Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০৪
কাগজের ফুল
আহমেদ পলাশ
কাগজের ফুল

হাউমাউ শব্দে নাবিলার চিৎকার।   দৌড়ে আসে মা-বাবা।

হৈচৈ পড়ে গেল পুরো বাড়ি। এই দারোয়ানের বাচ্চা! তোরা, এত্তগুলো মানুষ থাকতে মরা পাখিটা দরজায় এলো কীভাবে? দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা ঝিমানোর জন্য তোদের নিয়েছি? অসভ্যের বাচ্চারা এক্ষুনি আমার বাড়ি থেকে বের হ! বাড়ির পুরনো দারোয়ান কাসেম। সে দুই হাত জোড় করে বলে—সাহেব আমাদের ভুল বুঝবেন না। আমি দশ মিনিট আগেও পুরো বাড়ি চক্কর দিয়ে গেছি। কোথাও কিচ্ছু দেখিনি। হয়তো পাখিটা উড়তে গিয়ে কোন কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। শেষে ভারসাম্য হারিয়ে ডানা ঝাপটে দরজায় এসে পড়েছে। নাবিলার বাবা আসাদুজ্জামান দারোয়ানকে ধমক দিয়ে বলে—জ্ঞান দিতে এসো না। বেশ মাস্টার হয়ে গেছ! দারোয়ান মাথা নিচু করে ভুল শিকার করে। সে জানে, সাহেবকে বোঝানো সম্ভব নয়। কারণ সাহেবরা সব জানে, বুঝে কিন্তু না বোঝার ভান ধরে নিজেদের এগিয়ে রাখে।

 

নাবিলার শরীর ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। নাবিলা আচমকা পাখিটিকে ডানা ঝাপটে মরতে দেখেছে। নিজের চোখের সামনেই করুণ দৃশ্য! সে চিৎকার করেছে পাখিটির মৃত্যুর আগ মুহূর্তে ডানা ঝাপটানোর তীব্র কষ্ট আর চিৎকার দেখে; পাখির মৃতদেহ দেখে নয়। এ কথা কেউ বোঝার চেষ্টা করে না। সে জানে বাপ্পিকে যত বোঝাবে ততই জামেলা বাড়বে বৈ কমবে না। হয়তো বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা হতে গেলে বাপ্পি রেগে দারোয়ান চাচাকে চাকরি থেকে বের করে দেবে। তখন আরও মহাবিপদ! পরে উনি যাবেন কোথায়। খাবে কী। দারোয়ান চাচার জন্য মায়া হয় নাবিলার। কারণ আজ পাঁচ বছর এই দারোয়ান চাচাই তাকে স্কুলে নিয়ে যায়, নিয়ে আসে। আম্মু ছাড়া কখনো নাবিলা বলে ডাকে না। এমন অনেক দিন গেছে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাসায় নিয়ে আসছে। নাবিলার জন্য বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়েছে। কিন্তু কখনো তা কাউকে বুঝতে দেয়নি। বরং অসুস্থ শরীর নিয়েই পর দিন আবার স্কুলে নিয়ে গেছে। আজ বাবার আচরণে দারোয়ান চাচার মন খারাপ। নাবিলারও মন ভালো নেই।

 

মরা পাখিটা এখনো দরজায় পড়ে আছে। পাখিটা কীভাবে এখানে এলো? কেউ ফেলে গেল কিনা? কিংবা পাখির শরীরে কোনো বিষাক্ত দ্রব্য আছে কিনা? সবাই কৌতূহলী হয়ে এগুলো নিয়েই ভাবছে।

কিন্তু কারও মাথাব্যথা নেই পাখির মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে। এমন কি ভয়ে কেউ পাখিটিকে ধরছেও না। আজকাল পাখির শরীরে নাকি বিষাক্ত জীবাণু পাওয়া যায়। যা হাতে স্পর্শ করলে রোগ ছড়ায়। নাবিলার কথাগুলো বিশ্বাস হয় না। সে ভাবে, পাখিটি যদি মানুষ হতো তবে কী কেউ জীবাণুর দোহাই দিতো?

 

নাবিলা তার দাদুর মৃত্যুর সময় দেখেছে, দাদুর মৃতদেহে সবার কী আদর! দাদুর মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে বাপ্পির কী কান্না! পুরো বাড়িজুড়ে কান্নার শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায়নি। একজন আরেক জনকে জড়িয়ে ধরে কত যে সমবেদনা! অথচ অসহায় পাখিটির মৃত্যুতে কারও ভেতরে বেদনা কিংবা বিন্দু পরিমাণ মায়ার আঁচ নেই।

বরং বিবাদ আর হট্টগোল ঢের বেশি। কিন্তু নাবিলা যে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বইতে পড়েছিল ‘পশু-পাখির প্রতি সদয় আচরণ করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্তব্য। সেটা কী তবে ভুল!

অবশেষে দারোয়ান চাচা হাতে গ্লাভস পরে পাখিটি নিয়ে যাচ্ছে। নাবিলা দূর থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এতগুলো মানুষের মধ্যে কারও মন খারাপ নেই। কেউ কেউ দৃশ্যটি দেখে তালি দিচ্ছে। কেউ কেউ আপদ গেল বলে হাঁফ ছেড়ে প্রমাদ গুনছে। নাবিলার মনে বিষয়টি আঘাত করেছে। সে বুঝতে পেরেছে, মানুষের মৃত্যুতে যে কান্না করা হয় তা নেহাতই লোক দেখানো, সম্পদ ভাগাভাগির নীরব চিৎকার। কিংবা মৃত্যুর গভীরে আনন্দের সম্মিলন।

 

সকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। মা আসমা জামান মেয়ে ভয় পেয়েছে বলে বেশ আদর যত্ন করছে। এক সময় নাবিলা মাকে জিজ্ঞেস করে বসে, আচ্ছা মা, আমি মরে গেলে তোমরা কী হাসবে আর হাততালি দেবে? মা চোখ বড় করে বলে তোমাকে এই বাজে কথাগুলো কী দারোয়ান শিখাচ্ছে? এ ধরনের বাজে কথা আর কখনো মুখে আনবে না। মা এবার নাবিলাকে বুকে নিয়ে বলে, তোমার কিচ্ছু হলে সাথে সাথে আমিও মরে যাব। নাবিলা বলে, তবে তোমরা পাখির মৃত্যুতে এতটা কান্না করছ না যে? উত্তর নেই মার!

 

নাবিলার ঘুম আসছে না। সে উঠে গিয়ে টেবিলে বসে। রঙিন কাগজগুলো কেটে সুন্দর একটি গোলাপ ফুল তৈরি করে। গোলাপটি সে পাখির কবরে উৎসর্গ করবে। কারণ, সে যে দেখেছে দাদুর মৃত্যুর পর তার কবরেও ফুল দেওয়া হয়েছে।

 

সকালে নাবিলা দারোয়ান চাচাকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার নাম করে মৃত পাখির কবরে যায়। চারদিকে পাখিদের হাহাকার। মায়া আর বেদনার সুনসান নীরবতা। নাবিলা স্কুল ব্যাগ থেকে কাগজের ফুলটি বের করে, গেঁথে দেয় পাখির কবরে। দারোয়ান চাচার ক’ফোঁটা জল পড়েছে ফুলে!

এই পাতার আরো খবর
up-arrow