শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:২০

লিটনের বিড়াল ছানা

আবুল কাশেম

লিটনের বিড়াল ছানা

গভীর মনোযোগের সাথে অঙ্ক কষছে লিটন। বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। সেই সকাল থেকে। আজ ছুটির দিন। কথা ছিল আজ বিকেল থেকে সবুজ সংঘ আয়োজিত কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টের খ-গ্রুপের খেলা শুরু হবে। বৃষ্টির কারণে প্রোগ্রামটাই মাটি। বাসার সবাই দিবা নিদ্রায় মগ্ন। বাসার নতুন কাজের ছেলেটা পর্যন্ত। ছেলেটা বয়সে লিটনের চেয়ে বছর দুয়েক বড়। গ্রাম থেকে যখন প্রথম আসে তখন দিনে ঘুমুতে দেখে অবাক হতো। আর এখন নিজেই শহরে আরামে গা ভাসিয়েছে। লিটনের একা একা ভালো লাগছিল না। বাহিরে যাওয়াও বন্দ, নিরুপায় হয়ে অঙ্ক নিয়ে বারান্দায় চেয়ারে টেবিলের বসেছে, পায়ে সুঁড়ি সুঁড়ি অনুভূতি লিটনের একাগ্রতায় বাধা দেয়। টেবিলের নিচে তাকিয়ে ওর চোখ স্থির হয়ে যায়, ওমা! একি কান্ড, সাদা কালো মেশানো এক ফুট ফুটে বিড়াল ছানা। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গায়ের লোমগুলো লেপটে গেছে। থেমে থেমে মিউ মিউ করছে। অঙ্ক নিয়ে ব্যস্ত ছিল বলে শব্দটা শুনতে পায়নি।

বিড়াল ছানাটা বোধ হয় বুঝতে পেরেছে যে লিটন ওর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। লিটনের পায়ের সাথে ঘা ঘষছে আর মিউ মিউ করছে। যেন বলছে দেখ, আমার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে। জ¦রে কাঁপছি আমাকে একটু আশ্রয় দাও। পৃথিবীর সমস্ত মায়া যেন লিটনের মনে এসে জমা হলো। নিচ থেকে তুলে বিড়াল ছানাটিকে টেবিলের উপর রাখলো লিটন। তারপর এক দৌড়ে বাথরুম থেকে ওর তোয়ালেটা নিয়ে এলো, ভালো করে গা মুছে দিল, চুলোর উপর গরম দুধ জ¦াল দেওয়া ছিল, লিটন বাটিতে করে খানেকটা দুধ এনে দিল, বিড়াল ছানাটি চুক চুক করে খেতে লাগল, লিটন মজা পাচ্ছে। ভাবছে ওর জন্য এত বড় একটা চমক ছিল, আম্মা ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দেখলেন লিটন বিড়াল নিয়ে খেলা করছে, তিনি কপাল কুঁচকে ধমকে উঠলেন। লিটন ছিঃ ছিঃ তুমি বিড়াল ধরেছ। ডিপথেরিয়া হবে যে, যাও শিগগির হাত ধুয়ে এসো। এই বিড়ালটা আবার কোথেকে এল? কাদের, কাদের, এই কাদের বিড়ালটাকে দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আয়, লিটন করুণ চোখে আর্তনাদ করে ওঠে, না আম্মু। এটা আমার বিড়াল বান্টি, এটাকে আমি পুষব। লিটন বিড়াল ছানাটিকে বুকে আঁকড়ে ধরে এমন করুণ মুখ করে রাখে যে আম্মু কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরপর থেকে লিটন দিন রাত্রি কাটে বান্টি নিয়ে। বিকেল বেলা খেলতে যায় না, বন্ধুরা ডাকতে এসে ফিরে যায়, রাতে প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে বসে উসখুস করে। স্যার একবার আমার বান্টিকে দেখে আসি, স্কুলে যাওয়ার আগে বান্টিকে তুলে নিয়ে আদর করে বান্টিও মিউ মিউ করে আদর নেয়। একদিন হয়তো বান্টি মিউ মিউ করছে না। ব্যাস! স্কুলে যাওয়া বাদ। কারণ বান্টির মন খারাপ স্কুলের হোমটাস্ক করতে বসে লিটন একটু পর পর বলে, বান্টি সোনা ওদিকে যেও না। এটা ধরো না, ওখানে উঠো না। পড়ে যাবে এদিকে এসো। মানুষের বছরে একবার জন্মদিন আসে, কিন্তু বান্টির জন্মদিন মাসে চার বার পালিত হয়। প্রতি শুক্রবার এইবার বান্টি প্রথম লিটনের কাছে এসেছিল কিনা। বিশেষ দিনে বিশেষ খাবার। মাছ, মাংস, দুধ, ভাত বান্টির মঙ্গল চিন্তা সারাক্ষণ লিটনের মাথায় ঘুরপাক খায়। আম্মু তার একমাত্র ছেলের এহেন অত্যাচারও সহ্য করতেন কিন্তু যেদিন লিটন স্কুল হতে প্রোগ্রেস রিপোর্টটা হাতে নিয়ে লিটনের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বললেন, এবার অন্তত ক্ষান্ত হও বাবা! পরদিন স্কুল থেকে ফিরে লিটন যথারীতি বান্টি বান্টি বলে চেঁচাতে লাগল কিন্তু বান্টির কোন সাড়া শব্দ নেই। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে লিটন ক্লান্ত হয়ে আম্মুকে জিজ্ঞেস করল, বান্টি কোথায়? আম্মু উত্তর না দিয়ে গম্ভীর মুখে অন্যদিকে চলে গেলেন। লিটন ঠাস করে কাদেরের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল।

কাদের ভ্যাঁ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার কী দোষ? আম্মাইতো দূরে ফ্যালাইয়া দিতে কইল। রাগে দুঃখে লিটনের চোখে পানি চলে এল, দৌড়ে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। বালিশে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল, কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল লিটন টের পায় নি। পায়ে সুঁড়সুঁড়ি পেয়ে ঘুম ভাঙে। তাকিয়ে দেখে বান্টি। তড়াক করে উঠে বসে লিটন ছোঁ মেরে বান্টিকে কোলে তুলে নেয়। বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে, বান্টিও মিউ মিউ করতে থাকে। যেন বলছে আর পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ো না। এবার না হয় রাস্তা চিনে আসতে পেরেছি। এরপর হয়তো আরো দূরে কোথাও রেখে আসবে। কাজেই আমার দিকে তাকিয়ে অন্তত পড়াশোনায় মন দাও।


আপনার মন্তব্য