গৃহকর্তা জমিসংক্রান্ত মামলার বাদী। হাজিরা দেওয়ার জন্য শহরে রওনা হয়েছিলেন সকাল ৭টায়। যাত্রার সময় তিনি গৃহকর্ত্রীর হাতে দশ টাকার নোটের একটি তাড়ায় পাঁচ শ টাকা দিয়ে বলেছেন, পাশের গ্রাম থেকে পাওনাদার আসবে একজন। টাকাগুলো যেন ওই ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কারও নজরে যাতে না পড়ে, সেভাবে রান্নাঘরে হাঁড়িপাতিল রাখার তাকের এক কোনায় টাকাগুলো রাখা হয়। পাওনাদার এলো দুপুরে। গৃহকর্ত্রী তাক হাতড়ান টাকার তাড়ার জন্য। ওরে আল্লাহ! টাকা তো পাওয়া যাচ্ছে না। চুরি হয়ে গেছে।
বাড়িতে কাজের জন্য আছে দুই নারী, দুই পুরুষ। এরা রান্নাঘরে বারবার আসা-যাওয়া করে। চারজনকেই সন্দেহ করা হয়। চারজনই বলে, ‘চুরি করিনি আম্মা।’ গৃহকর্তার স্ত্রীর ভাই মনসাদ তার বোনজামাইর টাকায় পরে আর খায়। মওকা পেলেই খুব লাফায়। সে বলে, ‘চাইরডারেই ছ্যাঁচা দিমু। মাইর খাইয়া ফরফর কইরা চোট্টামির কথা স্বীকার যাবেই।’ বহিরাগতের এমন চোটপাট বাড়ির স্থায়ী পুরুষ সদস্যরা বরদাশত করল না। তারা বলে, পিটুনির দরকার নাই। স্বনামখ্যাত গুনিন জাকু পাটোয়ারিকে আনা হচ্ছে। উনি এসে ‘চাল পড়া খাইয়ে অপরাধী চিহ্নিত করবেন।
গৃহকর্তার ছোট ভাই নাসিমুল হক জানান, গুনিনের মন্ত্রপূত চাল চারজনকে নয়, খাওয়ানো হবে পাঁচজনকে। মানে কাজের চার লোক আর মনসাদকে। স্তম্ভিত মনসাদ জানতে চায়, কী কারণে তাকে চোর মনে করা হচ্ছে। নাসিমুল বলে, রান্নাঘরে তুমিও বারবার আসা-যাওয়া কর। কখনো চা বানাতে বলো। কখনো চুলার আগুনে সিগারেট ধরাও। কখনো ডাব কেটে পানি খাওয়ার জন্য দা সন্ধান কর। এসবের ফাঁকে দুলাভাইর টাকাকে নিজের টাকা মনে করে যে সরাওনি, তার নিশ্চয়তা মোরা পাব কোথা?
‘অপমানের একটা সীমা থাকা চাই। এ বাড়িতে আমি আর এক সেকেন্ডও থাকব না।’ মনসাদ ঘোষণা করে এবং তার মালসামানা গোছগাছ করতে কাজের এক লোককে নির্দেশ দেয়। লোকটা নির্দেশ পালনে উদ্যত হতেই নাসিমুল হাত ইশারায় তাকে থামিয়ে মনসাদকে বলে, তোমার মহান সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে হবে ঘণ্টা খানেক পরে। আশা করি, ওই সময়ের মধ্যে জাকু পাটোয়ারি এসে পড়বেন।
জাকু এসে বিড়বিড় করে রহস্যময় আওয়াজ দিয়ে এক বাটি আতপ চালে ফুঁ দেন। সেই চাল মুঠো মুঠো করে পাঁচজনকে দিলেন। বললেন, চিবাও। চিবিয়ে মুখ থেকে বের করে ঘরের মেঝেতে ফেলবে। নির্দেশমতো ওরা চিবোয় এবং মেঝেতে ফেলে। দেখা যায়, চারজনের মুখ থেকে বেরিয়েছে ফিরনির মতো তরল। কাজের এক লোকেরটা ছিল শক্ত আটার দলার মতো। তার ডান হাতের কবজি পাকড়িয়ে গুনিন জাকু পাটোয়ারি বলেন, এ-ই-ই টাকা চুরি করেছে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা নাসিমুল হকের পায়ে পড়ে বলে, মাফ কইরা দেন গো কাগা। জীবনে আর এরকম করুম না। যদি করি ফাঁস দিয়া আমারে আল্লাহর কাছে সোপর্দ কইরা দিয়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে এ ঘটনা শুনে জাকু পাটোয়ারির গুণমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তাঁকে দেখার আগ্রহও হয় খুব। কিন্তু দেখার সুযোগ হয় না। বহু বছর পর, ১৯৭৮ সালের এক বাদলা দিনে ট্রেনে ঢাকা থেকে আমরা তিন বন্ধু বাড়ি ফিরছি। পথিমধ্যে এক স্টেশন থেকে পাঁচ ছয়জন যাত্রী উঠল আমাদের কম্পার্টমেন্টে। তাদের মধ্যে সাদা বাবরি চুল, সাদা লম্বা দাড়ি ঘন গোঁফধারী বিলকুল রবিঠাকুরের চেহারার ব্যক্তিকে দেখিয়ে বন্ধু রহমত বলে, ইনিই জাকু পাটোয়ারি।
আমরা আলাপ জমাই। একপর্যায়ে জানতে চাই, আতপ চালে কোন মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন। ৮২ বছর বয়সি গুনিন বলেন, মন্ত্রফন্ত্র কিছু না বাবা। মনের ভিতর বনের কুহু ঢুকিয়ে দিই। তাতেই কাম সারা। চোরার গলা শুকিয়ে যায়। তার চিবানো চাল হয়ে যায় আটার দলা।
২. মানসিকভাবে দুর্বল করে অপরাধীকে ধরা দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা সোজা কাজ নয়। তবু কেউ কেউ মনে করেন, ওটা তেমন কঠিন নয়। চোপাবাজিতে লক্ষ্যার্জন সম্ভব। আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী আজিজ আহমেদদের বাড়িতে অনেক নারকেল গাছ। ওই গাছের ডাব একটু পোক্ত হতেই চুরি হয়ে যেত। আরেক সহপাঠী মুন্সি ফারুক ঘোষণা করে যে রাতের আঁধারে একটি গাছের ডাব সমগ্র আত্মসাতের অধিকার তারও রয়েছে। আজিজ জানায়, ফারুক লেট করে ফেলেছে। কেননা আজিজের দাদি পানি পড়া ঢেলেছেন গাছের গোড়ায়। চোর ডগায় উঠলেই অন্ধ হয়ে যাবে। ডাব চুরি করা দূরের কথা, গাছ থেকে নামতেই পারবে না। এ অবস্থায় বিষ পিঁপড়ার কামড়ের পর কামড়। যন্ত্রণায় চোর হাউমাউ কাঁদতে থাকবে আর বাড়ির লোকজন এসে তাকে দিবে প্যাদানি।
‘হ্যাঁ, লেট হয়তো কিছুটা হয়েছে’ বলে মুন্সি ফারুক, ‘কিন্তু সময় তো ফুরিয়ে যায়নি। উপরের বস্তু করায়ত্ত করতে সংকল্প পোষণই যথেষ্ট-এরকম ভাবলে তো ভবিষ্যৎ হাওয়া। নিচ থেকে উপরে পৌঁছার যথোপযুক্ত সময় তৈরি করে নিতে হয়। কেন না ওটা কেউ কাউকে উপহার দেয় না।’ আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। ফারুককে পরামর্শ দিই, অন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিস্না বন্ধু। কিন্তু তার সাফ কথা : নো রিস্ক নো গেইন।
এক দুপুরে সাইকেল হাঁকিয়ে বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফারুক বিকাল ৪টার মধ্যে তাদের বাড়িতে যেতে বলে। সে ম্যাজিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। জাদুকরের নাম কী, তার বাড়ি কোথায়? ফারুকের উত্তর : নাম নয়-কর্মই মানুষকে মহান বানায়। জাদুকরের বাড়ি দিয়ে কী হবে? তার দক্ষতায় খাদ আছে কি নেই সেটাই বিচার্য। বন্ধুরা সবাই জাদু দেখতে জড়ো হলো। আজিজও ছিল সেখানে। ফারুক সবাইকে বাড়ির বৈঠকখানার একটি কামরায় নেওয়ার পর সুর করে গায়-‘ডাবের আমি/ ডাবের তুমি/ ডাব দিয়ে যায় চেনা।’ আমরা দেখি, কামরায় রয়েছে দুই ডজনেরও বেশি ডাব যেগুলো আজিজদের গাছে ছিল। ডাবগুলো যেন বলছে, ফারুকের মনের ভিতর বনের কুহু ঢুকিয়ে দেওয়ার আজিজি চেষ্টা ব্যর্থ।
৩. নীলফামারীর ডোমার থানা (বর্তমানে উপজেলা) সদরেও বিজন সর্বজ্ঞ নামের এক গুনিন ছিলেন, যিনি মনের ভিতর বনের কুহু না ঢুকিয়েই হারানো দ্রব্য বা মানুষ কোন অবস্থায় কোথায় বিদ্যমান সেই সন্ধানদানে ছিলেন পারঙ্গম। ভুক্তভোগী বহু লোক কানাকড়িও খরচ না করে গুনিনের হাতে উদ্ধার পেয়েছেন। বিজন সর্বজ্ঞর এক নাতি (ভ্রাতুষ্পুতের পুত্র) উৎপল সর্বজ্ঞ প্রতিবেদক পদে কাজ করতেন ঢাকায় এক দৈনিক পত্রিকায়। উৎপলের মুখেই শুনেছি পরোপকারের বিনিময়ে তাঁর ওই দাদু উপনীত হয়েছিল ‘যার মাথায় ধরলাম ছাতি/সে মারল মাথায় কষিয়ে এক লাথি’ অবস্থায়।
পাকিস্তানি জমানায় শেষ প্রান্তে ডোমারে বদলি হয়ে এলেন এক সরকারি অফিসার নজর আলী শাহ (এটা কল্পিত নাম)। উৎপল তাঁর বাবার কাছ থেকে শুনেছেন, অবাঙালি ওই অফিসার উঠতে-বসতে সর্বদা ক্ষমতার আস্ফালন করতেন। ছিলেন থানা পর্যায়ের হুজুর। ভাবভঙ্গি ছিল গোটা প্রদেশের হুজুরে আলার মতো। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের তিন মাসের মাথায় নজর আলী হুজুরের স্ত্রীর গলার সোনার হার খোয়া যায়। বাসস্থানের আঙিনায় পাতকুয়ার পাড়ে গোসল করার আগে একটা পিঁড়ির ওপর সোনার হারটি রেখেছিলেন বেগম হুজুর। গোসল সারার পর তিনি আর হারটি খুঁজে পান না। রহস্যময় ঘটনা!
খোলা আকাশের নিচে বেগম হুজুরের গোসলের সময় নারী বা পুরুষ, সবারই উঠোনে আসা নিষিদ্ধ। তার মানে কেউই হারটা দেখেনি। দেখেনি অথচ চুরি হয়ে গেল, এ কীভাবে সম্ভব? প্রশ্নের জবাব মিলছিল না। ফলত বিরামহীন চলছে নজর আলী শাহের তর্জনগর্জন। থানা-পুলিশ আশ্বাস দেয়, ঘাবড়ানোর কিছু নেই স্যার। তদন্ত জারি আছে। নজর বলেন, পাঁচ দিন ধরেই শোনাচ্ছ জারি আছে জারি আছে। জারি দিয়ে আমার কী কাজ! আমি চাই নেকলেস। ওটা উদ্ধার করবে কখন? আমার ইন্তেকালের পরে?
নজর আলীর অস্থিরতা প্রশমনের উদ্দেশ্যে তাঁর অফিসের সিনিয়র কেরানি চুরি-উত্তর বিভিন্ন ঘটনার ইতিবাচক উত্তরণের বর্ণনা দিয়ে জানালেন, তাঁর মনে হচ্ছে গুনিন বিজন সর্বজ্ঞর সাহায্য নিলে সংকট মোচন সম্ভব। গুনিনের সাহায্য প্রার্থনার অনুমতি পান কেরানি। তাঁর মুখে সব শোনার পর বিজন সর্বজ্ঞ চোখ বুজে ধ্যান করলেন মিনিট তিনেক। এরপর বললেন : চুরি যায়নি। হারখানা আছে কুয়ার ভিতরে। খুব সম্ভব কাক ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে ওখানে ফেলেছে। কুয়া থেকে তোলা হয়েছিল সেই সোনার হার। গুনিনের গুণপনায় অতিশয় মুগ্ধ নজর শাহ নগদ দুই শ টাকা দেন বিজন সর্বজ্ঞকে। কিন্তু গুনিন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গুরুর হুকুম আছে উপকারের বিনিময়ে পুরস্কার নিও না। নিলে ঈশ্বর কুপিত হবেন।
ঘটনার পরদিন ভোরে পুলিশ এসে বিজন সর্বজ্ঞকে থানায় নিয়ে গেল। থানার ওসি বলেন, নজর আলী হুজুরের ধারণা, যে ব্যক্তি সোনার অলংকার কোথায় আছে ঠিকঠাক বলে দিতে পারে। সে ব্যক্তি তো চোর-ডাকাতের দলকেও বলে দিতে পারে গৃহস্থের অলংকার কোন কোন জায়গায় আছে। ওসি বলেন, এই যুক্তিতে, আপনাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন নজর আলী শাহ। আপনি বসে চা-বিস্কুট খান। সেকেন্ড অফিসার কিছুক্ষণের মধ্যে আপনাকে জেরা শুরু করবেন।
মিনিট পাঁচেক পরেই থানার সেকেন্ড অফিসার এসে বলেন : সর্বজ্ঞ মশাই। আপনাকে তিন ঘণ্টা ধরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে (আসলে কোনো প্রশ্নই তাঁকে করা হয়নি)। কাজ শেষ। আপনি বাড়ি যেতে পারেন।
৪. উপকার গ্রহণের পর কিছু কিছু লোক কী করে তার সরস কেচ্ছা শুনিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী।
অর্থকষ্টে জর্জরিত এক ব্যক্তি রোজার ঈদের আগে খামের উপরে লিখেছে-‘প্রাপক, আল্লাহ।’ ডাকঘরের লোকরা বিস্মিত। তারা খাম খুলে দেখেন চিঠিতে লেখা-‘ছেলেমেয়ে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ঈদ করার জন্য কিছু টাকা দেবেন দয়াময়।’
পোস্ট মাস্টারের উদ্যোগে ডাকঘরের কর্মীরা দয়াপরবশ হয়ে চাঁদা তুলে লোকটার ঠিকানায় দুই হাজার টাকা পৌঁছে দিয়ে জানায়-‘আল্লাহ পাঠিয়েছেন।’ ঈদুল আজহার আগে লোকটা আবার আল্লাহর ঠিকানায় চিঠি দেয়-‘রাব্বুল আলামিন, গত ঈদে আপনার টাকায় ঈদটা ভালোভাবেই করেছি। এবারও টাকা দরকার দয়াময়। তবে এবার ফেরেশতার হাতে পাঠানোর আবেদন করছি। কারণ আমার বিশ্বাস, গতবার আপনি চার হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বেজন্মার বাচ্চা বেজন্মা পোস্ট মাস্টারটা দুই হাজার টাকা মেরে দিয়েছে।
♦ লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন