পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আহলে বায়েত ও ইমাম হোসাইন (রা.)-এর বিশেষ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ ইমানের পরিচয় হিসেবেও নির্ধারিত। আহলে বায়েতের ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পূতপবিত্র রাখতে।’ সুরা আহজাব, আয়াত ৩৩। সুরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতেও আহলে বায়াতের বিশেষ মর্যাদার আভাস দেওয়া হয়েছে। হজরত জাবির (রা.) বলেন, ‘আমি আরাফার দিবসে রসুলুল্লাহকে তাঁর কাসওয়া নামক উটের ওপর বসে খুতবা দিতে শুনেছি। তিনি বলেন, ‘হে মানবসকল! আমি তোমাদের কাছে যা রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা এগুলো আঁকড়ে ধর বা প্রতিপালন কর তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তার মধ্যে এক হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং অন্যটি আমার আহলে বায়েত।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে।’ ইবনে মাজাহ। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রিয় নাতি হজরত হাসানকে (রা.) ভালোবাসতেন নয়নের টুকরা হিসেবে। আল্লাহর রসুল দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তাকে ভালোবাসি, অতএব তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যারা তাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসো।’ (বুখারি)। আহলে বায়েতের প্রতি ভালোবাসার দ্বারা যে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা অর্জন করা যায় সে বিষয়টি ওই হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে। তিরমিজি। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহকে ভালোবাসো তাঁর নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে, আমাকে ভালোবাসো আল্লাহর ভালোবাসার জন্য এবং আমার পরিবারকে ভালোবাসো আমার ভালোবাসার জন্য।’
১০ মহররম রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)সহ নবী পরিবারের বহু সদস্য ও সঙ্গী মিলে ৭২ জন শাহাদাতবরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ৬১ হিজরির ১০ মহররম শুক্রবার। ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ইমাম হোসাইন (রা.) তার হাতে বায়াত নিতে অস্বীকৃতি জানান। ইয়াজিদ ছিল দুশ্চরিত্র, বেনামাজি ও মদ্যপায়ী। হজরত মুয়াবিয়ার (রা.) ইন্তেকালের পর খিলাফতের ন্যায়সংগত দাবিদার ছিলেন হোসাইন (রা.)। নীতিজ্ঞানহীন ইন্দ্রিয়পরায়ণ ইয়াজিদের কাছে জীবনের বিনিময়েও হজরত হোসাইন (রা.) মাথা নত করতে রাজি ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের বায়াত গ্রহণ করলে ইসলামের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাঁর দেখাদেখি অন্য অনুসারীরাও ইয়াজিদের কাছ থেকে বায়াত নেবেন। ইমাম হোসাইন (রা.) অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসীন ইয়াজিদের বায়াত না নিয়ে বাতিলের সামনে মাথা নত না করার অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন। কুফাবাসী ইমাম হোসাইন (রা.)-কে চিঠির মাধ্যমে তাদের কাছে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার অবৈধ শাসন মোকাবিলায় তাঁর হাতে বায়াতের অঙ্গীকার করে বিপুলসংখ্যক চিঠি ইমাম হোসাইন (রা.)-এর কাছে প্রেরণ করা হয়। তারা ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খিলাফতের অধিক যোগ্য, তাঁর জন্য জানমাল কোরবানির জন্য প্রস্তুত এবং আহলে বায়াতের অনুরক্ত এমন বার্তা পাঠায়। তাদের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য হোসাইন (রা.) আপন চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে কুফায় পাঠান। কুফার গভর্নর নুমান বিন বশিরসহ ৪০ হাজার মানুষ মুসলিমের হাতে হোসাইন (রা.)-এর নামে বায়াত নেন। পরিস্থিতি হোসাইন (রা.)-এর অনুকূলে এমন বর্ণনা দিয়ে একজন পত্রবাহককে চিঠি দিয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফায় আসতে অনুরোধ করা হয়। ৬০ হিজরির ৮ জিলহজ পরিবারপরিজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা দেন। ‘জি জাশাম’ নামক স্থানে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের পক্ষ থেকে হুর ইবনে ইয়াজিদ ইমাম হোসাইনের পথরোধ করে এবং ইমাম কাফেলার সামনে ছাউনি ফেলে। হুর ইবনে ইয়াজিদ ইমাম হোসাইন (রা.)-কে তাদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করে। ইমাম হোসাইন (রা.) তাদের সঙ্গে চললেন। ৬১ হিজরির ৯ মহররম বৃহস্পতিবার ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর সঙ্গীসহ কারবালা প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন। কারবালায় অবস্থানের দ্বিতীয় দিনে আমর ইবনে সাদ ৪ হাজার সৈন্য নিয়ে ইবনে জিয়াদের পক্ষ থেকে কারবালায় পৌঁছে। ইয়াজিদ বাহিনীর পক্ষ থেকে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১০ মহররম ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবারপরিজন ও সঙ্গীদের নিয়ে জালিমদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হন এবং একে একে হোসাইন (রা.)সহ ৭২ জনের সবাই শাহাদাতবরণ করেন। পরিবারের নারী-শিশুসহ বাকি ১২৮ সদস্য বন্দি হন। ১০ মহররম কারবালার ময়দানে ইমাম হোসাইন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে যে অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা ইমানদারদের জন্য অনুসরণীয়। এ যুদ্ধে পাপিষ্ঠ শাসক ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া জয়ী হলেও ইতিহাস ইমাম হোসাইন (রা.)-কে স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে। তাঁর বিপরীতে ইয়াজিদকে ভাবা হয় ইসলামি চেতনার পরিপন্থি রাজতন্ত্রী ও স্বৈরচারী শক্তির প্রতিভূ হিসেবে।
♦ লেখক : ইসলামি গবেষক