শিরোনাম
বুধবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০০:০০ টা
আজ ভালোবাসা দিবস

ভালোবাসাই হোক জীবনের সারকথা

আফরোজা পারভীন

ভালোবাসাই হোক জীবনের সারকথা

বছরের ৩৬৫ দিন বাঁধা পড়েছে কোনো না কোনো দিবসের নামে। মা দিবস, নারী দিবস থেকে শুরু করে হাত ধোয়া দিবস পর্যন্ত আছে। যেন মা দিবস ছাড়া বাকি সব দিবস মাকে ভালোবাসতে মানা, হাত ধোয়া দিবস ছাড়া অন্যদিন  মানুষ হাত ধোয় না। এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই আছে, হাসাহাসিও আছে

 

আজকাল দিবসের ছড়াছড়ি। বছরের ৩৬৫ দিন বাঁধা পড়েছে কোনো না কোনো দিবসের নামে। মা দিবস, নারী দিবস থেকে শুরু করে হাত ধোয়া দিবস পর্যন্ত আছে। যেন মা দিবস ছাড়া বাকি সব দিবস মাকে ভালোবাসতে মানা, হাত ধোয়া দিবস ছাড়া অন্যদিন মানুষ হাত ধোয় না। এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই আছে, হাসাহাসিও আছে। বিষয়টা তেমন না। এ দিনগুলো প্রতীকী। এ দিনগুলোর উৎপত্তির পেছনে কোনো না কোনো ইতিহাস আছে। আর দিবস পালন করা মানে এটা নয় যে, অন্য দিনগুলোতে এ কাজগুলো করা বারণ। বরং এ বিশেষ দিনগুলো উদযাপন করে মনে করিয়ে দেওয়া মাকে ভালোবাসা, নারীকে অধিকার বুঝিয়ে দেওয়া, বন্ধুকে বন্ধুত্ব দেওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়া প্রয়োজন। তাই দিনগুলোকে নিয়ে অপব্যাখ্যা বা হাস্যরস না করাই ভালো।

এ দিনগুলো একসময় পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক থাকলেও এখন বিশ্বব্যাপী মহাসমারোহে পালন করা হয়। পালন করা হয় আমাদের দেশেও। বলা চলে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দিনগুলো উদযাপন করি ঘটা করে। যাদের জন্য পালন করা হয় তারাও থাকেন আনন্দিত।

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে। আমরা ছেলেবেলায় এ দিবসের কথা শুনিনি। মাঝ বয়স পেরিয়ে আসার পর থেকে জানতে পেরেছি। এ দিন ভালোবাসার মানুষরা পরস্পরকে ফুল কার্ড মিষ্টি চকোলেট বা উপহার পাঠায়। ফোনে কথা বলে, দেখা করে। পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র রেস্টুরেন্টগুলো ভালোবাসার মানুষে পরিপূর্ণ থাকে। ভালোবাসার মানুষ মানে কিন্তু শুধু প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী নয়। ভালোবাসা তো অনেক রকম। একেকজন এক একেক রকমভাবে ভালোবাসে। সম্পর্কের বিন্যাসও ভিন্ন। কিন্তু মূলে থাকে ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই পরস্পরের এ আদান-প্রদান।

সব ঘটনার পেছনে যেমন ইতিহাস বা গল্প থাকে ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তির পেছনেও গল্প আছে। একটা নয়, অনেক গল্প। আছে ভিন্ন ভিন্ন মত।  ভ্যালেন্টাইনস ডে প্রথম উদযাপন করা হয়েছিল ৪৯৬ সালে। এটি রোমানদের প্রাচীনকালের ঐতিহ্য। রোমানদের থেকেই দিনটির জন্ম বলে মনে করা হয়। শোনা যায়, একজন বিখ্যাত সেইন্ট বা ধর্মযাজকের নাম থেকে দিনটির উৎপত্তি। তিনি কে তা নিয়ে আছে নানা গল্প। তার একটি হলো- সেন্ট ভ্যালেন্টাইন খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে রোমের একজন পুরোহিত ছিলেন। তার নাম ভ্যালেন্টাইন। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ২০০ খ্রিস্টাব্দে রোমে বিবাহ-প্রথা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তার মতে, যুবকরা যদি বিয়ে করে, তবে যুদ্ধ করবে কারা? তিনি মনে করেছিলেন বিবাহিত পুরুষরা ভালো সৈনিক হয় না। তিনি ঘোষণা দেন, আজ থেকে কোনো যুবক বিয়ে করতে পারবে না। যুবকদের জন্য শুধুই যুদ্ধ। তারা শুধু যুদ্ধই করবে। ভ্যালেন্টাইন ছিলেন অসীম সাহসী। সম্রাট ক্লডিয়াসের এ ঘোষণা তার কাছে অন্যায় মনে হয়েছিল। ঘোষণার প্রতিবাদ করেন এক যুবক। তাই তিনি নিয়ম না মেনে গোপনে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। সম্রাট ক্লডিয়াস এ খবর জানতে পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তার আদেশে ভ্যালেন্টাইনকে বন্দি করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তাকে মৃত্যুদন্ড দেন তিনি। ভ্যালেন্টাইন কারাগারে থাকাকালে কারাপ্রধানের মেয়ের প্রেমে পড়েন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার দিন। এদিন সকালে তার মাথা কেটে ফেলা হয়। তাকে মুত্যুদন্ড দেওয়ার জন্য যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন ভালোবাসার মেয়েটির উদ্দেশ্যে একটি প্রেমপত্র পাঠান তিনি। সেই প্রেমপত্রে লেখা ছিল- ‘তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ থেকে’। ভালোবাসার জন্য ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে তখন থেকেই এ দিনটিকে পালন করা হয় ভ্যালেন্টাইনস দিবস হিসেবে।

ধীরে ধীরে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামটি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে। মানুষ ভালোবাসার মানুষের কাছে অনুভূতি প্রকাশের জন্য নামটি ব্যবহার করতে থাকে। ভ্যালেন্টাইনস ডে সম্পর্কে আরও অনেক কাহিনি থাকলেও এসব মতের কোনোটিই সর্বজন স্বীকৃত নয়। ভ্যালেন্টাইনস ডের উৎপত্তির বিষয়ে সম্পূর্ণ আলাদা মত রয়েছে। এ মতে বিশ্বাসীরা মনে করেন, ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে ভালোবাসাবাসীর কোনোই সম্পর্ক নেই।  প্রাচীনকালে মানুষের বিশ্বাস ছিল, ১৪ ফেব্রুয়ারি পাখিদের বিয়ের দিন। পাখিরা বছরের দ্বিতীয় মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডিম পাড়তে বসে। মধ্যযুগের শেষ দিকে মানুষ বিশ্বাস করত, এদিন থেকে পাখিদের মিলন ঋতু শুরু হয়। মিলিত হওয়ার জন্য তারা সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। পাখিদের দেখাদেখি মানুষও তাই সঙ্গী নির্বাচন করে এ দিনে।

৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ভ্যালেন্টাইনস ডের উদ্ভব হলেও প্রথম দিকে বিশ্বব্যাপী তেমন প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। বর্তমানে ভ্যালেন্টাইনস দিবসের কদর বিশ্বব্যাপী। প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমের দেশগুলোতে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এ দিবস উপলক্ষে এ দিনে প্রায় কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করে।

ভালোবাসা দিবসের উৎপত্তি যেভাবেই হোক এ উৎসব এখন আমাদের আনন্দের উৎসবে পরিণত হয়েছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন এ উৎসব পালন করে। একসময় মনে করা হতো, শুধু ধনী শ্রেণির মানুষই এসব উৎসব পালন করে, কারণ তাদের অঢেল টাকা আছে। ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়। এখন মানুষের রুচি বদলেছে। অল্প আয়ের মানুষও অল্প অল্প টাকা জমিয়ে এ উৎসব পালন করে। তারা প্রিয়জনকে ছোটখাটো উপহারসামগ্রী কিনে দেয়। তাই আমরা পয়লা বৈশাখসহ যে কোনো উৎসবেই দেখি অঢেল জনস্রোত। এখন জীবনের ধারণা বদলে গেছে। এখন আর কেউ শুধু খেয়ে-পরে জীবন কাটাতে চায় না। মানুষ বুঝে গেছে জীবন একটাই। তাই আনন্দ খুঁজে বেড়ায়। আসুন আমরা একে অন্যকে ভালোবাসি। ভালোবাসাই হোক আমাদের জীবনের সারকথা।

                লেখক : কথাশিল্পী, গবেষক, সাবেক যুগ্মসচিব

সর্বশেষ খবর