শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

কবর নিয়ে রাজনীতি নাকি রাজনীতির কবর

সৈয়দ বোরহান কবীর

কবর নিয়ে রাজনীতি নাকি রাজনীতির কবর

বাংলাদেশে কয়েক দিন ধরে ‘কবর’ বিতর্ক সরগরম। চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবর আছে কি নেই এটিই যেন দেশের প্রধান সমস্যা। রাষ্ট্র, সমাজে যেন কোনো ইস্যু নেই। একমাত্র ইস্যু কবর। দেশে সব মানুষের করোনার টিকা কবে কী হবে তা নিয়ে যেন কোনো মাথাব্যথা নেই। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেন জ্যোতিষী মন্ত্রী, প্রতিদিন টিকা দেওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। গণটিকার জন্য দেশের জনগণকে ডেকে এনে হয়রানি করেন। এ নিয়ে রাজনীতিতে কারও টুঁশব্দ নেই। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে তা নিয়ে বিতর্ক নেই, রাজনীতিবিদদের মাথাব্যথা নেই। বিতর্কের একমাত্র ইস্যুই হলো চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার সমাধিতে আসলে কী আছে। এ বিতর্কে আওয়ামী লীগের একেকজন মন্ত্রী যেন গবেষক, প্রত্নতত্ত্ববিদ। জিয়ার কবর এবং লাশ দেখা না দেখা নিয়ে বিতর্কে বাংলাদেশের রাজনীতির যে কবর রচিত হচ্ছে তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কবরে লাশ খোঁজার অরুচিকর বিষয় রাজনীতির জনবিচ্ছিন্নতারই এক প্রমাণ। আমাদের মতো মূর্খ আমজনতা তীব্র এবং উত্তপ্ত ‘কবর’ বিতর্কে খানিকটা বিভ্রমে পড়েছে বইকি। ধরা যাক, চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবর নেই। এতে রাষ্ট্রের বা আওয়ামী লীগের কী লাভ? আবার আমরা যদি ধরে নিই, চন্দ্রিমা উদ্যানেই জিয়ার কবর। তাতে রাষ্ট্রের বা আওয়ামী লীগের কী ক্ষতি? কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না। তবে এ প্রত্নতাত্তি¡ক বিতর্কে সবচেয়ে লাভ হয়েছে বিএনপির। কোথা থেকে বিএনপিকে তুলে তাকে জীবিত করার এক প্রাণান্ত চেষ্টা চলছে। ১ সেপ্টেম্বর ছিল বিএনপির ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ক্ষমতার গর্ভে জন্ম নেওয়া দলটি গত ১৫ বছরে অস্তিত্বের সংকটে। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এখন ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবে স্বীকৃত। তরুণ প্রজন্ম যত সঠিক ইতিহাস জানছে ততই জিয়া পরিত্যক্ত অধ্যায় হচ্ছেন ইতিহাসের পাতায়। ’৭৫-এ জিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের রায়েই বিস্তারিত বলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে জিয়া যে জড়িত ছিলেন তা সর্বোচ্চ আদালতের রায়েই প্রমাণিত। ’৭৫-এর পর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জিয়া ক্ষমতায় আসেন। জিয়া কীভাবে বিচারের নামে তখন প্রহসন করে কর্নেল তাহেরকে হত্যা করেছেন তা আজ সবাই জানে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত একে ‘হত্যাকান্ড’ বলে রায় দিয়েছে। জিয়া যে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাঁচাতে তাদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তা-ও প্রমাণিত। বিএনপিও এখন অস্বীকার করে না যে জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দিয়েছিলেন। জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কূটনৈতিক চাকরি দিয়েছিলেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের শিরোমণি গোলাম আযমকে পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছিলেন। জিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে স্বাধীনতাবিরোধী ফ্যাসিস্ট দল জামায়াতকে রাজনীতি করার অনুমতি দিয়েছিলেন। রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত আমাদের সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উপড়ে ফেলেছিলেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য ১৩ হাজারের বেশি সৈনিক এবং সেনা কর্মকর্তাকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন জিয়া। এখন সত্যগুলো আজ প্রকাশিত। দেশের জনগণ এখন ইতিহাস জানে, বোঝে। তাই জিয়াকে নিয়ে উচ্ছ্বাস-আবেগ এখন আর কারোরই নেই। ইতিহাস এমন এক জায়গা যেখানে মিথ্যা বেশিদিন বসতি গড়তে পারে না। বিএনপিও এখন দিবস ছাড়া জিয়াচর্চা করে না। বিএনপির নতুন প্রজন্মের মধ্যে ‘ভাইয়া’-প্রেম আছে, জিয়া-প্রেম নেই। বিএনপির নেতারা এখন জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলে ইতিউতি তাকান কেউ মুখ টিপে হাসল কি না। সেই জিয়াকে যেন জীবিত করার মহান দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন আওয়ামী লীগের কতিপয় মন্ত্রী। জার্মানিতে এখন কেউ নাৎসি নিয়ে কথা বলে না। এ নিয়ে কথা বলাটা অনেকে অপরাধ মনে করে। এটা না বলার কারণ সম্পর্কে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এসব নিয়ে যত কম আলোচনা ততই জার্মানদের মঙ্গল। আলোচনা মানেই হলো নাৎসিবাদ জিইয়ে রাখা।’ এখন জিয়াকে নিয়ে ঘটা করে আলোচনা করে তাঁর আকর্ষণ জিইয়ে রাখা হচ্ছে।

বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা বেগম খালেদা জিয়া। জিয়ার মৃত্যুর পর যিনি বিএনপিকে নবজীবন দিয়েছিলেন। বেগম জিয়াকে বলা হতো ‘আপসহীন নেত্রী’। কিন্তু এবার তাঁর আপসের মুখোশটা খুলে গেছে। ১৭ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন নাজিমউদ্দিন রোডে না থেকে ফিরোজায় থাকার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। বেগম জিয়া এখন বিএনপির কাগজে আছেন, বাস্তবে নেই। মুখে কুলুপ এঁটে তিনি বসে আছেন। তাঁর এখন একটাই প্রার্থনা- আর যেন জেলে যেতে না হয়। বিএনপির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তারেক জিয়া। মূলত বিএনপির এখনকার প্রধান নেতা হলেন তারেক জিয়াই। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। তারেক জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ একজন ব্যক্তি। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার তীব্র ইমেজ সংকট রয়েছে। এখন বিএনপির মধ্যেই তার বিরুদ্ধে পদবাণিজ্য এবং মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ শোনা যায়। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরা কয়েক দফা তাকে রাজনীতি থেকে সাময়িক বিদায়ের আহ্‌বান জানিয়েছিলেন। বিএনপির শুভাকাক্সক্ষীরা প্রায়ই হাহুতাশ করেন তারেক জিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে। তারেক রহমানের হাতে বিএনপি নিরাপদ নয়- এমন কথা কান পাতলেই শোনা যায়। তারেক রহমান বিদেশে বসে ভিডিওকলে দল চালান। একটি রাজনৈতিক দল যে এভাবে চলতে পারে না তা তো বিএনপিকে দেখলেই বোঝা যায়। তারেক বিদেশে আর বেগম জিয়া স্বেচ্ছায় ফিরোজায় বন্দী থাকায় বিএনপির কার্যকরী প্রধান নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি মহাসচিব। বিএনপির ইতিহাসে এত ক্ষমতাহীন এবং কর্তৃত্বহীন মহাসচিব দেখা যায়নি। দলে যেমন তিনি ক্ষমতাবান নন, জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের আলোয় আলোকিত নন। বিএনপি মহাসচিবের একমাত্র কাজ হলো কথা বলা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, আওয়ামী লীগের সমালোচনার জবাব দেওয়া। ২০১৮-এর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর তার পদত্যাগের দাবি উঠেছিল বিএনপিতেই। কিন্তু বিএনপি এতই দুর্দশাগ্রস্ত এক রাজনৈতিক দল, এর মহাসচিব হতেও কেউ আগ্রহী নয়। দলটির স্থায়ী কমিটিও পূর্ণাঙ্গ নয়। বিএনপির জন্য এখন কেবল করুণাই করা যায়। বিএনপি কত দিনে এবং কোন প্রক্রিয়ায় মুসলিম লীগে পরিণত হবে তা নিয়ে অনেকে গবেষণাও করেন আজকাল। বিএনপির মধ্যেই হতাশার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় সর্বত্র। এ রকম একটি হতাশ, জীর্ণ, বিবর্ণ এবং প্রায় বিলুপ্ত রাজনৈতিক দলটি যেন জাদুর কাঠির ছোঁয়ার নতুন জীবন পাচ্ছে। আওয়ামী লীগের কিছু কিছু নেতা এমনভাবে জিয়া এবং বিএনপি নেতাদের সমালোচনা করছেন যেন বিএনপি যে কোনো সময় আওয়ামী লীগের ঘাড় মটকাবে। বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগের কল্যাণে যেন কিছু কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। রাজনীতিতে সেই পুরনো উত্তাপের আঁচ কিছুটা হলেও লাগছে।

কবর বিতর্কে দীর্ঘদিন পর রাজনীতিবিদদের লাইমলাইটে দেখা যাচ্ছে। জিয়ার লাশের লুকোচুরি গল্পে মাতোয়ারা এখন রাজনীতির মাঠ। কিন্তু এ কবর আর লাশ বিতর্ক কি দেশের প্রধান দুই দলের বিতর্কের ইস্যু হতে পারে? রাজনীতি মানে আসলে কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনীতির সহজ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি এবং কৌশল। একটি নির্দিষ্ট আদর্শ, নীতি এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। যারা এ নীতি, আদর্শ বিশ্বাস করেন তারা ওই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন। ওই আদর্শ ও কর্মসূচি তারা অন্যদের মধ্যে প্রচার করেন। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ করেন। জনগণ যে আদর্শ ও কর্মসূচি পছন্দ করে নির্বাচনে তাকে ভোট দেয়। জনগণের ভোটে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় সে দল ক্ষমতায় আসে। সরকার গঠন করে। ক্ষমতায় থাকার পর রাজনৈতিক দলটি তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করে। একটি রাজনৈতিক সরকারের প্রধান কাজ জনকল্যাণ করা। যে দল জনগণের ম্যান্ডেট পায় না তারা বিরোধী দলে থাকে। ওই দলের প্রধান কাজ সরকারের ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়া। সরকারের যেসব কর্মসূচির সঙ্গে তারা একমত নয় সেসব কর্মসূচির বিকল্প দিয়ে জনগণের মন জয়ের চেষ্টা করা। যেন পরের নির্বাচনে জনগণ তাদের পক্ষে রায় দেয়। মোটা দাগে রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো জনগণ এবং জনগণের কল্যাণ। একটি রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের পথে এগিয়ে নেওয়াই রাজনীতি। রাজনীতির মূল কথা হলো জনগণ। রাজনীতির মূল প্রাণ হলো আদর্শ। আদর্শহীন রাজনীতি সম্পর্কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘রাজনীতি স্বচ্ছ থাকবে জগাখিচুড়ি হবে না। আদর্শহীন লোক নিয়ে ক্ষমতায় গেলেও দেশের কাজ হবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার হতে পারে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী : শেখ মুজিবুর রহমান, পৃষ্ঠা ২৪৯)। এজন্যই একটি জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণে রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি স্বপ্ন দেখায়। এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। একটি জাতিরাষ্ট্রের বিনির্মাণের সোপান গড়ে। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি দিয়েই বাঙালির মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন। রাজনীতি দিয়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজনীতি দিয়েই তিনি উন্নয়নের পথরেখা এঁকেছেন। রাজনীতিহীন একটি রাষ্ট্র অনেকটা মুন্ডহীন মানুষের মতো। রাজনীতি জনগণের ক্ষমতায়নের এক প্রতিরূপ। রাজনীতি একমাত্র বিষয় যেখানে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-হতাশা মূল্যায়িত হয়। রাজনীতির মাধ্যমেই রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছে থাকে। রাজনীতি ছাড়া একটি রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বৈরতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র অথবা জনবিচ্ছিন্ন সুশীলতন্ত্র। তাই একটি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলো যত সক্রিয়, জনগণের অধিকার ততই প্রাণবন্ত। রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলের নীতি, আদর্শ এবং কর্মসূচির বাহাসেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এ গণতন্ত্রই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। গণতন্ত্রই জনআকাক্সক্ষার আলোকে উন্নয়ন ঘটায়। এ কারণেই আমরা দেখি অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় এসে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে, রাজনৈতিক কর্মকান্ডের গলা টিপে ধরে।

ইদানীং রাজনীতিকে হত্যার নতুন কলাকৌশলও দেখা যায়। আমলা বা বিশেষ গোষ্ঠী এমনভাবে সবকিছু পরিচালিত করে যেন রাজনীতি নির্বাসনে যায়। লুটেরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিকে গুরুত্বহীন করা হয়। অবাধ পুঁজিবাদে কিছু মানুষের কাছে শুধু সম্পদই কুক্ষিগত হয় না, রাষ্ট্রক্ষমতাও কুক্ষিগত হয়। লুটেরা পুঁজিবাদে জনগণের মনোজগতে ধনিক গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম পরিকল্পিতভাবে রাজনীতিবিদ্বেষ ছড়ায়। ফলে সাধারণ মানুষ আস্তে আস্তে রাজনীতির ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়ে ভোট এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকেও জনগণ নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। রাজনীতি মানেই খারাপ, এ রকম একটি প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে রাজনীতির প্রতিপক্ষ করা হয়। পুঁজিবাদী সমাজে যে কোনো মূল্যে ধনী হওয়ার এক অনৈতিক মানসিকতা মাদকের মতো জনগণের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সার নেশায় মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, অমানবিক পশুতে রূপান্তরিত হয়। সমাজে পচন ধরে। অর্থবিত্তই হয়ে ওঠে একমাত্র আরাধ্য। শিক্ষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ভালোবাসা ক্রমে মূল্যহীন হয়ে ওঠে। সুস্থ ও কল্যাণকামী রাজনীতি যেন সমাজের এ বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে না পারে সেজন্য রাজনীতিতেও ঢোকানো হয় লোভ, দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন। রাজনীতি হয়ে ওঠে জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন লুটেরাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সিঁড়ি। রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ ঘটে লুটেরা, দুর্বৃত্ত, কালো টাকার মালিকদের। রাজনীতি হয়ে ওঠে আরেকটা ব্যবসা। সবচেয়ে দ্রুত ধনী হওয়ার সিঁড়ি। যে কোনো মূল্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে ঢুকে পড়ে দুর্বৃত্তরা। এরপর কিছু বিনিয়োগ করে নেতা বনে যায়। তারপর টেন্ডারবাণিজ্য, বদলিবাণিজ্য, নিয়োগবাণিজ্য। ব্যস। রাতারাতি ভাগ্য পাল্টে যায় কিছু ব্যক্তির। জনগণও দেখে রাজনীতি আসলে কিছু ব্যক্তির টাকা বানানোর মেশিন। তখন জনগণের মধ্যে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদ সম্পর্ক প্রচন্ড ঘৃণা তৈরি হয়। রাজনীতিবিদদের মানুষ ভাবে অর্থলোভী। এ সময় বিরাজনীতিকরণের পৃষ্ঠপোষকরা ঢোলে আরও জোরে বাড়ি দেয়। জনগণকে বোঝায় রাজনীতিবিদদের জন্য সবকিছু নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতি এবং লুটেরা একাকার হয়ে যায়। গণতন্ত্র, সংসদ, জনপ্রতিনিধিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হতে থাকে। তখনই মঞ্চে আবিভর্‚ত হয় অগণতান্ত্রিক শক্তি। যাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। তবু রাজনীতিবিদদের শায়েস্তা দেখে জনগণ হাততালি দেয়। বাংলাদেশে এ প্রক্রিয়ার নীরব বাস্তবায়ন চলছে। নানা ভাবে নানা রূপে। ফলে আদর্শবাদী রাজনীতিবিদরা হয় বনবাসে গেছেন অথবা যুগের হাওয়ার সঙ্গে নিজেকে পাল্টে ফেলেছেন।

২০০৮-এর নির্বাচনের পর টানা ১৩ বছর ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের শিকড় অনেক গভীরে। এ দলটির সঙ্গে এ দেশের মাটি এবং মানুষের সম্পর্ক। এ দলটির হাত ধরেই জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা এ বাংলাদেশ পেয়েছি। আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি। প্রথমত, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ। সেই যুদ্ধে আওয়ামী লীগ এখন অনেকটাই সফল। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। দ্বিতীয়ত, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই চ্যালেঞ্জে আওয়ামী লীগ অনেকটাই ব্যর্থ এবং পরাজিত। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা প্রয়াত মোহাম্মদ ফরহাদ বলেছিলেন, ‘রাজনীতি যদি রাজনীতিবিদদের হাতে না থাকে যদি লুটেরাদের হাতে যায় তাহলে তা হয় ভয়াবহ। সেই রাজনীতি জনগণের কোনো কল্যাণ দিতে পারে না।’ ’৭৫-এর পর থেকে অস্তিত্বের প্রয়োজনে আওয়ামী লীগকে অনেক আপস, সমঝোতা করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগে ব্যবসায়ী, আমলা, সুবিধাবাদী লুটেরারা বানের পানির মতো ঢুকে গেছে। এরা এখন আওয়ামী লীগকেই গিলে খাচ্ছে। এদের লক্ষ্য একটাই- ক্ষমতায় থাক, টাকার পাহাড় গড়। এরা টাকা দিয়ে কমিটিতে ঢুকছে। মনোনয়ন নিয়ে এমপি হচ্ছে, মন্ত্রী হচ্ছে। ভোটের জন্য এদের এখন আর জনগণের কাছে যেতে হয় না। তাই কুৎসিত, কদর্য কায়দায় তেলবাজি আর অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়াই এদের একমাত্র কাজ। এরা না জানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, না জানে আওয়ামী লীগের ত্যাগের ইতিহাস। এরা মুখে শেখ হাসিনার কথা বলে ফেনা তোলে আর মনে কোথায় টাকার খনি আছে তা খোঁজে। এরা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য, চাটুকার। তা না হলে ১৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভানেত্রী কোন প্রেক্ষাপটে, কেন জিয়ার কবর প্রসঙ্গ এনেছিলেন তা যাচাই-বাছাই না করেই এ ধরনের কুৎসিত কবরযুদ্ধে লিপ্ত হতো না। কবরযুদ্ধের তর্কে নেমে এরা কেবল সরকার এবং আওয়ামী লীগের ক্ষতি করছে না, সবচেয়ে ক্ষতি করছে রাজনীতির। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ওই দিন জিয়ার কবর প্রসঙ্গ এনেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। তিনি বলেছিলেন বিএনপি ঢাকা মহানগরী কমিটির জিয়ার কবরে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে তান্ডব করার পরিপ্রেক্ষিতে। চন্দ্রিমা উদ্যানে বিএনপির উচ্ছৃঙ্খলতার উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেছিলেন, ‘তারা যে জিয়ার কবরে গিয়ে হইচই করে তারা জানে না সেখানে জিয়ার কবরই নেই!’ পরিপ্রেক্ষিত, কার্যকারণ বিচার-বিশ্লেষণ না করেই আওয়ামী লীগের কতিপয় অতি উৎসাহী বিষয়টি লুফে নিলেন। তাদের ধারণা (অথবা তারা নিশ্চিত) এ নিয়ে কথা বললে ‘নেতা’ খুশি হবেন। নেতা খুশি থাকলেই চেয়ার ঠিক থাকবে। চেয়ার ঠিক থাকলে টাকার গাছও সজীব-সতেজ থাকবে। এরা যদি এতই নেতাভক্ত আদর্শবাদী হবেন তাহলে নেতার সব নির্দেশ তো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময় বলেন : ‘দুর্নীতি করবেন না’, ‘জনগণের কল্যাণে ত্যাগ স্বীকার করুন’, ‘রাজনীতি ত্যাগের ভোগের নয়’, ‘রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করবেন না’। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর এ নির্দেশগুলো যদি আওয়ামী লীগের এসব অতি উৎসাহী অর্ধেকও পালন করতেন তাহলে বাংলাদেশের চেহারাটা অন্যরকম হতো। টিকা ছাড়া বের হওয়া যাবে না- এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করা মন্ত্রী যখন কবর নিয়ে মাতামাতি করেন তখন ভয় হয়। যে মন্ত্রী পদ্মা সেতুতে ফেরির ধাক্কা বন্ধ করতে পারেন না, তিনি যখন বলেন ‘আওয়ামী লীগ দরজা খুলে দিলে বিএনপি করার লোক থাকবে না’, তখন লজ্জিত হই। নিজের কাজটা না করে কবরে লাশ খোঁজাটা নিশ্চয়ই মন্ত্রীদের কাজ নয়। দলের সাংগঠনিক দায়িত্বটা না পালন করে জিয়ার কবর নিয়ে অনুসন্ধান নেতার কাজ নয়। শেখ হাসিনাকে খুশি করতে ‘কবর’ ‘কবর’ করে যে নেতারা আর্তনাদ করছেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ- দয়া করে বলুন, দুর্নীতি না করে আমরা শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করব, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। জনগণকে হয়রানি করব না। অসত্য কথা বলব না। তা হলেই শেখ হাসিনার প্রতি আসল শ্রদ্ধা ও আনুগত্য জানানো হবে।

আমি ধন্যবাদ জানাই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে। যিনি বলেছেন, ‘জিয়াউর রহমানের কবর সরানো নিয়ে এ মুহুর্তে সরকারের সিদ্ধান্ত নেই।’ আশা করি এর ফলে আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীদের কবর খোঁড়া বন্ধ হবে। কবর নিয়ে রাজনীতি না থামালে রাজনীতিরই কবর রচিত হবে। চাটুকার, বসন্তের কোকিলরা আশা করি এ কথাটি জানেন, ডালে বসে গাছ কাটলে নিজেকেই বিপদে পড়তে হয়। রাজনীতি না থাকলে আপনাদের নাদুসনুদুস মাখনমাখা চেহারাটা যে ভচকে যাবে তা একটু ভেবে দেখবেন।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।

ইমেইল : [email protected]