শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৪৯

বিমার

শাহ্‌নাজ মুন্নী

বিমার

সেইবার বছরটা শুরুই হয়েছিল যতসব অঘটন দিয়ে, এক ভোরে হঠাৎ কাজিবাড়ির পুকুরে বুক চিতিয়ে মরে ভেসে উঠল শত শত বর্ণহীন মাছ, বিকালে ঝিরঝির বৃষ্টিতে গোরস্থানে লেউক্যার বুড়ি মাকে কবর দিতে গিয়ে অকস্মাৎ বজ্রপাতে পুড়ে ঝলসে গেল গাঁয়ের তিন-তিনজন জবরদস্ত জোয়ান মর্দ পোলা, সেই ঝলসানো লাশ যারা দেখল তাদের চোখে ঘুম যেন হারাম হলো, চোখ বন্ধ করলেই তারা শিউরে উঠত ভয়ে, কবিরাজ মশাই কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে সেইসব ভয়ার্তের কয়েক দিন অজ্ঞান করে রাখলে ধীরে ধীরে তারা সেরে ওঠে। এত সব দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পালবাড়ির বাগানে তরতরিয়ে ওঠা যুবতী লাউগাছগুলো দুয়েকটা কচি লাউয়ের কড়া ও হলুদ ফুলসহ এক তেতে ওঠা দুপুরে প্রথমে নেতিয়ে পড়ল, পরে শুষ্ক বিবর্ণ হতে হতে যেদিন একেবারেই মরে গেল সেদিন রাতেই সমস্ত শরীরজুড়ে গুটি উঠল মনোরঞ্জন পালের বড় ছেলের-

শুরুটা এভাবেই, এই ঘর ওই ঘর ঘুরতে ঘুরতে ধ্বংসমগ্ন মহামারী হানা দিল ফুলমালার বাড়িতে, প্রথমে মরলো সতীন পুত, পরের দিন স্বামী, শেষমেশ যখন গলার কাঁটা, চোখের বিষ সতীনটাও মরে গেল তখন ভাঙাচোরা আর কাটাছেঁড়া ঘর গেরস্থির মায়া ছেড়ে নিজের আপন পুত্রটিকে বুকে চেপে প্রাণ বাঁচানোর অবিনাশী সাহসে ভর করে এক ভোরে ঘরের পিছনের বেড়া ভেঙে পালালো ফুলমালা। পিছন ফিরে চাইলো না একবারো, শুধু প্রসারিত সম্মুখে রুদ্ধশ্বাস ছোটা, ছুটতে ছুটতে, ফুলমালার সামনে পড়ল, হাহাকার, কাঁটাবন, বিরান-গেরাম, দাহ ও কবরবিহীন অসহায় রোগগ্রস্ত লাশ, বিলাপের সুর আর ঢেউভরা বিশাল নদী। নদীতে খেয়া পারাপার নেই, পার হওয়ার ব্যবস্থা নেই, দৌড়ক্লান্ত ফুলমালা নদীতীরে বসে পড়ে, তার শরীর বিশ্রাম চায়, চায় নৌকা আসার জন্য অপেক্ষা করতে, ফুলমালা তাই করে।

নদীর বায়ু সুশীতল এবং এতে এক ধরনের মায়া ও আদর আছে। ফুলমালার কেমন যেন ঝিমুনী আসে, সে অবসাদময় চোখের পাতা বন্ধ করে, এই অবসরে তার মধ্যে স্বপ্নের মতো রোদ্দুর আসে তারপর দুঃস্বপ্নের মতো সেই রোদ কালো কবরে ঢুকে গেলে ফুলমালার ছেলেটি খিদেয় কেঁদে ওঠে। ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে ওঠে ফুলমালা কান্নাকাতর শিশুর মুখে বুকের দুধ ঢুকিয়েই দেখে পাশের সঙ্গিনীটিকে। ধবধবে সাদা কাপড় পরা থুত্থুড়ে এক সুন্দরী বুড়ি।

-কই যাবি লা?

বুড়ি তার তীক্ষè কিন্তু ঘোলাটে চোখ তুলে প্রশ্ন করে।

‘নদীর হেই পার। আপনে?’

-আমিও

বুড়ি সংক্ষেপে জবাব দেয়। ধু-ধু প্রান্তরে একজন সঙ্গীর উপস্থিতি ফুলমালাকে নিশ্চিন্ত ও খুশি করে, কোলের শিশুটিকে ঘুম পাড়িয়ে বুড়ির কাছ ঘেঁষে আসে সে।

-আপনেরে দেইখ্যা আমার মরা দাদির কথা মনে পড়তাছে। মরণের সময় তারে শেষ দেখটাও দেখতে পারি নাই।

ফুলমালার চোখ ভিজে ওঠে। বুড়ি স্থির, তার নির্বিকার মুখে কোনো আবেগের ছাপ পড়ে না। ভেজা চোখ মুছে ফুলমালাই আবার প্রশ্ন করে,

-তোমার বাড়ি কই বুড়ি মা? কই থিকা আইছো?’

 বুড়ি মাথা চুলকায়, বলে,

-আমার বাড়ি বড় দূরে রে বেটি, আইছিও বড় দূরের মেঘগিরি পর্বত থিকা, একসঙ্গে জগতে আইছিলাম সাত বইন, সাত বিবি...’

এইখানে অকস্মাৎ কথা থামিয়ে বুড়ি উদাস হয়ে যায়, দুই পা লম্বা করে সামনে ছড়ায়, মাথা থেকে টাকুস টুকুস উকুন এনে মারে। শিথিল হাওয়ায় জলের মধ্যে দুয়েকটি কম্পন তুলে উড়ে যায় মাছরাঙা, সময় নিঝঝুম টুপটাপ ঝরে। ফুলমালা ঘুমন্ত ছেলের মুখ থেকে মাছি তাড়ায়। কোমর থেকে পুটুলী খুঁলে চিঁড়া গুড় বার করে, নিজে খায়, খুব সাধাসাধি করে বুড়িকেও যত্ন করে খাওয়ায়। বুড়ি খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করে,

-তোর বাড়ি কই?

এই প্রশ্নে ফুলমালা তার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে, আমার বাপের বাড়ি চান্নিচর, স্বামীর বাড়ি কাঞ্চনপুর। আমার বিয়ার সময় জানিই না যে ঘরে সতীন আছে, স্বামীর বাড়ি আইসা যখন সতীনের মুখ দেখলাম, তখন আমার কান্দন দেখে কে? পারলে তখনই স্বামীর ঘর ছাড়ি, কিন্তু ছাইড়া আর যামু কই, রাগে দুঃখে দিলাম স্বামীর সঙ্গে কথা বন্ধ কইরা, সব কিছুই করি, খালি কথা কই না, সতীনের সাথেই ঘর করি, সতীনটা আছিলো খারাপ মেয়ে, অপবাদ রটাইলো আমি নাকি ডাইনি...

 বুড়ি হঠাৎ হাত তুলে ফুলমালাকে থামিয়ে দিয়ে বলে

-থাম্ থাম্, এদিকে আয়, আমার পিঠটা চুলকায়া ঘামাচিগুলান মাইরা দে,

ফুলমালা ঘুমন্ত ছেলেকে মাটিতে শুইয়ে উঠে আসে বুড়ির পিছনে, হাঁটু গেড়ে বসে, পিঠ থেকে কাপড় সরিয়ে চুলকায়া দেয়, ঘামাচি খুটে, বলে- মুখে রক্ত উইঠা পাশের বাড়ির কালীপদ যখন মরল, মাগি কইল আমি নাকি অ’রে বাণ মারছি, তারপরে হের রক্ত আর কলিজা খাইছি। গেরামে যখন মহামারী লাগল সে তখন এইখানে সেইখানে বলতে শুরু করল, আমিই নাকি রোগের বীজ ছড়াইতাছি, কি সুন্দর কইরা যে ও মিথ্যা বলতে পারত যদি দেখতা! ও নাকি দেখছে অমাবস্যার রাইতে আমি ন্যাংটা হইয়া কালা কুত্তার পিঠে চইড়া জঙ্গলের দিকে গেছি আর পুরান বটগাছের শিকড় খুঁইড়া নিয়া আইছি রোগের বীজ,

বুড়ি ফোকলা দাঁতে ফিক্ফিক্ হাসে, হেসে গড়িয়ে পড়ে,

-তুই নাকি আনছস রোগের বীজ? তুই নাকি রোগের কারণ?

ফুলমালাও হাসে,

-ওই মাগি তো এই কথাই কইয়া বেড়াইত,

বুড়ির হাসির মাত্রা আর বাড়ে,

-এমুন মজার কথা শুনাইলি, দে দেখি এইবার তুই আমার মাথাটা বিলি দিয়া দে,

ফুলমালার হাত এইবার উপরের দিকে ওঠে, বুড়ির ঘন সাদা চুলে ভর্তি মাথাটা সে টেনে নেয় নিজের দিকে, আঙ্গুল চালায়,

সতীনের জ্বালা বড় জ্বালা গো বুড়ি মা, দেশ গেরামে কয় না-অস কেটে বসত করি, সতীন কেটে আলতা পরি সতীন মাগি, মুখপুড়ি...

বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যায় ফুলমালা, তার নিঃশ্বাস বন্ধ, চোখ বিস্ফোরিত যেন কোনো বিমূঢ় পাষাণ মূর্তি, অনেকক্ষণ পরে যখন তার ঠোঁট দুটো নড়ে, তখন সে ভয়ে বিস্ময়ে তোতলায়,

-ও বুড়িমা... তোমার... তোমার... মাথায়...

আরামে চোখ বন্ধ করে ঢুলছিল বুড়ি, এসব কিছুই যেন কানে যাচ্ছিল না তার, ফুলমালা জোরে ধাক্কা দেয় বুড়িকে, প্রায় চিৎকার করে বলে, তোমার মাথায় এইডা কি?

এতক্ষণে বুড়ি চোখ মেলে যেন সম্বিৎ ফিরে পায়, তারপর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, ওইটা কিছু না, ওইটা আমার চক্ষু, কি কও বুড়ি, ফুলমালা আঁতকে ওঠে, মাইন্ষের মাথায় চোখ?

-আ মরণ, বুড়ি এবার বিরক্ত হয়, সোজা হয়ে বসে, বলে,

-আমি মানুষ না, বিমার, আমি ঝোলা বিবি, ফুলমালা শুনতে পায় ওলা বিবি এবং সে কি করবে বুঝতে না পেরে কেমন নিঃসাড়, যেন ভয়ে অচেতন পথহারা পাখি কিংবা শোকাচ্ছন্ন নীরব গেরাম, হ, কইলাম না তোরে, আমরা সাত বইন, আসান বিবি, ওলা বিবি, ঝোলা বিবি, মড়ি বিবি, আজগৈ বিবি, ঝেটুনে বিবি আর বহ্ড়া বিবি-সাত বইনের কাছে আছে সাত সাতটা রোগ, দেশ যখন পাপে পূর্ণ হয় তখন শাস্তি হিসেবে আমাদের পাঠানো হয়, বুঝলি?

বুড়ি ফুলমালার হাত ধরে সামনে আনে, তার মাথায় হাত বুলায়, বলে, ডরাইস্ না বাছা, তোরে আমার পছন্দ হইছে, তোর আদর যতেœ খুশি হইছি। আমি আজকেই যামু গা, আর একজনের উপরে বিমার ঝাড়লেই এইবারের মতো আমার কাম শেষ।

ফুলমালার জিজ্ঞেস করতে গলা কেঁপে যায়,

-কারে বিমার দিবা, বিবি? কে মরব?

বুড়ি রহস্যময় হাসে, কি জানি কে? কে জানে কার আয়ু শেষ? মধ্যরাতে হুকুম আসে, মধ্যরাতেই জানা যায় সব,

ফুলমালা তাড়াতাড়ি তার ছেলেকে কোলে তুলে নেয়, উঠে দাঁড়ায়, মাথায় ঘোমাটা টানে, ‘যাই ওলা-মা ওই যে ঘাটে নাও লাগছে, যা, সুখে থাক্ তুই

বুড়ি চোখ বন্ধ করে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুলে।

ফুলমালা নৌকায় বসে বারবার চমকে ওঠে, তার মনে পড়তে থাকে বুড়ির চেহারাটা যা আসলে গিরগিটির মতো, বুড়ির পিঠের চামড়া খস্খসে যেন মাছের আঁশ আর মাথার পিছনের সেই চোখটা যেন অগ্নিবর্ণ ক্ষুধিত হা, ক্রদ্ধ কিন্তু কেমন ধোঁয়াটে ম্লান ও অপার্থিব। ফুলমালার বুক ধুক্ ধুক্ কেঁপে ওঠে, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি, সে ভাবে এবং এক কুয়াশাচ্ছন্ন ঘোরের মধ্যে ভর সন্ধ্যায় নদীর ওপারে তার খালার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। সেই রাতেই তার সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে ফুঁসে ওঠে জ্বরের ফণা। জ্বরের তপ্ত ছোবলে জর্জরিত ফুলমালা সমস্ত দৃশ্য জুড়ে বীভৎস নক্ষত্রের মতো শুধু সেই চোখটি দেখে, দশ আঙ্গুলে খড়ের মতো শুকনো খড়খড়ে চুলে বিলি কেটে হঠাৎ যার মুখোমুখি হয়েছিল সে। ভয় যেন বিষাক্ত ঠান্ডা একটি সাপ যা তার জ্বরতপ্ত শরীরকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পেঁচিয়ে রাখে। পাশে শুয়ে ছেলেটা কাঁদে চিৎকার করে।

বিধবা খালা অতঃপর শিশুটিকে নিজের কাছে নিয়ে গেলে খালিঘরে একলা পড়ে থাকে ফুলমালা, আর মধ্যরাতে ঘরের বেড়া ফুঁড়ে কেউ একজন অথবা একটি ছায়া প্রবেশ করে, ছায়াটি ফুলমালার মাথার কাছে দাঁড়ায়, ধীরে ধীরে তার কপালে হাত রাখে, একটি নিঃসঙ্গ পাখির ডানার ঝটপটানি শোনা যায়, চাঁদের উপর থেকে সরে যায় মেঘ এবং ছায়াটি হঠাৎ এক ঝটকায় নিজের হাতটি সরিয়ে নেয় ফুলমালার কপাল থেকে,

-তুই কে? ফুলমালা নাকি? তোর নাম নাকি ফুলমালা?

ছায়াকণ্ঠে বিস্মিত প্রশ্নবোধক। পাশ ফিরতে গিয়ে কঁকিয়ে ওঠে ফুলমালা, চোখ মেলে, তারপর বিষম চমকে এক ঝটকায় উঠে বসে, তুমি ওলা বিবি, না?

ফুলমালার পৃথিবী ঘুরতে থাকে, সৃষ্টি কাঁপতে থাকে এবং পর মুহূর্তে সমস্ত নিশ্চল হয়ে যায়, প্রচ- আলোড়নের পর যেন নেমে আসে বিধ্বংসী নৈঃশব্দ। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে,

-কেন আসছ ওলা বিবি, কি জন্য আসছ তুমি? মরণের বর্শা দিয়া আমারে গাঁথতে আসছো? বসন্তের গুটি দিয়া আমারে মারতে আসছ?

প্রবল জ্বরে ফুলমালা হাঁপাতে থাকে, বৃদ্ধার মাথা নিচু যেন খানিকটা হতবুদ্ধি যেন নিমগ্ন ব্যথায় কাতর, বলে, স্রষ্টা আমারে বানাইছে দুরারোগ্য দুষ্ট ব্যাধি, আমার হাতে দিছে মৃত্যুর বল্লম, মানুষের ঘরে আমি তো শুধু প্রাণ চুরি করতেই আসি, আমার সঙ্গী তো শুধু অভিশাপ আর আর্তনাদ।

ফুলমালা আর বসে থাকতে পারে না, শীর্ণ শরীর নিয়ে শুয়ে পড়ে, তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে নামে অশ্রু বিন্দু, যুগপৎ চিকচিক করে ঘৃণা ও ভয়। ওলাবিবি এবার ফুলমালার পায়ের কাছে যায়, তার আবছা আকৃতি নিজের কপালে করাঘাত করে, হায় রাক্ষুসী নিয়তি, আমার মমতাশূন্য বুকে কেন দিলি স্নেহের প্রলেপ?

বৃদ্ধা যেন কিছুক্ষণ গুনগুন করে কাঁদে, কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুক্ষণ ভাবে, তারপর বলে, যা ফুলমালা, আমার জাদুতে ঘুঘু হয়ে বনে উড়ে যা, তোর জীবন বাঁচবে, বাঁচবার এই একমাত্র উপায়,

বৃদ্ধার কণ্ঠে এইবার আশাবাদ কিন্তু তা ফুলমালার মধ্যে সংক্রমিত হয় না, সে দৃঢ় গলায় বলে, না, ওলাবিবি, পাখির জীবন থাকে শিকারির তীরের আগায়, বড় অসহায় পাখির জীবন। রোগী যেমন ঘেন্না করে রোগ, বৃদ্ধ যেমন ঘেন্না করে বৃদ্ধকাল, আমি তেমন ঘেন্না করি অসহায়ত্ব, তুমি নেও, আমার জীবন নিয়া যাও ওলা-মা...’

ঝোলা বিবি কথা বলে না, চুপচাপ যেভাবে এসেছিল সেভাবে মিলিয়ে যায়।

আবার জ্বরতপ্ত আচ্ছন্নতায় ফুলমালার দীর্ঘ সময় কাটে টুকরো টুকরো দৃশ্যের নকশা চোখে ভাসে তার। দেখে, গোবর লেপা উঠোনের কোনায় সোনালি আগুনের ফুলকী ভরা মাটির চুলায় বোরো চালের সুগন্ধী ভাত ফুটছে-মুরগির পিছনে শব্দ করে ছুটে যাচ্ছে গৌরুষদীপ্ত মোরগ-দেখে কালো বিবর্ণ অন্ধকার, আকাশ ভরা বিস্তীর্ণ মসৃণ জোছনায় ফুটে আছে একটি অমানুষিক রক্তবর্ণ চোখ, সেই শুষ্ক নির্দয় চোখে কোনো ¯ন্ডেœহ নেই।  

রাত হলে ছায়ার শরীর নিয়ে আবারও সন্তর্পণে ফুলমালার ঘরে ঢোকে ঝোলা বিবি, তুই তোর মায়ার জাল কাইটা নে ফুলমালা, নয়তো মানুষের বদলে নে অন্য প্রাণীর জীবন, আমার যাবার সময় হইছে, আমারে তুই মুক্তি দে,

-তুমি আমারে বিমার দেও ওলা-মা, তুমি কাইটা নেও তোমার মায়া,

তৃতীয় রাতের মধ্য প্রহরে আবার আসে ঝোলা বিবি, এইবার তার কণ্ঠ করুণ ও আর্দ্র শোনায়,

-পৃথিবীতে এই আমার শেষ আগমন ফুল, তাই তোরে শেষ দেখা দেখতে আসলাম।

ঘুম ভেঙে জ্বরহীন ঝরঝরে শরীরে জেগে ওঠে ফুলমালা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় এবং অচিরেই তার ভয় লাগে কেননা বুড়ির সুন্দর হলুদ মুখটা আনারসের মতো অসংখ্য গুটিতে ফুটে ভয়ঙ্কর ক্ষতবিক্ষত, একি অবস্থা তোমার ওলা-মা?

হ্যাঁরে বাছা, যে বিমার তোরে দেওয়ার ছিল তাই আমি সর্বাঙ্গে ধারণ করলাম, এইটাই নিয়ম, এখন আমার চিরকালের জন্য বিদায়।

সেই ঘটনার পর থেকে এই পৃথিবীতে কখনো গুটিবসন্তের প্রকোপ দেখা দেয়নি। মাঝে মাঝে ঝোলাবিবির যখন খুব করে এই ধুলোমাটির পৃথিবী দেখতে ইচ্ছে হয় তখন সবুজ আম পাতার উপর কালো কালো গুটির রূপ ধরে সে পৃথিবীকে দেখে, এই দেখা হয় অত্যন্ত অল্প সময়ের কারণ রোগাক্রান্ত আমপাতাটি বৈশাখি বাতাসের ঝাপটায় সহজেই ঝরে পড়ে আর মানুষের অনুভবের অতীত একটি লম্বা বেদনার্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঝোলাবিবি পৃথিবী থেকে অন্তর্হিত হয়।


আপনার মন্তব্য