শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মে, ২০২১ ২৩:৪৮

কচ্ছপের গল্প

নেয়ামুল নাহিদ

কচ্ছপের গল্প
Google News

এখন তোমরা কচ্ছপকে যতটা লাজুক দেখো, সে অতটা লাজুক ছিলো না। সেও অন্যদের মত মাথা উঁচু করেই সবার সামনে দিয়ে চলতো, কাউকে দেখেই মাথা খোলসের মধ্যে লুকিয়ে ফেলতো না।

অনেক দিন আগের কথা। তখন কুমির, শুশুক আর কচ্ছপ মিলেমিশে থাকতো। একজন আরেকজনের পাশে থাকতো, গল্প করত আর খুনসুটিও করতো। বিশেষ করে শুশুক তো কচ্ছপ আর কুমিদিকে একটুও আরামে থাকতে দিতো না। কুমিরকে, শুশুক আর কচ্ছপ কুমিদি বলে ডাকতো। রোদে শুয়ে যখন তারা রোদ পোহাতো, তখন শুশুক জলের উপর ভেসে পানি ছিটিয়ে গা ভিজিয়ে দিতো। ওরা মাঝেমাঝে শুশুককে তাড়া করতো, কিন্তু কার সাধ্য যে শুশুককে ধরে ফেলে! তবে এরকম দুষ্টুমি করলেও, কেউ কাউকেই ছেড়ে যেতো না। বিপদে-আপদে পাশেই থাকতো, আসলে তারা তো ছিলো খুব ভালো বন্ধু।

একদিন এক শীতের সকালে কচ্ছপ খুব আয়েশ করে রোদে পিঠ দিয়ে শুয়ে আছে আর অমনি শুশুক এসে পানি ছিটিয়ে দিলো। সে কুমিদির কাছে অভিযোগ করলো।

কুমিদি হেসে বললো- রাগ করিস না কচ্ছু, আয় তোকে নদী থেকে ঘুরিয়ে আনি।

কুমিদি আদর করে কচ্ছু বলে ডাকতো ওকে।

‘তুমি আবার নদীর মাঝে নিয়ে ডুব দেবে না তো, আমার আজ খুব ঠান্ডা লাগছে’ বললো কচ্ছপ।

কুমিদি বললো- আরে না না, তুই আয় তো।

কচ্ছপ খুশি হয়ে কুমিদির পিঠে উঠে বসলো। ওরকমভাবে নদীতে ঘুরে ঘুরে রোদ পোহাতে কি যে ভালো লাগতো কচ্ছপের! হঠাৎ দেখা গেলো শুশুক পাশে এসে হাজির।

কচ্ছপ মাথাটা একটু পিছনে নিয়ে বললো- দেখ শুশুক, পানি ছিটাবি না। অনেক ঠান্ডা!

হি হি হি, শুশুক হাসলো। বললো- এতো ঠান্ডা কেন তোর?

‘এমনি, তাতে তোর কি?’ 

তারা গল্প করতে করতে ঘুরতে লাগলো- পুরোনো দিনের গল্প, তাদের ঘরসংসারের গল্পও বাদ গেলো না। নানা গল্প করতে করতেই কুমির একসময় হাসিহাসি মুখ করে বললো- একটা খুশির খবর আছে। কে কে শুনতে চায়?

শুশুক জলের উপর লাফ দিয়ে উঠে বললো- আমি, আমি, আমি।

কচ্ছপ যোগ করলো- আর আমিও।

তাহলে শোন- কুমিদি বললো। সামনের সপ্তাহেই আমাকে ডিম পাড়তে হবে। কিন্তু একটা কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে।

ডিমের খবর তো খুশির খবর, কিন্তু কি নিয়ে ভাবছো কুমিদি? জানতে চাইলো কচ্ছপ।

সাতদিনের জন্য আমাকে পাশের নদীতে যেতে হবে, মেজদির অসুখ। কিন্তু ডিম পেড়ে রেখে গেলে তো বিপদ হতে পারে। তোদের কেউ যদি পাহারা দিতে পারিস, তাহলে খুব ভালো হতো।

অনেক আগ্রহ নিয়ে বললো কুমিদি।

সবাই বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। একটু পর কুমিদিই বললো- হ্যাঁ রে কচ্ছু, তুই তো জল ডাঙ্গা সবখানেই থাকতে পারিস। তুই আমার সোনামানিক ডিমগুলোকে কয়েকদিন দেখে রাখতে পারবি না?

শুনেই শুশুক বেশ মন খারাপ করলো, তাকে দায়িত্ব দেয়নি বলেই বোধ হয়! সে বললো- এ ভুল করো না কুমিদি। তুমি তো জানোই- কচ্ছু খুব অলস। তাছাড়া ওর যা ঘুম, ঘুমিয়ে পড়লে তোমার ডিমের কথা ওর খেয়ালই থাকবে না।

কচ্ছপকে অলস বলায় ও একটু ক্ষেপে গেলো। সে বললো- কুমিদি যখন বলেছে তখন আমি ঘুম ছাড়তে পারি। আগে তো দায়িত্ব, যেভাবেই হোক ডিম আমি পাহারা দিতে পারবো।

তবুও শুশুক প্রতিবাদ করলো- কুমিদি আরেকবার ভেবে দেখো! ডিমগুলো হারিয়ে গেলে কিন্তু কেঁদে কুল পাবে না।

কচ্ছপ রেগে গেলো- আরে যা যা। আমি থাকলে ডিমের কিচ্ছু হবে না।

কিন্তু কুমিদিরও তো কোনো উপায় ছিলো না। মেজদির বয়স হয়েছে, কখন কি হয় বলা যায় না। অনেক বলেকয়েই কয়েকটা দিন সে নিয়েছে, যাতে ডিমগুলো পেড়ে রেখে যাওয়া যায়। আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ডিম পাড়তে তার একদম ভালো লাগে না। এসব ভেবেই সে সিদ্ধান্ত নিলো- কচ্ছপকেই ডিম পাহারার দায়িত্ব দেবে।

কুমিদি দুদিন পরেই অনেকগুলো ডিম এনে কচ্ছপকে ডেকে বললো- দেখিস কচ্ছু, আমার সোনামানিকদের ঠিকমত দেখে রাখিস।

কচ্ছপ মুচকি হেসে বললো- তুমি যাওতো কুমিদি। আমি আছি, তোমার ডিমের কিচ্ছু হবে না।

এরপর তিনদিন কেটে গেলো। কচ্ছপ ডিমের কাছ থেকে নড়তেই পারে না। ভয় হয়- পাছে ডিমের কিছু হলে প্রাণিসমাজে তার মানসম্মান বলে কিছু থাকবে না। পাড়া প্রতিবেশীর সামনে সে মুখ দেখাতে পারবে না।

চার দিনের দিন হলো কি, কচ্ছপের একটু ঝিঁমুনি এসেছে। সে ভাবলো- ঘুম আসবে না, কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তার খেয়াল নেই। অনেকক্ষণ পরে যখন ঘুম ভাঙল, তখন ভয়ে আর লজ্জায় মাথাটা আপনিই ছোট হয়ে এলো ওর। দেখলো- কয়েকটা ডিম ভেঙে পড়ে আছে আর বাকিগুলো উধাও।

কয়েকদিন চারদিকে খুঁজে সে পেরেশান হয়ে গেলো, কিন্তু ডিমগুলো আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। কুমিদি এসে কান্নাকাটি করলেন। প্রতেবেশীদের ডেকে ডেকে বললেন- এই কচ্ছপটাই আমার ডিম নষ্ট করেছে। তাকে বিশ্বাস করলাম আর সে আমার এতো বড় ক্ষতি করলো!

কেউ কচ্ছপের কথাকে পাত্তা দিলো না। সবাই কচ্ছপকেই দোষারোপ করতে লাগলো। প্রতিবেশী সকলের নানা তিরস্কারের কথায় তার খুব কষ্ট হলো। তাকে দেখলেই নানাজনে নানা কটুকথা শোনাতো।

কচ্ছপের মাথায় শুধু ঘুরপাক খেতে লাগলো- সে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেনি। নদীপাড়ের এই প্রাণিসমাজে কথা দিয়ে কথা রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর না রাখা খুব লজ্জার।

সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করতো তার একসময়ের বন্ধু শুশুক। নদীর জলে ভেসে উঠে সে খিলখিল করে হাসতো। আগের চেয়ে বেশি পানি ছিটিয়ে দিতো আর টিটকিরি করতো।

তারপর থেকেই কচ্ছপের এমন হলো যে কাউকে দেখলেই তার মনে হতো- সে বুঝি তারই সমালোচনা করছে। আপনাআপনি লজ্জায় যেন তার মাথাটা খোলসের মধ্যে হারিয়ে যেতো! অনেক অনেক দিন কেটে গেছে, কিন্তু কচ্ছপের এ লজ্জা এখনো যায়নি।