২০০৫ সালের কনকনে শীত। টানা তিন দিন না খেয়ে ছিলেন ৮০ বছরের বৃদ্ধা চিয়ারণ। পুত্রবধূর সঙ্গে ঝগড়ার জেরে ঘরে খাবার জোটেনি তার কপালে। ক্ষুধায় ক্লান্ত, জীবন তখন তার কাছে অসহনীয় এক বোঝা। প্রতিবেশীর দেওয়া একমুঠো ভাত খেতে শুরু করতেই পুত্রবধূ এসে সেই ভাতে ছাই মিশিয়ে দেন। অপমান, অনাহার আর মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে চিয়ারণ বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
গ্রামবাসীর তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে গেলেও ঠাঁই হয়নি নিজের বাড়িতে। ঠিক তখনই দেবদূতের মতো পাশে দাঁড়ান প্রতিবেশী ইসমত আরা। নিজের ঘরে আশ্রয় দেন অসহায় চিয়ারণকে। সেখান থেকেই শুরু হয় একটি মানবিক আশ্রয়কেন্দ্রের পথচলা।
২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ইসমত আরার বাড়িতে একে একে আশ্রয় নিতে থাকেন আরও অনেক অবহেলিত, নিঃস্ব, ভালোবাসাহীন মা। সময়ের পরিক্রমায় সেই বাড়িই আজ ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলার পরিচিত একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান— “জোড়াপুকুরিয়া বৃদ্ধাশ্রম ও পুনর্বাসন কেন্দ্র”। এখানে শুধু খাবার বা থাকার জায়গা নয়, মেলে মমতা, স্নেহ আর সম্মানের জীবন।
এই ভালোবাসার ঠিকানায় গতকাল শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) হাজির হয় বসুন্ধরা শুভসংঘের ঝিনাইদহ জেলা শাখা। উদ্দেশ্য—কিছুটা সময়, কিছুটা যত্ন আর কিছুটা ভালোবাসা দিয়ে এই মায়েদের মুখে হাসি ফোটানো।
শুভসংঘের সদস্যরা বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে মায়েদের সঙ্গে সময় কাটান, তাদের সুখ-দুঃখের গল্প শোনেন, খোঁজখবর নেন স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের। আয়োজন করা হয় একবেলার পুষ্টিকর খাবারের।
খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে গল্প করা—সবকিছুতেই ছিল আন্তরিকতার ছোঁয়া। অনেকেই চোখ ভেজা কণ্ঠে বলেন,“আমাদের খোঁজ নিতে কেউ আসে না। আজ মনে হচ্ছে আমরা একা না।”
জোড়াপুকুরিয়া বৃদ্ধাশ্রম ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ইসমত আরা জানান, “এখানে যারা থাকেন, তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের সবচেয়ে বড় অভাব টাকা নয়, ভালোবাসা। আজ শুভসংঘের ছেলেমেয়েরা এসে যে সময় দিয়েছে, সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
বসুন্ধরা শুভসংঘের সদস্যরা বলেন, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোই তাদের মূল লক্ষ্য। বৃদ্ধাশ্রমের এই মায়েদের সঙ্গে সময় কাটানো তাদের জন্যও ছিল এক আবেগঘন অভিজ্ঞতা। আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ ঝিনাইদহ জেলা শাখার সহসভাপতি সহকারী অধ্যাপক মো. শাহানুর আলম, সহকারী অধ্যাপক (অব:) কে এম সালেহ, সরস্বতী সাহা, সাধারণ সম্পাদক কেয়া রাণী প্রামানিক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শোভন সাহা সবুজ এবং কার্যকরী সদস্য অনুপম বিশ্বাস প্রমুখ।
বিডি-প্রতিদিন/মাইনুল