শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৪৩

ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তাক লাগালেন

চিকিৎসাবিদ্যা পরীক্ষায় বিশ্বসেরা বাংলাদেশি ডাক্তার জেসি

জামশেদ আলম রনি

চিকিৎসাবিদ্যা পরীক্ষায় বিশ্বসেরা বাংলাদেশি ডাক্তার জেসি

ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে আমি পড়াশোনা করতাম। আমি আসলে কিছু করিনি, ইচ্ছাও ছিল না। আমি আমার যতটুকু সক্ষমতা ছিল, পড়েছি। রেজাল্টের কথা চিন্তা করে আমি পড়িনি। তবে আমি প্রস্তুতিটা নিয়েছিলাম স্ট্রংলি...

 

ইংল্যান্ডের এমআরসিপি (মেম্বারশিপ অব দ্য রয়েল কলেজস অব ফিজিশিয়ান্স অব দ্য ইউনাইটেড কিংডম) পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসক মাহমুদুল হক জেসি (ডা. জেসি হক)। সারা বিশ্বের চিকিৎসকদের মর্যাদাপূর্ণ এ পরীক্ষাটি ১ হাজার নম্বরের। এতে পাস মার্ক ৪৫৪। সেখানে ৯০৬ নম্বর পেয়ে সারা বিশ্বের সব প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে প্রথম হয়েছেন বাংলাদেশি এ তরুণ চিকিৎসক।

বর্তমানে শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলা হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত তিনি। চিকিৎসকরা বলছেন, নিকট অতীতে পৃথিবীতে ৯০০ নম্বরের বেশি পাওয়ার ঘটনা দুর্লভ। ঈর্ষণীয় এ সাফল্যে দেশ-বিদেশে প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন তিনি।

জানা যায়, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ডা. মাহমুদুল হক ২০০৫ সালে মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ২০০৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখানে ভর্তি পরীক্ষায় ৫৬তম হয়ে ট্রিপল-ই বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু চিকিৎসার বিভিন্ন জটিল বিষয়ে আগ্রহী থাকায় প্রকৌশল বিষয়ে মন টেকেনি। পরের বছর আবার তিনি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। মেধা তালিকায় ২৯তম হয়ে মাহমুদুল হক ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকেই এমবিবিএস পাস করেন। ইন্টার্নশিপ শেষ করে দেশবরেণ্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আজিজুল কাহ্হারের চেম্বারে তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেখান থেকেই মেডিসিনের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১৯ সালের মে মাসে এমআরসিপি পার্ট-১ পরীক্ষায় অংশ নেন। এরই মাঝে তিনি ৩৯তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ডা. জেসি বলেন, ‘ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে আমি পড়াশোনা করতাম। আমি আসলে কিছু করিনি, ইচ্ছাও ছিল না। আমি আমার যতটুকু সক্ষমতা ছিল, পড়েছি। রেজাল্টের কথা চিন্তা করে আমি পড়িনি। তবে আমি প্রস্তুতিটা নিয়েছিলাম স্ট্রংলি।’

তিনি আরও জানান, পরীক্ষা দেওয়ার পর আমার মনে হয়েছিল, পরীক্ষাটা ভালো হয়েছে। মনে হয়েছে, আমি বাংলাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেতে পারি হয়তো। কিন্তু বিশ্বে সর্বোচ্চ নম্বর পাব, তা কখনই ভাবিনি। ফল পাওয়ার দিনের কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরীক্ষার আগে নিজস্ব অ্যাকাউন্টেই রেজাল্ট আসে। কিন্তু সেদিন কোনোভাবেই আমি আমার অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারছিলাম না নেট স্লো থাকার কারণে। আবার রেজাল্ট হওয়ার কারণে সবাই নিশ্চয়ই সাইটে ঢুকতে চাচ্ছিল, সে কারণেও হতে পারে। সে রাতে কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা করেও রেজাল্ট না পাওয়ায় ঘুমিয়ে গেলাম। পরদিন সকাল ৭টার দিকে রেজাল্ট পাই। সেখানে নম্বর ছিল ৯০৬। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

বই পড়ার উৎসাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার বই পড়ার পেছনে আগ্রহ তৈরি করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবদুল হানিফ টাবলু। স্যারের অবদান রয়েছে। আর ক্লাসে যখন পাঠ্যবই পড়ানো হতো, তখন আমার মনে হতো, কেবল এই বই পড়ে বিষয়টি পুরো বোঝা যাচ্ছে না, তখন আমি বিশ্বের নানা বই পড়তাম।

ডা. জেসি হক বলেন, এ পর্যন্ত মেডিকেল রিলেটেড অনেক বই পড়েছি। এখন ইংল্যান্ডে চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চতর ট্রেনিং করতে চাই। সেখানে দক্ষতা অর্জন করে দেশে ফিরে সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। তিনি বলেন, আমি যা করেছি তাতেই আমার মায়ের সমর্থন ছিল, আমার কোনো কাজেই তারা বাধা দেননি। আমি সন্তুষ্ট থেকেছি, এমন সবকিছুতেই সায় দিয়েছেন তারা, শতভাগ স্বাধীনতা দিয়েছেন বাবা-মা দুজনই। বাবা তাঁর জমি বিক্রি করে বই কেনার টাকা দিয়েছেন। ডা. জেসি হক বলেন, ‘একটা বিষয় বোঝার পেছনে কখনো কখনো আমার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এতে আমি কিছুই মনে করিনি। কারণ জ্ঞান অর্জনটাই আমার কাছে মুখ্য ছিল। কোনো কিছু সম্পর্কে পরিষ্কার বুঝতে পারা আমার কাছে নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। একদিন আমার আব্বু একটা কাজে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ আমি তাঁকে ফোন দিয়ে বললাম, আমার কিছু বই কিনতে হবে, যার জন্য ৫০ হাজার টাকা লাগবে। ঠিক ওই মুহূর্তে আমার আব্বু তাঁর প্রয়োজনীয় কাজটি না করে পুরো টাকাই আমাকে দিয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার বাবা-মা। মেডিকেল লাইফে যখনই খারাপ লাগত তখনই মা-বাবার কথা মনে করতাম। শুধু ভাবতাম, দুজন মানুষ কতটুকু নিবেদিত হলে লাখ লাখ টাকা আমার বই  কেনার পেছনে ব্যয় করতে পারেন। শুধু মা-বাবার জন্য হলেও আমাকে ভালো ডাক্তার হতে হবে।’


আপনার মন্তব্য