মেগাসিটির অবয়ব পরিবর্তন এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। চসিকের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার সময় সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এই মেগা পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, এই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত চেহারা বদলে যাবে এবং নগরবাসী একটি আধুনিক, টেকসই ও নিরাপদ নগরীর সুবিধা পাবেন।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, প্রকল্পগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামের চিরচেনা যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনে। এর মধ্যে ২২০০ কোটি টাকা, ৩৫০০ কোটি টাকা এবং ২৮০০ কোটি টাকার তিনটি বড় প্রকল্প রয়েছে, যা নগরের প্রধান সমস্যাগুলো সমাধানে ধন্বন্তরি হিসেবে কাজ করবে।
এছাড়া সড়ক সম্প্রসারণ, ফুটপাত আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ৪০০ কোটি, ৪৫০ কোটি এবং ১০০০ কোটি টাকার পৃথক প্রকল্প রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় ৩০০ কোটি টাকা ও ২০৩ কোটি টাকার প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন চট্টগ্রাম গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মেয়র।
চসিকের তথ্যানুযায়ী, বন্দরনগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনে চসিকের আওতায় প্রাথমিক সড়কসমূহের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২,২০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি নগরীর দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা দূরীকরণে নেওয়া হয়েছে দুটি বিশাল প্রকল্প।
এর মধ্যে চট্টগ্রামের ২১টি প্রধান খালসহ অন্যান্য খাল খনন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,৫০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্তৃক বাস্তবায়িত ৩৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হচ্ছে আরও ২,৮০০ কোটি টাকা। নগরীকে একটি নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত কাঠামোর আওতায় আনতে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক সিসিটিভি সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম এবং সৌর ও সাধারণ শক্তির সমন্বয়ে ‘স্মার্ট লাইটিং’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পাশাপাশি নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ জোর দিয়ে কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে একটি আধুনিক ল্যান্ডফিল নির্মাণ প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক যান ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের জন্য আরও ২৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে।
নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় চসিকের উন্মুক্ত স্থানসমূহের আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও সবুজিয়ান প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার বাজেট ৪৫০ কোটি টাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রেল ক্রসিং-এর ওপর ওভারপাস নির্মাণে ১,০০০ কোটি টাকা এবং নগরীর দেওয়ানহাট ব্রিজ নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এছাড়া অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ‘কিচেন মার্কেট কাম বাণিজ্যিক ভবন’ নির্মাণ করছে কর্পোরেশন। চসিকের নিজস্ব প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে ২০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে একটি আধুনিক ‘নগর ভবন’। বর্তমানে সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে প্রাথমিক পর্যায়ে ২৭ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ পুরোদমে চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এই নতুন মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলোর আওতায় চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। ১২টি প্রকল্পের মধ্যে ১১টির সুনির্দিষ্ট প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। বাকি প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ নকশা ও ব্যয় চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে, যা যুক্ত হলে মোট ব্যয় ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
বিডি-প্রতিদিন/টিএ