শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মার্চ, ২০২১ ২৩:২৯

শমসের সাহেবের সমস্যা

মোস্তফা মামুন

শমসের সাহেবের সমস্যা

শমসের সাহেব নিজেকে বড় ভালোবাসেন। সে সবাই ভালোবাসে কিন্তু আর দশজনের সঙ্গে শমসের সাহেবকে মেলানোটা ভুল হবে। শমসের সাহেব নিজেকে এজন্য ভালোবাসেন না শমসের সাহেব লোকটা তিনি নিজে। তিনি ভালোবাসেন কারণ এই মানুষটা খুব গুণী। আর সেটা স্রেফ ধারণালব্ধ বিশ্বাস নয়, রীতিমতো বৈজ্ঞানিক উপায়ে তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তাঁর একটা বাঁধাই করা খাতা আছে। সেখানে ১-২-৩ দিয়ে পয়েন্ট আকারে বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কথা লেখা। সিদ্ধান্তগুলো দেখে আসি একে একে

১. উপরোক্ত উদাহরণ এবং আলোচনার ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি শমসের চৌধুরী একজন আদর্শ মানুষ।

২. পৃথিবীর সব মানুষ তাঁর মতো হলে আদর্শ পৃথিবী বই থেকে বেরিয়ে বাস্তবে চলে আসত।

৩. পৃথিবীর সবাইকে তাঁর মতো বানাতে জাতিসংঘ বা জো বাইডেনের সহায়তা লাগবে। বিশ্বব্যাংক বা এডিবির সহায়তায় আন্তর্জাতিক প্রকল্প তৈরি করতে হবে। তাই বলে বসে থাকলেও তো চলবে না। পৃথিবী বদলাতে না পারুন, নিজের সংসার বা আশপাশকে তো নিজের মতো আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরি করা সম্ভব।

শমসের সাহেব এখন সেই কাজে হাত দিয়েছেন। সবার আগে তাঁর শ্যালক আতিক। ও ঘুম থেকে ওঠে সকাল ১০টায়। সূর্যোদয় দেখে না। ওকে লাইনে আনতে হলে ঘুম ভাঙাতে হবে খুব ভোরে।

আতিক প্রস্তাব শুনে হাসতে হাসতে বলল, ‘শুনুন দুলাভাই দিনে দুই বেলা আমি আপনার সঙ্গে খাই। দুই বেলাই আপনার বিরক্তিকর সব গল্প শুনতে হয়। এখন সকালে ওঠলে নাস্তার সময় আরেক দফা বেশি হয়ে যাবে।’

শমসের সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আমার গল্প বিরক্তিকর?’

‘কোনো সন্দেহ নেই। খুবই বিরক্তিকর।’

‘জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি তোমার আকর্ষণ নেই জানি, তাই বলে সেটাকে বিরক্তিকর মনে করার মূর্খতায় চলে গেছ ধারণা ছিল না।’

‘দুলাভাই কেউ কেউ মূর্খ থাকলেই ভালো। মূর্খ মানুষ আছে বলেই তো জ্ঞানীরা জ্ঞান ঝাড়তে পারে।’

‘তোমার সঙ্গে আর কথা বাড়াতে চাচ্ছি না। আমার নির্দেশ হচ্ছে কাল থেকে তুমি ভোরবেলা উঠবে। সূর্যোদয় দেখবে।’

আতিক কী যেন একটু ভাবল। শেষে বলল, ‘তথাস্তু। আপনি ঘাড়ে বসিয়ে ২০ বছর ধরে খাওয়াচ্ছেন আর আপনার সামান্য একটা অনুরোধ রাখতে পারব না এটা হয় না। আমি কাল সূর্যোদয় দেখে আপনার কাছে রিপোর্ট করব।’

যদিও আতিক ২০ বছর এবং ঘাড়ে বসে খাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে কিন্তু বিষয়টা এরকম নয়। বাড়ির সবাই শমসের সাহেবকে চেনে। তিনি মোটেও আলাভোলা ধরনের বুড়ো নন। নিজের সিদ্ধান্ত প্রয়োগের জন্য প্রায় হিটলার হয়ে যান। আতিক ঘুম থেকে সকালে না ওঠলে শেফালিকে দিয়ে ওর মুখে গরম পানি ঢেলে দেওয়াও সম্ভব। এর চেয়ে সকাল বেলা ওঠে যাওয়া ঢের নিরাপদ।

বাকি সবাই আগেই শমসের সাহেবের নির্দেশনা মতো ভোরবেলায় ওঠে সূর্যোদয় দেখে থাকে। আতিক ছিল অন্য ক্ষুরে মাথা কামানো ব্যতিক্রম। এখন আর সেটা থাকল না। শমসের সাহেব স্বস্তিবোধ করেন।

আতিককে যখন লাইনে আনা গেছে তখন আজ মনোয়ারাকে লাইনে আনা যাবে বলে বিশ্বাস হয় তাঁর। বাসার সবাই সকালের নাস্তার পর এক গ্লাস করে দুধ খায়। মনোয়ারা খাবেন না। তাঁর মতে, দুধ খেলেই তাঁর নিজেকে বিড়াল বিড়াল মনে হয়। তিনি এই শেষ বয়সে বিড়াল হতে চান না।

শমসের সাহেব আতিকজনিত বিশ্বাস নিয়ে আজ আবার মনোয়ারার মুখোমুখি।

মনোয়ারা বললেন, ‘দুধ খেতে বলবে তো?’

‘সারা জীবন ধরেই বলছি। শুনছ না। দুধের মধ্যে আছে শক্তি, বিশ্বাস, ভালোবাসা। নিয়মিত দুধ খেলে দেখবে এই যে কোমরের ব্যথা কিংবা দাঁতের ক্ষয় বা পেটে মোচড় দেওয়া কিচ্ছু নেই।’

মনোয়ারা হাসেন, ‘তাহলে আর দুনিয়ায় এত ওষুধ-পথ্য কেন? ডাক্তার তো লিখে দিত, এক গ্লাস দুধ। ব্যস, শেষ।’

‘সবাই সকালে নিয়ম করে খেলে তো আর ডাক্তারের কাছে যাওয়াই লাগত না। খায় না বলেই না...’

‘সবাই তো আর দুধ খেতে পারবে না। তোমার গুচ্ছের টাকা আছে। সবার তো নেই।’

এটা অবশ্য চিন্তার কথা। তিনি নিজেও ভেবেছেন। কিন্তু তাঁর মতো জ্ঞানী মানুষের যুক্তি পেতে সমস্যা হয় না। যাদের সামর্থ্য আছে এরা সবাই যদি দুধ খায় তাহলে দুধের গুরুত্বটা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন সবাই খেতে চাইবে। আর আগ্রহী হলে টাকা কোনো সমস্যা না। চাহিদা তৈরি হলে ব্যবসার সম্ভাবনা। তখন এনজিও, ব্যবসায়ী, সরকার সবাই এগিয়ে আসবে। বাণিজ্যের সুযোগ থাকলে এ দেশে এখন টাকার জন্য কিছুই আটকায় না।

মনোয়ারা হঠাৎ হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে যাও। খাব আমি এখন থেকে। শেষ বয়সে তোমার একটা অনুরোধ রাখি।’

শেষ বয়সটা কাকে উদ্দেশ্য করে বলা? জিজ্ঞেস করলে, মনোয়ারা বলবেন, নিজেকে বলেছি। এটাও তাঁর খুব অপছন্দ। মনোয়ারার শেষ বয়স মানে তাঁর নিজের শেষটাও চলে এসেছে। তিনি মানেন না। শেষ বয়স বলে কিছু নেই। সব বয়সই কাজ করার বয়স।

একটা খটকা লাগল অবশ্য। এরা সবাই আজ এত ভালো হয়ে গেছে কেন? অবশ্য কে জানে হয়তো এতদিনে তাঁর মর্যাদা বুঝতে শিখেছে। এরকমই হয়। সক্রেটিসের কথা কি মানুষ শুরুতে বুঝতে পেরেছিল? বুঝেছে তাঁর মৃত্যুর শত শত বছর পর। সেই হিসেবে জীবিতাবস্থায় যে তার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এটা ভেবে আনন্দ হয়।

আনন্দটা অবশ্য বেশিক্ষণ থাকল না। তাঁর দুই নাতির মধ্যে প্রচন্ড মারামারি লেগে গেছে। আবীর ক্লাস সিক্সে পড়ে, পিঠাপিঠি ভাই অনীক ক্লাস ফাইভে। এরা যে কীভাবে এমন সহিংস হলো ভেবে অবাক হয়ে যান।

এখন আবীর ঘুষি মেরেছে অনীকের নাকে। জবাবে অনীক আবীরের কান দুটো এমন টেনে ধরেছে যে কাজের মেয়ে শেফালি সর্বশক্তি দিয়েও কানটা ছাড়াতে পারছে না।

শেফালি চিৎকার করে বলল, ‘দাদু হাত লাগান।’

‘আমাকে বলছ?’

‘জি আমি একটা কান ছাড়ানোর চেষ্টা করছি। আপনি এই বাম কানটা ছাড়ানোর চেষ্টা করেন।’

তিনি বিস্মিত বোধ করলেন। তার মতো বিজ্ঞ মানুষকে বাচ্চাদের কান ছাড়ানোর কাজে নামতে হবে। এসব তুচ্ছ কাজ করার সময় আছে নাকি তাঁর।

চলে যেতে চাচ্ছিলেন। শেফালি চিৎকার করে, ‘দাদু একজনের কান কিন্তু আরেকজনের হাতে চলে আসবে। বাসায় এখন আর কেউ নেই। আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’

শেফালি মেয়েটা চালু আছে। জানে এই একটা জায়গাতেই তাঁর ভয়। হাসপাতাল। খুবই লজ্জার কথা কিন্তু সত্য যে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় বাচ্চাদের মতো মিথ্যা বলে। শেষবার যে কী কা  হয়েছিল! পার্কে যাওয়ার কথা বলে তাঁকে নিয়ে বের হলো সবাই। শেষে ঢুকিয়ে দিল হাসপাতালে। রক্ত-টক্ত পরীক্ষার নামে কীসব কারবার।

তিনি তাড়াতাড়ি করে গিয়ে অনীকের হাত ধরে টানতে শুরু করলেন। আর অনীক, বিচ্ছুটা তখনই হাতটা ছেড়ে দিল। তাতে আবীরের কান বাঁচল। কিন্তু তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন বলে হঠাৎ হাত ছেড়ে দেওয়াতে তাল হারিয়ে উল্টে পড়ে গেলেন। তাঁর ভয় হলো, এই বুঝি হাসপাতাল! চোখে অন্ধকার দেখতে থাকলেন।

হাসপাতালে যেতে হয়নি। এখন বসেছেন বিচারে। দুটোকে ধরে আনা হয়েছে। দাদুকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার মতো বড় অপরাধ করেছে বলে চুপচাপ বসে আছে।

তিনি জানতে চাইলেন, ‘এই মারামারি কেন?’

অনীক বলল, ‘আমার দোষ নেই। ভাইয়া প্রথমে আমাকে ঘুষি মেরেছে।’

আবীর বলল, ‘আমারও দোষ নেই। আমার ঘুষি খেয়ে ও চুপ করে থাকলেই তো আর মারামারি হয় না। আমি মেরেছি কিন্তু মারামারিটা তো ও বাঁধিয়েছে।’

তিনি একটু মুশকিলে পড়ে গেলেন। দুজনেই তো ঠিক। বিচ্ছুদের বুদ্ধি আছে বটে।

কিন্তু এখন বুদ্ধিতে চমৎকৃত হওয়ার সময় নয়। এখন বরং সুযোগ কাজে লাগানোর সময়। সদ্য বড় অপরাধ করে হাতেনাতে ধরা পড়ায় এখন তিনি যা বলবেন শুনবে।

শমসের সাহেব ঘোষণার মতো করে বলবেন, ‘এসবকিছুর মূলে হচ্ছে তোমাদের অতিরিক্ত কার্টুন দেখা। এগুলো যুদ্ধ শেখায়, মারামারি শেখায়।’

আবীর বলে, ‘তাহলে টেলিভিশন দেখব না?’

‘দেখবে। কিন্তু আমার মতো ভালো জিনিস দেখতে হবে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখবে কিংবা সিএনএন। এগুলো দেখলে দেশ-দুনিয়া বিষয়ে শিখতে পারবে।’

‘ওগুলো তো আমরা বুঝতে পারি না।’

তিনি হাসলেন, ‘বোঝানোর জন্যই তো আমি। এখন থেকে প্রতিদিন বিকালে তোমরা আমার সঙ্গে এক ঘণ্টা টিভিতে ভালো ভালো প্রোগ্রাম দেখবে।’

তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শুধু ওরা কেন, আমরা সবাই দেখব।’

শেফালি বলে, ‘আমিও?’

‘অবশ্যই। কোনো বৈষম্য আমার বাড়িতে চলবে না। কাজের মেয়ে বলে তোমাকে নিম্নরুচির সিনেমা দেখাব আর শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখব এ হয় না। আমরা সবাই সমান। মনীষী-ঋষিরা সেটাই বলেছেন।’

আতিক একটু ব্যঙ্গের স্বরে বললেন, ‘ওনারা তো কত কথা বলে গেছেন।’

‘ওনারা বলে চলে গেছেন। আমি করে দেখাব।’

আরেকটু হলে তাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। তিনি সুস্থ এবং স্বাভাবিক আছেন-এখন বিরোধিতা করলে উত্তেজনায় ঝামেলা হতে পারে ভেবে সবাই মেনে নিল।

নিয়ম হয়ে গেল যে সবাই টিভিতে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখবে। এটাও নিয়ম হলো সকালবেলা সবাই খবরের কাগজ পড়বে। দেশ-দুনিয়ার খবর রেখে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মন তৈরি করতে হবে।

শমসের সাহেবের বাসার সবাই এখন তাঁর মতো। সকালে সূর্যোদয় দেখে। নাস্তার সময় দুধ খেয়ে স্বাস্থ্যবান থাকে। মন দিয়ে পত্রিকা পড়ে একে-অন্যের সঙ্গে দেশ এবং সমাজ নিয়ে আলোচনা করে। বিকালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি দেখে জ্ঞানী হয়।

খুবই চমৎকার ব্যবস্থা। শুধু একটাই সমস্যা, শমসের সাহেব আর বলার মতো কথা খুঁজে পান না। তিনি যা চান, সবাই তা-ই করে, কাজেই কাকে ধমকাবেন। কার কাছে জ্ঞান ফলাবেন।

সেদিন আতিককে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের সম্পর্ক প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, দেখা গেল আতিক তার চেয়ে এখন এই বিষয়ে বেশি জানে। তিনি কিছু বলতে গেলে থামিয়ে দিয়ে নিজে বলতে শুরু করল।

ভালোই সমস্যায় পড়া গেল। সবাই নিজের মতো হয়ে গেলে দেখা যাচ্ছে নিজেরই আর কোনো গুরুত্ব থাকে না।