তাজা সরবরাহে সাজিয়ে রাখতেই দেশে গিয়ে তরুণদের সঙ্গে কাজ করি। তারুণ্যের নতুন নতুন উদ্যোগ ও সাহসের বর্হিপ্রকাশে বিস্ময়ে হতচকিত হয়ে যাই। রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়াই তাদের ব্যক্তিগত সাধনাগুলো চোখে পড়ার মতো। এবং সব কিছুর পেছনে রয়েছে তাদের দেশজ ভাবনা। সংগীতে ও সাধনায়, পোশাকে ও পরিবেশে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বাসনায়, খেলাধুলা ও চিত্র কলায়, পরিচিতি ও পর্যটনে সর্বত্রই কেবল মাটির টান। বাংলাদেশের মেরুদণ্ড ও মজ্জা যে কৃষকের নির্মাণ, বাংলাদেশ মানে যে গ্রাম, এ দেশের সুর মানে যে লোকসংগীত, কাহিনি মানে বাংলার পুরাণ, সুতা মানেই সুতি আর বিভা ও বৈভব হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা-এর আর কোনো ব্যত্যয় হয়নি। আর এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখতে হলে দেশে আসতে হয় নববর্ষ উদযাপনে। সেই যে পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র সংগীত বন্ধ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করে রমনার বটবৃক্ষের নিচ থেকে ছায়ানটের আয়োজনে শুরু করেছিল পয়লা বৈশাখ ও আন্দোলন আজ তা অন্যতম জাতীয় উৎসব।

দেশে এলে দেখি তারুণ্যের নতুন নতুন উদ্যোগ ও সাহসের বহিঃপ্রকাশ। তাদের ব্যক্তিগত সাধনাগুলো চোখে পড়ার মতো। খাবার দোকান, ভাস্কর্য, রাস্তার সজ্জা, চীনমৈত্রী হলের বিশাল সাংস্কৃতিক আয়োজন, একুশের বইমেলা সব কিছুর পেছনেই দেখি দেশজ ভাবনা। সংগীতে ও সাধনায়, পোশাকে ও পরিবেশে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বাসনায়, খেলাধুলা ও চিত্রকলায়, পরিচিতি ও পর্যটনে সর্বত্রই কেবল দেশি। দেশি মানেই রুচি। বাংলাদেশের মেরুদণ্ড  ও মজ্জায় কৃষক, বাংলাদেশ মানে যে গ্রাম আর এদেশের সুর মানে যে লোকসংগীত, কাহিনী মানে বাংলার পুরাণ, সুতা মানেই সুতি আর বিভা ও বৈভব হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার আর কোনো ব্যত্যয় নেই।

আর এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখতে হলে দেশে আসতে হয় নবর্বষ উদযাপনে। সেই যে রবীন্দ্র সংগীত বন্ধ করার চেষ্টার বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করেছিল আর রমনার বটবৃক্ষের নিচ থেকে শুরু হয়েছিল ছায়ানটের আয়োজনে পয়লা বৈশাখ উদযাপন আজ তা অন্যতম জাতীয় উৎসব। কিন্তু সব কিছুই মনে হয় পারফর্মেন্স ওরিয়েন্টেড স্বল্পমেয়াদি। সব যেন স্কিন ডিপ-ঘনত্ব ত্বকগভীরতা অবধি। উপরে উপরে যা চোখ ধাঁধায় কিন্তু উপলব্ধির ভিতরে বাসা বাঁধে না। মনে হয় যেন সব ইন্দ্রিয় ভেদ করার কোনো চেষ্টা নেই। সবই ব্যয়বহুল কিন্তু স্বল্পমেয়াদি। না হলে যে ভাষা অর্জনের লড়াই থেকে যাত্রা শুরু করে এ দেশ অর্জন তার প্রতি নেই কেন দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা চিন্তা।

আমি থমকে গেছি এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ভাষা শুনে। সব অব্যয় ব্যয় হয়ে ইংরেজি এসে গেছে। এখন; কিন্তু, তো, কেনো, কি, উফ হয়ে গেছে-বাট, সো, হোয়াই, হোয়াট, আউচ। খালা, মামা, চাচি, চাচা, খুড়া, জ্যেঠা, ফুপু সব হয়ে গেছে আঙ্কেল আর আন্টি। তেমনি মোবাইলে আছে আরেক ভাষা। কিছু কিছু রেডিও স্টেশন, টিভি নাটক সে সব স্নায়ু-অবশ করা শব্দগুলো সাদরে তুলে এনে বাজিয়ে চলেছেন।

ভাষা তো পোশাকের মতো, তার পকেটে পাথর ভরলে তা  হাঁটলেও বেশি দূর যেতে পারবে না। পাথর বলে কথা। ফুল বানিয়ে সে পাথরই গুঁজে দিয়েছে আমাদের কিছু গুরু! আর তাই পরে পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের এই প্রজন্ম। এ কেমন জামা যে জানাজা থেকে জানজট, নাটক থেকে নৃত্য, সংসদ থেকে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, বক্তৃতা থেকে বঙ্গভবন! সবই এক? একি আলামত! হা প্রমিত! হা শিষ্ট কথন! আমাদের এ অপভাষা ক্ষয় করছে ছেলেমেয়েদের লয়। 

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রাকৃতের এই স্বভাব নিয়ে লেখকেরই প্রধান বিপদ। তার তো লিখতে হয়। আর তিনি যা লিখেন তাই সবাই পড়ে। আর পড়ে পড়েই ভাষা বেছে নেন অনেকেই। তাই ধারণা করি তাঁরই দায়িত্ব বেশি। তাঁর লেখা থেকেই তো নাটক, চলচ্চিত্র, গান। কারও দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করার আমি কে? আমি তো সে দলেরই একজন।

আমাদেরই ভাষা-সংগ্রামের কারণে ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর বিশ্বের সব মাতৃভাষার দিকে সবার নজর পড়েছে-কেবল আমরা ছাড়া। এলোমেলো অবিবেচনাপ্রসূত শব্দ ব্যবহারে মহাক্ষতির আশঙ্কা আছে।  ভাষার বেগ বুঝে আবেগী হলে নিজেদেরই ক্ষতি। বিব্রত না হয়ে বিক্ষিপ্ত না হয়ে ভাষার এই পথগুলোকে একটি পথে মিলিয়ে নেওয়ার কাজ করার কথা মনে করার মাস এটি। আসুন, সবাই মিলে তাই করি।

 


আপনার মন্তব্য