গত এক বছরে মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে আমার বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে স্যারের সঙ্গে আর দেখা হবে কি না। কিন্তু স্যার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জোর গলায় বলেছেন-সাগর আবার দেখা হবে, তোমাদের এখানে এসে খুব ভালো লাগে। তোমাদের সঙ্গে আড্ডা দারুণ উপভোগ করি। তোমরা আমাকে অনেক ভালোবাস এটাও বুঝি। মুস্তাফা মনোয়ারের বক্তৃতা অনেক শুনেছি। ছোটবেলা থেকেই তাঁর কথা শুনে আসছি। আজকে আমাদের এই রুচিবোধ তাঁর কাছ থেকেই শেখা। টেলিভিশনে যাঁদের কাছ থেকে যা কিছু শিখেছি তাঁদের ভিতর মুস্তাফা মনোয়ার অন্যতম। তিনি শিখিয়েছেন টেলিভিশনের পর্দার মাধ্যমে যে কাজ করা যায়, মানুষের মন জয় করা যায়। আমার এখনো মনে আছে-তাঁকে যেদিন আমি টেলিভিশন পর্দায় দেখেছি তিনি দেখাচ্ছিলেন কাগজ কেটে কীভাবে মজার মজার খেলনা জিনিস বানানো যায়। তিনি টেলিভিশনে ছোটদের জন্য অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। তাঁর প্রথম দিককার অনুষ্ঠানের মধ্যে কাটুম কুটুম কিংবা ফেলনা জিনিস খেলনা নয় এরকম অনুষ্ঠান করেছিলেন। আমরা তাঁর অনুষ্ঠানগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতাম এবং শিখতাম। টেলিভিশনের সেই সাদা-কালো যুগ থেকে রঙিন যুগ পর্যন্ত টেলিভিশনের পর্দায় কীভাবে জাদু দেখানো যায়, কীভাবে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে পরিবর্তন আনা যায়, সেটার বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। তিনি ডিআইটির সেই ছোট্ট স্টুডিওতে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর মতো নাটক করেছিলেন। এই নাটকটি যে কারও পক্ষেই বড় স্টুডিওতে করা কঠিন কিন্তু তিনি করতে পেরেছিলেন তাঁর মেধা এবং মনন দিয়ে।
শেক্সপিয়ারের নাটকের ছায়া অবলম্বনে নাট্যরূপ দিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। আমি জানি না, মুখরা রমণী বশীকরণ নাটকটি বিটিভির আর্কাইভে আছে কিনা। যদিও তখন ধারণ করে রাখার ব্যবস্থা ছিল না। থাকলে দেখা যেত সেই প্রযুক্তিহীনের যুগে তিনি কী অসাধ্য কাজটি করেছিলেন। শুধু নাটক নয়, ছোটদের ভালো লাগে কিংবা তাদের মানসিক বিকাশ ঘটে এমন অনুষ্ঠান তৈরিই তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল। আমি আর আলী ইমাম একবার ওয়ার্ল্ড ডিজনির জন্মদিন বছরে দুইবার পালন করেছিলাম। ভুল স্বীকার করে খালেদা ফাহমীর কাছে দুঃখ প্রকাশও করেছিলাম। কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ার শুনে একটুও বিস্মিত হননি বরং তিনি বলেছিলেন ওয়ার্ল্ড ডিজনির জন্মদিন দুবার পালন করে তোমরা ভুল করোনি। তাঁকে নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান করা দরকার তাহলে আমাদের শিশুরা অনেক কিছু জানতে পারবে শিখতে পারবে। ওয়ার্ল্ড ডিজনি, মিকি মাউস এসব সম্পর্কে শিশুদের জানা প্রয়োজন। জন্মদিন নাহলেও মিকি মাউস ও ছোটদের বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে অনুষ্ঠান করা দরকার। ছোটদের কখনো ছোট মনে করবে না। তারাই কিন্তু একদিন এই দেশ চালাবে। তারাই এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হবে। সুতরাং তাদের বড় মনে করে সেরকম শিক্ষাই দেবে, যাতে তারা সত্যিকার শিক্ষিত হতে পারে। টেলিভিশন নিয়ে তাঁর অনেক কথা বলা যাবে। তাঁর আর একটি বড় কাজ আমাদের শহীদ মিনার নিয়ে। আমাদের শহীদ মিনারের পেছনে যে বড় লাল বৃত্ত সেটা তাঁর তৈরি। একবার টেলিভিশনের শুটিং করছিলেন। তিনি ক্যামেরায় দেখলেন দূরে মেডিকেল কলেজের বারান্দায় কাপড়চোপড় নাড়া দেখা যাচ্ছে। তিনি ভাবলেন এটা টেলিভিশনের পর্দায় খারাপ দেখা যাবে। পেছনে কোনো কিছু দেওয়া দরকার তাহলে আর কাপড়চোপড় দেখা যাবে না। তিনি শহীদ মিনারের স্তম্ভের পেছনে বড় একটি কাপড়ে লাল বৃত্ত এঁকে দিলেন। তাতে করে আমাদের শহীদ মিনারের আলাদা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠল। এটি সূর্যের প্রতীক কিংবা লাল রক্তের প্রতীক হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছে। এটা একান্তভাবে মুস্তাফা মনোয়ারের তৈরি। মুস্তাফা মনোয়ারের এমন অনেক কাজ নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি খেলার যে মাসকাট সেটা তৈরি করেছিলেন। তাঁর চিন্তার ফসল যে আমাদের উপহার দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর চিন্তায় সব সময় ছিল বাংলাদেশ। তিনি মানুষের কীসে ভালো হবে সেই চিন্তাই করেছেন। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কীভাবে ছোটদের দেশপ্রেম শেখানো যায়, সেটাই ভেবেছেন। নিজে গাইতে পারতেন। আঁকতে পারতেন। তিনি বাংলাদেশে পাপেটের জনক। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল পাপেট বানান কেন? তিনি বলেছিলেন আমার জীবনে পাপেট নেই তাই পাপেট বানাই। বাঘা এবং মিনি চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি দেশের কথা দশের কথা বলেছেন। তিনি আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ছিলেন। অনেক বিখ্যাত চিত্রশিল্পী তাঁর ছাত্র। চ্যানেল আইতে আমরা তাঁর নামে একটি স্টুডিও বানিয়েছি। সেই স্টুডিও উদ্বোধনে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন। আমাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা দিয়েছিলেন। আনন্দ পেয়েছিলেন। ইউনিসেফ যে মীনা কার্টুন তৈরি করেছে, সেই মীনা কার্টুন তৈরির মূল টিমেও তিনি ছিলেন। তাঁকে নিয়ে লেখার শেষ নেই। তাঁকে জানার জন্য বোঝার জন্য আরও অনেক গবেষণা প্রয়োজন। আমরা তাঁকে মন্টু মামা ডাকতাম। আমাদের মন্টু মামা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দেশের মানুষের মনে তাঁর কাজের মাধ্যমে। কীর্তিমানের কখনো মৃত্যু হয় না।
♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব